পূর্ব বাংলার পাকিস্তান প্ৰাপ্তিঃ ‘স্বাধীনতা’র প্রাথমিক উপলব্ধি ও জনগণের প্রতিক্রিয়া-পর্ব ৩

পর্ব ১ঃ জনগণের উচ্ছ্বাস  পর্ব ২ঃ পূর্ববঙ্গের জীর্ণ যাত্রা  

লিখেছেনঃ  ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

স্বাধীনতাপূর্ব দিনগুলিতে মুসলিম লীগ তার সমস্ত কর্মকাণ্ড ও ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করেছিল এই উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক জাতীয় পরিচয় নির্মাণের উদ্দেশ্যে। ১৯৪০-এর ২৩ মার্চের লাহোর প্রস্তাব মোতাবেক মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতো মুসলিগ লীগ। কিন্তু তারা ঔপনিবেশক শাসনের কঠোর সমালোচনা যেমন করেনি, তেমনি সম্ভাব্য রাষ্ট্রের চারিত্র্য সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট বক্তব্যও রাখেনি। মূলত এ রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিল নেতিবাচকভাবে।৫৮ পাকিস্তানবাদ হয়ে দাড়ায় উপনিবেশবাদবিরোধিতা এবং ব্ৰাহ্মণ্যবাদ বিরোধিতার নামান্তর।৫৯

যে ইতিবাচক বক্তব্য লীগের ছিল তাকে বৃহৎ পরিসরে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কখনো পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐক্য এবং সময় ও বৌদ্ধিক সম্পদের অভাবের দোহাই দিয়ে একে যুক্তিসঙ্গত বলে প্রতিপাদন করা হয়েছে।৬০ তার ফলে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ পরিকল্পনা ও নীতি প্ৰণয়ন সংক্রান্ত সব ধরনের আলোচনাকে এড়িয়ে গেছেন।

লীগের কিছু সদস্যের একমাত্র ভয় ছিল এই যে স্বাধীন অখণ্ড ভারতে হিন্দুরা প্ৰধান্য বিস্তার করবে। অন্যরা আশা করেছিল যে অতীত ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শক্তির গৌরবের পুনর্জন্ম হবে।কিন্তু কোন পক্ষেরই পরিষ্কার ধারণা ছিল না কিভাবে রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে সংগঠিত করা হবে।৬১

আসলে তাদের চিন্তাভাবনা ছিল মূলত এলিটবাদী। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কিছু নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণীর লোকের স্বার্থকে সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাৰ্থ হিসেবে দেখানো। এ ছিল তাদের আভিজাত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবে তারা ইসলামী ঐক্যের ধারণাটিকে ইসলামী সাম্রাজ্যের গৌরবময় অতীতের কল্পলোকে স্থাপন করলেন।৬২ বহু মুসলিম লীগ কর্মীর বক্তৃতা ও লেখায় এই উদ্দেশ্য সচেতনভাবে ক্ৰমাগত প্রকাশিত ও প্রতিফলিত হয়েছে। স্বাধীনতার ঠিক উষালগ্নে পূর্ব পাকিস্তানের এক জেলায় জনৈক মুসলিম লীগ কর্মীর উচ্ছাস ছিল, ‘মুসলিম ভারত তার হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পেতে যাচ্ছে’।৬৬ অতীত কালের ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে লীগ চেষ্টা করতে লাগলো মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক মানসপ্রবণতাকে একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত করতে।

একটি পৃথক রাষ্ট্র যখন প্রকৃত অর্থেই জন্ম নিল, তখন তা অনেকটা বৃটিশ প্রদত্ত উপহার হয়ে দাঁড়ালো।স্বাধীনতা দিবসে প্ৰকাশিত স্টেটসম্যান পত্রিকায় একে ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে জাতির অর্জনের পরিবর্তে বৃটিশের অমূল্য উপহার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার এই সম্মতিভিত্তিক পরিবর্তন পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিণাম বয়ে নিয়ে এলো। ১৫ আগস্টে পাকিস্তান বৃটিশ ভাইসরীয় (Vice-regal) পদ্ধতি অবলম্বন করলো।জিন্নাহ গভর্নর জেনারেল উপাধি ধারণ করে গণপরিষদের সভাপতির পদ গ্রহণ কবলেন এবং একই সাথে মুসলিম লীগের সভাপতির পদেও বহাল থাকলেন।যুক্তপ্রদেশ মুসলিম লীগের একজন নেতা লিয়াকত আলী খান প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করলেন।

মুসলিম লীগের ভিন্ন ধারা*

বাংলার বেশ কিছু স্বনামধন্য মুসলিম লীগ নেতা দেশবিভাগ এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহের পরিণামে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে উৎখাত হয়ে যান। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এইচ. এস. সোহরাওয়াদী, যিনি একবার মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের নেতৃত্বচ্যুত হয়েছিলেন, তিনি তাঁর সমস্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন ইতিমধ্যে অবনতিশীল বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের সম্পর্ককে উন্নত করার জন্য। যখন দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতা শহরকে স্বাধীনতা পরবতী বিজয়োৎসবের আনন্দ আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, তখন তিনি এক দরিদ্র মুসলমানের জীর্ণগৃহে অনশনরত গান্ধীজীর অনশন ভাঙানোর চেষ্টা করছিলেন। ফজলুল হক, যিনি যুগ যুগ ধরে বাঙালি মুসলমানদের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন, তিনি জিন্নাহর কূটকৌশলের দরুন বাংলার মুসলিম লীগের রাজনীতিতে প্রভাব-প্রতিপত্তি হারিয়ে কলকাতায় নিজের বাসভবনে পরাজয়ের মর্মবেদনা নিয়ে কালাতিপাত করছিলেন।

মুসলিম লীগের সেক্রেটারি আবুল হাশিম, যিনি মৃতপ্রায় এই সংগঠনটিকে একটি কর্মপরিকল্পনা ও প্রাদেশিক কর্মসূচির ঘোষণাপত্ৰ দিয়ে এর উদ্যমী তরুণ ছাত্র-সদস্যদের উজ্জীবিত করেছিলেন, তিনিও দেশবিভাগের সময়কার গোলযোগ ও বিভ্ৰান্তির শিকার হন। তিনি তখন সোহরাওয়াদীর নেতৃত্বে একটি সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার জন্য তাঁর সমস্ত কর্মোদ্যোগ নিয়োগ করেন। অবশ্য এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে তিনি অবশেষে বর্ধমানে তার গ্রামের বাড়ীতে প্ৰত্যাবর্তন করেন।

আসামের মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট মওলানা ভাসানী, যিনি পূর্ববঙ্গ থেকে আসামে এসে বসবাসকারী মুসলমান কৃষকদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে আসামের জেলা সিলেটকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সংগ্ৰাম করেছিলেন, তিনিও দেখতে পেলেন, স্বাধীনতা-উত্তরকালে নতুন মুসলিম লীগের দলীয় বিন্যাসে তার কোন স্থান নেই এবং অল্প দিনের মধ্যেই তিনি আসাম সরকারের কারাগারে বন্দি হলেন।

শেখ মুজিবর রহমানআবুল মনসুর আহমদ বঙ্গদেশ বিভক্ত হওয়ার পর কলকাতায় থেকে যান। আতাউর রহমান খান, কামরুদিন আহমেদ, শামসুল হক প্রমুখ ঢাকাভিত্তিক বিশিষ্ট মুসলিম লীগ নেতা তখন স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের নতুন কেন্দ্র ঢাকার নবাববাড়ী ‘আহসান মঞ্জিল’ পর্যন্ত তাঁদের দূরত্ব পরিমাপ করে চলেছেন।৬৪ তাদের প্রত্যেকেই স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিরোধী দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

খাজা নাজিমুদিন এবং মওলানা আকরাম খাঁ যথাক্রমে প্ৰাদেশিক সরকার ও মুসলিম লীগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রাক্তন ঔপনিবেশিক গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বোর্ন স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হন। মূলত মুসলিম লীগ তিনটি কেন্দ্রের কাছে বাধা পড়ে।এগুলো হচ্ছে নেতৃত্বের জন্য আহসান মঞ্জিল, প্রচারের জন্য দৈনিক আজাদ, অর্থের জন্য ইস্পাহানির বাণিজ্যিক সংস্থা।৬৫ সংক্ষেপে এই ছিল তদানীন্তন মুসলিম লীগের চেহারা। ভারতের মুসলমানদের একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বৃটিশ রাজ এই সংগঠনের কাছেই তার রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

কমিউনিস্টদের চিন্তাধারা*  

মার্ক্সীয় চিন্তাধারা পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে এক নাজুক অবস্থায় পড়ে যায়। ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে সমর্থন করতো এবং মুসলিম লীগের স্বজাতির প্রতিনিধিত্ব করার দাবিকেও স্বীকার করতো।৬৬ কিন্তু পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের সাথে সাথেই কমিউনিস্টদের মোহমুক্তি ঘটে।জাতীয়তাবাদীদের সাথে তাদের সম্পর্ক ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠে এবং পরিণামে তাদের যাত্ৰাপথ ভিন্ন হয়ে যায়। তারা কেবল পৃথক পথ বেছে নিয়েই ক্ষান্ত হয় নি, সশস্ত্ৰ সংঘর্ষের মাধ্যমে পরস্পরকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়।এ পর্যায়ে কমিউনিস্টদের উচ্চকিত শ্লোগানে বলা হয়, এ স্বাধীনতা মিথ্যা।পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক স্বাধীনতার মার্ক্সীয় ব্যাখ্যায় প্রাথমিক মুহুর্তগুলির তিক্ততার ছাপ লক্ষ্য করা যায়।

ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এমনকি বেশ কয় বছর পর কেউ কেউ স্বাধীনতার বাস্তবতাকে অস্বীকার করে একে তুলনা করেছে ‘সাদা হাতীর কালো মাহুত’ অথবা ‘নতুন বোতলে পুরানো মদ’-এর সঙ্গে।৬৭ স্বাধীনতার মোহভঙ্গ আমূল সংস্কারকামীদের কাছে এত গভীরপ্রসারী হয়েছিল যে, তারা একে অন্ধ যুগের আবির্ভাবের সাথে তুলনা করেছেন।৬৮ প্রায় দুই যুগ পরে ১৯৭১ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পাটির খুলনা শাখার প্রাক্তন সদস্য ধনঞ্জয় দাস ১৯৪৭ সালের আগস্টে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে অংশ নিয়েছিলেন বলে খেদ প্ৰকাশ করেছেন।৬৯ সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত বরিশালের এক মুসলমান কমিউনিস্টের আত্মজীবনীতে বৃটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভে তার অনুভূতির কথা কিছুই লেখা হয় নি।৭০

বহু সংস্কারবাদীর কাছেই রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ আর কিছুই নয়, শাসন কাঠামোর বাহ্যিক রূপের পরিবর্তন এবং বৃটিশ, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমন্বিত যোগসাজশের ফলশ্রুতি মাত্র। যেমন একজন সক্রিয় কমিউনিস্ট বিদ্রুপের সাথে লিখেছেন : “কিছু পরিবর্তন হয়েছে বটে, বৃটিশ পুলিশের স্থলে ক্যাম্প স্থাপন করেছে পাকিস্তানী পুলিশের ’।৭১ কমিউনিস্ট আন্দোলনের অপর এক সক্রিয় কর্মী পাকিস্তানের প্রতি বাঙালি মুসলমানের সমর্থনকে সনাক্ত করেছেন এইভাবে:

“পাকিস্তান দাবির প্রতি পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জোরালো ও সক্রিয় সমর্থন রয়েছে।” সেই সাথে তিনি যুক্ত করেছেন: “যদিও এ দাবি ভুল ছিল কিংবা এতে সচেতনতার অভাব ছিল, তথাপি পূর্ববাংলার খেটে খাওয়া মুসলমান জনগোষ্ঠী পাকিস্তানকে তাদের নিজস্ব ভূমি হিসেবেই গ্রহণ করেছে।’৭২ পাকিস্তান সম্পর্কে কমিউনিষ্ট সাহিত্যের রায় এই যে এটি হচ্ছে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গণসচেতনতা’কে ভ্ৰান্ত হলেও সত্য বলে মেনে নেয়া।

হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া*

পূর্ববাংলার সমাজের অপর গুরত্বপূর্ণ অংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশই জাতীয় কংগ্রেসের ছত্ৰছায়ায় সংগঠিত ছিল। তাদের প্রতিক্রিয়া এবং প্রত্যাশাও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক জটিলতায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। প্রথমেই ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট অর্জিত রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি লাহিড়ীর প্রতিক্রিয়া দিয়ে শুরু করা যাক: “বলা যায়, ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট জেলা কংগ্রেস কমিটির প্রেসিডেন্ট অনেকটা ফাঁদে পড়েই মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্টের সাথে সম্মিলিতভাবে (পাকিস্তানী) পতাকা উত্তোলনে বাধ্য হলেন। মনে হয়, এই সংস্থাকে কেবল অপমানিত করার উদ্দেশ্যে এটা করা হয়েছিল, যে সংস্থার অবিচল দাবি ছিল অখণ্ড ভারতবর্ষের স্বাধীনতা…এতে বাঙালি বিপ্লবীদের… পক্ষে আনন্দিত হওয়া ছিল কঠিন ব্যাপার।৭৩

পাকিস্তানের সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে এক আকস্মিক পরাজয়, হতাশা ও বিশ্বাসভঙ্গের অনুভূতি পূর্ববঙ্গের উচ্চ সম্প্রদায়ের হিন্দু গোষ্ঠীর মনকে ভারাক্রান্ত করলো। একজন হিন্দু নেতা তার মোহভঙ্গের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে :

হিন্দুরা কখনো পাকিস্তান চায়নি। পাকিস্তানকে তাদের উপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।৭৪

ঢাকার একজন প্ৰবীণ কমিউনিস্ট কর্মী জ্ঞান চক্রবতী উল্লেখ করেন যে, হিন্দুদের কাছে গোড়া থেকেই পাকিস্তান অগ্রহণযোগ্য ছিল এবং স্বাধীনতা প্ৰাপ্তির পরপরই বিপুল সংখ্যক হিন্দু দেশত্যাগ করে। তাঁর বক্তব্য অনুসারে,

এই সম্প্রদায়ের প্রায় সকল সরকারি কর্মচারিই সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে।৭৫ কিছু স্থানে হিন্দু পেশাজীবীদের প্রতিক্রিয়া এত বেশি তিক্ত ছিল যে, দেশত্যাগের পূর্বে তাঁরা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর পর্যন্ত করেছিল। অজয় ভট্টাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, সিলেট হাসপাতালের হিন্দু কর্মচারীরা হাসপাতালের সম্পদ ভাঙচুরের পর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়।৭৬ 

খবর পাওয়া যায় যে মন্সিগঞ্জ সাব-জেলের হিন্দু কেরানী ও বন্দিরা স্বাধীনতা দিবস উদযাপন বরাদ্দ ‘বাড়তি রেশন’-এর কোটা বর্জন করে।৭৭ সমাজের ‘নেতৃস্থানীয় শ্রেণী’৭৮ উচ্চতর বর্ণের হিন্দুরা রাতারাতি তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারালো এবং বঙ্গবিভাগ তথা ১৯৪৭ সালের ভয়ানক দিনগুলোর মর্মান্তিক অনুভূতিসঞ্জাত হতাশা, তিক্ততা ও মোহভঙ্গ এই নিবন্ধের আওতার বাইরে এক লক্ষণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করলো।৭৯

লাহিড়ীর অভিমানসূচক অভিব্যক্তিতে প্ৰতিফলিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উচ্চবর্ণের হিন্দুর ব্যর্থতাবোধ, যা পূর্ববাংলায় সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও অধিক সংখ্যক হিন্দুর মনে জাগ্রত হয়েছিল। এমনকি হিন্দু সমাজের নিম্নবর্ণের নির্যাতিত শ্ৰেণী সাংবিধানিক রাজনীতির পরিমণ্ডলে তাদের ভাগ্যকে বাংলার মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল।৮০

তবুও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন সংস্কারবাদী রাজনীতিতে যুক্ত বহু হিন্দু এখানেই থেকে যাওয়ার এবং পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক জীবনে অবদান রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এঁদের অন্যতম ত্ৰৈলোক্য নাথ চক্রবতী লিখেছেন : আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি দেশত্যাগ করবো না। আমি পাকিস্তানেই থেকে যাব। পাকিস্তানের জনগণের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে এখানেই আমি থেকে যাব। এই দেশ পূর্ব বাংলা আমার দেশ… কেন আমি এই দেশ ত্যাগ করবো?৮১ তাঁর মতো মনোভাবসম্পন্ন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কমিউনিস্টও এদেশে থেকে যান। পরবতীতে পূর্ব পাকিস্তানের কারাগারসমূহে দীর্ঘ বছর গুলোর দুর্ভোগপূর্ণ বন্দিত্ব বরণ করে নেয়ার।

উপজাতিদের প্রতিক্রিয়া* 

উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহেও অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায়, যেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষত গারোরা মনে করে যে নতুন রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের ব্যাপারে কোন নির্দিষ্ট নীতিমালা নেই।অতএব, একমাস শেষ না হতেই ময়মনসিংহের পার্শ্ববতী এলাকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর একটি স্মারকলিপি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়।৮২ এই স্মারকলিপি উত্থাপিত হয় ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট-উত্তর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের রাংরাপাড়ায় আয়োজিত উপজাতীয়দের সমাবেশে। সেখানে উপস্থিত প্ৰায় ৪০০০ লোক তাদের বসতি অঞ্চলের একত্রীকরণ দাবি করে। এর মধ্যে ছিল ময়মনসিংহের অধীন ৫টি থানা এবং ঐ এলাকা সন্নিহিত ভারতের আসাম প্রদেশ।৮৩

বৃটিশ রাজ কর্তৃক গৃহীত জাতিভিত্তিক নতুন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত সংখ্যালঘু জাতিসমূহকে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার দাবি জানানোর সুযোগ করে দিল। বৃটিশরাজের এই দেশবিভক্তি গারো সম্প্রদায়ের উপজাতীয় নেতা ও জনগণকে অনুপ্ৰাণিত করলো উপজাতি সম্প্রদায়গুলিকে সংগঠিত করে এই দাবি জানাতে। সাধারণ গারোরা যে কারণে অস্থিরতার শিকার হয় তা এই যে স্বেচ্ছাচারী রেডক্লিফ রোয়েদাদ মোতাবেক জোরপূর্বক দেশবিভাগের মাধ্যমে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র সৃষ্টির ফলে তাদের একাংশ ভারতীয় ভূখণ্ডের আওতাভুক্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদের মাধ্যমে দেশবিভাগের দ্বারা গারোদের দু’টি অংশের ঐতিহাসিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, অথচ এ ব্যাপারে তাদের সাথে কোন আলোচনাই করা হয়নি।স্বাধীনতার সময়ে উপজাতীয়দের আশা ও ভীতি যে বিতর্কিত বিষয়গুলির জন্ম দিয়েছিল, তা আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়।

* উপ-শিরোনামগুলো মূলধারা বাংলাদেশ সম্পাদকের সংযোজন। 

তথ্য নির্দেশিকা

ref-3

[উৎসঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ বামপন্থীদের ভূমিকা, মেসবাহ কামাল (সম্পাদিত), প্রথম প্রকাশ, প্রকাশকঃ সম্পর্ক, কলিকাতা, ২০০০ , পৃঃ৩৫-৪০ ]

পর্ব ৪ঃ আমজনতার  উচ্ছ্বাস ও জমিদারি নির্যাতনের স্মৃতি

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির উত্থান, পতন ও প্রভাব

কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে-সুনীতি কুমার ঘোষ

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও ১৯৪৭ সালের বাঙলা ভাগ – জয়া চ্যাটার্জী

হিন্দু অভিজাত শ্রেনীর বিশেষ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধার জন্যই  বাংলা ভাগ– নুরুল কবির

বাংলা ভাগে ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি– নুরুল কবির

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion