পূর্ব বাংলার পাকিস্তান প্ৰাপ্তিঃ ‘স্বাধীনতা’র প্রাথমিক উপলব্ধি ও জনগণের প্রতিক্রিয়া-শেষ পর্ব

পর্ব ১ঃ জনগণের উচ্ছ্বাস  পর্ব ২ঃ পূর্ববঙ্গের জীর্ণ যাত্রা   পর্ব ৩ঃ হিন্দু সম্প্রদায় ও কমিউনিস্টদের প্রতিক্রিয়া

পর্ব ৪ঃ আমজনতার  উচ্ছ্বাস ও জমিদারি নির্যাতনের স্মৃতি

লিখেছেনঃ  ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অতীতের স্বর্ণযুগ ফিরে আসবে বলে বিশ্বাসে উদ্দীপ্ত হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে “পাকিস্তান’- এর ধারণার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হতো। এই বিশ্বাসের প্রবক্তারা বেশ্যালয়, মদ ও জুয়ার অবলুপ্তি সাধনের আহবান জানাতেন এবং এজন্য ইসলামী বিধান কার্যকর করতে চাইতেন।১১৪ মুসলিম লীগের সভা ও মিছিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠে ‘কৃষককে ভূমিদান’ এবং ‘ঋণের অবসান’ প্রভৃতির প্রতিশ্রুতিভিত্তিক শ্লোগান।১১৫

বলা হয় যে, যখন কলকাতার এক শ্রমিক জিন্নাহকে বলেন, ‘তারা (হিন্দু নেতারা) বলে যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবে ধনীদের জন্য, দরিদ্রদের জন্য নয়’, তখন জিন্নাহ বলেন, ‘যদি বৃটিশরা বলে যায় এবং ঐ এলাকা (বাংলা) পাকিস্তানে পরিণত না হয়, তাহলে হিন্দুরা কোন দিনই জমিদারের জোয়াল থেকে মুসলমানদের মুক্তির জন্য কোন আইন সৃষ্টি করতে দেবে না’।১১৬

চট্টগ্রামের এক জনসমাবেশে নাজিমুদিন শপথ করেন, ‘যদি পাকিস্তান অর্জিত হয়, তবে আপনার সন্তান মুন্সেফ হবে, তাদের সন্তান ম্যাজিষ্ট্রেট, ডেপুটি ও দারোগা হবে।’১১৭ আইয়ুব খান যিনি স্বাধীনতার পরপরই ঢাকায় কর্মরত ছিলেন, স্মৃতিচারণ করেন, “তারা (জনগণ) ভেবেছিল [স্বাধীনতা পেলে] তাদের জীবনে আর কোন সমস্যা থাকবে না।”১১৮

তাই এটি মোটেই আশ্চর্যজনক নয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের জন্মের পরপরই তাঁতী সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ সরকারের কাছে তাদের নতুন সামাজিক স্বীকৃতি ও সামাজিক অবস্থানের উত্তরণ দাবি করে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার আলোকে তারা এই দাবিকে যুক্তিযুক্ত ও বৈধ মনে করেছে।১১৯

গুরুত্বপূর্ণ কৃষক আন্দোলন চলাকালে পাকিস্তান অর্জিত হয়। এ আন্দোলন হচ্ছে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন বা বৰ্গাচাষীদের সংগ্রাম এবং খাজনা প্ৰদানের জন্য টংক ও নানাকার প্রথার বিলোপ আন্দোলন। রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পূর্বের দশকে পূর্ব বাংলার প্রায় সমগ্র পূর্বাঞ্চল এবং আসামের অংশবিশেষ, প্রধানত সিলেট জেলা বিভিন্ন প্রকৃতি ও মাত্রার কৃষক আন্দোলনের আওতায় ছিল।স্বাধীনতার পূর্ববতী পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই এসব আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে।

এসব আন্দোলনের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভাগচাষীদের আন্দোলন, যা তেভাগার লড়াই নামে বহুল পরিচিত।উৎপাদিত ফসলের উপর জমিদারের অংশ অর্ধেকের বদলে একতৃতীয়াংশে নামিয়ে আনার দাবিকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন।বস্তুত সুনির্দিষ্টভাবে আন্দোলনকারী কৃষকদের এই দাবির কারণে আন্দোলনের নামও হয়েছে তেভাগার লড়াই। বামপন্থী ঐতিহাসিকদের মতে, বিভাগপূর্ব বাংলার উনিশটি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলনে ষাট লক্ষ কৃষক অংশ গ্ৰহণ করে।১২০ কোন কোন ঐতিহাসিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের উপরোক্ত সংখ্যার যথার্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।১২১

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের সংখ্যা সংক্রান্ত এই বিতর্ক কোনভাবেই বর্গাচাষীদের দ্বারা পরিচালিত আন্দোলনের গুরুত্বকে খাটো করে না, যে আন্দোলন পরবর্তীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা প্রদেশের কৃষক ফ্রন্ট প্রাদেশিক কৃষকসভা কর্তৃক সমর্থিত হয় এবং এর সাহায্য লাভ করে। একজন খ্যাতনামা কৃষকসভাকমী এই আন্দোলনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন, যিনি এই আন্দোনকে এমন একটি বিরাট ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন যা গ্রামবাংলাকে আন্দোলিত করেছিল।১২২

ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ড. আহমেদ কামাল, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই আন্দোলন জমিদারি উচ্ছেদ কিংবা ব্যপক প্ৰচলিত বৰ্গাচাষ প্ৰথা ধ্বংস করার লক্ষ্য স্থির করেনি, যা ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে সমগ্র বাঙলার কৃষিজমির এক-পঞ্চমাংশ এবং কৃষিভিত্তিক পরিবারের ৩৫ শতাংশের জন্য বর্গাচাষকে একটি প্রজাস্বত্ব ব্যবস্থায় পরিণত করে।বর্গাচাষ, যা বর্গা নামে সমধিক খ্যাত এবং উৎপাদনের অন্যান্য পদ্ধতিসমূহের প্রসার ঘটেছিল, বিনয় চৌধুরীর বর্ণনানুসারে, ‘অকৃষিকরণ  প্রক্রিয়ার’ মাধ্যমে। এর ফলে রায়তী জমি কমে যাচ্ছিল এবং অকৃষক শ্রেণী এইসব রায়তদের হস্তচ্যুত জমি হস্তগত করছিল। এভাবে রায়ত কমছিল, বর্গাদার বাড়ছিল। কৃষকদের ঋণগ্রহণ এবং তার ফলে মহাজন কর্তৃক জমি জবরদখল অকৃষিকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।১২৩ বর্গাচাষ বিষয়ে কোন রকম স্বার্থ না থাকা সত্ত্বেও অকৃষিকরণের এই পদ্ধতিগুলি বিপুল সংখ্যক ভূমিহীন ও প্রায় ভূমিহীন কৃষিমজুরকে এই আন্দোলনে টেনে আনে।

হাশেমীর মতে, জোতদার ও মহাজনসহ ক্ষুদ্র ভূস্বামীদের মোকাবিলায় পরিচালিত এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও প্রকৃত কৃষকের মধ্যকার সকল মধ্যস্বত্ত্বভোগীকে ধ্বংসের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।১২৪ এই আন্দোলনের প্রভাব গ্রামীণ জীবনে গণতন্ত্র চর্চার সূচনায় যে সাহায্য করেছিল তাও কতিপয় বামপন্থী নেতার দৃষ্টি এড়ায়নি, যদিও ঐতিহাসিকগণ কেবলমাত্র এই আন্দোলনের অর্থনৈতিক লক্ষ্যের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন।১২৫

ভবানী সেনের মূল্যায়নে তেভাগা আন্দোলন সফল হয়েছিল; কারণ ৪০ শতাংশ ভাগচাষী ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ ভাগ লাভে এবং বাকি ৬০ শতাংশ কৃষকের আবওয়াব বা ঋণের সুদ মওকুফ করাতে সমর্থ হয়। যারা তেভাগা লাভে সমর্থ হয় নি, তারাও সরকারের উপর অধিকতর চাপ প্রয়োগে ভূমিকা পালন করে, যার ফলে সরকার নূ্ন্যতম বর্গাচাষীদের দাবিদাওয়া অন্তর্ভুক্ত করে একটি সংসদীয় বিলের সুচনার কথা ঘোষণা করে।১২৬

যা হোক, এটুকু অর্জন করতে প্রকৃতপক্ষে অনেক মূল্য দিতে হয়।প্রায় ৫০০০ কৃষক বন্দি এবং ৫০ জন কৃষক শহীদ হয়।১২৭ পক্ষান্তরে একজন ভূস্বামীরও মৃত্যুদণ্ড হয়নি কিংবা কৃষক কর্তৃক তাদের ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়নি। এই ধরনের দমন-পীড়ন কৃষক বিদ্রোহে প্রায়শ পরিলক্ষিত হয়।১২৮

তেভাগা আন্দোলনের চেয়ে প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন টংক আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল মূলত উপজাতীয় কৃষকদের মধ্যে, প্রধানত ময়মনসিংহ জেলার উত্তরাঞ্চলের হাজংদের মধ্যে। হাজার হাজার হাজং উপজাতীয় কৃষকের সমর্থিত এই আন্দোলন ৫০ মাইল দীর্ঘ এবং ১০ মাইল বিস্তৃত একটি বিশাল এলাকাব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।আন্দোলনকারী কৃষকদের অধিকাংশ হাজং হলেও তাদের সাথে কোচ, হাদি, ডালু এবং বনাই উপজাতীয় কৃষকরাও জড়িয়ে পড়ে।১২৯

ভট্টাচার্য এই আন্দোলন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মুসলমান টংকদারের জড়িত থাকার কথা আগ্রাহ্য করেছেন। তবে এই আন্দোলনের অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা মনিসিংহ তাঁর আত্মজীবনীতে ১৯৩৭ সালে এই আন্দোলনের শুরুতে মুসলমান কৃষকদের অংশগ্রহণের কথা স্মরণ করেছেন।

টংক পদ্ধতি এক ধরনের বর্গাচাষ প্ৰথা, যা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, যেমন ধানকারারি, ফুরর কিংবা চুক্তিবর্গ।১৩০ যেখানে উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ খাজনা হিসেবে প্ৰদান করতে হতো। বলা হয়, এই আন্দোলনের উৎস বৰ্গা প্রথার চেয়ে অধিকতর আধুনিক এবং একজন ঐতিহাসিক এই আন্দোলনকে শতাব্দীর বাঁক বলে গণ্য করেছেন।১৩১ উৎপত্তিগতভাবেই এই আন্দোলন ছিল উত্তরপূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

যে লক্ষ্য নিয়ে টংক আন্দোলন পরিচালিত হয় তা হচ্ছে খাজনা প্ৰদানের মাধ্যমে টংক-এর পরিবর্তে নগদ রূপান্তর, যার পরিমাণ ছিল অনেক কম; এতে বৰ্গাচাষীদের উৎপাদিত শস্যের এক-তৃতীয়াংশ দেয়া হলেও তা ছিল নগদ টাকায় খাজনা প্ৰদানকারী সাধারণ কৃষকদের দেয় অংশের চেয়েও ৫০০ ভাগ বেশি।১৩২ ১৯৪৭ সালে প্ৰতি একর টংক জমির খাজনা ছিল ৪০-৭০ টাকা; পক্ষান্তরে ঐ একই পরিমাণ জমির সাধারণ খাজনা ছিল মাত্র ৬ টাকা। প্রতি একরে টংক খাজনা ছিল ৩ মণ ৩৩ সের ধান, যা অ-টংক জমির খাজনার চেয়ে ৮ গুণ বেশি।১৩৩ স্বাধীনতাপূর্ব ভারতের বিধানসভার একজন বামপন্থী সদস্য সোমনাথ লাহিড়ী এই আন্দোলনকে ‘গরিব কৃষকদের উন্নতির জন্য বৈধ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

টংক প্রথা বাতিলের সংগ্রামে ১৯৩৭ সালে থেকে ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে ২ জন মুসলমান কৃষকসহ অসংখ্য হাজং এবং ডালু উপজাতীয় কৃষক তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।১৩৪

অন্যদিকে নানকার বিদ্রোহের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল বর্গাচাষীর কায়িক শ্রম প্ৰদান প্রথার বিলোপ সাধন।এই প্রথায় এক একর জমির একজন বৰ্গাচাষীকে জমির মালিকের বাড়িতে মাসে পাঁচ থেকে সাত দিন বেগার খাটতে হতো; জমির মালিক ডাকা মাত্রই কৃষক তার স্বীয় প্রয়োজন-অপ্ৰয়োজন নির্বিশেষে কাজ করতে বাধ্য হতো।নানকার জমির উপর বর্গাচাষীর কোন অধিকার ছিল না।১৬৫ নানকার কৃষকের প্রাত্যহিক নির্দেশিত কাজ এত বেশি ছিল যে সেই কাজ করতে তার পুরো পরিবারকে শ্রম দিতে হতো, অন্যদিকে তার নিজস্ব যে ছোট্ট এক টুকরো জমি থাকতো, যা দিয়ে তার পুরো পরিবারের বাৎসরিক ভরণপোষণ চলতো, তার খুব কমই পরিচর্যা সে করতে পারতো, ফলে তার উৎপাদন কমতো।

জমিদারের কাজ না করলে শারীরিক নির্যাতন ছিল সাধারণ বিষয় এবং সময় নষ্ট করার জন্য সময় পুষিয়ে নিতে আরো অনেক বেশি কাজ দেওয়া হতো। জমিদার কিংবা জমিদারবাড়ির পুরুষ সদস্যদের দ্বারা প্রায়শ নানকারদের স্ত্রী এবং যুবতী মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার হতো এবং এই অবস্থা নিরসনে ব্যক্তিগত কিংবা দলগতভাবে প্রতিরোধ ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। এই ধরনের প্রতিরোধের জন্য চরম মূল্য দিতে হতো-বাস্তুচ্যুত করা থেকে জমিদারের ‘গুণদাস’ কর্তৃক হত্যা পর্যন্ত। ১৯৪৬ সাল ও ১৯৪৭ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে এই বর্বর প্রথা সিলেট জেলার অধিকাংশ গ্ৰাস করে।ত্ৰিশ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই জেলার জনসাধারণের ১০ শতাংশ এই আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থন করে।১৩৬ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে কৃষক বিপ্লবের ‘ভূমি ও খাজনা’ প্রশ্নটি পর্যায়ক্রমে প্রশমিত করে পরে একেবারেই খারিজ করে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি এবং বঙ্গবিভাজন কমিউনিস্ট কর্মীদের মতানুসারে কৃষকদের, জমিদার ও রাষ্ট্রের কর্মচারীদের সঙ্গে বিরোধিতা থেকে সরে আসার মূল কারণ ছিল। সক্রিয় কৃষক কর্মীরা এবং কৃষকসভার সদস্যগণ বিশ্বাস করতো, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া অপ্রয়োজনীয়। তারপর প্রত্যাশা ছিল যে, জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তাদের দাবি মেনে নেবে। এমনকি ভাগচাষীদের আন্দোলনের ওপর সাম্প্রতিক লেখালেখিতেও তার সাক্ষ্য মেলে। কুপার বিশ্বাস করেন, এ ধরনের প্রত্যাশা তেভাগা আন্দোলনকে দুর্বল করেছিল।১৩৭

 মুসলিম লীগের নেতৃত্ব খোলাখুলিভাবে জনসমক্ষে কথা দিয়েছিল যে, তারা জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ঘটাবে এবং অন্যান্য কৃষি বিষয়ক সংস্কার সাধন করবে। কতিপয় প্রধান আঞ্চলিক নেতা কৃষকদের প্রত্যাশার পরিমাণকে আরো বাড়িয়ে তুলেছিলেন। গিয়াসুদ্দিন পাঠান ময়মনসিংহের একজন অন্যতম লীগ নেতা শোনা যায়, মুসলমান ভাগচাষীরা, যারা কৃষকসভার সাংগঠনিক নেতৃত্বে আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, তেভাগার পিছনে তাদের সময় ও শ্রম ও অপচয় করা উচিত নয়; যেহেতু পাকিস্তানের অভ্যুদয় আর বেশি দূরে নয়, তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের পুরোটাই অর্থাৎ চৌভাগই পাবে। মনি সিংহের ভাষ্য অনুযায়ী, এ কথায় যাদুমন্ত্রের মতো কাজ হয়।কৃষকরা জমিদারদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত শস্য ফিরিয়ে দিল।১৩৮

বস্তৃত মুসলিম লীগ ভাগচাষীদের দাবিদাওয়া মেটানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা গ্রামীণ পরিবর্তনসূচক পদক্ষেপ হিসেবে বিরোচিত হতে পারে।১৯৪৭-এর ২২ জানুয়ারি ‘দি বেঙ্গল বৰ্গাদার বিল’, যা অল্পদিনের মধ্যেই সমগ্র প্রদেশে তেভাগা পদ্ধতি উপস্থাপন করতো, কলকাতা গেজেটে প্রকাশিত হয়।এই বিল খুব ফলপ্রসুভাবে বিক্ষোভ প্রশমিত করে। যদিও প্রতিক্রিয়ার তারতম্য ঘটে, তবে মোদ্দা কথা এই যে, আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি আন্দোলনের প্রচণ্ডতাকে থিতিয়ে দেয়।১৩৯

ভাগচাষীদের বিল কৃষি ব্যবস্থায় এক ধরনের প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে এবং একই সাথে আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্পর্কে আশা ও ভীতির জন্ম দিয়েছে। এই বিলটি মুসলমান কৃষকদের নিকট মুসলিম লীগের ভাবমূর্তিকে অনেক উঁচু করে তোলে, যদিও বিলটি পাশ করানোর জন্য কার্যকর কিছুই করা হয়নি। এমন কথাও বলা হয়ে থাকে যে, খাজা নাজিমুদিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক পর্যায়ের মসলিম লীগ নেতা ব্যক্তিগত পর্যায়ে জমিদারদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের স্বাৰ্থ-পুরোপুরি সংরক্ষণের আশ্বাস দিয়েছিলেন।১৪০

একটি জাতীয় সরকারের সম্ভাবনা সিলেট জেলায় নানকারদের চলমান সক্রিয় আন্দোলনে ছেদ ঘটায়। অজয় ভট্টাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মীরাও স্বীকার করেন যে, সিলেটের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা এবং ধাধাঁ ছিল যে, নানকার সংকট আপোসের মাধ্যমেই সমাধান করা হবে, যদি জনগণ পাকিস্তানের প্রতি তাদের সমর্থন অটুট রাখে।১৪১ 

 এই একই সম্ভাবনা হিন্দু নানকারদের মধ্যেও হতাশার সৃষ্টি করে।পরিস্থিতি আরো বেশি জটিল হয়ে ওঠে যখন উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুরা পাকিস্তানের জন্মের পরই তড়িঘড়ি করে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। এঁদের কাছ থেকে অল্প হলেও যে সমর্থন পাওয়া গিয়েছিল, তা তখন আর থাকলো না।১৪২ একজন কৃষকসভাকর্মী হাজী মোহাম্মদ দানেশ বলেন যে, হিন্দুরা ভেবেছিল মুসলমানদের দেশ পাকিস্তানে তারা অসহায় হয়ে পড়বে।১৪৩ হিন্দু ও মুসলমান নানকারদের মধ্যে একটি পার্থক্য, পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে পাকিস্তান অথবা ভারতের অংশ হওয়ার প্রশ্নে সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার সময়, যা সহজে পরিণত হতে পারতো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। এরই সাথে যুক্ত হলো করিমগগঞ্জ থানার বিভাজন, যা ছিল আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্ৰস্থল এবং এর ফলে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সৃষ্টি হলো অনিশ্চয়তা।১৪৭

পাকিস্তানের জন্ম হয় দুৰ্ভিক্ষ আক্রান্ত সময়ে। তারপরও একটা লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, মুসলমান কৃষকরা তাদের হিন্দু ভাইদের মতো সেই সময়ে দেশত্যাগ করেনি।একটি স্বাধীনতা রিপোর্টে বলা হয় ‘পাকিস্তান অর্জিত হয়েছে।মুসলমানরা প্রত্যাশা করে, দ্রব্যমূল্য নেমে আসবে।তারা দুৰ্ভিক্ষ প্রতিরোধ নিয়ে ততোটা চিন্তিত নয়। তারা তাদের দেশ ত্যাগ করেও চলে যাবে না’।১৪৫

একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী আবদুস শহীদ স্মরণ করেন কিভাবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জাতীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল হয়ে বহু মানুষ আশান্বিত হয়, যখন প্রকৃত অর্থে তাদের সামনে ছিল আসন্ন দুর্ভিক্ষের আশংকা।১৪৬ রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্ৰাপ্তির আনন্দে চট্টগ্রামের এক পল্লীগায়ক গেয়েছেন:

১৯৪৩ সালে সাম্রাজ্যবাদের পীড়নে,
অনাহারে লক্ষ লক্ষ লোক দিয়েছে জীবন
এইবার মোদের স্বাধীন রাষ্ট্র দুর্ভিক্ষের অন্নকষ্ট
ঘুচাইয়ে শান্তিরাজ্য কর ভাই স্থাপন।১৪৭

১৯৩৭-এর নির্বাচনের পর থেকেই মুসলমান নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের ভবিষ্যৎ বাসভূমির ছবি এঁকেছেন।এমন হবে সে দেশ যেখানে দরিদ্র কৃষকের দু’বেলা দু মুঠো খাদ্য পানির স্বপ্ন সত্যি হবে।১৪৮ মহা দুর্ভিক্ষের পর ‘বিপর্যয় পরবতী ইউটোপিয়ার’  প্রেক্ষিতে জনগণের কাছে দু’মুঠো ‘ভাত’ পাওয়াই হয়ে দাঁড়ায় পরিপূর্ণতার প্রতীক। Greenough-এর মন্তব্য অনুসারে, বহু কৃষকের জন্য অন্নের সংস্থানই হচ্ছে তার স্বাধীনতা।১৪৯  লীগ কামীরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর এইসব বাস্তব দুর্দশাকেই তাদের রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় করে তুলেন।

সাধারণ মুসলমান কৃষকদের আশাবাদ এবং পাকিস্তান-কেন্দ্রিক প্রত্যাশা নিঃসন্দেহে পূর্ব বাংলার সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে জাতীয়তাবাদী অনুভূতির প্রতিফলন। তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতির চরিত্র বিশ্লেষণ করলে সবদিক দিয়ে প্রকৃত প্রস্তাবে জাতীয়তাবাদ হতে পারতো নিতান্তই একটি উচ্চবর্গীয় চিন্তাভাবনা। কেননা মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদ ছিল বহু বিপরীত পরিস্থিতির একটি, যা দরিদ্রকে আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছিল ১৫০  

ইসলাম ধর্ম স্বয়ং এবং ইসলামের অন্তর্নিহিত সাম্যবাদী জাতীয়তাবাদ১৫১ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে রূপান্তরিত হলো, বিশেষত যখন নিপীড়ক শক্তিকে উচ্চবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের নিপীড়ক শক্তির প্রতিনিধি হিসাবে দেখানো হয়েছিল। ইসলাম দৈনন্দিন রাজনীতিতে সেই সময় এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, এমনকি ধর্মনিরপেক্ষ দাবিসমূহও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ দ্বারা ঈষৎ রঞ্জিত হতো।

৫০-এর দশকের সদ্য গঠিত বাংলা ভাষা কেন্দ্ৰিক জাতীয়তাবাদ ইসলামের সংগঠন ও বাণী থেকে এর বহু ধারণা ও উদাহরণ গ্ৰহণ করেছিল।  এই জাতীয়তাবাদের প্রথম দিককার লেখায় নতুন রাষ্ট্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমরের প্রসঙ্গ ও উদাহরণ টেনে আনা হয় এবং তার মতোই একটি আদর্শ সমাজ অর্জন ও প্রতিষ্ঠার কথা তুলনামূলকভাবে কেউ কেউ লিখেছেন ‘কখন আমরা হযরত ওমরের মতো একজন আদর্শ শাসক পাবো? কখন সেই চার খলিফার যুগের আবার পুনরাবির্ভাব ঘটবে?’১৫২

মুসলিম লীগের এই প্রচারণা ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করেছিল, কারণ তা মুসলমান কৃষকদের ঐতিহ্যগত ধমীয় আনুগত্যের সাথে সামঞ্জপূর্ণ ছিল।১৫৩ লীগ তার প্রচার কার্যক্রম চালাতো সামাজিক আনুষ্ঠানিক সমাবেশগুলির মধ্যে, যেমন জুম্মার নামাজ, মিলাদ মাহফিল, ওয়াজ ও ঈদের জামাত প্রভৃতি।এভাবেই সামাজিক জীবনকে রাজনীতির সাথে যুক্ত করে মুসলিম লীগ ঐতিহ্যগত ধর্মীয় আনুগত্যকে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করলো, যা কখনো সাম্প্রদায়িক আন্দোলন এবং কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদের দ্যোতক প্রতীকের মাধ্যমে আত্মপ্ৰকাশ করেছে।১৫৪

সংক্ষেপে এই হলো বাংলার মুসলমান জনগণের নিজেদের পৃথক বাসভূমি অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রামের পথে তাদের বিশ্বাস, আকাঙ্ক্ষা ও শ্রমলব্ধ অবদানের ইতিহাসের প্রেক্ষাপট। স্বাধীনতা-উত্তরকালে মুসলিম লীগ সম্পর্কে মোহমুক্তি সম্পর্কে ধারণালাভের জন্য মনে রাখা প্রয়োজন জনগণের সে সময়কার প্রত্যক্ষ আশা ও প্ৰত্যাশার কথা, যা প্ৰাথমিক পর্যায়ে লীগকে ক্ষমতাসীন করার ক্ষেত্রে কার্যকর শক্তি হিসাবে কাজ করেছিল।

তথ্য নির্দেশিকা

ref 5

[উৎসঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ বামপন্থীদের ভূমিকা, মেসবাহ কামাল (সম্পাদিত), প্রথম প্রকাশ, প্রকাশকঃ সম্পর্ক, কলিকাতা, ২০০০ , পৃঃ৪৪-৫০ ]

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির উত্থান, পতন ও প্রভাব 

১৯০৫ সালের বাংলাভাগ ও পূর্ববাংলায় প্রতিক্রিয়া

কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে-সুনীতি কুমার ঘোষ

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও ১৯৪৭ সালের বাঙলা ভাগ – জয়া চ্যাটার্জী

বাংলা ভাগে ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি– নুরুল কবির

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion