বাংলায় বৌদ্ধধর্মের হারিয়ে যাওয়া এবং বাঙালী মুসলমানের শিক্ষা-পর্ব ৪

আগের পর্বঃ  

১ম পর্বঃ বৌদ্ধরাই বাংলার আদিবাসী এবং গৌতম বুদ্ধ এই ধর্মটির প্রতিষ্ঠাতা নন শেষ প্রবক্তা

২য় পর্বঃ বৌদ্ধদের প্রতি বহিরাগত বর্ণ হিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গি

পর্ব ৩ঃ বৌদ্ধ ধর্মে বিভাজন ও কালচারাল ব্রাহ্মণায়নের শুরু 

ছয় শতকের গোড়ার দিক থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং ক্রমান্বয়ে স্থানীয় রাজাদের উত্থান হতে থাকে এবং স্থানীয় রাজাদের হাতেই বাংলা এবং উত্তর ভারত শাসিত হতে থাকে। সাত শতকের শুরুতে (৬০১ খ্রিস্টাব্দে) পশ্চিম বঙ্গে হিন্দু রাজা শশাঙ্কের আবির্ভাব হয়। তার শাসনকাল ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। শশাঙ্ক ছিলেন চরম বৌদ্ধ বিদ্ধেষী। শশাঙ্কের নিষ্ঠুর অত্যাচারে অনেক বাঙালি বৌদ্ধ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় ( R .C. Majumdar, বাংলা দেশের ইতিহাসঃ প্রাচীন যুগ, ১৯৮৮, পৃঃ১২৮)

৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ভারত ভ্ৰমণকারী চীনা পরিব্রাজক হিউয়ান সাং বলেন রাজা শশাঙ্ক গয়ায় বোধিবৃক্ষ ছেদন করেন এবং নিকটবর্তী বৌদ্ধ মন্দির থেকে বুদ্ধমূর্তি সরিয়ে সেখানে শিবের মূর্তি প্রতিস্থাপন করেন [T. Walters, on Yuan Chwang’s Travels in India (A.D 629-45), 1905, page 111, 115]। এছাড়াও পাটালিপুত্তা ও কুশীনারাতে বৌদ্ধদের অনেক বিহার এবং সৌধ ধ্বংস করা হয় (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯২)।

রাজা শশাঙ্কের বৌদ্ধনীতি সম্পর্কে রামাই পন্ডিতের শূন্য পুরান থেকে ধারণা পাওয়া যায়। ‘সেতুবন্ধ হইতে হিমালয় পর্যন্ত যেখানে যত বৌদ্ধ আছে তাহাদের বৃদ্ধ ও বালকদের পর্যন্ত যে না হত্যা করিবে, সে প্রাণদন্ডে দণ্ডিত হইবে-রাজভৃত্যদিগের প্রতি রাজার এই আদেশ (শ্রীচারু বন্দোপাধ্যায়, রামাই পন্ডিতের শূন্য পুরান, পৃষ্ঠা ১২৪)।

সংখ্যালঘু হিন্দুরা মেজরিটি বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের শাসন করতে গিয়ে যেই দমন-নিপীড়ন শুরু করেন তাতে এক গুমোট পরিবেশ তৈরী হয়, শশাঙ্কের মৃত্যুর সাথে সাথে এই পরিস্থিতির বিস্ফোরণ ঘটে। পরবর্তী একশত বছর পর্যন্ত অরাজক পরিস্থিতি চলতে থাকে যেটাকে মাৎসান্যায়ের একশো বছর বলা হয়। এই সময়ে একক কোনো রাষ্ট্র প্রধান ছিল না, ছোট ছোট সামন্তরা নিজ নিজ এলাকায় ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিল।

পাল শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণায়ন

বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ ক্ষমতার দ্বন্ধে একশত বছরের অরাজক পরিস্থিতির পর বৌদ্ধ ধর্মালম্বী গোপালের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত হয়, প্রায় ৪০০ বছর পাল বংশীয় বৌদ্ধরা বাংলা শাসন করে (৭৫০-১১৬২খ্রিস্টাব্দ)।শশাঙ্কের অত্যাচারে দেশ থেকে অনেক বৌদ্ধের পালিয়ে যাওয়া, কেউ বাধ্য হয়ে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করার পরও দেশের সংখ্যাগুরু মানুষ ছিল বৌদ্ধ ধর্মালম্বী।হিউয়ান সাং এর বর্ণনা অনুযায়ী বাংলা ছিল মূলত বৌদ্ধ ধর্মালম্বী লোকদের অঞ্চল (T. Walters পৃষ্ঠা ১৮২-১৯১)। তবে ততদিনে এই বৌদ্ধদের চার ভাগের এক ভাগ মহাযানী মতের অনুসারী হয়ে পরে (R. C. Mitra, The decline of Buddhism in India, Shantiniketan, 1954, P: 50)।

ফলে সংখ্যাগুরু ধর্মালম্বীদের প্রতিনিধি হিসেবে গোপালের ক্ষমতার গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসে। গোপাল তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একজন ব্রাহ্মণকে নিয়োগ দেয়। গোপালের পূর্ব পুরুষরা ছিল ব্রাহ্মণ, পরবর্তীতে তারা মহাযানী বৌদ্ধে কনভার্ট হয়। ফলে গোপাল বৌদ্ধ ধর্মালম্বী হলেও তার মধ্যে অত্যাধিক ব্রাহ্মণ প্রভাব ছিল এবং ব্রাহ্মণদের মধ্যে গোপালের গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। (ড. আব্দুল মু’মিন চৌধুরী, Rise and Fall of Buddhism in South Asia, ২০০৮, পৃষ্ঠা ২২৮)।

গোপালের ছেলে ধর্মপাল, প্রথম মহিপাল এর সন্তান নয়াপাল ব্রাহ্মণদের প্রতি খুব সহানুভুতিশীল ছিলেন এবং ভূমি দান করেছেন। অর্থাৎ পাল শাসনামলে বৌদ্ধদের প্রতি কোনো অত্যাচার-নির্যাতন হয়নি কিন্তু নীরবে-নিভৃতে ব্রাহ্মণায়ন ঘটেছে। রাষ্ট্র বৌদ্ধ ধর্মের মূলস্রোত থেরাবাদী বৌদ্ধদের তুলনায় হিন্দু প্রভাবিত মহাযানী, বজ্রযানী এসব সম্প্রদায়কেই মূলত পৃষ্ঠপোষকতা করেছে (ড. আব্দুল মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২০-২২৫)।  ধারণা করা হয় রাষ্ট্র কর্তৃক বৌদ্ধ ধর্মের বিকৃত সম্প্রদায়গুলোর পৃষ্ঠপোষকতার কারণে বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর বাংলাদেশ ছেড়ে চিরদিনের জন্য তিব্বত চলে যান (ড. আব্দুল মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩১)। 

সেন শাসনামলে বৌদ্ধ নির্মুল 

দক্ষিত ভারত থেকে আগত হিন্দু ধর্মালম্বী সেন বংশের লোকেরা পাল বংশের রাজা থেকে ক্ষমতা দখল করে নেয়। শুরু হয় বৌদ্ধদের উপর আরেক দফা নির্যাতন। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজিয়ের আগ পর্যন্ত সেনরা বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চলতে থাকে। ঐতিহাসিক তারানাথ এবং সুম্পার (Sumpa) উদ্ধৃতি দিয়ে ড. মু’মিন চৌধুরী বলেন সেন রাজাদের অত্যাচারে বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরা বাংলা থেকে প্যাগান, পেগু, আরাকান, কুকি এসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২৩৬)।  বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণদের এসব অত্যাচারের কথা রামাই পন্ডিত রচিত ‘শুন্য পুরানে’ বিস্তারিত রয়েছে। সেন শাসনামলে বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণ/হিন্দুদের অত্যাচারের মাত্রা ছিল অনেকটা শশাঙ্কের মত।

সেন রাজাদের অন্যতম ছিল রাজা বল্লাল সেন। তিনি কুলীন প্রথা চালু করেন। বৌদ্ধদের একটা অংশকে কুলীন পদমর্যাদা দিয়ে হিন্দু ধর্মে গ্রহণ করে নেয়া হয় যারা কায়স্থ নামে পরিচিত। যারা সেনদের শাসনকে মাথা পেতে নেয়নি তারা হয়ে গেলেন নিম্ন বর্ণ (ড. মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২৪১)। দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে  ‘বস্তুত কৌলিন্য সে সকল লোককে দেওয়া হইয়াছিল, যাহারা ব্রাহ্মণ শাসন শিরোধার্য্য করিয়া লইয়াছিলেন’ (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-৪৮৩)।

সামাজিকভাবে সেন শাসনামলে পতিতাবৃত্তি মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল, এমনকি প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের মন্ত্রীমহোদয়গন পতিতা ও নর্তকিদের সাথে দামাদামি করতো(S.Sen: 1963 উদৃত ড. মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা-২৪৪)। লক্ষণ সেনের অনেকগুলো স্ত্রী ছিল।পয়সাওয়ালারা সেন আমলে নারীদেরকে দাসী হিসেবে রাখত এবং সেটা শুধু যৌন আমোদ প্রমোদের জন্যই।যদি কোন দাসীর একাদিক মালিক থাকত তাহলে তারা শেয়ার অনুসারে পর্যায়ক্রমে তাদের ব্যবহার করত  (N. R. Roy 1993:466 উদৃত ড. মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা-২৪৪)। এ থেকে একথা প্রতিয়মান হয় যে, সমাজে অশ্লীলতার বিস্তার ব্রাহ্মণ্যবাদের একটি আদি কৌশল।

বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় ও বৌদ্ধ-মুসলিম সুসম্পর্ক

সেনদের নিষ্ঠুর অত্যাচারে স্থানীয় বাঙালি বৌদ্ধদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় ছিল সবাই। সেই সময়ে বখতিয়ার খলজির আগমন ঘটে বাংলায়। তিব্বতী বুদ্ধ ঐতিহাসিক কুলাচার্য জ্ঞানানশ্রীর বিবরনী থেকে জানা যায় মগধ থেকে এক দল ভিক্ষু মির্জাপুরে গিয়ে বখতিয়ারের সংগে দেখা করে তাকে মগধকে মুক্ত করতে আবেদন করেন (Journal of the Varendra Research Society, Rajshahi, 1940)। তাঁর আগমনে ব্রাহ্মণ্য শাসনের অবসান ঘটে। বৌদ্ধরা মুসলিম শাসনকে স্বাগত জানায়। দীনেশ চন্দ্র সেন তার পর্যবেক্ষণে বলেন;

বৌদ্ধগণ এতটা উৎপীড়িত হইয়াছিল যে তাহারা মুসলমানদের পূর্বকৃত শত অত্যাচার ভুলিয়া বিজয়ীগণ কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলন এবং মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয় ভগবানের দানস্বরূপ মনে করিয়াছিল। শূন্যপুরাণের ‘নিরঞ্জনের উষ্মা’ নামক অধ্যায়ে দেখা যায়-তাহারা (বৌদ্ধরা) মুসলমানদিগকে ভগবানের ও নানা দেবদেবীর অবতার মনে করিয়া তাহাদের কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলনে নিতান্ত আনন্দিত হইয়াছিল। …….ইতিহাসে কোথাও একথা নাই যে সেনরাজত্বের ধ্বংসের প্রাক্কালে মুসলমানদিগের সঙ্গে বাঙালি জাতির রীতিমত কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হইয়াছে। পরন্তু দেখা যায় যে বঙ্গবিজয়ের পরে বিশেষ করিয়া উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু, নব ব্রাহ্মণদিগের ঘোর অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-৫২৮)

মুসলিম শাসকদের উদারতা, বৌদ্ধদের প্রতি মুসলিমদের ভালো ব্যবহারের ফলে দলে দলে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ‘বাংলার অর্ধেক বৌদ্ধ মুসলমান হইয়া গেলো’ (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বৌদ্ধধর্ম, পৃষ্ঠা ১৩১)। তবে মুসলমান হওয়ার এই প্রক্রিয়াটি রাতারাতি হয়ে যায়নি, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে বৌদ্ধ-মুসলিম সংমিশ্রনের ফলে বৌদ্ধরা আস্তে আস্তে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে।

১২০৪ খ্রিস্টাব্দ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের আগেই বাংলাদেশে ইসলামের  আগমন ঘটেছিলো।তবে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পর সেটা অনেক বেড়ে যায়।ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৭২ সালে ভারতে প্রথম বারের মত আদমশুমারি হয়।সেই  রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলা-বিহার-উড়িষ্যাতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা খুব দুর্বল। বিহার-উড়িষ্যার তুলনায় বাংলাতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে আরো দুর্বল ছিল। পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থার কোনো অস্তিত্বই ছিল না (Dr. Kamal Siddiqui, Local government in Bangladesh,The University Press Limited, page-37)।এই চিত্র ভারতে আর কোথাও ছিলনা।ফলে  মুসলমানদের ইসলাম প্রচার প্রসারে এবং নির্যাতিত বৌদ্ধদের ইসলাম গ্রহণে ভারতের অন্য অঞ্চলের মত কোন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি।

গিয়াস আদ দীন ইয়াদ (১২১৩-২৭) এবং মুগিস আদ দীন তুগরাল (১২২৭-৮১) এর শাসনামলে সেনাবাহিনীতে স্থানীয়দের (বৌদ্ধদের) নিয়োগ দেয়ার কথা জানা যায়। এছাড়া ইলিয়াস শাহের শাসনামলে (১৩৪২-৫৭) সেনাবাহিনীতে কর্মরত ‘পাইক’ বাহিনী একটি শক্তিশালী ফোর্সে পরিণত হয়। পাইক শব্দের অর্থ হচ্ছে পদাতিক বাহিনী এবং এই শব্দটি প্রাকৃত / পালি থেকে এসেছে।এই পাইকরা ছিল বৌদ্ধ। এ থেকে বুঝতে পারা যায় যে মুসলিম শাসকদের সাথে বৌদ্ধদের সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল(ড. মু’মিন চৌধুরী,প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা ২৭০)। এখনো বাংলা ভাষায় পাইক-পেয়াদা শব্দটি প্রচলিত আছে।

মুসলিম শাসকদের মধ্যে স্থানীয় (বৌদ্ধ) শিক্ষিত শ্রেণীর প্রভাব ছিল, একইসাথে মুসলিম প্রশাসনের ভূমি ব্যবস্থায় এসব স্থানীয়রা রাজস্ব্য আদায়কারী এবং হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা ছিলেন।  (ড. মু’মিন চৌধুরী,প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা ২৭১ )। স্থানীয় বৌদ্ধদের সাথে শাসক মুসলিমদের বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে খুবই ভাল সম্পর্ক ছিল। এই বিষয়টি ফুঁটে উঠে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় (দেখুনঃ Johan Elverskog,  Buddhism and Islam on the Silk Road, Philadelphia: University of Pennsylvania Press, 2010)। এর ফলে মুসলিম অত্যাচারে বাংলা থেকে বৌদ্ধদের উৎখাতের ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রচারণা ভিত্তিহীন হয়ে পরে।

বৌদ্ধ-মুসলিম সুসম্পর্কের আরেকটি বড়ো নমুনা হচ্ছে বখতিয়ার খলজি এবং তার পরবর্তী শাসকরা কখনো স্থানীয় বৌদ্ধ এবং অন্যদের উপর জিজিয়া কর চাপিয়ে দেয়নি (ড. মু’মিন চৌধুরী,প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা ২৬৬)। অর্থাৎ, মুসলিম ট্রেডিশান মতে কোন দেশ  মুসলিম কর্তৃক যুদ্ধে জয়ী হলে অমুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য ট্যাক্স হিসেবে জিজিয়া আদায় করা হয়। কিন্তু বাংলায় সেটা ঘটেনি।

ধর্মান্তরন ঠেকাতে  বৈষ্ণব ধর্ম চালু

মুসলিম শাসন দীর্ঘায়িত হওয়া এবং স্থানীয় লোকজনের ইসলাম গ্রহণ অব্যাহত থাকায় শ্রী চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম চালু করেন বৈষ্ণব ধর্মে বলা হয় মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না-উচ্চ বর্ণ-নিম্ন বর্ণ বলে কিছু নাই, শুধু সৃষ্টিকর্তাকে ভক্তি করলেই হবে। তখন অনেক বৌদ্ধ বিশেষ করে মহাযানী বৌদ্ধরা বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে বৈষ্ণব ধর্ম হিন্দু ধর্মের সাথে একীভূত হয়ে যায়। হিন্দু ধর্মের সাথে মিশে যাওয়ার কারণে এই ধর্মের অনুসারীরাও হিন্দু হয়ে যায় এবং নিম্ন বর্ণের হিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। যারা বৌদ্ধ থেকে বৈষ্ণব হয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দু হয়েছে এরা বৈষ্ণব ধর্ম চালু না হলে বৌদ্ধ থেকে মুসলিম হয়ে যেত বলে মত প্রকাশ করেন  দীনেশ চন্দ্র সেন।দীনেশ মন্তব্য করেন;

‘এদেশে ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের পুনরভ্যুদয়ে বিজিত বৌদ্ধদিগের প্রতি যেরূপ কঠোর নিপীড়ন চলিয়াছিলো, তাহাতে বৈষ্ণবেরা যদি সেই সকল হতভাগ্যের জন্য স্বীয় সমাজের দ্বার উদঘটনা না করিতেন, তবে সেই শ্রেণীর সকলেই মুসলমান হইয়া যাইতো (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-১০)।

বর্তমানে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে যারা নিম্ন বর্ণের হিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয় তাদের ৮০% হচ্ছে বৈষ্ণব ব্যাকগ্রাউন্ড, আর বৈষ্ণব মতবাদের একটা বড়ো অংশই এসেছে বৌদ্ধ ধর্ম থেকে (ড. মু’মিন চৌধুরী,প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা ৩১১, ৩১৪)।

বাংলাদেশে একদিকে বৌদ্ধরা ছিল চরমভাবে নির্যাতিত, অন্যদিকে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা না থাকার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়া খুব সহজ হয়েছিল।বৈষ্ণব ধর্ম চালুর মাধ্যমে মহাযানি বৌদ্ধদের হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তন, ব্রাহ্মণ্য অত্যাচারে অনেক বৌদ্ধের দেশত্যাগ এবং অবশিষ্ট বৌদ্ধদের বড় অংশের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার ফলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা ক্রমান্বয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।

শেষ পর্বঃ মুসলমান বনাম ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বন্ধ বৌদ্ধদের থেকে বাঙ্গালী মুসলমানের শিক্ষা

প্রাসঙ্গিক পোস্টঃ

ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তির কারণ

ব্রাক্ষণ্য অত্যাচারের এক অন্ধকার অধ্যায়

যেভাবে বৌদ্ধ বাংলা রুপান্তরিত হল মুসলিম বাংলায়

বাংলায় ব্রাম্মন্যায়নের শুরু এবং বৌদ্ধ ধর্মে তাঁর প্রভাব– ড. এম আবদুল মু’মিন চৌধুরী

ব্রাহ্মণদের সাথে বৌদ্ধদের দন্ধে ঐতিহাসিক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয়।কিন্তু উপনিবেশ সময়ে এসে এর দায়ভার মুসলিম সেনাপতি বখতিয়ার খলজি’র উপর চাপানো হয়। এই বিষয়ে জানতে পড়ুন

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাসের রাজনীতি ও বখতিয়ার খলজির বিহার অভিযান

Facebook Comments