বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদে ইসলাম প্রসঙ্গঃ ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা

১।

সম্প্রতি জঙ্গি আক্রমণ এবং দেশব্যাপী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকারি ও বেসরকারি প্রচারণার প্রেক্ষিতে আমাদের জাতীয়তাবাদের চেতনায় ধর্মের- নির্দিষ্ট করে বললে, ইসলামের- ভূমিকা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই বিষয়ে ইতোমধ্যেই প্রচলিত আলাপে (আসলে বলা উচিত বিতর্কে) মোটাদাগে দুটো ধারা লক্ষ্যনীয়: একটা ধারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির ধর্ম ইসলামকে আশ্রয় করে নিজেদের আলাদা পরিচয় নির্মাণে ব্রত, যে পরিচয় তাদেরকে আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী ভারত থেকে পৃথক করে। এদের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তা করা সত্বেও অসংখ্য বাস্তব এবং যৌক্তিক কারণ রয়েছে ভারতের প্রতি বাংলাদেশীদের বিদ্বেষ পোষণ করার। কিন্তু শুধুমাত্র ধর্মকে দলগত পরিচয়ের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে নেওয়ায় এই ধারাটি কমপক্ষে দুটো সমস্যার মুখে পরে;

এক, একই ধর্মাবলম্বী হিসেবে পাকিস্তান এবং এর প্রতি সহানুভূতিশীলরাও একই দলের ঢুকে পড়ে, যারা ঐতিহাসিক কারণে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের শত্রুদলে থাকার কথা। দুই, ইসলাম ব্যতীত অন্যান্য সকল ধর্মাবলম্বীরা বাংলাদেশে একই সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের অংশ হওয়া সত্বেও দলের বাইরে পড়ে যায়, যারা কয়েক শতবছর (হাজার না হলেও) ধরে বড় ধরণের কোনরকম সংঘাত ছাড়াই পাশাপাশি সহাবস্থান করে আসছে।

hasan-mahmud
লেখক

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বাংলাদেশী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীদের কথা, যাদেরকে এই ধারার জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের মধ্যে গ্রহন করেনা এবং সর্বদা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে।এরা স্বদেশী এসব ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের থেকে বরং ভিন্ন দেশের, ভিন্ন জাতির মুসলমানদেরকে বেশি আপন মনে করে। যেমন, বাংলাদেশের অধিবাসী ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দুঃখ-দুর্দশা এদেরকে তেমন একটা না কাঁদালেও রোহিঙ্গা, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার মুসলমানদের জন্য এদের সহানুভূতির ঘাটতি থাকে না। শুধুমাত্র ধর্মের পার্থক্যের কারণে একই জাতির হলেও অমুসলিম বাংলাদেশীদের এরা নিজ দলের বাইরে রাখে। ইচ্ছেয় হোক আর অনিচ্ছেয় হোক, সচেতনে হোক আর অবচেতনে হোক, এদের কাছে অমুসলিমরা অবাংলাদেশীরা অন্যমানুষই রয়ে যায়। সার্বজনীন মানবতার বদলে সার্বজনীন মুসলিম ভ্রাতৃত্ব এদের কাছে বড়। এ কারণে, এই মতাদর্শিক অবস্থানকে আমি মনে করি অমানবিক, এবং কাজে কাজেই, অগ্রহনযোগ্য।

দ্বিতীয় আরেকটা ধারা লক্ষ্যণীয় যা’ ধর্মকে বাদ দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ‘বাঙালিত্বের’ ভিত্তিতে নিজেদের আলাদা পরিচয় নির্মাণে সচেষ্ট। এই ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান মর্যাদা পাবে। এই ধারা সচেতন ভাবে ইসলামকে আত্মপরিচয়ের বিচার থেকে সড়িয়ে রাখার প্রয়াস পায়। এদের যুক্তির পক্ষে ঐতিহাসিক সমর্থন এই যে, পাকিস্থান রাষ্ট্র আমাদেরকে ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং নিপীড়ণ করেছে। কাজেই, পাকিস্তানের সাথে সাথে ইসলামও আমাদের জাতীয় শত্রু।পাশাপাশি ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে বলে এরা ভারতের প্রতি বন্ধু ভাবাপন্ন। এদের কাছে বাংলায় কথা বলা আর বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করাই জাতীয় পরিচয়ের একমাত্র মাপকাঠি।

অন্যদিকে, কেউ বাঙালি হয়েও যদি পাঞ্জাবী-টুপি পড়ে, দাড়ি রাখে, নিয়মিত মসজিদে যায়, সে অবশ্যম্ভাবীরূপেই মুসলিম মৌলবাদী এবং পাকিস্থানের দোসর ও জাতীয় শত্রু।অতএব, মাদ্রাসায় পড়া অভাবী, অনন্যোপায় বাংলাদেশী মুসলিমদেরকে স্বজাতির জন্য স্বভাবসূলভ সহানুভূতি দিয়ে মূলস্রোতে নিয়ে আসার বদলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়াই এদের কাছে শ্রেয়। একইভাবে, মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে আক্রান্ত অসহায় মানুষগুলো শেষ আশ্রয় হিসেবে প্রতিবেশী বাংলাদেশের দিকে আসতে চাইলে শুধুমাত্র মুসলমান বলেই তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে এদের চরম অনীহা। ইসলামের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে এই ধারাও কমপক্ষে দুইটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েঃ

এক, দেশের বেশিরভাগ মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং তারা নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে দেখে না। তাদের প্রাত্যহিক ও সামাজিক জীবনযাত্রায় ধর্ম ওতোপ্রতোভাবে মিশে আছে- ব্যক্তির নামকরণ থেকে শুরু করে বিয়ে, পরিবার, ব্যবসা-বানিজ্য, আচার-অনুষ্ঠান, বিচার-সালিশ, সর্বত্র; এবং এটা বাংলাদেশে সকল ধর্মেই প্রায় সমানভাবে দৃশ্যমান। এই ধারার জন্য চ্যালেঞ্জটা আরো কঠিন হয়ে ওঠে এইজন্য যে, যে ইসলাম ধর্মের (তথা রক্ষণশীল কট্টরবাদী ব্যাখ্যার ইসলাম ) বিরুদ্ধে এরা নিজেদের স্থাপন করে, তা’ বাঙালি মুসলমানের সহজাত ধর্ম নয়। বাঙালির ইসলাম ধর্ম অন্য ধর্মের সাথে আপোষ করে একত্রে সহাবস্থান করে, একে অপরের আচার-অনুষ্ঠান গ্রহন করে, সহ্যও করে, কিন্তু নিগৃহ করে না। একারণেই আমরা পীরপূজা, কি পৌষপার্বণ, কি নববর্ষ বরণ, সর্বত্র সকলের সাগ্রহ অংশগ্রহন দেখতে পাই। ইসলামকে সড়াতে গিয়ে এই ধারা বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির আত্মিক সমর্থন হারিয়ে ফেলে।

দুই, শুধুমাত্র বাঙালিত্বকে জাতীয় পরিচয়ের মাপকাঠি হিসেবে নিলে বাংলাদেশের বাইরে (প্রধানতঃ ভারতে) বসবাসকারী আরো কয়েক কোটি বাঙালিও একই দলের মধ্যে চলে আসে, যারা নিজেদেরকে জাতীয়তায় বাঙালি হিসেবে পরিচয় দেয় না, দেওয়ার সঙ্গত কোন কারণও নেই। তাহলে এই ধারার সংকটটি হচ্ছে এই যে, এটি নিজ দেশের একটা বড় অংশকে শুধুমাত্র ইসলামের কারণে পর করে দেয়, আবার অন্যদেশের কয়েককোটি মানুষকে শুধুমাত্র সংস্কৃতি ও ভাষার মিলের কারণে আপন করতে চায়। এই মতাদর্শের কাছে সার্বজনীন মানবতার চেয়ে সার্বজনীন বাঙালিত্ব বেশি বড়। একারণে, এই অবস্থানকেও আমি আগেরটার মত একই ভাবে অমানবিক এবং অগ্রহনযোগ্য মনে করি।

আমার মতে জাতীয়তাবাদ বা আমাদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে এই যে মোটাদাগে একটা বিভাজন দেখা যায়, এর প্রধান কারণ এতে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে আমাদের মতানৈক্য। জনগোষ্ঠির পরিচয়ের মাপকাঠি হিসেবে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব এবং বিকাশের প্রেক্ষিত পর্যালোচনা করলে আশা করি বিষয়টা খানিকটা খোলাসা হবে।

২।

জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ইউরোপেই; শুরু ১৭ শতকে হলেও পরিপূর্ণ বিকশিত হতে লেগেছে প্রায় ১৯ শতকের শেষ অব্দি।  পার্লামেন্ট, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সংঘ, শ্রমিক সংঘ, পার্শ্ববর্তী রাজ্য, ইত্যাদি আভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শক্তির সাথে ধারাবাহিক দ্বন্দ্বের ফলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের রাজার নিরংকুশ ক্ষমতা ক্রমাগত ক্ষয়ে যেতে যেতে এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যের ভিত্তি ভেঙ্গে পড়ে। ১৭৮৯ এর ফরাসী বিপ্লব এই ধারারই চুড়ান্ত পরিণতি। যেখানে সাম্রাজ্যের প্রজা থেকে প্রথমবারের মত জনগণ জাতিরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শাসক আর শাসিতের মধ্যে স্থাপিত হয় ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract)যেখানে ‘শাসকের প্রতি আনুগত্যের’ বিনিময়ে জনগন পায় ‘নাগরিক অধিকার’।

১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে ইউরোপে স্থাপিত হয় ‘সামাজিক চুক্তি’ এবং নাগরিক অধিকার

সাম্রাজ্যে শাসকের প্রতি প্রজার আনুগত্য শর্তহীন, প্রজা হিসেবে জন্ম হয়েছে বলেই তাকে রাজার আনুগত্য করতে হবে। আর এই দর্শনকে জাষ্টিফাই করতে ব্যবহার করা হতো ধর্ম বা ঐশী বাণী যা’ শাসককে প্রজাদের থেকে উন্নত বৈশিষ্ট্যের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতো। বৃহদাকার রাজনৈতিক সংগঠনের (রাজ্য, সাম্রাজ্য) শুরু থেকেই ধর্মের এইরূপ ব্যবহারের অজস্র দৃষ্টান্ত আছে। ফরাসী বিপ্লবের ফলস্বরূপ সাম্রাজ্যের স্থলে যে জাতিরাষ্ট্র দেখি, সেখানে প্রজার এই আনুগত্য শর্তাধীন।

অর্থ্যাৎ, শাসক যতদিন নাগরিক অধিকারে স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দিবে, ততদিন নাগরিকদের আনুগত্য পাবে; আর নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে শাসক জনগণের আনুগত্য এবং শাসনক্ষমতা দুইই হারাবে। একারণে একে বলা হয় গণতন্ত্র বা জনগণের শাসন।

আর যেহেতু প্রজার আনুগত্য লাভের জন্য ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল, তাই জাতিরাষ্ট্রে ধর্মের ভূমিকাও খর্ব হলো। উপরন্ত, ধর্মকে রাজার প্রতি প্রজার নিঃশর্ত আনুগত্য আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে একে সচেতনভাবে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করা হলো যেন শাসক আর কখনো ধর্মের আশ্রয় নিয়ে নাগরিকদের কাছ থেকে নিঃশর্ত আনুগত্য আদায়ের চেষ্টা করতে না পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় জাতীয়তাবাদের সূচনা হয় ইংরেজদের আমলে, সুনির্দিষ্ট করে আধুনিক (আদতে উপনিবেশিক) শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলনের পর। এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনে যদিও ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল একটা ছাপোষা শ্রেণী তৈরী করা যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের কলোনিয়াল শাসন পরিচালনায় সহায়তা করবে, এদের মধ্যে কেউ কেউ সেসময় বিলেত বা প্যারিসে পড়তে গিয়ে জাতীয়তাবাদের মূল ধারণার সাথে পরিচিত হয়ে ফিরে এসে ইংরেজ শাসনেরই বিরুদ্ধে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র ধর্মের প্রসঙ্গে যে পথে হেটেছে, ভারতবর্ষে জাতিরাষ্ট্র একেবারে উলটো দিকে যাত্রা করে। অর্থ্যাৎ, ধর্মকে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করার বদলে ধর্মকে আরো ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে, ধর্মের ভিত্তিতে দুইটা আলাদা জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দেয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্ম প্রসঙ্গে জাতীয়তাবাদের এই উলটো-যাত্রার সামাজিক পটভূমি আছে যা’ ইউরোপের থেকে আলাদা। সেটা কেমন?-

ইউরোপের ইতিহাসে খ্রীষ্ট ধর্মের একক আধিপত্য দেখা যায়। সুদীর্ঘকাল খ্রীষ্টধর্ম রাজা/সম্রাটদের দ্বারা রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে, সাম্রাজ্যের পতনের পর জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব হলে জনগণ খ্রীষ্টধর্মকে প্রত্যাখ্যান করে সেক্যুলার হয়েছে। কিন্তু বাংলায় সাধারণ জনতা শাসকের (এবং সেই সাথে শাসকের ধর্মেরও) নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক ধর্মের আশ্রয় নিয়েছে। যেমন- সেনদের কুলীন-ব্রাম্মণ্যবাদ থেকে রেহাই পেতে তারা ইসলামে কনভার্ট করেছে। হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলামে এই যে কনভার্সন, এটা প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক। এটা বোঝা যায় বাংলার মুসলমানদের মন-মানসিকতা এবং আচার-আচরণে ইসলামের প্রভাব বিচার করলে।

আহমদ ছফা এই বিষয়ে একটা দূর্দান্ত প্রবন্ধ লিখেছেন “বাঙ্গালী মুসলমানের মন” শিরোনামে। সেখানে তিনি সাধারণ মুসলমানদের হাতে গড়া পুঁথি সাহিত্য থেকে উদাহরণ নিয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করে দেখিয়েছেন;

কিভাবে বাংলার কনভার্টেড মুসলমানরা ব্রাহ্মণ্যবাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য হযরত আলীর কল্পিত পুত্র আবু হানিফার চরিত্র এঁকেছে যে কিনা এমনকি আরবের মরুভূমিতেও হিন্দু ব্রাহ্মণদের খুঁজে হত্যা করে, তাদের অসংখ্য কুমারী কন্যার পাণিপীড়ণ করে, মৃত হোসেনের ছিন্নমস্তকের সামনে কালেমা পড়ে ধার্মিক ব্রাহ্মণও সপরিবারে মুসলমান হয়, ইত্যাদি।

এইসব পুঁথিসাহিত্যের কোথাও ডকট্রিনাল বা খাঁটি ইসলাম যথা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কি আল্লাহর শাসন কায়েম, কোনটাই প্রধান হয়ে আসেনি। তবে আচার-অনুষ্ঠানে ইসলাম এসেছে। কিন্তু সেটা আবার শক্তিমানের ইসলাম না, সেটা দীন-দুঃখীর ইসলাম, পীর-ফকিরের ইসলাম, যা’ ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভেদ করে না, যা’ মসজিদে যায়, আবার মাজারেও যায়, ঈদগাহে যায়, আবার পূজামন্ডপেও যায়। একারণে, বাংলার আম জনতার মাঝে যে ইসলাম, তা’ মূলতঃ হিন্দু কৌলিণ্য প্রথার নিষ্পেষণ থেকে প্রধানতঃ নিম্নবর্ণের আত্মরক্ষার একটা কৌশলগত আশ্রয়মাত্র। আর তাই এরা ধর্ম পরিবর্তন করলেও বংশ পরম্পরায় চর্চা করে আসা সংস্কৃতির (তথা লোকসংস্কৃতি, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, ইত্যাদি) অধিকাংশকেই আঁকড়ে ধরে থাকে এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তা’ ইসলামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হলেও, যেমন মাজার সংস্কৃতি, বিয়ের নানান আচার-পদ্ধতি, ইত্যাদি।

আহমদ ছফার দৃষ্টিতে বাংলায় সাধারণ জনগণের ইসলাম ধর্মে কনভার্সনের এই দিকটা ধরা না পড়লেও তৎকালীন বাংলা, এবং সেই সাথে ভারতবর্ষে বৃটিশবিরোধী রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটা সহজেই বোঝা যায়। বংগভংগ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বাংলার মুসলিমদের হিন্দু-বিরোধী (নির্দিষ্ট করে বললে, হিন্দু নের্তৃত্ব বিরোধী) মনোভাব ক্রমাগত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইসলামের আশ্রয়ে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এই যে রাজনৈতিক ভাবে আলাদা পরিচয় দানা বাঁধতে থাকে, তা’ ইসলামী শাসন কায়েমের উদ্দেশ্যে নয়, বরং প্রধানতঃ উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার ও শাসকদের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে।

অর্থ্যাৎ, বাংলার ধর্মান্তরিত এইসব মুসলিম নিজেদের জন্য একটা স্বতন্ত্র্য পরিচয় নির্মাণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইসলামকে ব্যবহার করেছে। আল্লাহ ভীতি, বেহেস্তের আশ্বাস বা ইসলাম ধর্মের নীতিবাক্য নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজনেই বাংলার মুসলিম জনতা ইসলাম গ্রহন করেছে। তবে ইসলামের যেটুকু গ্রহন করলে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে, শুধু সেইটুকুই। পাশাপাশি, আগের ধর্মের সেইটুকু ত্যাগ করেছে যেটুকু না করলেই নয়। এজন্য বাস্তব জীবনাচরণে বাংলায় আমজনতার মাঝে হিন্দু/মুসলিম/বৌদ্ধের পার্থক্য সামান্য।

অতএব, বাংলায় ইসলামকে আশ্রয় করে যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ দেখি, তা’ আসলে ডক্ট্রিনাল ইসলামের পূণর্জাগরণ নয়, কোন ধর্মীয় রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যেও পরিচালিত নয়। এর উদ্ভবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার আম-জনতা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের শাসন থেকে মুক্তির আশায় প্রথমে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে। পরবর্তীতে একই কারণে, অর্থ্যাৎ কংগ্রেসের নের্তৃত্বে গঠিত ভারতে গিয়ে আবার হিন্দু-নের্তৃত্বের অধীনে যাওয়ার বদলে মুসলিম লীগের অধীনতাকে শ্রেয় মনে করেছে। কিন্তু মুসলিম লীগের নের্তৃত্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রেও নির্যাতন অব্যাহত থাকলে সেই তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্র থেকে বের হয়ে আসতেও দ্বিধা করেনি।

অর্থ্যাৎ, বাংলার মুসলমান যে ইসলামী চেতনার আশ্রয়ে নিজেদের জাতীয় পরিচয় নির্মাণ করে, সেটা আদতে ধর্মতাত্ত্বিক নয়, বরং রাজনৈতিক, এবং মূলতঃ সেক্যুলার, যে অর্থে ইউরোপীয় জাতীয়বাদ খ্রীষ্টধর্মকে রাজনীতি থেকে বাদ দিয়ে সেক্যুলার।

৩।

এখন আশা যাক বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ এবং ইসলাম প্রসঙ্গে বিদ্যমান বিতর্কে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যে সেক্যুলার আদর্শের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়েছে, তা’ প্রকৃতপক্ষে ‘বাঙালি মুসলমানের ইসলাম’ বিরোধী নয়। তারা অতীতে ইসলামকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে হিন্দুত্ববাদের জাতিভেদ প্রথা থেকে নিজেদের মুক্তির জন্য। মুসলিম লীগের নের্তৃত্বে ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলো, সেখানে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে তারা সেই রাষ্ট্রকেও ভেঙ্গে স্বাধীন হলো। বর্তমানে কোন কোন বুদ্ধিজীবি বাঙালি মুসলমানের পাকিস্তান থেকে এই স্বাধীনতাকে ‘ঘরে ফেরা’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তারা আবার ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল বা ইসলামপূর্ব হিন্দুত্ববাদী যুগে ফিরে গেল।

বাঙালি জাতীয়তাদের প্রবক্তারা মনে করেন যে, ১৯৭১ এ বাংলার মুসলমান ইসলামের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছে, ইউরোপীয়দের মতো ধর্মকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে সেক্যুলার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলিমরা ত’ শুরু থেকেই সেক্যুলার, মুসলিম নাম নিয়েই। কারণ, তারা শুধুমাত্র আলাদা রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্যই নামমাত্র মুসলমান হয়েছিল, ইসলামী শাসন, বা আল্লাভীতি, বা বেহেস্তের লোভে নয়।কাজেই, উল্লিখিত মতাদর্শে মৌলবাদী ইসলামের যে ভয়, তা’ বাংলার মুসলমানদের মধ্যে নেই, তা’ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চাপিয়ে দেওয়া।

আমাদের রাজনীতিতে একটা ধারা অবশ্যই আছে যা’ মৌলবাদী ইসলামকে ধারণ করে। কিন্তু সেটা কখনোই মূলধারা নয়, একেবারে ক্ষীণ একটা ধারা যা’র প্রমাণ পাওয়া যায় জাতীয় নির্বাচনসমূহে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের নগণ্য সংখ্যায়।

যেহেতু বাংলার মুসলমান স্বাধীনতার পর তাদের মুসলিম পরিচয় ছুড়ে ফেলেনি, তাই ইসলামকে জাতীয় পরিচয় থেকে মুছে দিতে চাইলে তারা প্রতিবাদ করে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষের তথা ইসলামমুখী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ক্ষুব্ধ জনতাকে নিজেদের দলে ভিড়াতে চেষ্টা করে এই বলে যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের হাতে তাদের মুসলিম পরিচয় নিরাপদ নয়। উপরন্তু, বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের মাঝে ইসলাম থেকে দূরত্ব তৈরী করার প্রচেষ্টাগুলোকে তারা ব্যাখ্যা করে এই হিসেবে যে, এগুলো পুণরায় হিন্দুত্বে ফিরে যাওয়ায় লক্ষণ যেখান থেকে তারা একবার বের হয়ে এসেছে। অতএব, হিন্দুত্ব থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র্য পরিচয় রক্ষা করতে হলে ইসলামী-আশ্রয়ী রাজনৈতিক দলগুলোই ভরসা।

ফলে জনগণ বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের ধারক আওয়ামীলীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে ইসলামমুখী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির দিকে যায়, কিন্তু জামায়াতের দিকে নয়।কারণ, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিল বলে বাংলাদেশের মূলধারা তথা সেক্যুলার মুসলিমদের কাছে জামায়াত এবং এর রক্ষণশীল ইসলাম সর্বদাই ত্যাজ্য।

কিন্তু মূলতঃ সেক্যুলার এই জনতা বিএনপির মধ্যে রক্ষণশীল দলগুলোর সাথে মাখামাখি, প্রতিবেশী অমুসলমানদের বদলে ভিনদেশী মুসলমানদের প্রতি বেশি দরদ দেখে হতবাক হয়, ক্ষুব্ধ হয়। ফলে ইসলামভিত্তিক যে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটাতে চায় বিএনপি এবং এর সহযোগীরা, তা’ বাঙালি মুসলিম জনতার কাছে আবেদন হারায়। আবার আওয়ামী লীগের কাছে আসলে যখন দেখে তারা মুসলমান পরিচয়কে মুছে দিয়ে শুধুমাত্র বাঙালি পরিচয়ের ভিত্তিতে আরেক জাতীয়তাবাদের অনুসরণ, তখনও হতাশ হয়, ক্ষুব্ধ হয়। ফলে এই ধারাও বাঙালি মুসলিম জনতার কাছে আবেদন হারায়।

দেশ শাসনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশের মানুষ এদের প্রতি ক্রমশঃই আস্থাহীন হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় কেউ কেউ আশংকা করেন যে, বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলো আবার গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠবে এবং বাংলাদেশ রক্ষণশীলদের ক্ষেত্রে পরিণত হবে।

এই দুইধারার বাইরে সবথেকে বেশি সম্ভাবনাময় হিসেবে স্বাধীনতার পর আমাদের মাঝে ছিল শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদ- এর ছিল বিশাল মেধাবী ছাত্র সংগঠন এবং তৃণমূল গণভিত্তি। কিন্তু ধর্মপ্রশ্নে এটিও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার মনোভাবকে বুঝতে ব্যর্থ হয়- ইউরোপের অনুসরণ করে ধর্মকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি নির্বাসনে পাঠানোর জন্য এটিও বাংলাদেশে মুসলিম জনতার কাছে আবেদন হারায়। ফলে, অমিত সম্ভাবনাময় এই ধারা কখনোই বিকশিত হতে পারেনি।আমার মতে,

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠির কাছে রক্ষণশীল কট্টরবাদী ইসলামের কোন আবেদন নেই। তারা মুসলমান শুধুমাত্র একটা স্বতন্ত্র্য পরিচয়ের জন্য, মুসলিম খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। ফলে কেউ যদি তাদেরকে দিয়ে সেটা করাতে চায়, বাঙালি মুসলমান তাদেরকে পরিত্যাগ করবে। আবার কেউ যদি তাদেরকে ইসলাম বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিতে পরিচিত করতে চায়, তাদেরকেও একইভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।

কাজেই, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ থেকে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৯০%) জনতার পরিচয় ইসলামকে বাদ দেওয়া অসম্ভব, একই ভাবে অসম্ভব তাদেরকে কট্টরবাদী ইসলামে টেনে নেওয়া। তারা মুসলিম পরিচয় নিয়েই একটা স্বতন্ত্র্য ও সেক্যুলার জাতীয় পরিচয়ের প্রত্যাশী, যা’র সাথে অন্যান্য ধর্মের প্রতিবেশীর সম্পর্ক সহমর্মীতার, সমব্যাথীর, সহযাত্রার, কিন্তু শত্রুতার নয়।

[ নোটঃ পোস্টের মতামত লেখকের নিজস্ব, কোনভাবেই ‘মূলধারা বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষের মতামত নয় ]

লেখকের অন্যান্য লেখাঃ

বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আবির্ভাবের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার পর্যালোচনা-পর্ব ১

প্রাসঙ্গিক পোস্টঃ

জাতি, জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবাদী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ন্যাশনালিজম’ ভাবনা

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion