মধ্যযুগের মহাকবি সৈয়দ সুলতান ও তার কাব্য প্রসঙ্গ-পর্ব ২

পর্ব ১

লিখেছেনঃ অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলী

মহাকবি সৈয়দ সুলতানের নবীবংশে (প্রথম খন্ড) প্রায় পঁচিশ হাজার পংক্তি রয়েছে । ‘হামদ’ অর্থাৎ আল্লাহ পাকের গুণকীর্তনের মধ্য দিয়ে কবি তাঁর মহাকাব্যের পর্দা উন্মোচন করেছেন । গ্রন্থের প্রথম চারটে পংক্তি এই-

প্রথমে প্রণমি প্রভু অনাদি নিধান
নিমিষে সৃজিছে যেই এ চৌদ্দ ভুবন ৷
আদি অন্ত নাহি তার নাহি স্থান স্থিত ৷
খন্ডন বর্জিত রূপ সর্বত্রে ব্যাপিত ।

উল্লেখিত ‘হামদ’ এরপর- “আদম সৃষ্টির পুর্বাবস্থা বর্ণনায় করি হিন্দু পুরানকে অবলম্বন করেছেন৷ অবশ্য তাঁর অজ্ঞতা ও আনাড়িপনার ছাপও সর্বত্র দৃশ্যমান । আগেকার ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব-হরি-সোম প্রমুখ নবীরা কিভাবে ইব্লিসের খপ্পরে পড়ে আল্লাহ নির্দেশিত ব্রতভ্রষ্ট হয়েছেন এবং তাঁদের নবুয়ত ব্যর্থ হয়েছে তার বর্ণনা দিয়ে শেষ নবী মুহম্মদের প্রয়োজনীয়তা এবং আপামরের ইসলাম বরণের যৌক্তিকতা প্রদর্শন করেছেন তিনি ।”৩

“হিন্দুর পুরানের ও হিন্দু সমাজের সঙ্গে গভীর পরিচয় ছিল কবির । তিনি এ পরিচয় কাজে লাগিয়েছেন।ইসলাম যে আল্লাহর মনোনীত শেষ ধর্ম এবং মুহম্মদ যে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ ও শেষ নবী, আর তার আবির্ভাবের ফলে পূর্বেকার নবীগণ প্রচারিত শিক্ষা ও আচার-আচরণ যে বাতেল হয়ে গেল, ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রেক্ষিতে তাই প্রমাণ করবার জন্যে তিনি হিন্দুর প্রধান দেবতা, অবতার ও ধর্মগ্রন্থে শয়তানের কারসাজিতে কি দোষ স্পর্শ করেছে তার বানানো কাহিনী বিবৃত করেছেন।”৪

হযরত মুহম্মদ (সা:)-এর জন্ম বৃত্তান্ত শুরু করার আগে সৈয়দ সুলতান আঠারজন নবীর কাহিনী বর্ণনা করেছেন । আদি পিতা আদম (আ:) এর কাহিনী এসেছে প্রথম এবং ঈশা (আ:) এর কাহিনী দিয়ে নবী বংশ প্রথম পর্বের ঘটেছে সমাপ্তি । সে জন্যেই ঈশা (আ:)-এর কাহিনী শেষ করার পর সৈয়দ সুলতান লেখেছেন-

সৈয়দ সুলতানে পাঞ্চালী ভণিল
অষ্টাদশ কিসসা নবী সমাপ্ত হইল ।

সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ দ্বিতীয় খন্ডে- রসুল চরিত, জয়কুম রাজার লড়াই, জ্ঞান প্রদীপ ও পদাবলী স্থান পেয়েছে৷ দ্বিতীয় খন্ডের পংক্তি সংখ্যা পনর হাজার থেকেও বেশী । যেহেতু হযরত মুহম্মদ (সা:)-এ এসে নবী আগমনের ধারা শেষ হয়ে গেছে সেহেতু হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর ওফাত পর্যন্ত কাহিনীকেই নবীবংশ বলা চলে । এ বাহিনীকে বাড়ানোর ইচ্ছা কবির ছিল বলে কোথাও কোন নিদর্শন নেই । বরং ওফাৎ-ই-রসুল-এর উপসংহারে কবি লিখেছেন-

পীর সব চরণে সহস্র প্রণাম,
সমাপ্ত হইল পাঞ্চালিকা অনুপাম ৷

‘ওফাৎ-ই-রসুল’ রচনার পর বার্ধক্যের কারণে কবি লেখা বাদ দিয়েছিলেন বলে কোন স্বীকৃত তথ্য নেই । আসলে তখন তিনি যেমন বৃদ্ধ হননি তেমনি লেখাও বাদ দেননি । কবির পদাবলীগুলো মূলতঃ ‘ওফাৎ-ই-রসুল’ পরবর্তী অধিকতর পরিণত বয়সের রচনা । অথচ কোন কোন বিজ্ঞ পন্ডিত মনগড়া ভাবেই কবির বার্ধক্যের কথা উল্লেখ করেছেন ।

শুধু কবির সময় পর্যন্ত নয়, এর থেকে আরও বহুদিন পর পর্যন্ত বাংলা ভাষাটা ছিল অবহেলিত। বিশেষ করে সিলেটে বাংলা বিরোধী মানসিকতাটা যৌক্তিক কারণেই অতি প্রবল ছিল বলে অনুমিত ৷ হিন্দু পন্ডিতগণ বাংলাকে বলতেন সংস্কৃতের দুহিতা ৷ আবার বাংলা লিপিমালাটিকেও গ্রহণ করা হয়েছিল সংস্কৃতের অনুকরণে । সে জন্যে হজরত শাহজালাল মুজররদ (রহঃ) পরবর্তী সিলেটের মূসলমানেরা বাংলাকে ‘হিন্দুয়ানী ভাষা’ বা ‘হিন্দুয়ালী’ ভাষা বলে বিশেষিত করতে শুরু করেন ৷

আসলে ‘হিন্দুয়ালী ভাষা’ বিরোধী মানসিকতাটা চরম আকার ধারণ করার কারণেই চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে স্বাতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে সিলেটের মুসলমানগণ বাংলার বিকল্প লিপি হিসেবে সহজতম “ছিলটি নাগরি হরফ” নামের লিপিমালাটি তৈরী করে নিয়েছিলেন । শেষে সিলেটের মুসলমানেরা “ছিলটি নাগরি হরফের” মাধ্যমে বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত সাফল্যের সাথে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাও চালিয়ে গেছেন।

তবে, বহিরাগত মুসলমানেরা লিপি বদল করতে সমর্থ হলেও এখানকার মানুষের বুলি বদল করতে সক্ষম হননি । ফলে, একই সময়ে সিলেটের বুকে বাংলা লিপিতেও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা চলেছে ।

কালে বাংলায় অনূদিত রামায়ণ মহাভারত এবং দীন ভবানন্দের লেখা বাংলা ‘হবিবংশ’ সিলেটের মুসলমানদের মধ্যেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল । সে জন্যেই সিলেটের যে সব মুসলমানেরা বাংলা লিপি পড়তে অজ্ঞ ছিলেন তাদের সাহিত্যিক রস পিপাসা নিবারণের কারণে সৈয়দ সুলতান ‘নবীবংশ’ লিখতে উৎসাহিত হয়েছিলেন বলে আমাদের ধারণা । সৈয়দ সুলতানের গ্রন্থের নামকরণের ব্যাপারে গবেষক জনাব আহমদ শরীফ লিখেছেন-

“কাব্যের ‘নবীবংশ’ নামটি ‘রঘুবংশ’ ও ‘হরিবংশ’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় । ‘নবীবংশ’ নামটি একালের আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে তাৎপর্যহীন বলে মনে হবে৷ কেননা, এটি প্রথমত কেবল নবী-কাহিনী তাদের কারুর বংশধরের বর্ণনা নয়। অবশ্য ‘নবীবংশ’কে দরাজ অর্থে আদম নবীর বংশধর কাহিনী বলে ধরলে এ নামের কেবল আংশিক যাথার্থ্য খুঁজে পাওয়া যায়, কারণ এ কাব্যে তাঁর সব বংশধরের কথা নেই।মনে হয় ‘নবীবংশ’ নামে করি মূখ্যত নবী পরস্পরা নির্দেশ করেছেন৷ আমাদের অনুমান সত্য হলে ‘রঘুবংশ’ কিংবা ‘হরিবংশ’ নামের অনুকৃতি এ ক্ষেত্রে অসঙ্গত ও অসার্থক হয়েছে ৷ কেননা ‘বংশ’ এর যে সামান্য অর্থ চালু রয়েছে, তার সঙ্গে এ অভিধা মেলে না। সব নবী অভিন্ন গোত্রেরও নন । অতএব, ‘ বংশ’ শব্দটিকে কুল, পরস্পরা, সমূহ, গণ, বর্গ প্রভৃতি অর্থে গ্রহণ করতে হবে৷ এবং এই অভিধায় চিহ্নিত করলেই ‘নবীবংশ’ নামের যাথার্থ্য ও সার্থকতা স্বীকার করা সহজ হবে । এই তাৎপর্যে আস্থা রাখলে নামটি রঘুবংশ বা হরিবংশএর অনুকৃতি বলেও মনে হবে না। ”৫

সৈয়দ সুলতানের গ্রন্থের নামকরনের ব্যাপারে দ্বীন ভবানন্দের ‘হরিবংশের পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে বলে আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি । আমাদের অনুরূপ অনুমানের স্বপক্ষে কিছু না কিছু যুক্তি রয়েছে। আমরা জানি সৈয়দ সুলতানের পীরের নাম সৈয়দ শাহ হোছন আলম । ইনি ‘রিছালত’ নামে একখানা গ্রন্থ লিখেছিলেন ৷ আসলে সৈয়দ সুলতানের গ্রন্থের নামও রিছালত বা নবীদের কাহিনী জাতীয় কোন কিছু থাকাটা যৌক্তিক ছিল । অথচ নাম রাখা হলো ‘নবীবংশ’ যদিও কোন বিশেষ নবীর বংশ বিবরণী লেখা হলো না সেখানে ।

সিলেটের দীন ভবানন্দ প্রথমে হিন্দু ছিলেন । সংস্কৃত ‘হরিবংশের নামানুকরণে লেখা তাঁর বাংলা ‘হরিবংশ’ গ্রন্থখানি আদিরসের ভিত্তিতে রচিত । সেখানে মুসলমানদের ধর্ম ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত কোন কিছু না থাকলেও হিন্দুদের ন্যায় ভবানন্দ কেদ্রিক এক শ্রেণীর মুসলমান সাধক সম্প্রদায়ও ‘হরিবংশ’ পাঠের জন্যে একদম পাগলপারা ছিলেন। সে জন্যেই পরবর্তীকালে বাংলায় লেখা ‘হরিবংশ’কে সিলেটী নাগরী লিপিতে লিপ্যন্তরের গরজ দেখা দিয়েছিল । সে যুগ তাে দূরের কথা, এখন পর্যন্ত সিলেটের আউল-বাউল-পীর-ফকির প্রভৃতি মুসলমান সাধক সম্প্রদায়ের উপর দীন ভবানন্দের ‘হরিবংশে’র ব্যাপক প্রভাবের কথা অনস্বীকার্য ।

খুব সম্ভব সে কারণেই… স্বধর্মে রক্ষণশীল, জ্ঞানী-গুণী-বিচক্ষণ ও দূরদর্শী পীরান পীর মহাকবি সৈয়দ সুলতান স্ব-সমাজে ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির সেসব প্রভাবকে মনে-প্রাণে বরণ করে নিতে পারেননি । তাই স্বতন্ত্রভাবে ও ব্যাপকভাবে তিনি বাংলা ভাষার মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজনীয়তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন । নামকরণের ব্যাপারে সৈয়দ সুলতান স্বধর্ম ও স্ব-সংস্কৃতির কথা স্ব-সমাজের সর্বসাধারণ মৌখিক কথাবার্তায় প্রচলিত সুবুলি বিশষ্ট স্ব-জবান বাংলার মাধ্যমে অতি সহজভাবে যাতে বুঝতে পারে, হেন মত করে বুঝানাের জন্যেই- ‘হরিবংশ’ নয়, পড়ো ‘নবীবংশ’-জাতীয় একটা পরোক্ষ মহৎ আত্যিক অনুপ্রেরণা থেকেই তাঁর পরিকল্পিত মহাকাব্য রচনা কাজে হাত দিতে উৎসাহ বোধ করেছিলেন বলে আমরা মনে করি ।

দ্বীন ভবানন্দের হরিবংশের কথা উল্লেখ না করলেও অন্য প্রসঙ্গে কবি তাঁর নিজের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন৷ মুসলমানদের নবী রসুলের কথা মুসলমানেরা স্মরণ করে না, অথচ লস্কর পরাগল খাঁর আদেশে বাংলায় অনূদিত হিন্দু ধর্ম সংক্রান্ত কবীন্দ্রের ভারত কথা হিন্দু মুসলমান কর্তৃক সমান ভাবে ঘরে ঘরে পঠিত হয়-এসব হৃদয়ঙ্গম করে কবি যে নিদারুণভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন সেটার প্রত্যক্ষ নিদর্শন কবির নিজের লেখার ভেতরই বর্তমান রয়েছে।যেমন-

লস্কর পরাগল খান আজ্ঞা শিরে ধরি
কবীন্দ্র ভারত-কথা কহিল বিচারি ৷
হিন্দু মুসলমান তাএ ঘরে ঘরে পড়ে
খোদা রসুলের কথা কেহ না গোঙরে ।

আরবী-ফারসী-উর্দু প্রভৃতি বিদেশী ভাষাতে নয়, দেশী ভাষাতেও সর্বসাধারণের জন্য নবী রসুল তথা ইসলামের মর্মকথাকে লেখার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন তিনি; কারণ উর্দু, আরবী, ফারসী ভাষায় লেখাগুলো কেবল আলেম সমাজের মধ্যেই ছিল বোধগম্য । সে জন্যেই কবি বলেছেন-

দু:খ ভাবি মনে মনে করিলু ঠিক
রসুলের কথা যত কহিমু অধিক ।

সৈয়দ সুলতানই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সাহস করে নবী রসুলের ইতিবৃত্ত এবং ইসলামের মর্মকথা বাংলা ভাষায় রচনা করতে শুরু করলেন । একে তিনি আল্লাহ রসুলের ও মুসলিম সমাজের প্রতি আলিমের ও পীরের দায়িত্ব ও কর্তব্য বলেই মানলেন:

আল্লাহএ বুলিব তোরা আলিম আছিলা ।
মনুষ্যে করিতে পাপ নিষেধ না কৈলা ।

আল্লাহর প্রশ্নের উত্তরে পাপী শিষ্যও বলবে-

গুরু ভেটিলাম গুরু না জানাইল মােরে।
কাজেই- দেশেত আলিম থাকি যদি না জানাএ
সে আলিম নরকে যাইবে সর্বথাএ।
এহি ভএ ভাবিয়া রচিল নবীবংশ
শুনি পাপীগণে যেন পাপে নহে ধ্বংস।

কতর্ব্য পালন করতে গিয়ে করি নির্বোধ রক্ষণশীলদের কাছে হলেন নিন্দিত:

যে সবে আপনা বোল না পারে বুঝিতে
পাঁচালী রচিলাম করি আছএ দৃষিতে ।

মুনাফিকে বোলে আক্ষি কিতাবেতু কাড়ি কিতাবের কথা দিলু হিন্দুয়ানী করি ।

কবি এ অকারণ নিন্দা থেকে রেহাই পাবার জন্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের খোরাসানী, যাভানী, চোল, রুমী, এরাকী, সামী, ইয়ামানী, ইরানী, পাঠান প্রভৃতির অনেক দৃষ্টান্ত দিয়ে (২য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ৪৭৭-৭৯) অবশেষে বলেছেন:

আলিমে কিতাব পড়ি বাখানে যে কালে
হিন্দুয়ানী করি যদি না বাখানি বোলে । 
বঙ্গদেশী সকলেরে কিরূপে বুঝাইব? 
যারে যেই ভাষে প্রভু করিছে সৃজন
সেই ভাষ তাহার অমূল্য সেই ধন । 
আল্লাএ বুলিছে, মুঞি যে দেশে যে ভাষ
সে দেশে সে ভাষে কৈলু রসুল প্রকাশ ।’ (২য় খণ্ড, পৃ: ৪৭৬- ৮০)

শাস্ত্র চিরকালই জনগণের ভাষায় অনূদিত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে মুখে মুখে কেবল লিপিবদ্ধ করণেই ছিল বধো ৷ মূর্খেরর নিন্দা অগ্রাহ্য করে কবি বলেন-

পয়গাম্বর সকলের মহিমা প্ৰচারিলু
পাপ মতি ইব্লিসের অযশ ঘোষিলু।
তােহ্মারা সবের মুঞি জান হিতকারী
ইমা-ইসলামের কথা দিলাম প্ৰচারি ৷

নবীবংশে বর্ণিত বিষয়-

যে রূপে সৃজন হইল এ তিন ভুবন
যে রূপে সৃজিল জান সুরাসুরগণ ৷
যে রূপে আদম হাওয়া সৃজন হইল
যে রূপে যতেক পয়গম্বর উপজিলা ৷
বঙ্গেত এসব কথা কেহ না জানিল

নবী বংশ পাঞ্চালীতে সকল কহিলু
মুঞি পাপী এ সকল প্রচার করিলু
তোহ্মারা সবের লাগি দর্পণ সৃজিলু ৷
এ দর্পণ দর্শিলে খন্ডিবে যত ধন্ধ
নিরক্ষিলে দর্পণ জানিবা ভালমন্দ ।

‘নবীবংশ’ রূপ জ্ঞান-দর্পণ সৃষ্টি করে কৃতার্থ করি সগর্বে দাবী করেছেন:

মাএ বাপে তােহ্মারে জনম দিয়া গেছে
দিব্য আঁখি তােহ্মারে দিলাম আক্ষি পাছে ।

নবীবংশ রক্ষণ-পঠনের যৌক্তিকতা ও সুফল সম্বন্ধে করি বলেন:

যে সকল মুমীন হএ করুণা হৃদএ
নবীবংশ পুস্তক রাখিতে জুয়াএ ।
এহি পুস্তক যদি পারে রাখিবারে
আল্লাহর গৌরব হৈব তাহার উপরে ।
(২য় খন্ড, পৃ: ৮৮০-৮২)

করি ভারতবর্ষীয় প্রতিবেশ স্মরণে রেখে নবীবংশ রচনা শুরু করেন । হিন্দুর সুরাসুর, বেদ, অবতার প্রভৃতি সব কিছুর সত্যতা তিনি সৃষ্টি ও শাস্ত্রের আনুক্রমিক ধারায় স্বীকার করেন ৷ কিন্তু ইব্লিসের প্রভাবে সুরাসুর বিভ্রান্ত, বেদ বিকৃত অবতার বিপথগামী, ঈশার কিতাবও বিকৃত। কাজেই একালের সর্বশেষ শাস্ত্র ইসলামই হচ্ছে সর্বজনগ্ৰাহ্য ও বরেণ্য ধর্ম ।

অর্থাৎ সৈয়দ সুলতান ইসলামের সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিকৃতিজাত অসারতা ও পরিহার্যতা যুক্তি প্রমাণ যােগে প্রতিপন্ন করতে প্রয়াস পেয়েছেন । তাঁর প্রত্যাশা ছিল, এতে দেশজ মুসলিম হবে ইসলামনিষ্ঠ আর হিন্দুও হবে ইসলামের সভ্যতায় আকৃষ্ট। মুসলিম মনে ঐতিহ্য-চেতনা, আত্ম প্রত্যয় ও স্বধর্ম গৌরব জাগ্রত করাই ছিল সৈয়দ সুলতানের মুখ্য লক্ষ্য । তাঁর অভিষ্ট সিদ্ধ হয়েছিল । ”৬

“করি সৈয়দ সুলতান ছিলেন একাধারে করি, পীর, সুফী-সাধক ও শাস্ত্রবেত্তা ৷ তিনি মীর বংশজ ৷ কাজেই তাকে-একজন অভিজাত, শিক্ষিত, পন্ডিত, ধার্মিক, সুফী, পীর ও কবি হিসাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ মিলে আমাদের ৷ এজন্য তাকে আদর্শ মুসলমান, যুগ-সংস্কৃতির প্রতিভু, সমকালীন সমাজ মানসের প্রতিনিধি স্থানীয় চিত্রকর এবং লোক-মনীষার ধারক ও ভাষ্যকার রূপে গ্রহণ করা অসঙ্গত নয় । ….. ধর্মবােধ ও আচরণে, লোকমানসের যে বিচিত্র অভিব্যক্তি ঘটেছে, গণ-সমাজের সে স্বচ্ছল গতিভঙ্গির অন্তর্নিহিত প্রেরণাগত ঐক্য-সূত্র আবিষ্কার করা ও তাকে স্বরূপে উপলব্ধি করার প্রয়াসই আমাদের লক্ষ্য ৷

সৈয়দ সুলতানের মনন-ধারায় প্রভাবিত অনুকারক কবির সংখ্যাও কম নয় । তাদের অধ্যাত্মবােধে ও সমাজ-ভাবনায় তার চিন্তাধারা প্রবহমান দেখতে পাই । বলা চলে, নবজাগ্রত ধর্মবুদ্ধির ও সমাজ-চিন্তার একটি School গড়ে উঠেছিল । তাই কেবল কবিকৃতিতেই সৈয়দ সুলতানের পরিচয় সীমিত নয়।সৈয়দ সুলতান যে কবি মাত্র নন এবং তাঁর রচনাও যে পদ্যে বর্ণিত নিছক কাহিনী নয়, আরো বেশী কিছু তা-ই আমাদের দেখবার-বুঝবার বিষয়।

সৈয়দ সুলতান শেষ কালের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের একটি পূর্ণা-বয়ব রূপ অনুধ্যান ও উপলব্ধি করেছিলেন এবং তাঁর ধ্যান ও রোধের অনুরূপ একটি ইসলামী পরিবেশ ও প্রতিবেশ রচনার প্রয়াসও তার ছিল । এই উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্যেই কলম ধরেছিলেন তিনি । সৃষ্টি-পত্তন থেকে হাসর অবধি ইসলামী ধারার জগৎ ও জীবন-চিত্র দানই ছিল তার উদ্দেশ্য । তার ভাব-চিন্তার বৈশিষ্ট্য এতই প্রকট যে নিতান্ত অমনােযোগী পাঠকেরও তা দৃষ্টি এড়ায় না ।”৭

বাংলা কাব্যে ইসলামী রেনেসাঁর দিশারী হিসেবে মহাকবি সৈয়দ সুলতানের শুভাগমন সম্বন্ধে যে সংক্ষিপ্ত ভূমিকা পেশ করা হলো এটা যে তার ঐতিহ্যশালী বংশধারার সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা অনায়াসেই বোঝা যায় ৷

তথ্য সংকেত:

৩. আহমদ শরীফ, সৈয়দ সুলতান- তাঁর গ্রন্থাবলী ও তার যুগ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ, নভেম্বর ১৯৭২: পৃষ্ঠা-২১৯

৪. ঐ, পৃষ্ঠা-২১২

৫. ঐ, পৃষ্ঠা-৭১

৬. আহমদ শরীফ, সৈয়দ সুলতান বিরচিত নবীবংশ (প্রথম খন্ড), বাংলা একাডেমী, ঢাকা, নভেম্বর, ১৯৭৮, ভূমিকা- পৃষ্ঠা সংখ্যা দশ-বার

৭. আহমদ শরীফ, সৈয়দ সুলতান তাঁর গ্রন্থাবলী ও তাঁর যুগ, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: প্রস্তাবনা/ক-খ ।

[উৎসঃ মুহম্মদ আসাদ্দর আলী, মহাকবি সৈয়দ সুলতান, আসাদ্দর রচনা সমগ্র (প্রথম খন্ড),দ্য এথনিক মাইনরিটিজ অরিজিনাল হিস্ট্রী এন্ড রিচার্স সেন্টার,লন্ডন,প্রথম প্রকাশ ২০১২, পৃ: ৪০-৪৬]

(চলবে)

প্রাসঙ্গিক পোস্টঃ 

বঙ্গ-ভাষার উপর মুসলমানের প্রভাবঃশ্রী দীনেশচন্দ্র সেন

মুসলমান বাংলা লিখিতে জানে না!– মহাকবি কায়কোবাদের তিক্ত সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতা

সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা– ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

বাংলা ভাগে ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি-নুরুল কবির

সাহিত্যের পাতায় মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রদায়িক চেহারা

Facebook Comments