হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও ১৯৪৭ সালের বাঙলা ভাগ-পর্ব ৬

জয়া চ্যাটার্জী

লিখেছেনঃ প্রফেসর জয়া চ্যাটার্জী, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়

পর্ব ১ঃ সর্ব–ভারতীয় প্রয়োজনে বাংলা বিভক্তি , পর্ব ২ঃ বাংলা ভাগের প্রাদেশিক উৎস, ১৯৪৫-৪৬

পর্ব ৩ঃ কলকাতা দাঙ্গার সাংগঠনিক পটভূমি   পর্ব ৪ঃ কুখ্যাত কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ

পর্ব ৫ঃ বিভক্তির জন্য সাম্প্রদায়িক প্রচার অভিযান 

বিভক্তির জন্য স্বাক্ষর অভিযান ও জনসভা, ১৯৪৬-৪৭ 

তবে বিভক্তির অনুকূল আন্দোলন শুধু কোলকাতা শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা প্রদেশের শহর ও গ্রামে এর সপক্ষে দৃঢ় সমর্থন আদায়ে এর সংগঠকেরা সমর্থ হয়। এটা অপ্রত্যাশিত ছিল না যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো এ আন্দোলনের পুরোভাগে থাকবে। কিন্তু পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতেও হিন্দুরা আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করে- যে আন্দোলনের দাবি মেনে নিলে তারা নিজ ভূমিতে পরবাসী হয়ে পড়বে (সারণী ৯)।

বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই আবেদন আসে; স্থানীয় সংগঠনগুলো প্রস্তাব নিয়ে প্রায় ক্ষেত্রেই কয়েকশ’ লোকের স্বাক্ষর যুক্ত করে তা প্রেরণ করত- এক বা দুটো ঘটনায় দেখা যায় দাবির সপক্ষে বুড়ো আঙুলের ছাপ দিয়ে আবেদনপত্রের কাগজ পাঠানো হয়েছে। এক্ষেত্রে হিন্দু সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর লোককে ব্যাপকভাবে সংগঠিত করা হয়েছিল- বাঙলার ইতিহাসে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যা কখনো হয়নি। প্রত্যেকেই বিভক্তির পক্ষে মত দেয়; প্রতিটি ফাইলেই দেখা যায় এককভাবে অনেক ব্যক্তির পত্র, যারা তাদের অসন্তোষ প্রকাশে ভীত হয়নি।৭৩

সারণি : বাঙলা বিভাগের দাবি সম্বলিত আবেদনের জেলাভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ ও হিন্দু জনগণের আনুপাতিক হার, ১৯৪৭

জেলা আবেদনের সংখ্যা হিন্দু জনসংখ্যা
(শতকরা হিসাবে)
বর্ধমান ৪৩ ৭৮.৬২
বীরভূম ৬৭.১৭
বাঁকুড়া ৩৪ ৯০.৯৯
মেদিনীপুর ৩৪ ৮৯.২৩
হুগলী ১৮ ৮২.৯৩
হাওড়া ৩৭ ৭৮.৩
কোলকাতা ৯৪ ৬৮.৭১
২৪ পরগণা ২৩ ৬৪.২
মুর্শিদাবাদ ৪৩.১
নদীয়া ১৮ ৩৭.৫৩
যশোর ৩৭.৫৫
খুলনা ১৫ ৫০.২২
রাজশাহী ২২.৮১
দিনাজপুর ৪৫.২২
জলপাইগুড়ি ১২ ৬৭.৫৩
দার্জিলিং ৪৫.২২
মালদা ১২ ৪২.১৭
রংপুর ২৮.৭৭
বগুড়া ১৬.৩৫
পাবনা ২২.৯৯
ঢাকা ২৪.১৪
ময়মনসিংহ ২২,৮৯
ফরিদপুর ৩৫.৮৬
বাকেরগঞ্জ ১৪ ২৬.৪২
ত্রিপুরা ২৪.১৪
নোয়াখালী ২১.৪৭
পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৭.২৭

সূত্র: সংকলিত হয়েছে এআইসিসি পেপার্স, ফাইন নং জি-৫৪(১)/১৯৪৭, সিএল-১৪ (বি)/১৯৪৬ ও সিএল-১৪(ডি)/১৯৬৪৬; হিন্দু মহাসভা পেপার্স, ২-৪ কিস্তি, ফাইল নং ৮২/১৯৪৭, পি-১০৭/১৯৪৭ এবং ১৩৮/১৯৪৬-৪৭ থেকে। হিন্দু জনসংখ্যার হিসাব নেওয়া হয়েছে সেন্সাস অব ইন্ডিয়া, ১৯৩১, খণ্ড ৫ থেকে।

জয়া চ্যাটার্জী
জয়া চ্যাটার্জী

সবচেয়ে বেশি আবেদন পাওয়া যায় পশ্চিম বাঙলার বিভিন্ন হিন্দু-প্রধান এলাকা থেকে । কোলকাতা ও ২৪ পরগণাসহ বর্ধমান বিভাগের ৬টি জেলার প্রাপ্ত আবেদনপত্র ছিল মোট সংখ্যার শতকরা ৭০ ভাগের বেশি। ৭৪এর মধ্যে কেবল বর্ধমান, মেদিনীপুর, কোলকাতা ও ২৪ পরগণা জেলাই শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ আবেদনপত্র প্রেরণ করে। বাঙলার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার মধ্য থেকে কেবলমাত্র বাকেরগঞ্জ এলাকা থেকে দশটির বেশি আবেদনপত্র প্রেরণ করা হয়। ৭৫

এই বিন্যাসটি একেবারে বিস্ময়কর কিছু ছিল না। কারণ, প্রস্তাবিত নতুন হিন্দু রাষ্ট্রে কেবলমাত্র হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল। ত্রিশ দশকের শেষ দিকে এবং চল্লিশ দশকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাওয়া জেলায় এ আন্দোলন বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে- উল্লেখযোগ্য এসব জেলা হল বর্ধমান, মেদিনীপুর, ২৪ পরগণা, হুগলী এবং অবশ্যই কোলকাতা। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে,

এসব জেলায় স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে হিন্দুদের হাত থেকে চলে গিয়েছিল এবং গোলযোগ হয়েছিল, যাকে এ পুস্তকে পূর্ববর্তী দাঙ্গা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলি হল সেইসব এলাকা যেখানে ভদ্রলোক হিন্দুরা মুসলমান শাসনের ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভব করে- নিজ এলাকায় সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও মুসলমান সরকারকে মেনে নিতে বাধ্য হয়।৭৬

বিভক্তির আন্দোলন বিভিন্ন জেলায় হিন্দু গ্রুপের স্থানীয় অভিযোগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ছিল না। বরং এটা ছিল একদল লোকের সুপরিকল্পিত আন্দোলন অধিকাংশ আবেদনপত্রে একই মনোভাব প্রকাশ পায় এবং একই ধারা অনুসরণ করা হয়:

বিষয়: পৃথক পশ্চিম বাঙলা প্রদেশ গঠনের দাবি। শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রার্থনাসহ: আমরা স্বাধীন ভারতীয় ফেডারেশনের অধীন থাকতে চাই। প্রস্তাবিত ‘পশ্চিম বাঙলা প্রদেশ’-এর জন্য দাবির  কথা আমরা আপনাদের অবহিত করছি। এই প্রদেশ থাকবে স্বাধীন ভারতীয় ফেডারেশনের অধীন।৭৭

এরপরই আবশ্যিকভাবে জোর দিয়ে বলা হয়েছে মুসলিম লীগ সরকার জীবন, সম্পত্তি ও স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে বাঙালি হিন্দুদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। সবশেষে স্বাক্ষরদানকারীরা দাবি করে যে, ‘মুসলিম রাজ’- এর অধীন অগ্রহণযোগ্য অবমাননার জীবন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রদেশকে বিভক্ত করতে হবে।

অধিকাংশ দাবিপত্র ছিল ছাপানো- ঐ দাবিপত্রের প্রতিটি পাতায় স্বাক্ষরকারীর পূর্ণ নাম, ঠিকানা, পোস্ট অফিস, জেলা, বয়স ও পেশার স্থান পূরণ করার করার ব্যবস্থা ছিল। মাত্র চারটি ছাড়া বাকি ক্ষেত্রে এ ধরনের আবেদনপত্র সর্ব-ভারতীয় কংগ্রেস কমিটির প্রেসিডেন্ট ‘রাষ্ট্রপতি’ জে. বি. কৃপালনীর নামে সম্বোধন করে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস অফিসে সরাসরি প্রেরণ করা হয়। হিন্দু মহাসভার বরিশাল শাখা থেকে বাকি চারটি আবেদনপত্র পাঠানো হয় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর কাছে। এর ভাবার্থ অত্যন্ত স্পষ্ট যে,

সংগঠনের সংঘবদ্ধ আন্দোলনে স্থানীয় কংগ্রেস গ্রুপগুলো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিল। এই সত্যটি যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। বরং ব্যাপকভাবে এবং ভ্রান্তভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, এই আন্দোলন ছিল শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মস্তিষ্কপ্রসূত (নিশ্চয়ই তিনি বিভক্তির সমর্থক ছিলেন) এবং মহাসভার স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা সংগঠিত।৭৮ বস্তুত বাঙলা-বিভাগ আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ছিল বেঙ্গল কংগ্রেস।

বাঙলা-বিভাগ আন্দোলনে বেঙ্গল কংগ্রেসের ভূমিকা একেবারে আকস্মিক ছিল না। বামপন্থীদের এবং বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে একের পর এক সংঘর্ষের পর চল্লিশের দশকে দলকে পুনর্গঠিত করা হয় এবং পরবর্তী বছরগুলিতে দলের নীতি সুস্পষ্টভাবে হিন্দু স্বার্থ রক্ষার পক্ষে পরিবর্তন করা হয়। এ প্রক্রিয়ার নতুন নেতা ডা. বিধান রায় ও নলিনী সরকারের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণে বেঙ্গল কংগ্রেস আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত সংগঠনে পরিণত হয়- দলের মধ্যে মারাত্মক কলহ-বিবাদ এ সময় অতীতের ঘটনায় পরিণত হয়। একই সাথে কংগ্রেস তার সামজিক আমূল পরিবর্তনবাদী মতবাদ ত্যাগ করে। সাবেক এক কংগ্রেস নেতা এ সম্পর্কে দুঃখ করে বলেন:

নেতা কর্মীদের সামঞ্জস্যপূর্ণ বিপ্লবী আহবানের মধ্য দিয়ে বেঙ্গল কংগ্রেস অতীতে কংগ্রেসের কিছু কিছু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারে বেশ সহায়ক হয়েছিল মাঝে মাঝে প্রকাশ্যে উপস্থাপিত নিছক সংস্কারমূলক প্রবণতার পথে তা প্রতিবন্ধক হিসেবেও কাজ করে গত কয়েক বছরে বেঙ্গল কংগ্রেস দৃশ্যপট থেকে একেবারে বিলীন হয়ে গেছে সাধারণভাবে সংগঠনটিকে কিছুটা সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়েছে যাতে ক্ষমতাসীন লোকদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তা খুবই সহায়ক হয়৭৯

নেতারা এ সময় সিদ্ধান্ত নেন যে, দলের অভ্যন্তরে তাদের ক্ষমতাকে বাইরের রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত করার জন্য বাঙলা ভাগ করা হল একমাত্র পথ। এ লক্ষ্য অর্জনে তারা তাদের নতুন সুশৃঙ্খল বাহিনীকে কাজে লাগায়, যেখানে প্রয়োজন সেখানে মহাসভার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। চল্লিশের দশকে সদস্যভুক্তি ও নীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেস ও মহাসভার পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়। সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে বাঙলায় মহাসভা ও কংগ্রেসের মধ্যে প্রায় কোনো পার্থক্য ছিল না। ভারতের অন্যান্য অংশে মহাসভার আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল অমার্জিত ও বাগাড়াম্বরপূর্ণ চালচলন, বাঙলায় সাধারণভাবে মহাসভা এটা পরিহার করে। এর মূল কৃতিত্ব শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বের প্রজ্ঞা এবং বেঙ্গল কংগ্রেসের চরমপন্থার ওপর তাঁর সংযমী কোমল ভাষ্য।৮০ 

দুই দলের মধ্যকার সম্পর্ক আস্তে আস্তে এমন পর্যায়ে আসে যে, কংগ্রেস নেতৃত্ব দেয় আর মহাসভা তা অনুসরণ করে। চল্লিশ দশকের প্রথম দিকে কংগ্রেসের পুরনো নির্বাচনী এলাকার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মহাসভা নিজের আওতায় আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু হিন্দু স্বার্থ রক্ষায় কংগ্রেস নীতি অধিক বাস্তবসম্মত হয়ে উঠলে অনেক হিন্দু কংগ্রেসের প্রতি তাদের আনুগত্যের পুনঃপ্রকাশ ঘটায় এবং ১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনে তারা কংগ্রেসকেই ভোট দেয়।

সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে বাঙলায় মহাসভা ও কংগ্রেসের মধ্যে প্রায় কোনো পার্থক্য ছিল না।দুই দলের মধ্যকার সম্পর্ক আস্তে আস্তে এমন পর্যায়ে আসে যে, কংগ্রেস নেতৃত্ব দেয় আর মহাসভা তা অনুসরণ করে।

যুদ্ধের পর বাঙলায় কংগ্রেস দুটো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়; এই সময় কংগ্রেস হাই কমান্ডের সুস্পষ্ট সমর্থন লাভ করে এবং কোলকাতার ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করে। ১৯৪৬ সালের দিকে মহাসভা হয়ে পড়ে একটা শক্তিহীন দল। কংগ্রেসের কাছে অবনত এই দল উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় একটা আসনেও জয়ী হতে ব্যর্থ হয়। চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে মহাসভা পরিচালিত করত কংগ্রেসকে, এই ভূমিকা এখন বিপরীতমুখী হয়ে পড়ে। বাঙলা বিভক্তির লক্ষ্যে উভয় দল একসাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলেও কংগ্রেস ঐ আন্দোলন পরিচালনায় সন্দেহাতীতভাবে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করে।

১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে মহাসভা ওয়ার্কিং কমিটি ‘বাঙলা বিভক্তির আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পাঞ্জাবি পুলিশের ‘নৃশংসতার বিরুদ্ধি প্রতিবাদ হিসেবে এক দিন হরতাল পালনের’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জানা যায় যে, ‘মহাসভা নেতারা একটা যৌথ কার্য পরিচালনার জন্য কংগ্রেস নেতাদের সাথে আলোচনা করছে’ এবং ‘প্রস্তাবিত হরতালের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বাঙলা প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির নির্বাহী পরিষদে’।৮১ মে মাসে কংগ্রেস ও মহাসভা বাঙলা বিভাগের দাবিতে যৌথভাবে কোলকাতায় এক বিরাট জনসভার আয়োজন করে, ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার৮২(আরো দেখুনঃ ইতিহাস চর্চায় যদুনাথ সরকারের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি)

প্রাদেশিক পর্যায়ে উভয় দলের নির্বাহীদের মধ্যে এ ধরনের সহযোগিতা স্থানীয় পর্যায়েও পরিলক্ষিত হয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে হুগলী জেলার শ্রীরামপুর শহরের কথা বলা যায়। এখানে বাঙলা ভাগের দাবিতে উভয় দলের স্থানীয় শাখার উদ্যোগে একটা যৌথ মিছিল পরিচালিত হয়। শ্রীরামপুরের এই তুচ্ছ ঘটনাতেও কংগ্রেস নেতৃত্ব দেয়- ঐ মিছিলের চেয়ারম্যান ছিলেন স্থানীয় কংগ্রেস নেতা বাবু কালিপদ মুখোপাধ্যায়। ৮৩

বাকেরগঞ্জ জেলার ঝালকাঠি এবং ঢাকা জেলার কালনায় কংগ্রেস ও মহাসভা মহকুমা শাখা বাঙলা বিভাগের দাবিতে যৌথভাবে জনসভা করে। অন্যান্য ঘটনায় দেখা যায়, স্থানীয় বিভিন্ন মহাসভা কমিটি বাঙলা বিভাগের প্রস্তাব পাশ করার পর তা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর কাছে না পাঠিয়ে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের কাছে প্ররণ করেছে। পশ্চিম বাঙলার বিভিন্ন মহাসভা কমিটির ক্ষেত্রে বিশেষ করে কোলকাতা,হুগলি, হাওড়া, ২৪ পরগণা এবং সর্বোপরি বর্ধমানের ক্ষেত্রে এটা সত্য ছিল।৮৪

এমনকি মহাসভা কর্মীরা বুঝতে পারে যে, শ্যামাপ্রসাদ নয়, কংগ্রেস নেতারাই নেতৃত্বে আছে। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাঙলা ভাগ হয়ে যাবে এ সময় উভয় দলের মধ্যে কাজের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার প্রয়াসে বাঙলার ‘খাদি-গ্রুপের নেতারা’ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে কংগ্রেস নেতা হিসেবে পশ্চিম বাঙলার মন্ত্রিসভায় যোগদানের আহ্বান জানায়। সেখানে উপস্থিত হিন্দু মহাসভার নেতারা তাঁকে এই প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য উৎসাহিত করেন। জানা যায়, ‘শ্যামাপ্রসাদ নিজে ব্যক্তিগতভাবে পশ্চিম বাঙলার একটা মন্ত্রীর পদ গ্রহণের পক্ষে ছিলেন; তবে বোঝা যায় যে, শীর্ষ কংগ্রেস নেতাদের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে কংগ্রেস পার্টিতে যোগদান করতে হবে বলে তিনি ঐ পদ গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।’৮৫

বাঙলা ভাগের যৌথ আন্দোলনে কংগ্রেস স্পষ্টতই ছিল অধিকতর অগ্রণী অংশীদার। আর বিভক্তির আন্দোলনে এর ভূমিকা (যাকে বলে নেতৃত্বের মর্যাদায়) হিন্দু মহাসভার সাথে শুধু সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা বাঙলায় মহাসভা ছাড়াই কংগ্রেস স্বতন্ত্রভাবে বাঙলা ভাগের আহবান জানিয়ে জনসভার আয়োজন করে। কোলকাতার বালিগঞ্জে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বাঙলার নেতৃস্থানীয় গান্ধীবাদী ড. প্রফুল্লচন্দ্র রায়- এ ধরনের জনসভার মধ্যে এটাই ছিল বহুল প্রচারিত।

বাঙলা ভাগের জন্য ৭৬টি জনসভার আয়োজন করা হয় বলে জানা যায়- এর মধ্যে কংগ্রেস একই কমপক্ষে ৫৯টি জনসভার আয়োজন করে। বারোটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয় মহাসভার উদ্যোগে, আর মাত্র পাঁচটি জনসভা হয় যৌথ উদ্যোগে।

ঘটনাচক্রে এক জায়গায় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে অথচ পুরোপুরি এককভাবে হয়নি এমন ঘটনাও স্পষ্ট গোচর হয়। এগুলি হয়েছে সেই সব জেলায়, যেখানে আন্দোলন অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল (অর্থাৎ কোলকাতা, বর্ধমান, মেদিনীপুর, হওড়া ও বাঁকুড়া) এবং যেখানে কংগ্রেস অগ্রণী ভূমিকায় ছিল। যুক্তিগ্রাহ্যভাবে এই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল বর্ধমান জেলা। কংগ্রেস কমিটিগুলো এ জেলায় বাঙলা বিভাগের পক্ষে শুধু কাটোয়া, কালনা ও আসানসোলের মতো শহরেই জনসভার আয়োজন করেনি, রায়ানের মতো ক্ষুদ্র গ্রামেও জনসভার আয়োজন করে। এ গ্রাম থেকেই স্বাক্ষর ও বুড়ো আঙুলের ছাপ দিয়ে একশ’টি দরখাস্ত প্রেরণ করা হয়।৮৬

এটা স্পষ্ট যে, বেঙ্গল কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি থেকে এই আন্দোলন যে শক্তি লাভ করে তা মোটেও কম নয়। ভদ্রলোকেরা ছিল এ আন্দোলনের মূল শক্তি, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। বস্তুত ভদ্রলোক রাজনীতির মূল স্রোত যে দিকে প্রবাহিত হয় তাতে বাঙলা ভাগ ছিল তার যৌক্তিক পরিসমাপ্তি।

 নোটঃ
ref 6

পর্ব ৭

(উৎসঃ জয়া চ্যাটার্জী, বাঙলা ভাগ হলঃ হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭, অনুবাদঃ আবু জাফর,  এল অ্যালমা পাবলিকেশনস, প্রথম মুদ্রন, ১৯৯৯, পৃঃ ২৮১-২৮৯ )। বইটির ই-বুক 

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

দেখুন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করে কি বলেছিল ভদ্রলোকেরা

উপনিবেশবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও বাংলা ভাগ– নুরুল কবির

কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে – সুনীতি কুমার ঘোষ

উপনিবেশবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও বাংলা ভাগ (পর্ব-১)– নুরুল কবির

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion