সমাজ পুনর্গঠনে প্রয়ােজনীয় ইসলামী মূল্যবােধ-শেষ পর্ব

পর্ব ১ঃ রাব্বিয়াত ও খিলাফতের ধারণা 

লিখেছেনঃ আবুল হাশিম*

আইনের শাসন

গ্রীক ও রোমান জাতি মানব সমাজে আইনের প্রবর্তন করে।কিন্তু ইসলাম শুধু আইনই প্রবর্তন করেনি, আইনের শাসনও প্রবর্তন করেছে।প্রাকৃতিক আইন কোনো ব্যক্তির বিশেষ মর্যাদা মানে না।আগুন দহন করে;আগুনে হাত দিলে একজন দীন-দরিদ্রের হাত যেমন পূড়বে;একজন রাজ-পুরুষের হাতও তেমনই পূড়বে।

ইসলামের মতে, কোন অপরাধী ব্যক্তিই রাষ্ট্রের মর্যাদা বা জনস্বার্থের অজুহাতে আইনের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে না। কথিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঘোষণা করেছিলেন যে, চৌর্য-অপরাধে ধরা পড়লে তিনি তাঁর প্রিয় নন্দিনী ফাতিমার হাত কাটার হুকুম দিতেও দ্বিধাবোধ করবেন না। খিলাফত-এর সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগের জওয়াব দেবার জন্যে মহান উমর (রা) এবং মহানুভব আলী (রা)-কেও বিচারকের এজলাসে হাযির হতে হয়েছিল। আইনের শাসন-নীতি মুসলিম সমাজে এত অধিক দৃঢ়মূল হয়েছিল যে, রাজতন্ত্রের যুগেও বাগদাদের উদ্ধত আব্বাসীয় সুলতান আল-মানসূরকে সামান্য একজন উষ্ট্রচালকের নালিশের জওয়াব দেবার তাঁর নিজেরই প্রতিষ্ঠিত বিচারালয়ে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল।আইনের শাসনের এ আদর্শ ইসলামী বিচার-ব্যবস্থার ভিত্তিমূল।

আইন প্ৰণয়ন 

ইসলামে মানুষের জৈবিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সত্তা ও সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে তার আইন প্রণয়ন-ক্ষমতাকে ‘খিলাফত’-ধারণার দ্বারা সীমিত করা হয়েছে।রাব্বিয়াত-এর প্রতিভূ হিসেবে মানুষকে সৃজনী-প্রতিভার অধিকারী করা হয়েছে। মানুষ সৃষ্টি করে; কিন্তু সে ‘কিছু না’ থেকে ‘কিছু’ সৃষ্টি করতে পারে না। সে পূর্বাবস্থিত উপাদানসমূহের সাহায্যে নতুন নতুন আকার ও প্রকারের দ্রব্য বা বস্তু উৎপাদন করে।

আবুল হাশিম (জানুয়ারি ২৭, ১৯০৫ - অক্টোবর ৫, ১৯৭৪)
আবুল হাশিম (জানুয়ারি ২৭, ১৯০৫ – অক্টোবর ৫, ১৯৭৪)

পক্ষী বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় জংলী মোরগজাতি থেকেই পৃথিবীর সর্ব প্রকার মোরগের উৎপত্তি ঘটেছে। মানুষ কৃত্রিম পন্থায় খাদ্য, প্ৰজনন ও পালনবিধি নিয়ন্ত্রণ করে অর্পিংটন জাতীয় বিলাতী মোরগ উৎপাদন করেছে। কিন্তু মানুষের চোখে যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, এই সুদৃশ্য মোরগটি আদতে একটি অতি দুৰ্ভাগ্য জীব। অনবরত পরিচর্যা ছাড়া এ একদিনও বেঁচে থাকতে পারে না। অথচ জংলী মোরগ-মুরগী পক্ষী-বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি বা পরিচর্যা ছাড়াই যুগ-যুগান্তর ধরে নিজ নিজ আহার্য সংগ্ৰহ করছে, শক্রর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করছে এবং বংশ রক্ষা করে চলেছে।

মানুষ আজ যে শুধু বিশেষ বিশেষ প্রকারের পক্ষী, কুকুর ও ঘোড়া উৎপাদন করে ক্ষান্ত হয়েছে, তা নয়, আপন ঔদ্ধত্যে সে বিশেষ ধরনের মানুষও তৈরি করে চলেছে। নীটশের দর্শন হিটলার-মুসোলিনীরূপ ফ্যাসিষ্ট মানবের জন্মদান করেছিল; কার্ল মার্কস-এর দর্শন রুশীয় ও চৈনিক লাল মানব-গোষ্ঠী তৈরি করেছে। এ ধরনের মানবীয় প্রচেষ্টার ফলাফল আজ সর্বজনবিদিত।

রাস্তার ডান পাশ বা বাঁ পাশ দিয়ে চলার নির্দেশ সম্বলিত আইন প্রণয়ন করাতে বড় একটা আসে যায় না; কিন্তু মানুষের জৈবিক-নৈতিক-আধ্যত্মিক সত্তার উপর ক্রিয়াশীল কানুনাদি প্রণয়নের বেলায় একবারে ঐশী নির্দেশ ও বিচক্ষণ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অধিকারী হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এ সকল ক্ষেত্রে আইন-পরিষদে সদস্যদের নাক-গোনা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন-প্রণয়নের ফল মারাত্মক হতে বাধ্য। আপন অজ্ঞতার জ্ঞানই হলো সত্যিকার জ্ঞান।

বিজ্ঞানের সাফল্য সম্পর্কিত ফাঁকা গৌরবের মোকাবেলায় নিউটনের সুপ্রসিদ্ধ বানীটি আজো উদ্ধৃত করে বলা চলে যে, ‘জ্ঞান সমুদ্র তটের উপলখণ্ড কুড়িয়ে চলেছি; জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার আজও আমাদের সামনে অনাবিকৃত রয়েছে।”

রুশ বিজ্ঞানীরা সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন যে, অগম্যাগমন (incest)-বিরোধী মনোভাব বুর্জোয়া ভাববিলাস ছাড়া আর কিছু নয়;আর সেমতে রুশীয় আইন মাতা-পুত্রে বিবাহ পর্যন্ত বৈধ ঘোষণা করেছিল। স্বল্পজ্ঞান ভয়ংকরী। দু’দশকের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তাদের আবার সে আইন নাকচ করতে হয়েছে। এখন রুশীয় আইনের এ ক্ষেত্রে আটটি ধাপে নিষেধাজ্ঞা পুর্নবহাল করা হয়েছে।

ইসলামে নৈতিকতা ও কানুন অতি নিকট-সংবদ্ধ। কোনো কাজ যদি কর্তার নিজের জন্যে বা অপরের জন্যে ক্ষতিকর হয়, তবে তা নৈতিকতা-বিরোধী; আইন-প্ৰণয়ন ক্ষেত্রেও এ নীতি সর্বাগ্রে অনুসরণীয়।

সম্পদের মালিকানা

‘মালিকানা’ একটি আইন-বিষয়ক শব্দ।এর অর্থ হলো নিজের বিষয়-সম্পত্তি ভোগ বা বিলি-ব্যবস্থা করবার অবাধ অধিকার। কুরআনে বলা হয়েছেঃ

له ما فى السماوات وما فى الأرض – ‘আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে সবই আল্লাহর’’।

এতেই ব্যক্তিগত বা জাতিগতভাবে সম্পদের উপর মানুষের মালিকানা অস্বীকার করা হয়েছে।

মানুষ সম্পদের অধিকারী হবে মালিক হিসেবে নয়, বরং নিজের ও পারিপার্শ্বিক সমাজের উপকারার্থে অছি স্বরূপ।মুসলমানকে তার বিষয়-সম্পদ থেকে আহৃত সুখ-সুবিধা ভোগ করবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তার প্রতি আসক্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে।

পাশ্চাত্যের প্রিয় Laissez-faire (let alone) বা অবাধ ব্যক্তিতন্ত্রী মতবাদ নিরঙ্কুশ ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকার করে নিয়েছে এবং যোগ্যতা ও চুক্তির স্বাধীনতার অজুহাতে মালিককে অবাধ অর্জন ও যদৃচ্ছ ব্যয়ের লাগামহীন অধিকার দিয়েছে।এ সত্য উপলব্ধি করতে তেমন কোনো দিব্য জ্ঞানের প্রয়োজন নেই যে, ক্ষমতা ও সম্পদের এই সমাজ ও মানবতা-বিরোধী ব্যবহারই বর্তমান জগতের সর্বপ্রকার দুঃখ-বেদনার উৎসস্থল।

ইসলাম মানব জীবন গঠনে ব্যক্তির ভূমিকা অস্বীকার করে না; কিন্তু সমাজ ও মানবতা-বিরোধী কার্যে স্বাধীনতা ও যোগ্যতার অপব্যবহারকে বাধা দান করতে সদা সচেষ্ট রয়েছে। ইসলামে স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে, যথেচ্ছাচারিতার নয়।এভাবে ইসলাম ব্যক্তির প্রচেষ্টাকে উৎসাহ দান করে; কিন্তু ঠিক ততদূর পর্যন্ত, যতদূর তা সাধারণ কল্যাণের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ

অর্থশাস্ত্রের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের (Individualism) অর্থ হলো ব্যক্তির নিজস্ব মালিকানা।১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার মহা-মন্বন্তরের আমলে দেখা গেল, ধনিকের প্রাসাদ-দুয়ারে ক্ষুধার্ত নর-নারীরা চারিদিকে অসহায় দৃষ্টি বুলাতে বুলাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, অথচ প্রাসাদাভ্যন্তরে সুস্বাদু খাদ্যসম্ভারের চাপে ডাইনিং টেবিল ত্ৰাহি ত্ৰাহি ডাক ছাড়ছে।এ রকম একটি বীভৎস ব্যাপার সম্ভব হলো কি করে? জওয়াব অত্যন্ত সোজা, ব্যক্তিক মালিকানার অবশ্যম্ভাবী ফল।

প্রাসাদবাসীরা মনে করতেন, নিজ নিজ আয়ত্ত বিত্ত অন্যদেরকে বঞ্চিত করে আত্ম-কল্যাণে যদৃচ্ছা ব্যবহারের সর্ব প্রকার অধিকার তাদের রয়েছে। সম্পদের প্রতি এই মনোভাব থেকেই সমাজবাদ (Socialism) জন্মলাভ করেছে।অতএব সমাজবাদ হলো এই ব্যক্তি-মালিকানা-নীতির একটি ঐতিহাসিক অন্বয় (Anti-thesis) মাত্র।

সমাজবাদ

”ইসলামে ‘সমাজবাদ’ বলে কিছু নেই।ইসলামী সমাজবাদ কথাটি একটি আত্ম-বিরোধী উক্তি।ব্যক্তিগত মালিকানা দ্বারা যেমন ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ যদৃচ্ছ ব্যবহারের অধিকার বোঝায়, সমাজবাদ দ্বারাও তেমনি বোঝায় সামাজিক ও জাতীয় সম্পদে সমাজের যদৃচ্ছ অধিকার।এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির বদলে সমাজ একটি ব্যক্তিরূপ নেয় মাত্র। তাছাড়া, বিশ্বের জাতিপুঞ্জের মাঝে প্রত্যেকটি জাতিই এক একটি ব্যক্তি বিশেষ।সে হিসেবে সমাজবাদকে বলা যায় বৃহত্তর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ; এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের যা দোষ-ত্রুটি, তার সব কিছুই এতে শোচনীয়তর রূপে প্রচ্ছন্ন রয়েছে। 

ব্যক্তিস্বতন্ত্র্যবাদের শোষণ ব্যক্তি বা শ্রেণীতেই নিবদ্ধ; কিন্তু শক্তিশালী জাতিদের হাতে সমাজবাদ পৃথিবীর দুর্বলতর জাতিসমূহকে শোষণ ও নিষ্পেষণের চূড়ান্ত নির্মম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।বংগীয় মহাদুর্ভিক্ষে মানুষ হাজারে হাজারে মৃত্যু বরণ করে, ক্ষুধার জ্বালায় পিতা-মাতা সন্তানদের বিক্রি করে দেয়, এক মুঠো অন্নের বিনিময়ে নারী ইজ্জত বিসর্জন দেয়।

অথচ সে সময়েই আমেরিকা ও রাশিয়ায় গমের একটি অতিরিক্ত ফলন হয়। কিন্তু সে অতিরিক্ত ফসল বাজারে এসে শস্য-মূল্যের উর্ধ্বগতি বোধ করবে এবং তাতে শস্যাধিপতিদের উচ্চতর মুনাফার উপর অসুবিধাজনক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে-এই আশংকায় আমেরিকা লক্ষ লক্ষ টন খাদ্যশস্য আটলান্টিকের অতল গভীরে বিসর্জন দেয় এবং রাশিয়া তার জ্বালানী সম্পদ বাঁচাবার অজুহাতে এই অতিরিক্ত খাদ্যশস্য চুলায় জ্বালিয়ে খতম করে দেয়।শুধু বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্তের কথা বাদ দিলেও, আল্লাহ্‌র রাজ্যের পশু-পক্ষী, কীট-পতঙ্গাদি পর্যন্ত সুন্দর ধরণীর এ দান ভোগ করার প্রকৃতিদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

আবার জিজ্ঞাস্যঃকেন এ সম্ভব হলো?এর উত্তরও অত্যন্ত সোজা-সমাজবাদের ইহা স্বাভাবিক পরিণতি।আমেরিকা ও রাশিয়া মনে করেছিল যে,তাদের নিজ নিজ সম্পদ স্বজাতির স্বার্থ রক্ষার্থে যে কোনভাবে ব্যবহার করার অবাধ অধিকার তাঁদের রয়েছে।ইসলাম এ ক্ষেত্রে দু’ধারী তলোয়ারের মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সমাজবাদ দু’য়েরই সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেছে।ইসলামী অর্থনীতির মূল কথা হলো বিশ্বমানবতাবাদ।”

বিশ্বমানবতাবাদ

অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশ্বমানবতাবাদ বলতে বোঝায়ঃ (১) আকাশ-রাজিও পৃথিবীর সৰ্ব সম্পদের মালিকানা আল্লাহর হাতে ন্যস্ত, এবং (২)সমগ্ৰ মানব জাতি এক বিশ্বভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। দৈনন্দিন জীবনে এ দুই ধারণাসঞ্জাত মূল্যবোধের কার্যত প্রয়োগের দ্বারা এটাই বোঝায় যে, আল্লাহর প্রত্যেকটি সৃষ্ট-জীবের প্রকৃতিদত্ত অধিকার রয়েছে ধরণীমাতার বুক থেকে আহার্য ও পানীয়ের সংস্থান করে নেয়ার।আল-কুরআনে রয়েছে;

والأرض وضعها للأئام . فيها فاكهة والنخل ذات الأكمام .  وَالْحَبُّ ذو العصف والريحان فبأى ألاء ربكما تكذبان .

‘‘এবং তিনিই তাঁর সমস্ত সৃষ্ট জীবের জন্যে পৃথিবীকে বিছিয়ে দিয়েছেন; তাতে রয়েছে ফলসম্ভার, বোঁটায় বোঁটায়  বেটায় সুকৌশলে ধূত খেজুর, শীষভর্তি সুঘ্ৰাণ শস্যাদি; তোমাদের রবের কোন বদ্যান্যতাকে তোমরা অস্বীকার করবে’’ (৫৫ঃ১০-১৩)

অতএব, গুটিকতক সৌভাগ্যবান ব্যক্তির ভোগের জন্যে সমাজ ও মানবতা-বিরোধী পন্থায় ব্যবহার করাতো দূরের কথা, আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্ট জীবকে বঞ্চিত করে কেবল মানুষের একক ভোগের জন্যেও এই ধরনীকে সৃষ্টি করা হয়নি। প্রত্যেকটি প্রাণীর জীবন ধারনের জন্যে একটি পরিমিত স্থানের প্রয়োজন এবং একে বলা যেতে পারে “স্থান-মান’ (Space-ratio) । মানুষের বেলায় এই স্থান-মান সভ্যতার অগ্রগতির সংগে সংগে সংকুচিত হয়ে চলেছে। আদিম পৃথিবীর গুহা-মানব বা মুক্ত মানবের জন্যে প্রকৃতি থেকে নিজ খাদ্য আহরণের প্রয়োজনে হয়ত দশ বর্গমাইল এলাকার প্রয়োজন হতো, আর আজ বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সভ্য মানুষের জন্যে দশ বর্গগজই যথেষ্ট।

যা হোক, সময় ও সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই একটি নির্দিষ্ট ’স্থান-মান’  থাকে।জনসংখ্যা স্থান-মানকে অতিক্রম করে গেলে সংশ্লিষ্ট ভূমির পক্ষে তাদের খাদ্য পরিবেশন সম্ভব হয় না এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে সে প্রত্যাখ্যান করে। এই অতিরিক্ত জন বা জীবসংখ্যা যদি অন্য কোথাও গিয়ে দাঁড়াবার মতো স্থান ও অবস্থার সুযোগ পায়, তবে তারা বেঁচে যায়; আর তা না হলে তাদের ধ্বংস অনিবাৰ্য। ধ্বংসের প্রকার ভেদ সম্বন্ধে বলা যায়, উদ্ধৃত্ত জনসংখ্যার জন্মভূমি যদি জার্মানীর মতো কোন শক্তিশালী দেশ হয়, তবে তারা যুদ্ধ-যজ্ঞে ধ্বংস হয়, আর যদি তা ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের বাংলাদেশের মতো দুর্বল ও অনগ্রসর হয়, তবে তারা শিকার হয় মন্বন্তর ও মহামারীর।প্রকৃতির অর্থশাস্ত্রের এটাই অমোঘ সূত্র।

যতদিন পৃথিবীতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সমাজবাদের অর্থনীতির পরিবর্তে ইসলামী বিশ্বমানবতাবাদের অর্থনীতি কায়েম না হবে, ততদিন যুদ্ধ-বিগ্ৰহ কিছুতেই বন্ধ হবে না। মানুষের সমাজে স্থায়ী শান্তি, সমৃদ্ধি ও প্রগতির সিলসিলাহ্ প্রতিষ্ঠিত করতে হলে পৃথিবীর সব দেশকে সকলের জন্যে উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং পৃথিবীর যে কোন অংশে যে কারুর জন্যে মেহনতের বদলে রুটি-রুজী সংগ্রহের অধিকারের নীতিকে আইনত স্বীকৃতি দিতে হবে।

বিজ্ঞান মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে স্থান ও কালের ব্যবধানকে প্রায় জয় করেছে। ফলে এই পৃথিবীর জন-সমুদ্রের মধ্যে কোনো জাতি আজ আর নিজেকে একটি আলাদা দ্বীপ বলে কল্পনা করতে পারে না। পৃথিবীর এক অংশে আগুন জ্বললে অন্য অংশ নিরুদ্বেগে বাঁশি বাজিয়ে কাল ক্ষেপণ করবে, তা আর সম্ভব নয়। এই আধুনিক সুউন্নত বৈজ্ঞানিক যুগে মানুষকে অবশ্যই একই তরণীর যাত্রীর মতো এক সাথেই হয় ভাসতে নয় ডুবতে হবে।

যুদ্ধোত্তর কালের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদেরকে শিখিয়েছে যে, সাংসারিক জীবনে যেমন, আন্তর্জাতিক জীবনেরও তেমনি আইনের শাসনকে সকলের জন্যে স্বাভাবিক বিধান বলে স্বীকার করে নিতে হবে এবং অন্যত্র দারিদ্র্য বিরাজমান থাকা অবস্থায় ভোগের অধিকার কোন জাতির নেই। এই-ই বিশ্বমানবতাবাদ।আমাদের শতাব্দীর গৌরব-মুকুট সেই জাতির বা জাতিজোটের শিরে শোভা পাবে, যারা ইসলামের এই বিশ্বমানবতাবাদ ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তা কার্যকরী করার জন্যে আন্তরিক ও আত্যন্তিক প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করবে।

 সাম্য

ইসলামের মৌলিক সামাজিক মূল্যবোধ মানুষে মানুষে সাম্যের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।ইসলামের বিচারে মানুষের সামাজিক মর্যাদা  তার নিজ অর্জিত উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য ক্ষমতা বা সম্পদের উপর নির্ভর করেনা, তার নিজ চারিত্রিক গুণ ও সমাজের উপকারার্থে তার অবদানের উপর নির্ভর করে। ইসলামের মতে, একজন কুশলী ও চরিত্রবান মুচির স্থান একজন অযোগ্য ও চরিত্রহীন সুলতানের উপরে।আল-কুরআনে বলা হয়েছেঃ

ان اکر مکم عند الله اتاقکم 

“নিশ্চয়ই আল্লাহর সামনে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যিনি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ধর্মপরায়ণ।” ( ৪৯ঃ ১৩)

সাম্য কথার দ্বারা অবশ্য কর্মক্ষমতার সমতা বোঝায় না, বোঝায় সুযোগের সমতা। তানসেন বা বিথোফেন-এর প্রতিভা যার অন্তরে প্রচ্ছন্ন, তাঁকে নিজ ক্ষেত্রে সুযোগ দিলেই তিনি বিশ্বব্যাপী অমরত্ব লাভ করতে পারেন ; কিন্তু তাঁকে কোন ইস্পাত কারখানায় কাস্তে-হাতুড়ি তৈরির কাজ করতে বাধ্য করলে, আর কয়জন মিস্ত্রির মতো তিনিও তা তৈরি করতে পারবেন বটে; কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে আবর্জনার সাথেই তাঁর স্থান হবে।

এই দিক থেকে বিচার করলে পুরুষ ও নারীর সমান আসন।সৃষ্টি-ব্যবস্থায় পুরুষ ও নারীর কর্তব্য-কাৰ্য এক নয়।তাদের দেহ-মন ও হৃদয় সৃষ্টি করা হয়েছে নিজ নিজ কর্তব্যের উপযুক্ত করে।কোনো পুরুষ নারীর কর্তব্য পছন্দ করে নিলে বা কোনো নারী পুরুষের কর্মক্ষেত্রে অনধিকার প্ৰবেশ করলে তাতে দু’জনেরই বিধি-নির্দিষ্ট স্বাভাবিক সীমালংঘন করা হবে। দু’জনকে  তখন নামতে হবে নিজ প্রকৃতির সাথে দ্বন্দ্বে এবং তাতে দু’জনেরই হবে চরম অধঃগতি।

সংস্কৃতি

ললিত-কলা ও সাহিত্য বলতেই সংস্কৃতি বোঝায় না। এসব হলো সংস্কৃতির বাহন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমে উপনিষদের দর্শন প্রচার করেছেন।অন্যপক্ষে বাংলার সাম্যবাদীরা সেই একই সাহিত্যের মাধ্যমে কমিউনিজম প্রচার করেছেন।প্রখ্যাত ভারতীয় নৃত্যশিল্পী উদয়শংকর নৃত্যের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির রূপ দিয়েছেন, আবার পূর্ব বাংলার প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী বুলবুল সেই একই মাধ্যমের সাহায্যে ইরানের সূফীবাদ অভিব্যক্ত করেছেন।

সংস্কৃতি হলো মানুষের চারিত্রিক বৃত্তিসমূহের চর্চা, এ রূপ নেয় তার চালচলন ও পারিপার্শ্বিকতা অবলম্বন করে।তা হলে, ইসলামী সংস্কৃতিতে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকতেই হবে। সংস্কৃতির নামে ইসলাম অশ্লীল গান-বাদ্য ও নৃত্যশিল্প তথা যা কিছুই মানুষের চারিত্রিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তার কিছুই সমৰ্থন করে না।

সামাজিক পুনৰ্গঠন

প্রতিটি আইন-পদ্ধতি কার্যকরীকরণের জন্য প্রয়োজন হয় তার অনুকূল একটা সমাজ-ব্যবস্থা। নৈর্ব্যক্তিক চিন্তার কাছে যতই সুষ্ঠু ও প্রগতিশীল প্রতিভাত হোক না কেন, কোনো কানুন, কোনো প্রথা বা কোনো মূল্যবোধ বিরোধী পরিবেশে সামাজিক জীবন প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না বা তাতে যথার্থ কৃতকার্যতা লাভ করা যায় না।উদাহরণত আধুনিক জগতের শ্রেষ্ঠতম আইন-পদ্ধতি বলে স্বীকৃত বৃটিশ আইনের শাসন সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রয়োগ করা চলে না। অন্য পক্ষে রুশীয় সম্পত্তি-আইনও ধনবাদী ইংল্যান্ডে প্রয়োগ করা অসম্ভব।

ইসলামী ব্যবস্থাবলী সম্পর্কেও একথা সমভাবে খাটে।সমাজের ইসলামীকরণ সম্পন্ন করতে হলে, এখানে সেখানে জোড়াতালি দিয়ে চলবে না, চিন্তা-ভাবনা ও কর্মের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপ্লব আনতে হবে।এ কাজ সাধনে রাষ্ট্রের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।রাষ্ট্রকে সমস্ত শক্তি-সামর্থ ও আয়োজন নিয়ে সুশৃংখল সৈন্যদলের মতো দৃঢ়পদে এ দ্বন্দ্ববহুল পথে এগিয়ে আসতে হবে।

ইসলামের আলোকে ব্যক্তিকে তার রীতি-নীতি সুসংহত করে তুলতে হবে; সমাজকে অনবরত সজাগদৃষ্টি রাখতে হবে তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানাবলীর কার্যক্রমের প্রতি এবং রাষ্ট্রকে তার আদর্শ রূপায়িত করতে হবে বিধি-ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে; আর এভাবেই সৃষ্টি হবে দারুল ইসলাম— ইসলামের অনুকূল পরিবেশ, যেখানে ইসলামী মূল্যমানের উত্তরোত্তর বিকাশ ও উন্নয়ন হবে সহজ, স্বাভাবিক ও স্বচ্ছল-গতি*

অনুবাদঃ কামাল উদ্দিন খান

[উৎসঃ  সমাজ বিজ্ঞান ও ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০১, পৃঃ১৮৩-১৮৯]

আবুল হাশিম ভারত উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত বাঙালি রাজনীতিবিদ ও ইসলামি চিন্তাবিদ।বিভাগপূর্ব সময়ে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।বাংলাদেশের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের পিতা।

Facebook Comments