বাংলায় বৌদ্ধধর্মের হারিয়ে যাওয়া এবং বাঙালী মুসলমানের শিক্ষা-শেষ পর্ব

আগের পর্বঃ ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ

নৃতাত্ত্বিক পন্ডিতগণ আধুনিক বঙ্গবাসীর নাসিকা ও মস্তক পরীক্ষা করিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, তাহারা দ্রাবিড় ও মঙ্গোলিয়ান জাতির সংমিশ্রনে উৎপন্ন (রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, বাঙলার আদিম অধিবাসী ও আর্যবিজয়, পৃষ্ঠা ২৯, বঙ্গদর্পন থেকে)। আর ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে বৌদ্ধ ধর্মই হচ্ছে বাঙালিদের সবচেয়ে পুরোনো ধর্ম।

কিভাবে বৌদ্ধ বাংলাতে হিন্দুদের আগমন ঘটলো এবং সর্বশেষ মুসলিমদের আগমন ঘটলো এবং বৌদ্ধধর্ম হারিয়ে গেলো সেগুলো আমরা ইতিমধ্যে সংক্ষিপ্ত আকারে আগের পর্বগুলোতে আলোচনা করেছি।আলোচনাকে বাংলাতে সীমাবদ্ধ রাখতে গিয়ে মগধে (বিহার) বৌদ্ধ সভ্যতার বিকাশ-নন্দদের শাসন, পরবর্তীতে ব্রাহ্মণ-মৌর্যদের উত্থানকে ইচ্ছাকৃতভাবে আনা হয়নি। বৌদ্ধ ধর্ম যে গৌতম বুদ্ধের অনেক আগে থেকেই এই উপমহাদেশে ছিল সে বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। (বিস্তারিত জানতে পড়ুনঃ বৌদ্ধরাই বাংলার আদিবাসী এবং গৌতম বুদ্ধ এই ধর্মটির প্রতিষ্ঠাতা নন শেষ প্রবক্তা)

গুপ্ত শাসনামলটা ছিল বাংলাতে ব্রাহ্মণদের আগমনের সময় এবং সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে ব্রাহ্মণায়নের সময়। শশাঙ্কের শাসনামলটা ছিল বৌদ্ধদের উপর নির্যাতনের সময়-তারপর একশত বছর বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ ক্ষমতার লড়াই-দ্বন্ধ-সংঘাত এবং অরাজকতার সময় ছিল।পাল শাসনামলে আবারো গুপ্ত শাসনামলের মত নীরবে-নিভৃতে ব্রাহ্মণায়ন চলতে থাকে।(বিস্তারত দেখুন ৪র্থ পর্ব) সেন শাসনামল ছিল শশাঙ্কের শাসনামলের ন্যায় চরম বৌদ্ধ-বিদ্ধেষী শাসনামল।গুপ্ত থেকে শুরু করে সেন শাসনামল পুরা সময়টাতে বৌদ্ধ ধর্ম ভিতর থেকে দুর্বল হতে থাকে মহাযানী সম্প্রদায়ের কারণে।পরবর্তীতে মহাযানী সম্প্রদায় থেকে বজ্রযানী সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। এছাড়া সহজিয়া বৌদ্ধ, গুরুবাদসহ নানা ধরণের মতবাদের জন্ম হয়েছে যেগুলো বৌদ্ধধর্মকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে অন্যদিকে একে ক্রমান্বয়ে হিন্দু ধর্মের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছে।

ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে বৌদ্ধদের একটা অংশ শ্রীলংকা, নেপাল, মিয়ানমারে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছে, একটা অংশ কুলীন মর্যাদা পেয়ে কায়স্থ নামে হিন্দু ধর্মে প্রবেশ করেছে। একটা অংশ বৈষ্ণব ধর্মের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মে ফিরে গিয়ে নমঃশূদ্র তথা নিম্ন বর্ণের হিন্দু হিসেবে আছে। বাকি অংশ বলা যায় বড়ো অংশটি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বৌদ্ধ বাংলাকে মুসলিম বাংলায় পরিণত করেছে।বাঙালি বৌদ্ধরা মেজরিটি ধর্মালম্বী হয়েও বাংলা থেকে হারিয়ে গেছে, সুতরাং এখান থেকে বাঙালি মুসলমানদের অনেক কিছুই শিক্ষার আছে। (বৌদ্ধ ধর্মে বিভাজন ও কালচারাল ব্রাহ্মণায়নের শুরু )

মুসলমান বনাম ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বন্ধ

Cast system
ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রকৃত চিত্র

ব্রাম্মণ্যবাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তারা সহাবস্থানে বিশ্বাস করে না। সবসময় অন্যকে অধীনস্ত করে রাখতে চায়। অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। লক্ষণীয় যে এই বাংলাতে মুসলমানদের সাত-আটশত বছর আগে হিন্দুদের আগমন ঘটলেও তারা জনসংখ্যার দিক থেকে কখনো মেজরিটি হতে পারেনি।অথচ মুসলমানরা পরে এসেও জনসংখ্যার দিক থেকে মেজরিটি হয়েছে।এর একটা বড় কারণ হচ্ছে ব্রাহ্মণরা অন্য কাউকে ব্রাহ্মণের সমান মর্যাদা দিতে চায় না, বরং সবাইকে অধীনস্ত করে রাখার নীতিতে বিশ্বাসী।

অন্যদিকে যে কেউ ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে একই বিশ্বাসের অনুসারী হিসেবে ভাই বলে বিবেচিত হয়, যেখানে উঁচু-নিচু,বর্ণবাদী জাত-পাত নাই।এই কারনে ভারতের হিন্দুরা এখনো ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। (দেখুন  Nearly 6,000 converted to Islam in Kerala in 5 years: Report, Times of India, Jul 15, 2016)

যাই হোক, বৌদ্ধ-ব্রাম্মণ দীর্ঘদিনের দ্বন্ধে আনুমানিক ১১শত সনে ব্রাহ্মণরা যখন বাংলাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল,এর অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলমানদের আগমনে ব্রাহ্মণদের সব স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যায়।ফলে ব্রাহ্মণ-বৌদ্ধ ক্ষমতার দ্বন্ধ রূপ নেয় ব্রাহ্মণ-মুসলিম ক্ষমতার দ্বন্ধে।মুসলমানরা ১২০৪ থেকে ১৭৫৭ পর্যন্ত বাংলা শাসন করতে থাকে।এই সময়ের মধ্যে ব্রাহ্মণরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তাদের কূটকৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে চেষ্টা করে।

উদাহরণ হিসেবে রাজা গণেশের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।মুসলিম শাসকগণ সমতার ভিত্তিতে বৌদ্ধ ও হিন্দুদের ক্ষমতায়ন করার চেষ্টা করে।এই সমতার সুযোগ নিয়ে দিনাজপুরে একজন জমিদার হিসেবে গণেশের উত্থান।মুসলিম সুলতানদের নিজেদের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্ধকে কাজে লাগিয়ে একসময় সে নিজেই আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে মসনদে বসেন। ক্ষমতার দ্বন্ধ সেসময় স্বাভাবিক ছিল।সেই হিসেবে গণেশের ক্ষমতা দখলকেও গ্রহণ করা যায়।কিন্তু ক্ষমতায় বসেই ব্রাহ্মণদের স্বভাবসুলভ রাজা গনেশ মুসলিমদের উপর অত্যাচার শুরু করেন।ফলে অনেক কৌশল করেও বেশিদিন তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি (বিস্তারিত R.C.  Majumdar, (ed.) The Delhi Sultanate, Mumbai ,2006 এবং ড. আব্দুল মু’মিন চৌধুরী, Rise and Fall of Buddhism in South Asia, ২০০৮)।

রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কালচারাল ধারায় মুসলিম শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে।চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলন ছিল এমনই একটি প্রয়াস।চৈতন্য মুসলিম শাসন উৎখাতের চেষ্টা করে সফল হননি বটে কিন্তু হিন্দু ও বৌদ্ধদের ধর্মান্তর ঠেকাতে যথেষ্ঠ সফল হন।বৌদ্ধদের একটা অংশকে বিশেষ করে মহাযানি বৌদ্ধদের হিন্দু ধর্মে পুনরায় ধর্মান্তর করেন।যারা আজও নিন্মবর্ণের হিন্দু (দলিত, নমশূদ্র)হিসেবে বেঁচে আছে। (বিস্তারিত দেখুন এই সিরিজের ৪র্থ পর্ব)

ব্রাম্মণ্যবাদের সাথে মুসলমানদের দ্বন্ধের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও হৃদয়বিদারক উদাহরণ হচ্ছে ১৭৫৭ সালে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সাথে ইংরেজদের আঁতাতে বাংলায় সাড়ে পাঁচশত বছরের স্বাধীন বাঙ্গালী মুসলিম শাসনের পতন এবং জঘন্য বিদেশী শাসক কর্তৃক উপনিবেশের শুরু।

যখন সিরাজ উদ দৌলাকে কিভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে এই নিয়ে প্রতিরাতে সলা-পরামর্শ চলতেছিল তখন নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র পরামর্শ দিলেন,  “ইংরেজদের সঙ্গে একযোগে কাজ করা হউক, আমি কালীঘাটে মায়ের দর্শনকামনায় প্রায়ই কলকাতায় যাইয়া থাকি।তাহারা মান্য, বদান্য, বুদ্ধিমান, রণনিপুণ, তাহাদিগের সঙ্গে যুদ্ধ লাগাইয়া আমরাই দাবার চাল চালিব, শেষ পর্যন্ত নবাব আমাদের হাতে কলের পুতুলের মত থাকিবেন, আমরাই যুদ্ধ চালাইব; ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’-নীতি অবলম্বন করিলে কেহ আমাদিগকে সন্দেহ করিতে পারিবে না, অথচ অভীষ্টসিদ্ধি অতি সহজেই হইবে, মীরজাফরকে আমরা নবাব করিব” (দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা ৮৭২)।

মুসলিম শাসনামলে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু বৌদ্ধ নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও ব্রিটিশ শাসনামলে দেখা গেল ব্রাহ্মণরা সবদিক দিয়ে সব রকমের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে শুরু করল। দীর্ঘ মুসলিম শাসনামলে কোনো দুর্ভিক্ষের ঘটনা না ঘটলেও ব্রিটিশ শাসনামলের ১৯০ বছরে ভয়াবহ লুটপাটের ফলে অনেকগুলি দুর্ভিক্ষ হয়। ১৭৭০ সনের দুর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ৩৫ লাখ মানুষ মারা যায়। উড়িষ্যার একটা দুর্ভিক্ষে ১০ লাখের অধিক মানুষ মারা যায়। (বিস্তারিত জানতে পড়ুনঃ ইংরেজ শোষণের প্রাথমিক পর্যায় ও জমিদারী বঞ্চনা ও দুর্ভিক্ষের স্মৃতি

ব্রিটিশদের বাংলায় ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বে ব্রাহ্মণ-মুসলিম বিরোধ ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক। সাধারণ হিন্দু-মুসলিমরা একই সমাজে মিলে মিশে ছিল।ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রাহ্মণদের মুসলিম বিদ্ধেষী সাহিত্যের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম বিদ্ধেষ সাধারণ মানুষের মাঝে পৌঁছে যায় যার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্কিম । ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বলা হতে থাকে মুসলমানরা বহিরাগত অথচ একই সুত্রে আর্য-ব্রাহ্মণরা নিজেরাও যে বহিরাগত সেটি তারা চেপে যায়। (জানুনঃ মুসলিমদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি)

মুসলমানরা একদিকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে থাকে অপরদিকে হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য স্বাধীনতা আন্দোলন করতে থাকে।যা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে একটি যৌক্তিক পরিণতি পায়।পাকিস্তান আন্দোলনের সফলতায় মুসলমানরা হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পায়। সামাজিক ও ধর্মীয় বৈষম্য থেকেও মুক্তি পায়।৪৭ এর ধারাবাহিকতায় আসে ৭১ এর আজাদী আন্দোলন। বাঙালি মুসলমানদের মুক্তি ঘটে, দুনিয়ার মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র জন্ম নেয় বাঙালি মুসলিম মেজরিটি দেশ বাংলাদেশ।

বৌদ্ধদের ইতিহাস  থেকে বাঙ্গালী মুসলমানের শিক্ষা

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে বাঙালি আইডেন্টিটিতে বিশ্বাসী এবং মুসলিম আইডেন্টিটিতে বিশ্বাসী দুইটা গ্রুপ ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।বাঙালী আইডেন্টিতে বিশ্বাসীদের বয়ান হচ্ছে বাঙালী হতে হলে ধর্মীয় পরিচয় বাদ দিতে হবে অন্যথায় পুরোপুরি বাঙালী হওয়া যাবেনা। অথচ ১৯৪৭ সালের পুর্বে বাঙ্গালী ও মুসলিম পরিচয় নিয়ে এমন কোন দ্বন্ধ ছিলনা।

মহাযানী বৌদ্ধরা যেমন ব্রাহ্মণবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বৌদ্ধ ধর্মকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে তেমনি বাংলাদেশে যারা মুসলিম আইডেন্টিটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে, ব্রাহ্মণ্যবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাঙালি আইডেন্টিটিকে একমাত্র আইডেন্টিটি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে তারাও বুঝে হোক বা না বুঝে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে।তাদের অনেকেই হয়ত জানেনা  মুসলমানদের বাঙ্গালীত্ব নিয়ে  ঐতিহাসিকভাবে ভিন্ন মতামত ছিল।

উনিশ শতকের জনপ্রিয় হিন্দু উপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের ১ম খন্ডে বলেন, ‘আজ বাঙালি ও মুসলমান ছেলেদের মাঝে ফুটবল খেলা চলিতেছে’। অর্থাৎ, বাঙালি মানে হিন্দু, মুসলিম বাঙালি হতে পারে না। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গের বাঙ্গালীরা মুসলমানদের বাঙ্গালী বানানোর জন্য উঠে পরে লাগল।এর কারন আর কিছুই না ঐতিহাসিকভাবে ব্রাম্মণ্যবাদ যেভাবে কালচারালি বৌদ্ধদের ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল সেই চেষ্টার বর্তমান ভার্সন, যার লক্ষ্য বাংলাদেশকে বিভক্ত রাখা।

কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ১৯৭০ সালে আওয়ামীলীগের ব্যানারে নোয়াখালী থেকে নির্বাচিত এমপি ও বঙ্গবন্ধুর সহচর এম এ মোহাইমেন  ১৯৭১ সালে ভারতে গিয়ে দেখেন সেখানকাঁর হিন্দুরা মুসলমানদেরকে বাঙ্গালী বলেনা।তিনি লিখেন; ” পশ্চিম বঙ্গে বাঙ্গালী বলতে শুধু হিন্দুদেরই বুঝান হয়।পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুরা মুসলমানদেরকে বাঙ্গালী বলে স্বীকার করেনা।তাদের মুসলমান বলে”(এম এ মোহাইমেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামীলীগ, ২য় প্রকাশ, ১৯৮৭, পৃষ্ঠা ৫৭ পৃষ্ঠা)।

বাঙালি বৌদ্ধরা মেজরিটি ধর্মালম্বী হয়েও বাংলা থেকে হারিয়ে গেছে।এটি কেবল ইতিহাস নয় বাস্তব।যেই বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের সূত্রপাত সেখানেই তারা আজ ছোট্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। বাঙালি মুসলমানদের অনেক কিছুই শিক্ষার আছে এই থেকে। আমরা কি বাঙালি না মুসলমান এই ধরণের বিতর্ক না করে ৪৭ আর ৭১ এর সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থাৎ মুসলিম এবং বাঙালিত্ব দুটাকে ধারণ করে জাতিগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বাঙ্গালীত্ব হচ্ছে একটি নৃতাত্ত্বিক বিষয়, এর সাথে ধর্ম এবং কালচারের বিরোধ লাগিয়ে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে যারা বিভাজন তৈরি করে রেখেছে তারা অনেকটা মহাযানী বৌদ্ধদের ভূমিকা পালন করতেছে।তাদের ব্যপারে সচেতন হতে হবে।ধর্মীয় পরিচয় এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয় একটি আরেকটির সম্পূরক,প্রতিপক্ষ নয়।

ঐতিহাসিকভাবে ব্রাহ্মণদের হাতে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট আন্দোলন সেক্যুলারইজমের নামে বাংলাদেশে মহাযানী বৌদ্ধদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে কালচারাল হিন্দুয়ায়ন এর কাজ চালিয়ে গেছে (দেখুনঃ বাংলাদেশের “হিন্দু মানসের” বিবর্তন)।ফলাফল হল এই, পহেলা বৈশাখের মত মতাদর্শ নিরপেক্ষ একটি উৎসবে মঙ্গল প্রদীপ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, শোভাযাত্রায় হিন্দু ধর্মের নানা প্রতীক ব্যবহার করা সহ হিন্দুয়ানী কালচারকে বাঙালি কালচার বলে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ( আরো দেখুন: বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সাংস্কৃতিক বিকৃতি )।

আমাদের মিডিয়াতেও রবীন্দ্রয়ানের মাধ্যমে ব্রাহ্মণায়নের কাজ চলতেছে। স্যাটেলাইট টিভির মাধ্যমে ইন্ডিয়ান হেজিমনিকে তুলে ধরা হচ্ছে। ভাষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি বাংলাকে তুলে না ধরে গৌড়ীয় বাংলাকে (পশ্চিম বঙ্গের প্রমিত বাংলাকে)তুলে ধরা হচ্ছে (বিস্তারিত পড়ুনঃ ঢাকার প্রমিত বাংলায় কলকাতা কেন্দ্রিক উপনিবেশের প্রভাব)।  একই ভাবে পাঠ্যপুস্তকেও হিন্দু ধর্মীয় শব্দ, চিহ্ন, কন্টেন্ট বাড়িয়ে মুসলিম ছেলে-মেয়েদেরকে কালচারালি বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলতেছে যা স্বাভাবিকভাবে জাতিকে বিভক্ত করে চলেছে।

বাঙালি মুসলমানদের কালচার তথা জীবনাচরগত দিকটাকে বাঙালিত্বের কথা বলে অন্যের অধীনস্থ করে নয় বরং নিজেদেরকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলে আত্ব-মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে।বাঙালি মুসলিম মেজরিটি দেশ বাংলাদেশে  বৌদ্ধ-হিন্দু এবং  অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সবাইকে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে (দেখুন; বাংলাদেশের সরকারী চাকুরীতে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থান)।তা সত্ত্বেও মেজরিটি মানুষকে কালচারালি বিভ্রান্ত করে জাতিকে বিভাজিত করে রাখলে আদতে বাংলাদেশেরই ক্ষতি, লাভ কেবল বাংলাদেশের শত্রুদের।বৌদ্ধদের ইতিহাস থেকে আমাদের সামগ্রিকভাবে সচেতনতা জরুরী।

প্রাসঙ্গিক পোস্ট

লাল সাম্প্রদায়িকতার ঐতিহাসিক কারণ

বাংলায় ব্রাম্মন্যায়নের শুরু এবং বৌদ্ধ ধর্মে তাঁর প্রভাব– ড. এম আবদুল মু’মিন চৌধুরী

ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তির কারণ

ব্রাক্ষণ্য অত্যাচারের এক অন্ধকার অধ্যায়

যেভাবে বৌদ্ধ বাংলা রুপান্তরিত হল মুসলিম বাংলায়

ব্রাহ্মণদের সাথে বৌদ্ধদের দন্ধে ঐতিহাসিক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয়।কিন্তু উপনিবেশ সময়ে এসে এর দায়ভার মুসলিম সেনাপতি বখতিয়ার খলজি’র উপর চাপানো হয়। এই বিষয়ে জানতে পড়ুন

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাসের রাজনীতি ও বখতিয়ার খলজির বিহার অভিযান

Facebook Comments