হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও ১৯৪৭ সালের বাঙলা ভাগ-পর্ব ৪

পর্ব ১ঃ সর্ব–ভারতীয় প্রয়োজনে বাংলা বিভক্তি , পর্ব ২ঃ বাংলা ভাগের প্রাদেশিক উৎস, ১৯৪৫-৪৬

পর্ব ৩ঃ কলকাতা দাঙ্গার সাংগঠনিক পটভূমি 

লিখেছেনঃ প্রফেসর জয়া চ্যাটার্জী, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়

কুখ্যাত কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ* 

মুসলমান শাসনের থেকে দেশ-বিভাগ অধিকতর পছন্দনীয়, এই ধারণা পশ্চিম বাঙলার অন্তত কিছু হিন্দুর মনে উদিত হয়। ১৯৪৪ সালে যখন রাজাগোপালাচারী বলেন যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর সমন্বয়ে পাকিস্তানকে গ্রহণ করা কংগ্রেসের উচিত- কোলকাতার কিছু হিন্দু তাঁর এই প্রস্তাবকে সাদরে গ্রহণ করে। রাজাগোপালচারীর এই ফর্মুলায় পাঞ্জাব ও বাঙলা বিভক্তির কথা পরোক্ষভাবে প্রকাশ পায়। ১৯৪৪ সালে শ্যামাপ্রসাদ ‘সি আর ফর্মুলা’-কে বর্জন করার আন্দোলন শুরু করলে হাওড়া থেকে একজন বাঙালি হিন্দু তাঁর কাছে একটা চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে তিনি ঐ পরিকল্পনার বিচক্ষণতার বিষয়টিকে লক্ষ করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন: ‘ভাইসরয় কর্তৃক ভারতের বিরুদ্ধে দেয়া চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার জন্য আর কী বিকল্প আছে?… ঐ ফর্মুলায় সারা ভারতের স্বাধীনতাকে ভিত্তি করে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্থায়ী সমাধান দেওয়া হয়েছে।’ ২১

১৯৪৬ সালের গ্রীষ্মকালে দিল্লীতে কেবিনেট মিশন ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনার সময় জল্পনা-কল্পনা উত্তেজনার তুঙ্গে ওঠে। তখন কোলকাতা ও পশ্চিম বাঙলার প্রাণকেন্দ্রের হিন্দুরা প্রদেশ বিভাগের পরিকল্পনাকে অনুকূল বলে মনে করে এবং এভাবে পশ্চিম বাঙলাকে একটা নতুন হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা চিন্তা করে।

জয়া চ্যাটার্জী
জয়া চ্যাটার্জী

মুসলমানদের ‘স্থায়ী শাসনের’ অধীন থাকার সম্ভাবনা পরবর্তী মাসগুলোতে ক্রমবর্ধমানভাবে অসহ্য মনে হওয়ায় পশ্চিম বাঙলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর অধিক সংখ্যক হিন্দুদের কাছে এই সমাধান অনুকূল বলে বিবেচিত। সম্ভবত আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ১৬ই আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণার (মুসলিম লীগের প্রস্তাবিত ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’) এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে সোহরাওয়ার্দীর সরকারি বিবৃতি- ঐ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রের বাইরে বাঙলার পুরোপুরি স্বাধীনতা ঘোষণার হুমকি দেন।

কেন্দ্রে সম্পূর্ণ কংগ্রেস অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রতিক্রিয়ায় সোহরাওয়ার্দী এই বলে সর্তক করে দেন:  লীগকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় বসানোর সম্ভাব্য পরিণতি হবে বাঙলার পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা ও সমান্তরাল একটা সরকার প্রতিষ্ঠা… এ রকম কেন্দ্রীয় সরকার বাঙলা থেকে কোনো রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারে তা আমরা নিশ্চিত করব, আর আমরা নিজেদের পৃথক রাষ্ট্র মনে করব যার সাথে কেন্দ্রের কোনো সম্পর্ক নেই।২২

সোহরাওয়ার্দীর এ বিবৃতিতে হিন্দু সংবাদপত্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, তারা এর ব্যাখ্যা করে সমগ্র বাংলাকে তখনই ‘পাকিস্তান বানাবার’ হুমকি হিসেবে।

হিন্দু বাঙালিদের কাছে ‘পাকিস্তান’ আসার অর্থ হল চিরকালের জন্য রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারানো এবং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ইচ্ছার অধীনে থাকা।

প্রথম কয়েক মাসে সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার অপরিণত ও উদ্ধত কার্যকলাপে এটা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, ভবিষ্যতেও এমন ধারা চলবে- ফলে অনেক হিন্দু এই পরিণতি এড়াবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়। ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’কে তাই কোলকাতার হিন্দুরা শুধু নিছকই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও শাসনতন্ত্র পরিষদের ব্যাপারে লেখা সর্ব-ভারতীয় পর্যায়ে নেয়া সুবিস্তৃত ও ভবিষ্যৎ দেনদরবারের একটি কৌশল হিসেবেই দেখেনি, তারা অস্তিত্বের জন্য আসন্ন হুমকি হিসেবে গণ্য করে, আর সে-জন্য তারা আমরণ লড়াই করতে প্রস্তুত ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে কুখ্যাত কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ (Great Calcutta Killing) সংঘটিত হয়। এই দাঙ্গায় কমপক্ষে পাঁচ হাজার লোক নিহত হয়-এ দাঙ্গা স্বতঃস্ফূর্ত ও অপরিচিত উন্মত্ত জনতার আক্রমণের ব্যাখ্যাতিরিক্ত হঠাৎ বহিঃপ্রকাশ ছিল না। উভয় পক্ষই যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি হয় (বিস্তারিত দেখুনঃকলকাতা দাঙ্গার পটভূমি তৈরিতে হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের ভূমিকা)। হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার চার দিন পর স্টেটসম্যান পত্রিকা তার পাঠকদের অবহিত করে:

এটা দাঙ্গা নয়। এ জন্য প্রয়োজন মধ্যযুগের ইতিহাস থেকে একটা শব্দ খুঁজে আনা- ক্রোধোন্মত্ততা (a fury); তবু ‘fury’ শব্দটির মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা আছে- এই ক্রোধোন্মত্ততাকে নিজের পথে ঠিক করে দেওয়ার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন কিছুটা চিন্তা ও সংগঠন। আট ফুট লম্বা লাঠি নিয়ে পঙ্গপালের মতো অসংখ্য লোক (the horde) অন্যকে আঘাত করছিল ও খুন করছিল- ঐসব লাঠি তারা আশপাশের স্থান থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে বা তাদের নিজের পকেট থেকে বের করেছে, এ কথা বিশ্বাস করা কষ্টকর।২৩ (আরো বিস্তারিত জানতেঃ কলকাতা সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞনুরুল কবির)

অন্য একজন প্রত্যক্ষদর্শী কোলকাতা হত্যাযজ্ঞকে ‘দাঙ্গা’ হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন ‘গৃহযুদ্ধ’ হিসেবে:

উভয় পক্ষ থেকেই ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করা হয়েছে। উভয় পক্ষ থেকেই দাঙ্গা ছিল সু-সংগঠিত। সোহরাওয়ার্দী নির্মমভাবে এ দাঙ্গা সংগঠিত করেন এটা দেখানোর জন্য যে,… (মুসলমানেরা) কোলকাতা অধিকারে রাখবে। হিন্দু পক্ষে এটা ছিল বাঙলা ভাগের জন্য লড়াইয়ের একটা অংশ বিশেষ। এর সংগঠকদের মধ্যে ছিল হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সদস্য, বিশেষ করে পুরনো সন্ত্রাসী কংগ্রেস নেতা যারা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়নি। মাড়োয়ারিরা প্রচুর সাহায্য করেছিল; তারা অর্থ দেয় ও দেশ-বিভাগের আন্দোলনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে। আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ আন্দোলন তখন শুরু না হলেও প্রত্যেকে জানত যে, এটা এ জন্যেই করা হয়েছে।২৪

কোলকাতা ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’ একটা আকস্মিক ঝলকের মতো বিষয় ছিল না, এটা ছিল উদ্ভূত বিভিন্ন ঘটনার ফল যা দীর্ঘদিন থেকে সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছিল। অংশত এটা ছিল মুসলিম লীগের নেতৃত্ব ও কর্মী-সমর্থকদের ক্রমবর্ধমান ঔদ্ধত্যের পরিণতি, সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাদের সাফল্যের উন্মাদনা এবং বাঙলাকে যে কোনো কাঠামোয় পাকিস্তান বানানোর ব্যাপারে তাদের ক্ষমতার ওপর দৃঢ় আস্থা; অংশত এটা ছিল তথাকথিত মুসলিম স্বেচ্ছাচারকে প্রতিরোধ করার হিন্দু সংকল্প।

১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গায় নিহিত মানুষ
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গায় নিহিত মানুষের লাশ, শুকন অপেক্ষায়

এই রক্তক্ষরণের দায়িত্বের অনেকটাই বহন করেন সোহরাওয়ার্দী নিজে; কারণ তিনি হিন্দুদের প্রতি খোলা চ্যালেঞ্জ দেন এবং দাঙ্গা শুরু হওয়া মাত্রই তা দমনে সন্দেহজনক অবহেলার (ইচ্ছাকৃত বা অন্য কারণে) কারণে ব্যর্থ হন। পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার পর দেখা যায় উভয় পক্ষের হাজার হাজার লোক নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। হত্যা শুরু হওয়ায় দশ দিন পর এই ভয়ঙ্কর রাতের শহর (city of dreadful night) ফুটপাতে তিন হাজারের বেশি মৃতদেহ পড়ে থাকে।২৫

মৃতদেহ পোড়ানোর জন্য শহরে যে ব্যবস্থা ছিল মৃতদেহের সংখ্যা তার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ফলে মৃতদেহ সংগ্রহ ও তা গণকবরে স্তূপীকৃত করার জন্য সরকারকে নিম্ন শ্রেণীর ডোমদের জড়ো করতে হয়।২৬

এটি সোহরাওয়ার্দীর নিন্দনীয় কাজ, এখন পর্যন্ত তা একটা সুপ্রতিষ্ঠিত কাহিনী হিসেবে টিকে আছে। ২৭ কিন্তু হিন্দু নেতারাও যে এই ঘটনায় গভীরভাবে জড়িত ছিল, এ সত্যটা তেমন সুবিদিত নয়। ঐ লড়াইয়ে হিন্দুর চেয়ে অনেক বেশি মুসলমান নিহত হয়। অভ্যাস মতো নিরুদ্বিগ্ন প্যাটেল ঐ বীভৎস বিষয়টিকে এভাবে মূল্যায়ন করেন: ‘হিন্দুরা এতে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হয়েছে।’ ২৮

শক্তির এই বীভৎস প্রতিযোগিতায় ১৯৪৬ সালে হিন্দুদের প্রস্তুতি একেবারে বিস্ময়কর ছিল না।কারণ এ কথা মনে রাখা দরকার যে, ত্রিশ দশকের শেষে এবং চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে কোলকাতা ও মফস্বল শহরগুলোতে হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সংগঠন প্রতিষ্ঠার আধিক্য দেখা যায়- এসব গ্রুপের বিঘোষিত নীতি ছিল হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা; কিন্তু তারা ভদ্রলোক যুবকদেরকে দৈহিক যোগ্যতা অর্জন করতে ও আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে উৎসাহ দিতে অধিকতর শক্তি ব্যয় করত।

হিন্দু দাঙ্গাকারীদের সম্পর্কে একটি বিশ্লেষণে ক্রমবর্ধমান উগ্র সাম্প্রদায়িকতার প্রেক্ষাপটে কোলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দুদের সংগঠিত করতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো কতটা সফল হতে পেরেছিল তা প্রকাশ পায়।

এই উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ছিল চল্লিশের দশকে ভদ্রলোক রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। মুসলমান দাঙ্গাকারীদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল পল্লি এলাকা থেকে শহরে আসা ভাসমান শ্রেণীর লোক। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার যে, বহু সংখ্যক ভদ্রলোক হিন্দুকে দাঙ্গার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।

দাঙ্গায় জড়িত হিন্দু জনতার গঠন সম্পর্কে আলোচনাকালে সুরঞ্জন দাশ লক্ষ করেন:

বাঙালি হিন্দু ছাত্র ও অন্যান্য পেশাজীবী বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক… সক্রিয় ছিল। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী সওদাগর, শিল্পী, দোকানদার… দাঙ্গার অভিযোগে গ্রেফতার হয়। মধ্য কোলকাতায় মুসলমানদের একটি সভা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য অন্যদের সাথে ভদ্রলোকেরাও অংশগ্রহণ করে- ঐ সভায় মুখ্যমন্ত্রী নিজে ভাষণ দেন। বিখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক ড. জামাল মোহাম্মদকে হত্যাকারী জনতার মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল ‘শিক্ষিত যুবক’… এটা বিস্ময়কর ছিল না যে, তাদের মধ্যে অনেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে।৫৫

আরো বিস্ময়ের ব্যাপার যে, হত্যাযজ্ঞের পর অব্যাহতভাবে অসন্তোষের মধ্যে মুসলমান জনতার মাঝে বোমা নিক্ষেপের জন্য হিন্দুদের মধ্য থেকে গ্রেফতারকৃত একজন হিন্দু ছিল বর্ধমানের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মহেন্দ্রনাথ সরকার। তিনি স্বীকার করেন: ‘এখন আমি একজন কংগ্রেস নেতা। আগে আমি ছিলাম হিন্দু মহাসভার সদস্য। বাঙলা বিভাগের পক্ষে আমি এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছি।৫৬

হিন্দুদের পক্ষে যোগ দেয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সৈনিক ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা।৫৭ ছাত্র, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী এবং দোকানদার ও পাড়ার ভাড়াটে গুণ্ডা মার্কা ছেলেদের অভাবিত ঐক্যের ফলে হিন্দু জনতার রক্তক্ষয়ী বিজয় হয় কোলকাতার রাস্তায়, ১৯৪৬ সালে। এটাই বাঙলা বিভাগ এবং একটা পৃথক হিন্দু আবাসভূমি গঠনের জন্য হিন্দু আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে।

কিন্তু হিন্দুদের এই জঘন্য কাজকে কখনও স্বীকার করা হয়নি। হিন্দু সংবাদপত্র এই আক্রমণের জন্য দোষারোপ করে সোহরাওয়ার্দী সরকার ও মুসলিম লীগকে; আর এই হত্যাযজ্ঞকে গণ্য করা হয় ভবিষ্যতে ‘মুসলমান শাসনে’র অধীন বাঙালি হিন্দুদের ভাগ্যের ভয়াবহ অশুভ লক্ষণ হিসেবে। (পড়ুনঃ কলকাতা দাঙ্গা মোকাবেলায় সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা –নুরুল কবির)

পরবর্তী মাসগুলোতে হিন্দু সংবাদপত্রে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের আবরণে কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ একটা শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে গণ্য হয় এবং তা পশ্চিম বাঙলায় একটা পৃথক হিন্দু রাজ্য গঠনের দাবির সপক্ষে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

নোয়াখালী ও টিপেরার স্থানীয় মুসলমানেরা কোলকাতা ও বিহারের মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যার গুজবে বিলম্বিত অথচ ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া দেখায়, এবং প্রতিশোধ হিসেবে শত শত হিন্দুকে হত্যা করে। হিন্দুরা নিজেদের নির্লজ্জভাবে যুদ্ধাবস্থায় দাঁড় করাতে এ রকম একটি ঘটনাই চাইছিল, তারা এই অজুহাতটি পেয়ে যায়;

সোহরাওয়ার্দীকে (তার নাম উচ্চারণে আমার ঘৃণা হয়) জানিয়ে দাও যে, হিন্দুরা এখনও মরে যায়নি, এবং সে বা তার দুশ্চরিত্র সাঙ্গোপাঙ্গোরা হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে শাসন করতে পারবে না… সোহরাওয়ার্দীকে তার দুষ্কর্মের জন্য খুব শীঘ্রই চরম শাস্তি ভোগ করতে হবে। সে-ই হিন্দুদের বিদ্রোহী করে তুলেছে। এখন থেকে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হল বিদ্রোহ এবং প্রতিশোধ গ্রহণ। এসো, আমরা মুললিম লীগের বর্বরদের সাথে যুদ্ধ করি। বাঙলা ভাগ না হওয়া পর্যন্ত এবং হিন্দুদের স্বদেশভূমি থেকে লীগ কর্মীদের বের করে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ থেকে বিরত হব না।৫৮

এ ধরনের অনুভূতি অনেক হিন্দুর মনে ক্রমবর্ধমান দৃঢ় সংকল্প গ্রহণে উৎসাহিত করে যে, যে কোনো মূল্যে, যা কিছুই হোক না কেন, বাঙলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে।

নোটঃ

ref 4

*উপ শিরোনামটি মূলধারা বাংলাদেশ সম্পাদকের দেয়া

 পর্ব-৫ঃ  বাংলা ভাগের জন্য সাম্প্রদায়িক প্রচার অভিযান, ১৯৪৬-৪৭ 

(উৎসঃ জয়া চ্যাটার্জী, বাঙলা ভাগ হলঃ হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭, অনুবাদঃ আবু জাফর,  এল অ্যালমা পাবলিকেশনস, প্রথম মুদ্রন, ১৯৯৯, পৃঃ ২৬৯-২৭২,২৭৬-২৭৭  )। বইটির ই-বুক 

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

১৯৪৬ সনের কলকাতা সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞনুরুল কবির

কলকাতা দাঙ্গা ও দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা –নুরুল কবির

কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে – সুনীতি কুমার ঘোষ

Facebook Comments