সমাজ পুনর্গঠনে প্রয়ােজনীয় ইসলামী মূল্যবােধ-পর্ব ১

প্রবন্ধটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকার ১৯৬২ সন ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা থেকে সংগৃহীত হয়েছে

লিখেছেনঃ আবুল হাশিম*

মূল্যবোধ

জীবনে ও জীবন-যাপন পর্যায়ে মূল্যবোধের অর্থ বা তাৎপর্য কি? দৈনন্দিন জীবনের লেনদেন উপলক্ষ করে মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চাল-চলনে যে আদর্শ বা উদ্দেশ্য ফুটে ওঠে, তাতেই রয়েছে তার মূল্যবোধের পরিচিতি। শ্ৰেষ্ঠমূল্যবোধ মানব-প্রকৃতির সমধর্মী, অতএব স্বাভাবিক উর্ধ্বতন মানুষের জন্যে সহায়ক; অপরপক্ষে হীন মূল্যবোধ ও ধারণাবলী থেকে মানব-প্রকৃতির স্বাভাবিক স্ফুরণ হয় বাধাপ্রাপ্ত। অজ্ঞতা, বল্গাহীন অহংকার, খামখেয়ালি ও গোঁয়ার্তুমি থেকে এসবের উদ্ভব, আবার এসব থেকেই সূত্রপাত হয় ‘যুলম’ বা সীমালংঘন-প্রবৃত্তির।

প্রতিটি জীবনদর্শন নিজ নিজ ছাপে মানব-সমাজ গড়ে চলেছে; প্রতিটি দর্শনে অন্তর্নিহিত যে মূল্যবোধ, তা প্রকট হয় তার অনুসারীদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্যে। ইসলাম সম্বন্ধেও এর ব্যতিক্রম কিছু নেই। ইসলামও নিজস্ব মূল্যবোধ দিয়ে তার অনুসারীদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলে, তাদের সত্তা ও সম্ভাবনার সংজ্ঞায়ন করে। চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখলে অনায়াস-দৃষ্টিতেও এ সত্য ধরা পড়ে যে, বিশ্ব-প্রকৃতি তার বিধৃত বস্তুরাজি নিয়ে নিরুদ্দেশের পথে ভেসে চলছে না; বরং এ গতিশীল মহাবিশ্বে সবই সুনিয়ন্ত্রিত এবং পরস্পর সুসামঞ্জস্য। এ থেকে বোঝা যায় যে, এ গতিশীলতার সংগে রয়েছে কোনো মহান উদ্দেশ্য সাধনের প্রেরণা। বিশ্ব সৃষ্টির এবং সাথে সাথে নিজ সৃষ্টির এই উদ্দেশ্যকে জানাই হলো মূল্যবোধের প্রথম পদক্ষেপ।

জীবনের উদ্দেশ্য

কোন কিছুকে আমরা বলতে পারি, কিংবা তার অস্তিত্ব সমর্থন করতে পারি, যদি তাতে এই সৃষ্টির উদ্দেশ্য সার্থক হয়। মানুষের সম্বন্ধেও একথা সত্য আল-কুরআনের মতে, প্রকৃতির বিবর্তনক্ৰমে ধরাপৃষ্ঠে মানুষের আবির্ভাব অহেতুক বা আকস্মিক কোন ব্যাপার নয়। মানব-সৃষ্টি একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যমূলক কর্ম। যে জীব পরস্পরের রক্তপাত করবে এবং ধরাপৃষ্ঠে শত রকম অন্যায়াচরণ করবে, তাকে কেন সৃষ্টি করা- এ নিয়ে ফিরিশতারা বিস্ময় বোধ করেছিলেন। আল কুরআনে রয়েছেঃ

و اذ قال ربك للملائكة ائى جاعل فى الأرض خليفة –

‘‘তোমার রব ফিরিশতাদের বললেন, ‘‘আমি পৃথিবীতে আমার খলীফা প্রেরণ করছি।’’ (২ঃ৩০) এই খলীফা সম্পৰ্কীয় ধারণাই ইসলামের  সৰ্বশ্ৰেষ্ঠ আধ্যাত্মিক মূল্যমান।এটাই সর্বপ্রকার ইসলামী মূল্যবোধের উৎস এবং ইসলামী নীতি-অনুসারী মানব-অস্তিত্বের চারিত্রিক রূপের চাবিকাঠি।

আল্লাহর গুণাবলী

কুরআনীয় আরাধ্যের ‘ইসমে জাত’ বা ব্যক্তিক (personal) নাম হলো ‘আল্লাহ্’।বিশ্ব-প্রকৃতি এবং তাতে যা কিছু রয়েছে, সবই সসীম, কিন্তু আল্লাহ অসীম।আল্লাহর এ অসীমত্ব স্থান-কাল সূত্রে নয়; তিনি অসীম তাঁর অসীম সম্ভাবনায়; তিনি ইচ্ছামত নিজের জন্যে যে কোনো গুণ সৃষ্টি করতে পারেন।সসীম জীব কখনো অসীমের কল্পনা বা ধারণা করতে পারে না। আল-কুরআনে রয়েছেঃ “তুমি কখনো আমাকে দেখতে পাবে না”।

আবুল হাশিম (জানুয়ারি ২৭, ১৯০৫ - অক্টোবর ৫, ১৯৭৪)
আবুল হাশিম (জানুয়ারি ২৭, ১৯০৫ – অক্টোবর ৫, ১৯৭৪)

আল্লাহ্ কখনো নিজের ব্যক্তিক রূপ মানুষের কাছে প্রতিভাত করেন না; কিন্তু সৃষ্টিতে পরিব্যাপ্ত তাঁর এমন কতকগুলি গুণের মাধ্যমে তিনি নিজেকে মানুষের জ্ঞান-গোচর করেন, যেগুলো বিশ্ব-প্রকৃতির সৃষ্টি, পালন ও বিবর্তনের প্রয়োজনে আসে। সৃষ্টিতেই আল্লাহর অস্তিত্বের নিদর্শন বিরাজমান।এ প্রসংগে আমি আল-কুরআনের রূপ-সুষমার অতুলনীয় এবং চিন্তাশীল মানুষের মনে স্বর্গীয় অনুভূতি সৃষ্টিকারী কাব্যিক বৰ্ণনাপূর্ণ আয়াতাংশের উদ্ধৃতি দেয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَاخْتِلاَفِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِي تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنزَلَ اللّهُ مِنَ السَّمَاء مِن مَّاء فَأَحْيَا بِهِ الأرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فِيهَا مِن كُلِّ دَآبَّةٍ وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخِّرِ بَيْنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ لآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ

“দেখ, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তের মধ্যে, মানবের  লাভ-লভের জন্যে অর্ণবপোতাবলীর সমুদ্রাভিসারে, আসমান হতে আল্লাহ্ যে বারি বর্ষণ করেন ও তাদ্বারা তিনি মৃত মৃত্তিকাতে যে প্রাণের সঞ্চার করেন, তার মধ্যে; ভূ-পৃষ্ঠে পরিব্যাপ্ত তাঁর সৃষ্ট জীবজন্তুদের মধ্যে অনুগত  এবং বায়ুপ্রবাহের গতি পরিবর্তনে- যা মেঘমালাকে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে অনুগত ভূত্যের ন্যায় টেনে নিয়ে  বেড়ায়-নিশ্চয়ই জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।’’(২ঃ১৬৪)

ভাবুক মন চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেই আল্লাহ্‌র গুণাবলী এবং প্রকৃতিতে তাঁর ইচ্ছার অভিব্যক্তি দেখতে পায়।এ যে শুধু ফুলে-ফলে বা বৃক্ষশাখায় নিবদ্ধ, তা নয়, মানুষের জীবনে, কার্যে, জাতিসমূহের আবির্ভাবে, উত্থান-পতনেও তা সমভাবে প্রতিভাত।আল-কুরআনে আল্লাহ্‌র নিরানব্বইটি গুণবাচক নাম বা পরিচিতি রয়েছে।

এই সব গুণ তাঁর সৃষ্টিতে প্রতিফলিত এবং মানুষের মধ্যে যখন এই সব প্রতিফলিত হয়,তখন সে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হয়।এ গুণাবলীর প্রত্যেকটি এক একটি মূল্যমান স্বরূপ-যা অবলম্বন করে মানুষের নিয়তি গড়ে ওঠে এবং যার অস্বীকৃতিতে মানুষের সম্ভাবনা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।আল্লাহ মানুষকে শ্রেষ্ঠতম ছাপে ও অপরিসীম সম্ভাবনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন;তিনি তাকে নিজ গুণাবলীতে অভিষিক্ত করেছেন।রাসূল (সা) নির্দেশ দিয়েছেনঃ

“আল্লাহর গুণাবলীতে গুণান্বিত হও।”

আল্লাহর নিরানব্বই গুণের মধ্যে মৌলিক হলো “আর-রব’ এবং অন্যগুলো হলো এর আবশ্যিক পরিপূরক।‘আল-ফাতিহা’ অধ্যায়ের প্রারম্ভিক বাক্যে আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্ট জগতের কাছে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন বিশ্ব-প্রকৃতির ‘রব’ বলে।

আর-রব

আরবী ‘আর-রব’ কথাটির সমার্থক কোন ইংরেজী শব্দ নেই।ইংরেজী Lord শব্দটি এর প্রতিশব্দ হতে পারে না। ‘রব’-এর অন্তর্নিহিত অর্থ রয়েছে বিশ্বজগতের সৃজন, প্রতিপালন এবং বিবর্তনের কর্তৃত্ব। অতএব ‘আর-রব’ হচ্ছেন মহাবিশ্বের একক স্রষ্টা, পালক ও বিবর্তক। মানুষও এক অর্থে স্রষ্টা বটে; কিন্তু যেখানে ‘কিছুনা’ থেকে কিছু সৃষ্টির প্রশ্ন, সেখানে তার কোনো হাত নেই। সে নিজের জীবনযাপন, আত্মরক্ষা এবং আত্মোন্নয়নের রীতি নির্ধারণ ও উপায় অবলম্বন করতে পারে মাত্র।

প্রত্যেকটি জীবন-দর্শনই মানুষের আত্মরক্ষা ও আত্মোন্নয়নের সমস্যাদি সমাধান ব্যাপারে নিজ বৈশিষ্ট্য সমাধান দিয়ে থাকে। অবশ্য খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সমস্যা পৃথিবীর সব মানুষের সর্বকালের সাধারণ সমস্যা।বিভিন্ন জাতির বা সম্প্রদায়ের দর্শনে, মতবাদে এবং বিভিন্ন জীবন-যাপন পদ্ধতিতে যে বিরোধ বা সংঘাত দেখা দেয়, তা এসব মৌলিক প্রয়োজনের স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি নিয়ে নয়, বরং এসব মৌলিক সমস্যাদির সমাধানের পন্থা নিয়ে।

অন্যান্য বিশিষ্ট মতবাদের মতো ইসলামেরও এসব জীবন-সমস্যা সমাধানের নিজস্ব রীতি-নীতি রয়েছে। ‘আর-রব’-এর পথ-পদ্ধতি তথা ইসলামী নীতি-বিধান বিশ্ব-প্রকৃতির বিকাশধারায় বিধৃত রয়েছে এবং আল-কুরআন মারফত অবতীর্ণ হয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় একেই বলা হয়েছে ‘রাব্বিয়াত’।

রাব্বিয়াত

‘রাব্বিয়াত’ বা বিশ্ব-প্রকৃতির পালন ও বিবর্তন সংক্রান্ত ঐশী রীতি-নীতির পাঁচটি মৌলিক বৈশিষ্ট রয়েছে-

প্রথমঃ আল্লাহ্‌ কোন প্রতিদানের প্রত্যাশা না করেই তাঁর সৃষ্ট জীবের মঙ্গল সাধন করেন।এমন অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি আছেন,যারা মূখে যা-ই বলুন না কেন, অবচেতন মনে আল্লাহ্‌কে মানবীয় চরিত্রে কল্পনা করে থাকেন।

তারা মনে করেন যে, সৃষ্ট-জীবের কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতার দরুন আল্লাহ তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হয়ে থাকেন। কিন্তু আল-কুরআনে আমরা পাই যে, আল্লাহ সৰ্বপ্রকার অভাবের উর্ধে এবং তিনি মানুষকে যা নির্দেশ দিয়েছেন, তা মানুষেরই শ্ৰেষ্ঠতম কল্যাণের জন্যে। আল্লাহর নির্দেশ মান্য করে মানুষ নিজেরই কল্যাণ সাধন করে এবং অমান্য করলে তার নিজেরই অপকার সাধিত হয়।

দ্বিতীয়ঃ সৃষ্ট জীবের বেঁচে থাকার জন্যে যা প্রয়োজন, প্রকৃতপক্ষে জীবন-ধারনের জন্যে প্রতি মুহুর্তে সে যা কিছুর উপর নির্ভরশীল এবং যা সে নিজের প্রচেষ্টায় করতে অপারগ— আল্লাহ্ তা’আলা তা মুক্ত হস্তে এবং বিনা শর্তে দান করেন।অর্থশাস্ত্রের পরিভাষায় এ সবের নাম ‘প্রকৃতির দান’ (free gifts of Nature)। আলো-হাওয়া-পানির মতো ‘অবতীর্ণ জ্ঞান’ (revealed knowledge)-ও পর্যায়ের একটি দান বিশেষ।

তৃতীয়ঃ আল্লাহ্ সৃষ্ট-জীবের প্রয়োজনাবলী পূর্ব থেকেই পরিজ্ঞাত এবং প্রকৃতপক্ষে জীবের প্রয়োজনে আসবার আগে থেকেই তিনি এসব বস্তু সরবরাহ করেন।সন্তান জন্মের পূর্ব থেকেই প্রসূতির স্তন্যে তার আহার্য সঞ্চিত হয়।

চতুর্থঃ আল্লাহর এসব স্বতঃপ্রবৃত্ত দান সার্বজনীন।এ ক্ষেত্রে আল্লাহ ভাল এবং মন্দ, পুণ্যশীল এবং পাপী, বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসীর মধ্যে কোনো তারতম্য করেন না।

রাবিয়াত-এর এই চারিটি বৈশিষ্ট্য অন্তর্নিহিত রয়েছে আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘আর-রহমান’-এ।

পঞ্চমঃ আর-রাহীম হিসেবে আল্লাহ্ ন্যায়বিচার করেন, কিন্তু সে ক্ষেত্রেও তাঁর বিচার হয় করুণানিষিক্ত।যে আল্লাহর দানের যথার্থ সদ্ব্যবহার করবে, সে পুরষ্কৃত হবে, আর যে তা করবে না, সে শান্তি পাবে।পুরস্কারের অর্থ নিজের কল্যাণ এবং শাস্তির অর্থ নিজের ক্ষতি। ‘রাব্বিয়াত’-এর এই নীতি অনুসারে প্রত্যেক ব্যক্তিই তাঁর প্রচেষ্টার ফল লাভ  করেন।সৃষ্ট জগত সম্বন্ধে বলা যায় যে, ‘আর-রব’-এর সৃজনবিধি সম্পূর্ণ নিখুঁত এবং সেমতে প্রত্যেক সৃষ্ট জীবের রয়েছে তার সার্থকতম নিয়তিতে পৌঁছাবার সম্ভাবনা। ‘রাব্বিয়াত’ বা সৃজন,পালন ও বিবর্তনের ঐশী নীতিই হলো ‘খিলাফাত’-এর মূল কথা।

খিলাফত

কেউ কেউ মনে করেন যে, মানুষ ‘খলীফাতুল্লাহ’ বা আল্লাহ্‌র প্রতিভূ।‘খিলাফত’ সম্বন্ধে এই ভুল ধারণা জন্মলাভ করেছে আল-কুরআনের নিন্মোক্ত বাক্যের নির্জলা অপব্যাখ্যা থেকেঃ

و اذ قال ربك للملائكة ائى جاعل فى الأرض خليفة

‘‘তোমার ‘রব’ তাঁর ফিরিশতাদের বললেন,আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিভূ(খলীফা)প্রেরণ করছি।’’ (২ঃ৩০)

এঁরা আল্লাহর একটি ‘ইসম-ই-সিফত’ বা গুণবাচক নামকে তাঁর  ‘ইসম-ই-জাত’ বা ব্যক্তিবাচক নামের সাথে সমাৰ্থক বলে মনে করেন।মানুষ ‘আল্লাহ’র প্রতিভূ নয়;সে হলো আল্লাহ্‌র ‘সিফাত’ বা ‘রাব্বিয়াত’-সংক্রান্ত গুণাবলীর প্রতিভূ বা প্রতিনিধি।‘‘তোমাদের প্রভু বললেন, আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিভু প্রেরণ করছি।’’-এ বাক্যে আল্লাহ্‌র নিজের ব্যক্তিবাচক নামের পরিবর্তে গুনবাচক নাম ‘আর-রব’ ব্যবহারের এটাই তাৎপর্য।

অর্থাৎ আল্লাহ্‌ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ‘রাব্বিয়াত’-এর প্রতিভূ করে এবং এই ‘রাব্বিয়াতের’নীতি অনুযায়ী বিশ্বস্ততার সাথে নিজের ও চারপাশের সৃষ্ট জীবের লালন-পালনের দায়িত্ব দিয়ে।এই মহান কর্তব্যের যথাযথ সম্পদনাই হলো সত্যিকারের ‘ইবাদত’বা আল্লাহ্‌র দাসত্ব।এই-ই ‘ইসলাম’-এর প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য-যাকে বলা হয়েছে আল্লাহ্‌র ইচ্ছার প্রতি বিনাশর্তে ও দ্বিধাহীন আত্মসমর্পণ।

ব্যক্তিগত জীবনেই হোক বা জাতীয় জীবনেই হোক, মানুষের মহত্ত্ব নির্ভর করে তার ব্যবহারের উপর।তাই খিলাফতের এ নীতির সাথে যার ব্যবহারিক জীবন সুসামঞ্জস্য,সে-ই মহৎ।অন্যপক্ষে,শ্রেষ্ঠতম অবয়ব ও সীমাহীন সম্ভাবনার অধিকারী মানুষ যদি অন্যের প্রতি কর্তব্যের চিন্তা বিসর্জন দিয়ে কেবল আত্মপূজায় বিভোর থাকে, আল-কুরআনের ভাষায় সে তখন হয়ে দাঁড়ায় আসফালুস্-সাফেলীন’ বা নিকৃষ্টের নিকৃষ্টতম। জাতির উত্থান-পতনের রহস্যও এতেই প্রচ্ছন্ন।‘আর-রব’-এর ন্যায়-বিচারের এই অমোঘ নীতির উল্লেখ করে আল-কুরআনে বলা হয়েছেঃ “আমি পৃথিবীতে তাদের পর তোমাদেরকে আমার প্রতিভূ করে পাঠিয়েছি-দেখতে যে তোমরা কিরূপ ব্যবহার করো।”

হক্কুল ইবাদ

‘রাব্বিয়াত’-এর ‘খলীফা’ হিসেবে মানুষের কর্তব্য ও দায়িত্ব দ্বিবিধ।তা হলোঃ নিজের প্রতি কর্তব্য ও অপরের প্রতি কৰ্তব্য। সাধারণ ভাষায় প্রথমটিকে বলা হয় হক্কুল্লাহ বা আল্লাহ্‌র প্রাপ্য (হক্ক) এবং দ্বিতীয়টিকে বলা হয় ‘হক্কুল ইবাদ’ বা আল্লাহ্‌র দাসদের প্রাপ্য।‘হক্কুল্লাহ’ আসলে হলো ‘হক্কুন-নফসের’ অর্থাৎ নিজের জন্যে প্রাপ্য; কেননা আল্লাহ্‌ সকল অভাব-অনটনের উর্ধ্বে এবং তাঁর নিজ উপকারের জন্যে তিনি সৃষ্ট জীবের উপর নির্ভরশীল নন।বিশ্বাসী বান্দা ‘সালাত’-এ তাঁর সামনে ভূলন্ঠিত হয়ে বা রমজানের উপবাসব্রত পালন করে তাঁর কোনো উপকার সাধন করেনা,নিজেরই কল্যাণ হাসিল করে।

আল্লাহ্‌র ‘হক্ক’ (হক্কুল্লাহ) সম্পর্কীয় প্রচলিত ধারণাও স্রষ্টার মানবীয়তা আরোপমূলক আরেকটি ধারণা এবং সেহেতু ইসলামের শিক্ষার বিকৃতি মাত্র।মানুষের এমন কোনো কাজ করবার অধিকার নেই,যা তার নিজের বা অপরের পক্ষে ক্ষতিকর।নিজের, নিজ পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর মঙ্গল সাধন প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।

বিশ্বস্ততার সাথে এ কর্তব্য সম্পাদন কোনো দাক্ষিণ্যমূলক কাজ নয়, বরং দৈনন্দিন দায়িত্বের ব্যাপার-যা পালন না করা পাপ এবং অপরাধের শামিল।ইসলামে দাক্ষিণ্য বলে কিছু নেই।দাক্ষিণ্য ধনিকের পূজি-বিলাস।ইসলামে ‘হক্কুল ইবাদ’ তথা অপরের প্রতি কর্তব্যের গুরুত্ব অতিরঞ্জনের অতীত।বিশ্বস্ততার সাথে ‘হক্কুল ইবাদ’ পালন ইসলামী সমাজ জীবন-যাপনের অপরিহার্য শর্ত।

এ ক্ষেত্রে ইসলামী নির্দেশ এত দৃঢ় যে, গৃহদ্বারে একটি কুকুরকে উপবাসী রেখেও পূর্ণ আহার গ্রহণ মুসলিমের জন্যে নাজায়েয।নিজের সম্পত্তি শুধু নিজ ভোগ-সুখ বা নিজ পরিবারের আরাম-আয়েশের জন্যে ব্যয়ের অধিকার কোন মুসলমানকে দেওয়া হয়নি।বরং তার প্রতিবেশীদের হক রয়েছে তার সম্পদ থেকে ফায়দা গ্রহণের।আল-কুরআনে বলা হয়েছে যে, যারা ইয়াতীমদের প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন,যারা ক্ষুধার্তকে অন্নদানে বিমুখ এবং যারা প্রতিবেশীর উপকারের প্রতি উদাসীন,সে সকল উপাসনাকারী অভিশপ্ত।আরও বলা হয়েছেঃ

‘‘পুন্যকর্ম পূর্ব বা পশ্চিম দিকে মুখ ফেরানোর মধ্যে নেই, বরং তা রয়েছে আল্লাহ্‌, শেষ বিচারদিন, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাব ও নবীদের উপর বিশ্বাসে এবং আল্লাহ্‌র প্রেমে আত্মিয়-স্বজন,ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত,গৃহহীন ও প্রার্থীজনের সাহায্যার্থে আপন সম্পদ বিতরণে, দাসত্ব মোচনে ব্যয়ে’’। (২ঃ১৭৭)

সার্বভৌমত্ব

খিলাফতের ধারণার স্বাভাবিক অনুসিদ্ধান্ত হলো আল্লাহ্‌ই সার্বভৌম এবং আল্লাহ্‌ই সকল পার্থিব সম্পদের মালিক-এই মত।সার্বভৌম ক্ষমতা এবং সম্পদের মালিকানা কিছুই মানুষের ব্যক্তিগত বা জাতিগত আয়ত্তে নয়।আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর আধিপত্য আল্লাহ্‌র।‘ এ বাক্যের ব্যাখ্যাচ্ছলে বলা যায়-আল্লাহর সার্বভৌমত্বের মানবীয় বুদ্ধিগ্রাহ্য তাৎপর্য হচ্ছেঃসার্বভৌমত্ব বা মানব-নিয়তি গঠনের এবং মানবীয় সম্পর্ক নির্ধারণের নিরংকুশ ক্ষমতা মানুষের করায়ত্ত নয়।লব্ধ ক্ষমতাকে এমনভাবে ব্যবহার করবার অনুমতি সে পায়নি,যা তার নিজের জন্যে,তার জাতির জন্যে বা আল্লাহ্‌র সৃষ্ট জীব-জগতের জন্যে অনিষ্টকর হতে পারে।ইসলামের মতে, লব্ধ ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা জাতীয় অহং-সত্তার পরিতৃপ্ত সাধনের উদ্দেশ্যে অসামাজিক বা মানবতা-বিরোধী কার্যে নিয়োগ করা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শামিল।

জ্ঞানবৃদ্ধ আবূ বকর (রা)খলীফা বা রাব্বিয়াতের প্রতিনিধিরূপে স্বজাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বভার গ্রহণকালে তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলেন যে, তিনি মাত্র ততক্ষণ জনসাধারণের আনুগত্যের অধিকারী,যতক্ষণ তিনি নিজে আল্লাহ্‌ এবং রাসূলের অনুগত থাকবেন।অন্য কথায়, ক্ষমতাসীন ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য মাত্র ততক্ষণ বাধ্যতামূলক,যতক্ষণ তিনি নিজে রাব্বিয়াত-এর খলীফা হিসেবে নিজ ক্ষমতাপ্রয়োগ-নীতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন।আল-কুরআনে রয়েছেঃ

  أطيعوا اللّه وأطيعوا الرسول وأولى الأمر منكم

‘‘হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহর অনুগত হও, তাঁর রাসূলের অনুগত হও এবং তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতাসীন, তাদের অনুগত থাক।” (৪ঃ৫৯)

ব্যক্তিগত রাজতন্ত্রের সপক্ষে বাগদাদের খলীফা নামধারী সুলতানদের আমলে ধর্মীয় সমৰ্থন আদায়ের জন্যে কুরআনুল করীমের এই আয়াতের এবং সুপ্ৰসিদ্ধ হাদীসের বাক্য  السلطان ظل الله-“সুলতান আল্লাহর ছায়া স্বরূপ”-এর ইচ্ছাকৃত অপব্যাখ্যা করে ইসলামে রাজপুরুষেরা ঐশী মর্যাদার অধিকারী—এ তত্ত্বও খাড়া করা হয়।

আল-কুরআনের উপরোক্ত বাণী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে “তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতাসীন” কথাটি বোঝাবার বেলায় সাধারণত উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তার আগেকার শর্ত ‘হে বিশ্বাসীগণ!” কথাটি চাপা দেওয়া হয়, যাতে যে কেউ ক্ষমতাসীন হোক না কেন, বিনা শর্তে তাকেই মানতে হবে-এ মনোভাব জন্মায়।

‘সুলতান আল্লাহর ছায়া’-কথাটি এই অর্থে সত্য যে, কোনো বস্তুর ছায়া যেমন তার সদৃশ হতে বাধ্য, তেমনই সুলতানকেও আল্লাহর রাব্বিয়াত-এর বিশ্বস্ত অনুসারী হতে হবে। ইতিহাস পাঠকের কাছে এ সত্য অজানা নয় যে, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ইসলাম ধর্মের থোড়াই তোয়াক্কা করতেন এবং প্রায় সব সময়ই সুরা ও অহিফেনের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন। তবুও তাঁকে ‘যিল্লুল্লাহ’ বা আল্লাহর ছায়া বলে সম্বোধন করা হতো।

উপরোক্ত বাক্যের এর চেয়ে অধিক হাস্যকর অপব্যাখ্যা আর কি হতে পারে? আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বিশ্বাস তথা মানুষের সার্বভৌমত্বের অস্বীকৃতিই হলো ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের প্রথম সোপান।এই ‘আল্লাহ্‌ সার্বভৌমত্ব’মতবাদ থেকে স্বভাবতঃই দু’টি সিদ্ধান্তের উৎপত্তি হয়।একটি হলো আইনের সম্মুখে সকলের সমমর্যাদা বা আইনের শাসন; অন্যটি আইন প্রণয়ন ব্যাপারে মানুষের সীমিত অধিকারের নীতি।

[উৎসঃ  সমাজ বিজ্ঞান ও ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০১, পৃঃ১৭৭-১৮৩]

আবুল হাশিম ভারত উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত বাঙালি রাজনীতিবিদ ও ইসলামি চিন্তাবিদ।বিভাগপূর্ব সময়ে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।বাংলাদেশের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের পিতা।

শেষ পর্বঃ পর্ব ২ 

Facebook Comments