পূর্ব বাংলার পাকিস্তান প্ৰাপ্তিঃ ‘স্বাধীনতা’র প্রাথমিক উপলব্ধি ও জনগণের প্রতিক্রিয়া-পর্ব ৪

পর্ব ১ঃ জনগণের উচ্ছ্বাস  পর্ব ২ঃ পূর্ববঙ্গের জীর্ণ যাত্রা   পর্ব ৩ঃ হিন্দু সম্প্রদায় ও কমিউনিস্টদের প্রতিক্রিয়া

লিখেছেনঃ  ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

স্বাধীনতার বড় বড় বুলি ভিন্নতর হয়ে যায় যখন আমরা স্বাধীনতা দিবসে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্ৰতিক্রিয়া বিবেচনা করি। তাজউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেন : “যখন রাত নেমে এলো এবং আনন্দোৎসব শেষ হলো, তখনো ঢাকার রাজপথের বহুলোক রয়ে গেল, যাদের অধিকাংশই বিজয়োৎসবে অংশ নেয়ার জন্য প্রতিবেশী জেলাসমূহের গ্রামগুলি থেকে ঢাকায় এসেছিল’।৮৪ রাজশাহী থেকে লাহিড়ী লিখেছেন : ‘দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে শত শত, হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ শহরে প্রবেশ করতে লাগলো।’৮৫

সমান সংখ্যক হিন্দুমুসলমান মিলে প্ৰায় ১ লক্ষ লোক ঢাকায় স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের জন্য উপস্থিত হয়। তাজউদ্দিন ১৫ আগস্ট লক্ষ্য করেন, অধিকাংশ লোকই জেলার বাইরের গ্রামবাসী।তারা এসেছিল সুদূর কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ থেকে ‘পাকিস্তান’-এর বাস্তব রূপায়ণ দেখার জন্য। তাদের অবস্থান গ্রামে, যেখানে ভৌগোলিক গতিশীলতা স্বাভাবিকভাবেই ছিল যথেষ্ট সীমাবদ্ধ।৮৬

শুধুমাত্র মুক্তির অনুভূতিই তাদের টেনে এনেছিল ঢাকায়, নতুন ক্ষমতার কেন্দ্ৰস্থলে।কিন্তু দুৰ্ভাগ্যবশত আমরা সেই রাতে ঢাকার পথে ‘আগত জনগণ’ সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানি না। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই দিবসের অনুষ্ঠানসমূহে অংশ নিয়েছে কোন অনভিপ্রেত ঘটনা ছাড়াই। সারাদেশে তাদের সৌভ্রাতৃত্বপূর্ণ মৈত্রী ছিল অন্তত ব্যাহ্যিকভাবে সুস্পষ্ট।

ঢাকায় তাজউদ্দিন ও লাহিড়ী উভয়েই বিচলিত হয়ে ছিলেন জনগণের অত্যধিক উচ্ছাসের প্রকৃতি লক্ষ্য করে। তাজউদ্দিন নেতাদের বক্তৃতা শুনার জন্য আগত জনগণের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব দেখে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন। তাঁরা এসেছিল নেতৃবৃন্দের বক্তব্য শুনতে এবং কোথাও আসন গ্ৰহণ না করে তারা ভিড় করছিল।৮৭ লাহিড়ী জানান যে এদের কেউ ট্রেনে অগ্ৰিম টিকিট করার প্রয়োজন বোধ করেনি।৮৮ তাজউদ্দিন আরো লক্ষ্য করেন যে যারা ঢাকায় এসেছিল ‘তাদেরকে ট্রেনের ভাড়া দিতে হয়নি’। এসব উচ্ছৃঙ্খল আচরণ মধ্যবিত্ত জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দের কাছে ছিল অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।

ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এছাড়া আরো বহু উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।একটি সরকারি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, ১৯৪৭-এর ১১ সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জ সাব-জেল থেকে ৮৩ জন বন্দি পালিয়ে যায়। এরা সকলেই স্বাধীনতা দিবসে মুক্তিলাভ করবে বলে আশা করেছিল।৮৯ স্বাধীনতা অর্জনকে আরো কতিপয় বন্দি মুক্তিলাভের এবং পরবর্তীতে আত্মউন্নয়নের সুযোগ বলে মনে করেছিল।১৯৪৭-এর ১৪ সেপ্টেম্বর আজাদ পত্রিকার রিপোর্ট বলা হয়:

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রায় সব বন্দিই এই মুহুর্তে অনশন ধর্মঘট পালন করছে। এই বন্দিরা স্বাধীনতা উপলক্ষে মুক্তি প্রার্থনা করেছিল। তারা কায়েদ-ই-আজম এবং খাজা নাজিমুদিনের কাছে মুক্তির জন্য আবেদন জানায় যাতে তাদের নিজেদের চরিত্র সংশোধনের সুযোগ তারা পায়।৯০

স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল বৃটিশ শাসন সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও রাষ্ট্ৰীয় সকল প্রতিষ্ঠানের অবলুপ্তির উপলক্ষ হিসাবে। জেলা পর্যায়ের একজন মুসলিম লীগ কর্মী আতাউর রহমান খানকে একজন প্ৰবীণ গ্রামবাসী জিজ্ঞাসা করেছিলেন,

“এখন যখন পাকিস্তান অর্জিত হয়েছে, এরপরও কি দেশে পুলিশ, কোর্ট-কাছারি, সৈন্য-সেন্ট্রি, জেল এবং লকআপের অস্তিত্ব থাকবে?’ খান উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কেন নয়? এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়া রাষ্ট্রকে রক্ষা করবেন কিভাবে?’ হতভম্ব সেই বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, ‘তাহলে কোন ধরনের পাকিস্তান আমরা পেলাম? দয়া করে এর নামটি পাল্টে ফেলুন। আপনারা এর নাম দেবেন পাকিস্তান অথচ অনাচার আর দুনীতিকেও প্রশ্ৰয় দেবেন!’৯১

উক্ত বৃদ্ধের কাছে রাষ্ট্ৰীয় ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিশেষকরে পুলিশ এবং আদালত স্বাধীনতার মূল্যবোধের অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অবশ্য এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার পেছনে বহু যৌক্তিক কারণও ছিল। পালিত লিখেছেন, ‘নালিশ, সওয়াল-জবাব ও সাক্ষ্য প্রদানের সম্পূর্ণ পদ্ধতিটিই বস্তৃত’ ছিল গরিবের জন্য বর্জনীয়, এর কারণ খরচ, বিলম্ব, হয়রানি ও লিখিত দরখাস্ত পেশ করার আনুষ্ঠানিকতা।৯২

ময়মনসিংহের উপজাতীয় কৃষক বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ভট্টাচার্য লক্ষ্য করেছেন যে কৃষকরা প্রায়শ আদালতের মামলার মাধ্যমে তাদের জমি হারাতো। কিন্তু সমস্যা শুধু উপজাতীয় কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মুসলমান কৃষকরাও জমির ‘ডিসপুট’ সংক্রান্ত মামলায় প্রচুর অর্থ খোয়ায়।৯৪ এই শতকের প্রথম দশকে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের কৃষকদের অবস্থা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে পানান্দীকর লক্ষ্য করেছেন যে, কৃষিকাজে লাভের কটি বড় অংশ ‘মামলা-মোকদ্দমায় নষ্ট হয়’।৯৫

স্বাধীনতার পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান এবং নাঈমুদ্দিন আহমেদ ব্যথিত চিত্তে লক্ষ্য করেছেন যে, ঔপনিবেশিক আদালতের যাতাকলে পিষ্ট কৃষকরা রাস্তার ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে।৯৬ এমনকি ১৯৪০ সালে ফ্লাউড কমিশন এই মর্মে মন্তব্য করে যে, আদালতে মামলা-মোকদ্দমার কারণে অনেক ভাগচাষী তাদের জমি হারিয়েছে।৯৭ 

আইন-আদালতের উপর অনগ্রসর শ্রেণীর জনগণের খুব কমই আস্থা ছিল। ৩০-এর দশকের প্রথম দিকের মালদহের উপজাতি বিদ্রোহের নেতা জিতু সাঁওতাল মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইংরেজ রাজ ছিল’ নিপীড়নকারী’, কারণ সরকারি আদালতে বিচার পাওয়া যায় না’।৯৮ বিচার বিভাগের অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান পুলিশ বিভাগ ছিল সমভাবে ভীতিপ্ৰত।

ইসলাম লিখেছেন,‘জনগণ (ঢাকা জেলার বদরপুরের) ছিল পুলিশের ভয়ে ভয়ংকরভাবে ভীত’। স্বাধীনতার আগে লাল পাগড়ী দেখে (ইংরেজ আমলে পুলিশ লাল পাগড়ী পরতো) জনগণ নিকটবর্তী ধানক্ষেত কিংবা ঝোপের আড়ালে পালাতো।৯৯

পূর্ববঙ্গ পুলিশ কমিটির রিপোটে বলা হয়, স্বাধীনতার পূর্ববতী প্ৰায় অর্ধশতকে কখনোই পুলিশ জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে নি১০০ পুলিশ হচ্ছে নুন্যতম বেতনভোগী চরম দুনীতিগ্রস্ত ও নিষ্ঠুর, সকলের অপ্রিয় হিসেবে পরিচিত এবং ইংরেজ আমলের দমন-পীড়নের মূর্তিমান প্রতীক হিসাবে স্মরিত।১০১ পূর্বোল্লেখিত কৃষকের রাজনৈতিক প্রত্যাশা ছিল এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের অবলুপ্তি।

সাধারণ মুসলমান কৃষকের আদর্শিক ভাবনায় পাকিস্তান স্থান পেয়েছে একটি নতুন নৈতিক মুল্যবোধের ভিত্তিভূমি হিসেবে, যেখানে পারস্পরিক অধিকারের এবং বিচারের নৈতিকতা সামাজিক জীবনের উপর কর্তৃত্ব করবে।সামাজিক উচ্চ শ্রেণী এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সদস্যদের দ্বারা যুগ যুগ ধরে অবদমিত হওয়ার ফলে তারা “পাকিস্তান” নামটিকে একটি ‘পবিত্র’ অনুভূতির মধ্যে স্থাপন করেছিল। একজন জনপ্রিয় কবির কবিতায় যেমন বলা হয়েছে :

‘সবসময় সত্য কথা বলো
পাকিস্তানের মাটিতে
পাকিস্তানের সব কিছুই পবিত্ৰ,
খাদ্য এবং বচন, জীবনের প্রতিটি দিক।
মিথ্যাচার এবং অনাচার
অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে।’১০২

ঐতিহ্যগতভাবে মুসলমান কৃষকগণ যে সুপরিচিত দমন-পীড়নের শিকার হতো, তা ছিল শ্রেণীগত এবং জাতিগত বা ধর্মীয় উভয়ই। মহাজন এবং জমিদারদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু।১৯৪৭ সালে বাংলায় ২২৩৭টি বড় জমিদারির মধ্যে ৩৫৮টি ছিল মুসলমান জমিদারি।১০৩ মহাজনদের অধিকাংশই জাতিতে ছিলেন বণিক ও তেলি, যারা খাতক মুসলমান জনগোষ্ঠীর নিপীড়নকারী বলে গণ্য হতেন। এরা ছিলেন ঋণ গ্রহণকারী মোট কৃষকগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশ।১০৩ সুদের হার ছিল কম-বেশি ১২ থেকে ২৮০ শতাংশ, কখনো কখনো তারও বেশি।১০৫

এই শতকের প্রথম দিকে কৃষকগোষ্ঠীর দ্বারা ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল নিন্মে পানান্দীকার প্রদত্ত পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি।তিনি হিসাব করেছেন যে, ৩৯১৮৯৪ পরিবারের মধ্যে ১৮৫৮৬৯টি পরিবার ঋণী এবং মোট ঋণের পরিমাণ ৪৩.০৩৩৪ লক্ষ টাকা। অনুমান করা হয়, ফরিদপুর জেলায় মোট ঋণ ছিল ২৩০ লক্ষ টাকা যা মাথাপিছু ১১ টাকা, কিংবা মোটামুটিভাবে সমগ্র পরিবারের বার্ষিক আয়ের এক পঞ্চমাংশ।১০৬

১৯৩৭ সালে ঋণের পরিমাণ দাড়ায় ৪৯ কোটি টাকা; সালিশী বোর্ডের নিকট মামলা দায়ের করা হয় ৪ লক্ষ।১০৭ এর বাইরে ছিল জমিদার ও তার লোকদের ‘আবওয়াবের’ মাধ্যমে জোরপূর্বক অর্থসম্পদ আহরণ। প্রদত্ত খাজনার বাইরে কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায় খরচ এবং জমিদারের নিযুক্ত প্ৰতিনিধিদের খরচ উঠাতে যে অর্থ আদায় করা হতো সেটাই আবওয়াব। তা ছাড়া বিশেষ আবওয়াব, যেমন খালবান্দি (বাধ খরচ), দাখিলা খরচ (খাজনা আদায় খরচ), পোল খরচ (সেতু তৈরি), ডাক খরচ, ভান্ডারী খরচ (হাটবাজারের রক্ষণাবেক্ষণ), শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয় ও মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, সাদিয়ানা (জমিদারবাড়ির বিবাহ খরচ) এবং সর্বশেষ বেগার খরচ (মজুরিবিহীন শ্রম) আদায় করা হতো। ব্যক্তিগতভাবে পাবলিক ব্যবহারের অনুমতিলাভের জন্য ১০ থেকে ২৫ টাকা এবং ছাতা ব্যবহার, হাতিতে চড়া কিংবা পুকুর খনন করতে ২০ থেকে ৪০ টাকা খাজনা প্রদান করতে হতো।১০৮ কোন কোন জেলায়, যেমন বরিশালে, আবওয়াব ছিল মূল খাজনার এক-চতুর্থাংশ কিংবা তারো বেশি।১০৯

মুসলমান কৃষকদের সর্বপ্রকার সামন্তবাদী বৈষম্যমূলক নিপীড়ন সহ্য করতে হতো। অবৈধভাবে উচ্ছেদ, আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড এবং জমিদারের লোকজন কর্তৃক ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা এসবেরই শিকার হতো তারা, যখন তারা খাজনা দিতে দেরি করতো অথবা জমিদারের আদেশ-নির্দেশ পালনে অস্বীকার করতো কিংবা বিদ্রোহ করতো। ইসলাম উল্লেখ করেছেন যে, বদরপুরে আইন অমান্যের জন্য সাধারণ কৃষককে বেত কিংবা জুতো দিয়ে পিটানো হতো, পক্ষান্তরে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থাসম্পন্ন কৃষককে কেবল জরিমানা করা হতো।১১০ নড়াইল মহকুমার জগপুর গ্রামের মুসলমান কৃষকগণ হিন্দু জমিদার দ্বারা কী ধরনের বৈষম্যমূলক কঠোর সামাজিক নির্যাতনের শিকার হতো সে বিষয়ে সিদ্দিকী বর্ণনা করেছেন:

“সমগ্র গ্রামের জমির মালিক সাতজন জ্ঞাতিদারের (জোতদার) মধ্যে একজন মাত্র ছিলেন মুসলমান (এবং সেও একজন ক্ষুদ্র জ্ঞাতিদার)…অধিকাংশ মুসলমান ছিল হিন্দু মালিকদের জমির ভাগচাষী এবং দিনমজুর। এর সাথে হিন্দুত্বের প্রচলিত ব্যাখ্যা (মুসলমানরা নীচ শ্রেণীর হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত) মুসলমান এবং দিনমজুর এই উভয় শ্রেণীকে আরও হীন করেছিল এবং গাঁয়ের মুসলমান প্রজাদের বিভিন্ন সামাজিক বৈষম্যমূলক নিপীড়নের শিকারে পরিণত করেছিল। তাদের ‘ছোটলোক’ (নীচ শ্রেণীর মানুষ) বলে প্রকাশ্যে সম্বোধন করা হতো… যদি কোন মুসলমান কোন ব্ৰাহ্মণের বাড়ি অতিক্রম করতো, তাহলে ঐ অপবিত্ৰ স্থানটি পানি ও গোবর ছিটিয়ে শুদ্ধ করা হতো।” 

সিদ্দিকী আরো উল্লেখ করেছেন যে, একজন বৃদ্ধ গ্রামবাসী। ১৯৪০ সালের একটি ঘটনা এখনো মনে রেখেছেন, যে ঘটনায় মুসলমান বালক হিন্দু জ্ঞাতিদারের আম বাগানে প্রবেশ করার কারণে জ্ঞাতিদার কর্তৃক প্রহৃত হয়।১১১

বস্তৃত সব শ্রেণীর সব কৃষকরাই মাটিতে মাদুর অথবা বেঞ্চের উপর বসতো, এমনকি অনেক জমিদার তার কাছারির (জমিদারি অফিস) পাশ দিয়ে জুতো পরে যাতায়াত করতে কিংবা জমিদারির মধ্যে ঘোড়া বা হাতিতে চড়তে অনুমতি দিতেন না। কোন কোন জমিদার আবার জমিদারির প্রজাদের কুয়া, পুকুর কিংবা পাকা বাড়ি তৈরির অনুমতি দিতেন না। হিন্দু জমিদার প্রায়শ মুসলমান প্ৰজাকে গরু জবাই করতে দিতেন না।১১২

প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতা আবুল মনসুর আহমদ এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ, যারা সচ্ছল অর্থনৈতিক শ্রেণীভুক্ত ছিলেন, তারা ছোটবেলায় হিন্দু জমিদার ও বর্ণ হিন্দুদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমন কিছু তিক্ত সামাজিক বৈষম্যের কথা তারা তুলে ধরেছেন, যার মাধ্যমে মুসলমান প্রজাদের উপর সামাজিক নিপীড়নের মাত্রাটি কেবল অনুভব করা যায়।১১৩ ইসলাম এবং সিদ্দিকী উভয়েই উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে, এসইব ঘটনাই গ্রামীণ পূর্ববঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির পথ সুগম করেছিল।

তথ্য নির্দেশিকা

ref 4

[উৎসঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ বামপন্থীদের ভূমিকা, মেসবাহ কামাল (সম্পাদিত), প্রথম প্রকাশ, প্রকাশকঃ সম্পর্ক, কলিকাতা, ২০০০ , পৃঃ৪০-৪৩ ]

শেষ পর্বঃ পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রত্যাশা ও কৃষক আন্দোলন

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

১৯০৫ সালের বাংলাভাগ ও পূর্ববাংলায় প্রতিক্রিয়া-পর্ব ১

কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে-সুনীতি কুমার ঘোষ

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও ১৯৪৭ সালের বাঙলা ভাগ – জয়া চ্যাটার্জী

হিন্দু অভিজাত শ্রেনীর বিশেষ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধার জন্যই  বাংলা ভাগ– নুরুল কবির

বাংলা ভাগে ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি– নুরুল কবির

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion