আধুনিক বাঙলা সাহিত্যে হিন্দু-মুসলিম স্বাতন্ত্র্যধর্মী ধারা

[নোটঃ প্রবন্ধটি ‘অগ্রপথিক’, ১৯৯০ সালের ১ মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত। পরে ‘অগ্রপথিকঃ ভাষা আন্দোলন সংকলনে’ (১৯৯৩) অন্তর্ভুক্ত, মূল শিরোনাম ছিলঃ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশে মুসলমানদের অবদান]

লিখেছেনঃ আবদুল মান্নান সৈয়দ

“আমি মনে করি, বিশ্ব-কাব্যলক্ষ্মীর একটা মুসলমানী ঢং আছে। ও-সাজে তাঁর শ্ৰীর হানি হয়েছে বলেও আমার জানা নেই। …বাঙলা কাব্য-লক্ষ্মীকে দুটো ইরানী ‘জেওর’ পরালে তাঁর জাত যায় না, বরং তাকে আরও খুবসুরতই দেখায়।আজকের কলা-লক্ষ্মীর প্রায় অর্ধেক অংলকারই ত মুসলমানী ঢং-এর। বাইরের এ—ফর্মের প্রয়োজন ও সৌকুমাৰ্য সকল শিল্পীই স্বীকার করেন।” (বড়র পিরীতি বালির বাঁধা॥ কাজী নজরুল ইসলাম ॥ “আত্মশক্তি’ ॥ ৩০ ডিসেম্বর ১৯২৭)

হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ধারার মাত্র এই সে-দিন, বছর ষাট আগে, ১৯২৭ সালে, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) কণ্ঠেই প্ৰথমবার বলিষ্ঠভাবে উচ্চারিত হলো ‘মুসলমানী ঢং’-এর আবশ্যিকতার কথা।মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি ভারতচন্দ্র রায় (১৭০৫ ?-৬০) অবশ্য বহু পূর্বেই উচ্চারণ করেছিলন “না রবে প্রাসাদগুণ না হবে রসাল।অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল।” এবং মধ্যযুগেও বাংলা সাহিত্য থেকেই নজরুল-কথিত মুসলমানী ঢং-এর সুপ্রচুর নিদর্শন পাওয়া যায়। কিন্তু বাঙালি-মুসলমানের আধুনিকতায় প্রবেশের কিছু কাল পরে মাত্র ওরকম দীপ্ত উচ্চারণ সম্ভব হলো।আর তাও নজরুলের মতো দুঃসাহসী, নজরুলের মতো হিন্দু-মুসলমানের মিলনকামিতার শ্রেষ্ঠ প্ৰবক্তার মুখে।

এখানে একবার বাংলা সাহিত্যের সমগ্র পরিপ্রেক্ষিতের কথা মনে করা যেতে পারে।সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে সাহিত্যের ঐতিহাসিকরা তিনটি অংশে ভাগ করেছেনঃ প্রাচীন যুগ-যা মোটামুটি সপ্তম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত, মধ্যযুগ-ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত,এবং আধুনিক যুগ-উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের ভূমিকা ছিলোনা, হিন্দুদেরও ছিলোনা, তা বৌদ্ধদের দ্বারা সৃষ্টঃ চর্যাপদ।

মধ্যযুগে বাঙালি-মুসলমান রোমান্স-কাব্যের মধ্য দিয়ে মানবিকতার উদ্বোধন করেন। সে-যে দেব-দেবী-অধ্যুষিত বাংলা সাহিত্যে মানবিকতার বন্দনা শুরু হলো, বাঙালি-মুসলমান আজো সেই মানবিকতারই জয়গান গেয়ে চলেছে। বাংলা সাহিত্যে বাঙালি-মুসলমানদের যদি শ্রেষ্ঠ অবদান এক কথায় চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে এই ‘মানবিকতা’ শব্দেই তাকে সনাক্ত করতে হবে।

আমাদের আলোচ্য বিষয়ঃ আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঙালি-মুসলমানদের অবদান নির্ধারণ।তার বিশদ বিশ্লেষণের জায়গা এটা নয়, আমি সংক্ষেপে কয়েকটি রেখায় তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করবো ।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে আমরা দু’টি অংশে ভাগ করতে চাইঃ

একটি উনিবংশ শতাব্দীর সূচনাকাল থেকে আজাদী লাভের আগে পর্যন্ত (১৮০০-১৯৪৭)।অন্যটি আজাদী লাভের পরবর্তীকাল থেকে আজ পর্যন্ত (১৯৪৭-৯০)।প্রথম পর্যায় আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংগঠনের যুগ। দ্বিতীয়টি বিস্তারের যুগ। প্রথম পর্যায়ের সাহিত্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী ছিলো কলকাতা; দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হচ্ছে ঢাকায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে কলকাতাতেও যৎসামান্য কাজ হয়েছে।

mannan-syed
আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩ – ২০১০)

১৯৪৭-এর আগে কলকাতা ছিলো বাংলা সাহিত্যের রাজধানী। ’৪৭-এর আজাদীর পর সাহিত্যের আরেকটি রাজধানী হয়ে ওঠে ঢাকা।আরেকটি কিন্তু দ্বিতীয় নয়, অপ্রতিম, অতুলনীয়। এই শতাব্দীর বিশের দশকে, কিংবা আরো কোনো খণ্ডকালে হয়তো, ঢাকার সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক উজ্জ্বলতা জাজ্বল্য হয়ে উঠেছে। ’৪৭-এর পরই এই শহর হয়ে ওঠে সাহিত্যের এক নতুন ও স্থায়ী কেন্দ্রকোরক-জায়মান সৃজনশীলতা ও মননশীলতাকে সে ধরে রাখতে থাকে তার আগ্রহ সেই কেন্দ্রে।

এখন ইতোমধ্যেই মাত্র এই কয়েক দশকে (১৯৪৭-৯০) ঢাকা কেন্দ্ৰিক যে সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের অনবশ্যিক অংশ।ঢাকা থেকে সম্পূর্ণ নতুন এক সাহিত্যধারা প্রবাহিত হচ্ছে আজ। আবার সম্পূর্ণ নতুন বলে কোনো কিছু নেই সাহিত্যে, বীজ বা অন্তর্গত ফল্গুধারা ভিতরে ভিতরে তার রয়েই যায় কোথাও।ঢাকাকেন্দ্ৰিক সাহিত্যের আজকের যে প্রবাহ তার অন্তর্গত ফল্গুধারা তলে তলে বহমান ছিলো, শীর্ণভাবে কিন্তু তীব্রভাবে, কলকাতা কেন্দ্ৰিক সাহিত্য-ধারায়।

উনিশ শতাব্দীর সূচনা মুহুর্ত থেকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মূল ভূমি হয়ে ওঠে কলকাতা। লিখিত কবিতা, লিখিত গদ্য, লিখিত নাটক বাংলা সাহিত্যে ক্রমাগতভাবে আধুনিকতায় দীক্ষিত হতে থাকে।সবাই জানেন, বাঙালি মুসলমান তাতে যোগ দেয় অনেক পরে শতাব্দীর অর্ধেক অতিক্রান্ত হওয়ার পর।তাও বিচ্ছিন্নভাবে ছেঁড়াছেঁড়াভাবে, যতো না সাহিত্যিক তার চয়ে বেশী সামাজিক ও ধাৰ্মিক সংগ্রামে।

প্রকৃত পক্ষে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বাঙালি মুসলমান ব্যাপকভাবে সাহিত্যে যুক্ত হয়।কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি মুসলমানের সেই প্রথম জাগরণের সময় সামাজিক রাজনৈতিক ভাবনা বেদনাই ছিলো তার মূখ্য আলোচ্য। তার আসন্ন পথ ও গন্তব্য জেনে নিতেই সে ছিলো ব্যাকুলভাবে সন্ধানী।

সেদিন কলকাতাই ছিলো কেন্দ্রভূমি। সমস্ত দেশ অর্থাৎ ভারতবর্ষ ছিলো অখণ্ডিত। একই কলকাতায় সাহিত্য চর্চা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, প্রমথ চৌধুরী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণুদে, বুদ্ধদেব বসু, তারাশংকর, মানিক, বিভূতিভূষণ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিমল কর, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ, সমরেশ বসু প্রমুখ এবং আবদুর রহীম, মোজাম্মেল হক, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ইসমাইল হোসেন শিরাজী, বেগম রোকেয়া, কাজী ইমদাদুল হক, এয়াকুব আলী চৌধুরী, ডাক্তার লুৎফর রহমান, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, শাহাদাৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, নজরুল ইসলাম, জসীম উদদীন, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবু রুশদ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, কাজী আবদুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন প্রমুখ।

ভাবতে অবাক লাগে, একই কলকাতায় বসে এঁরা একই বাংলা ভাষায় দুই স্বতন্ত্র সাহিত্যধারা প্রবাহিত করেন। ‘সুধাকর,’ ‘সওগাত,’ ‘মোহাম্মদী.’ মুসলিম-সম্পাদিত প্ৰায় সব প্রধান পত্রিকা কলকাতা থেকেই বেরিয়েছিল। মুসলিম-সম্পাদিত পত্রিকাসমূহে-রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী, মোহিতলাল, ভূজংগধর রায় চৌধুরী, অন্নদাশংকর রায় মাঝে মাঝে অবতীর্ণ হয়েছেন। যেমন নজরুল, জসীম উদদীন প্রমুখ হিন্দু সম্পাদিত পত্রিকাসমূহে। কিন্তু মোটামুটিভাবে হিন্দু-সম্পাদিত পত্রিকাগুচ্ছে হিন্দু আদর্শ এবং মুসলিম সম্পাদিত পত্রিকাসমূহে মুসলিম আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে।

অন্য মুসলিম লেখকদের প্রসংগ দূরে থাক, হিন্দু-মুসলমান মিলনের শ্রেষ্ঠ অগ্রদূত নজরুল ইসলামও আশ্চৰ্য-প্রধানত প্রকাশিত হয়েছেন মুসলিম সম্পাদিত পত্রিকা নিচয়েই। মুসলিম সম্পাদিত পত্রিকা নিচয়ের ছিলো তিনটি বিশিষ্টতঃ এক. মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রচার প্রসার; দুই. বাঙালি মুসলমানের ভাষা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা ও জবাব এবং তিন. হিন্দু-মুসলমানের মিলনকামিতা। হিন্দু-সম্পাদিত পত্রিকাসমূহে নয়, আশ্চর্য, মুসলিম সম্পাদিত পত্রিকাসমূহেই হিন্দু-মুসলমানের মৈত্রী পুনঃ পুনঃ ঘোষিত হতো।

মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘হিতকরী’ ছিলো হিন্দু-মুসলমানের মিলনকামী। এস. কে. এম. মুহাম্মদ রওশন আলী সম্পাদিত ‘কোহিনূর’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিলোঃ ‘হিন্দু-মুসলমানে’ সম্প্ৰীতি, জাতীয় উন্নতি, মাতৃভাষার সেবাকল্পে এবং কলিকাতার অনাথ আশ্রমের সাহায্যার্থে ‘কোহিনূর’ প্রচারে ব্ৰতী হইয়াছি। সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত ‘নবনূরের’ সম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃতি,ভারত বর্ষের অদৃষ্ট ফলকে হিন্দু-মুসলমানের সুখ দুঃখ এখন একই বর্ণে চিহ্নিতঃ বিজয়দৃপ্ত মুসলমান এখন হিন্দুর ন্যায়ই বিজিত।এই দুই মহাজাতির সম্মিলনের উপরেই ভারতের শুভাশুভ নির্ভর করে।”

‘সাহিত্যেই এই মিলনের প্রশস্ত ক্ষেত্র।’ এই মিলনকামিতাও ছিলো মুসলিম দৃষ্টি ও আকর্ষণ থেকে। এই মিলনকামিতা উভয় পক্ষের সদিচ্ছা সত্ত্বেও যে বাস্তবভাবে ফলপ্ৰসূ হচ্ছিলো না, তার সাক্ষ্য দেবে মুসলমান-সম্পাদিত কাগজে মুসলমান লেখকের উপস্থিতি, হিন্দু-সম্পাদিত কাগজে হিন্দু লেখকের উপস্থিতি।

‘সবুজ পত্রে’ এস. ওয়াজেদ আলী লিখেছেন বটে, ‘কল্লোল’ পত্রিকায় নজরুল, জসীম উদদীন, আবদুল কাদির ছিলেন বটে  ‘সওগাত’ রবীন্দ্রনাথ বা ‘বুলবুলে’ রবীন্দ্রনাথ-প্রমথ চৌধুরী-শরৎচন্দ্র অবতীর্ণ হয়েছেন-কিন্তু তবু পত্রিকাগুলি ছিলো স্ব-স্ব সমাজের প্রতিনিধি।(একমাত্র ‘কল্লোলে’র সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক এই নিরিখে বিচাৰ্য নয়, নজরুল ছিলেন ঐ পত্রিকার অন্যতম নায়ক।)

হিন্দু-মুসলমান পরস্পর মিলনকামিতা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দুই ভাবনা-বেদনায় প্রবাহিত ছিলো, সামান্য ব্যতিক্রম বাদে এদের মধ্যে যথার্থ-অর্থে ছিলো না, চিন্তার বিনিময়ও।

রবীন্দ্রনাথ ও মুন্সী মেহেরুল্লাহ একই বছরে জন্মেছিলেন (১৮৬১), কিন্তু সার্বভৌম কবি ‘রবীন্দ্রনাথের বহুধা কর্মের মধ্যে তিনি ছিলেন একদা ব্ৰাহ্মণ সমাজের সেক্রেটারী’, আর ‘মুসলিম বাংলার রামমেহান’ (মুহাম্মদ আবদুল হাই) মুন্সী মেহেরুল্লাহর ধ্যান-জ্ঞান ছিলো ইসলাম প্রচার। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৭) ও ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের প্রণেতা নজিবর রহমান (১৮৭৮-১৯২৩) ছিলেন সমসাময়িক-প্রথমোক্তের চারণক্ষেত্র ছিল হিন্দু সমাজ, দ্বিতীয়োক্তের মুসলিম সমাজ। সৃজন ও মননের দুই ক্ষেত্রেই হিন্দু মুসলমানের ছিলো স্বভাবী বিভিন্নতা।একই কলকাতার কেন্দ্রে থেকেও তারা ছিলেন দুটি বিভিন্ন ধারার স্নাতক।

দুটি দৃষ্টান্ত দেবো

১৯২৬ খৃস্টাব্দে ঢাকায় উত্থিত ‘শিখা’ গোষ্ঠীর কথা ধরা যাক। এঁরা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন করেছিলেন। তার মধ্যে দ্রোহ ছিলো। কিন্তু বিপ্লব ছিলো না। তাদের প্রতিষ্ঠানের নামই ছিলো ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। তাঁরা ইসলাম ধর্মকেই প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিলেন বুদ্ধি ও প্রযুক্তির উপরে। তাদের প্রথম সংখ্যায় সম্পাদকীয় নিবেদনে ছিলো এই পরিষ্কার বক্তব্যঃ ‘শিখার প্রধান উদ্দেশ্য বর্তমান মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন-সাধনা।’ শিখা-গোষ্ঠীর কেন্দ্রনায়ক কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৬-১৯৭০) হযরত মুহম্মদ (সা)-এর জীবন রচনা ও কুরআন শরীফের অনুবাদ করেছেন। শিখা-গোষ্ঠীর তাবৎ কর্মকাণ্ডই মুসলিম সমাজ-কেন্দ্রিক।

দ্বিতীয়ঃ নজরুল ইসলাম। সত্য, উনবিংশ শতাব্দীতে মীর মশাররফ হোসেনের তুল্য গদ্যপ্রতিভা (রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে) বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া তৃতীয় কেউ নেই। মীর বঙ্কিমচন্দ্রেরও স্বীকৃতি আদায় করেছিলেন, ঠিক, কিন্তু তিনিও পার্শ্ববতী হিন্দু সমাজকে তেমন নাড়া দিতে পারেন নি, যা দিয়েছিলেন নজরুল। এই নজরুলই ছিলেন হিন্দু-মুসলমানের মিলনের আজ পর্যন্ত বিচারে শ্ৰেষ্ঠ প্ৰবক্তা।কিন্তু তাঁকেও হিন্দু-মুসলমান মিলনবাণী প্রচার করতে হয়েছে মুসলমান-সম্পাদিত পত্রিকায় এবং হিন্দু-মুসলমানের মিলনবাণী প্রচার সত্ত্বেও এ তথ্যও সর্বদা স্মরণীয় যে, তিনি বাংলা ইসলামী গানের স্রষ্টা এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নির্মাতা।

নজরুলের হিন্দু-মুসলমান মিলনবাণী প্রচার করতে হয়েছে মুসলমান-সম্পাদিত পত্রিকায়

তার সংক্ষিপ্ত সাহিত্যিক জীবনের পুরোটাই ইসলাম ও মুসলমানের ধ্যানে কেটেছে। বাঙালি-মুসলমানের হিন্দু-মুসলমান মিলনের চিন্তা তাঁর মধ্যে চূড়ান্তরূপ নিয়েছে, প্রতিবেশী হিন্দু সমাজকে তিনিই তীব্রভাবে সচেতন করে তোলেন বাঙালি-মুসলমানদের অস্তিত্ব বিষয়ে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একদা একটি সাহিত্যিক তর্কে তিনি উত্থাপন করেছিলেন বিশ্ব-কবিতার একটি অপ্রতিরোধ্য মুসলমানী ঢঙে’র কথা।

‘প্রবাসী,’ ‘ভারতবর্ষ,’ ‘বসুমতী’র পাশে কলকাতাতেই উত্থিত হয়েছিলো ‘সওগাত’, ‘বুলবুল’, ‘মুহাম্মদী’র মতো পত্রিকা। একই কলকাতায় পাশপাশি বাস করে হিন্দু ও মুসলমান সমাজ তাদের আপন ঐতিহ্য ও গন্তব্য করে নিচ্ছিলো। মুন্সী মেহেরুল্লাহ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও ইসমাইল হোসেন শিরাজীর জাগরণকামী বক্তৃতা ও রচনামালা, সৈয়দ এমদাদ আলী, মওলানা আকরম খাঁ ও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের কুশলী সম্পাদনাশক্তি; বেগম রোকেয়া, কাজী আবদুল ওদুদ ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ভাবুকতা; আরো অসংখ্য লেখক ও কবির বহুমুখী উদ্যম; সর্বোপরি নজরুল ইসলামের অনন্যসাধারণ সাহিত্যকৃতি— এই সবই বাঙালি-মুসলানের আত্মচেতনাকে স্থানিকতা থেকে মুক্ত করে চৈতন্যের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করেছিলো।

বাঙালি-হিন্দু লেখক, এমনকি সাহিত্য-ঐতিহাসিকেরাও পুরোপুরি সচেতন ছিলেন না যে, তাদের একান্ত পাশ দিয়েই একটি শব্দহীন ধারা এগিয়ে চলেছে। তবে এখানেই স্মরণীয়, ঐ স্বাতন্ত্র্য কোনো উন্মুল ব্যাপার ছিলো না।বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ধারাবাহিকতা আর নবোন্মোষিত স্বাতন্ত্র্য সাধনা-এই দু’য়ের মাত্রাবিতরণে এগিয়ে চলেছিলো তাদের সাহিত্য। এই স্বাতন্ত্র্য সাধনাই মোহনায় এসে পড়ে ’৪৭-এর পর থেকে। অন্তত প্ৰায় একশো বছরের চাপ ছিলো তার উপরে। সাংস্কৃতিক চাপ। স্বাতন্ত্রের চাপ। একটি ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে সে মুক্তি পেলো। তারপর থেকে তার কেবল ক্ৰম-পরিণতি, অবিরল দুই ঝিনুকের চাপের ভিতর থেকে মুক্তার জন্ম-জন্মান্তরও বলা যেতে পারে।

সাহিত্য-ঐতিহাসিক মুহম্মদ আবদুল হাই বাঙালি-মুসলমান লেখকদের দুটি দলে ভাগ করেছিলেনস্বতন্ত্র্যধর্মীসমন্বয়ধর্মী দল। ‘সুধাকর’ পত্রিকাকেন্দ্রী ও তাঁদের অনুবর্তীদের তিনি বলেছেন স্বাতন্ত্রধর্মী: এঁরা ছিলেন ইসলামচিন্তিত।শেখ আবদুর রহিম, মুন্সী রেয়াজউদ্দীন আহমদ, পণ্ডিত রেয়াজউদ্দীন মাশাহাদী, ইসমাইল হোসেন শিরাজী প্রমুখ স্বাতন্ত্র্যধর্মী।অন্য লেখকেরা, নজরুল ইসলাম যেমন- সমন্বয়ধর্মী।কিন্তু শেষ-বিশ্লেষণে দেখা যাবে, শুধু স্বাতন্ত্র্যধর্মী লেখকেরাই নয়, সমন্বয়ধর্মী লেখকেরাও সততই স্বধৰ্মনিষ্ঠ-নজরুল ইসলাম বা কাজী আবদুল ওদুদের মতো সমন্বয়ধর্মীরাও সতত ইসলাম ও মুসলমান নিয়ে ভাবনা বেদনায় আক্রান্ত।

কী দেখা যাচ্ছে তাহলে? যাচ্ছে, একই স্থানের অধিবাসী হয়েও, একই দেশ-কালের বাসিন্দা হয়েও, বাঙালি-হিন্দু ও বাঙালি-মুসলমান লেখকেরা দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক  আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিলেন বিভাগ-পূর্বকালে।

স্বাতন্ত্র্য থাকে তাহলে ভূখণ্ডে নয়, পরাধীনতায় নয়—অর্থাৎ নয় রাষ্ট্রে বা স্বাধীনতায় স্বাতন্ত্র্য থাকে একটি জাতির চৈতন্যে বা আত্মায় আর, কোনো বহিঃশক্তি নয় আত্মিক শক্তিই মানুষের সবচেয়ে বড়ো শক্তি। চৈতন্যই তার নীলিমাভেদী নিশান।

[উৎসঃ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম অবদান, মোশাররফ হোসেন খান (সম্পাদিত), বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা, ১৯৯৮, পৃঃ ২৯৬-৩০০]

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ 

মধ্যযুগের মহাকবি সৈয়দ সুলতান ও তার কাব্য প্রসঙ্গ

বঙ্গ-ভাষার উপর মুসলমানের প্রভাব-শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন

বাংলা ভাষার নূতন পরিচয়– কবি গোলাম মোস্তফা

দুই বাংলার ভাষা ও সাহিত্যের সীমানা: খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি

মুসলিম বাংলার স্বাতন্ত্র্যবোধ, স্বকীয় ভাষা নিয়ে সাহিত্যিকদের মনে বিতৃষ্ণা কেন?– আবুল মনসুর আহমদ

ঢাকার প্রমিত বাংলায় কলকাতা কেন্দ্রিক উপনিবেশের প্রভাব

বাংলা সাহিত্যের ষাটভাগ সাহিত্য সাম্প্রদায়িক সাহিত্য-আহমদ ছফা

মুসলমান বাংলা লিখিতে জানে না!- উপনিবেশ কালের  মহাকবি কায়কোবাদের তিক্ত সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতা

১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগে ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি

সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

 

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion