বাহাত্তরের বাংলাদেশঃ জাতীয় দ্বিধাবিভক্তির খোঁজে-পর্ব ১

লিখেছেনঃ আলতাফ পারভেজ,গবেষক ও সাংবাদিক

সম্প্রতি দেশের জাতীয় সংসদে এবং গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাবলী নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে এবং হচ্ছে। বিভিন্ন গ্ৰন্থ ও দৈনিকের কলামকে কেন্দ্র করে এসব বিতর্ক দেখা দিলেও তার গোড়ায় একদিকে রয়েছে-যুদ্ধ ও যুদ্ধপূর্ব ঘটনাবলী এবং অন্যদিকে রয়েছে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাজনীতি। দু’ পর্যায়ের ঘটনাবলীরই অন্যতম চরিত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে ‘মুজিব বাহিনী’-কে।

1972-1975

একাত্তরের যুদ্ধপূর্ব ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মুজিব বাহিনী কীভাবে চলমান ঘটনাবলীকে প্রভাবিত করে-তা বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় এতদিন অনুপস্থিত ছিল। সাম্প্রতিক বিতর্ক ও পর্যালোচনা এক্ষেত্রে অবশ্যই মূল্যবান অবদান রাখবে। চলতি বিতর্কের পটভূমি বোঝার লক্ষ্যে বর্তমান লেখক মুজিব বাহিনীর পূর্বাপর নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধান করেছেন। বর্তমান লেখাটি লেখকের প্রকাশিতব্য গ্ৰন্থ মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ’-এর একটি অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত রূপ যা থেকে লক্ষ্য করা যাবে যে, ১৯৭২ পর্যায়ে দেশজুড়ে যুদ্ধকালীন উপদলগুলো কীভাবে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি প্রভাবিত করছিল এবং এর ফলে কীভাবে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ বিপজ্জনকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

আমি ফিরে না এলে তোমরা সিকিম হইয়া যাইতা। -শেখ মুজিবুর রহমান।  ১৯৭৩ সালে সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ ও গিয়াস কামাল চৌধুরীকে ৩২ নম্বর রোডে এক ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়।

“১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে আমি পাঁচ বার ঢাকা শহরে ঢুকেছি। মাঝখানে প্রতিটি এলাকায় একই কথা শুনেছি। সকলেরই এক প্রশ্ন, ‘ভারতীয় বাহিনী কবে আসবে? ইন্দিরা গান্ধী কবে সৈন্য পাঠাবে? ইন্দিরা গান্ধী সৈন্য পাঠাচ্ছে না কেন? তিনি কি আমাদের মেরে ফেলতে চান?…অন্যদিকে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় যে কথাগুলো প্ৰথম শুনলাম তার মর্মার্থ হচ্ছে চরম ভারত বিরোধিতা। কোন কৃতজ্ঞতা নয়, কোন মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়। সর্বত্র শুধু লুটপাটের কাহিনী।”নির্মল সেন, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক  

১৯৭১-এর মার্চের আগে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর রাজনৈতিক সহযোগীরা ‘সোনার বাংলা’ নামক দুটি শব্দের স্বপ্নে বিভোর করে তুলেছিলেন পূরব-পাকিস্তানের মানুষদের। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রায় তিন সপ্তাহ পর মুজিব যখন দশ মাসের অনুপস্থিতি শেষে দেশে ফেরেন তখন তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী এবং ব্যক্তিত্ব ছিল চ্যালেঞ্জের অযোগ্য। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে কীভাবে জাসদ ও সর্বহারা পার্টির মতো নবীন দলগুলো  তাঁর জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠলো তার উত্তর পাওয়া যায় প্রকৃতপক্ষে সেসময়কার সমাজ জীবনের উদীয়মান লক্ষণগুলোতে। যার কয়েকটি শনাক্ত করা যায়। এভাবে :

১। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছিলো তীব্ৰ বেগে। যুদ্ধের সময় চালের মন ছিল চল্লিশ টাকার নিচে। বাহাত্তরের জানুয়ারিতে তা ৫০ টাকায় দাঁড়ায়। পরবর্তী দু’ মাসে তা ৮০ টাকা হয়। সকল পণ্যের ক্ষেত্রে না হলেও কিছু জরুরী সামগ্ৰী স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যোগাড় করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠছিল। তার মধ্যে একটি ছিল শিশুখাদ্য। ন্যায্যমূল্যে ‘বেবিফুডে’র দাবীতে ঢাকায় একাধিক দিন মিছিল হতেও দেখা যায়। এসবের ফলে মানুষ দারুণ দুর্ভোগে পড়ে। অবস্থা সামাল দিতে সরকার দেশীয় উৎপাদিত পণ্য এবং আমদানীকৃত পণ্যের একটি নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘ডিলারশীপ প্ৰদান শুরু করে। প্রক্রিয়াটি এত বেশি দুনীতিগ্রস্ত ছিল যে, এরূপ ২৫ হাজার ডিলারশিপের অর্ধেকের বেশি অব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতারাই নিয়ে নেন এবং পরে তা পেশাদার ব্যবসায়ীদের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করেন।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রগুলো যে জনমতের প্রকাশ ও জনদুর্ভোগের খবর প্রকাশ করে প্রশাসনকে প্রতিকারে উদ্ধৃদ্ধ করবে এবং গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত রাখবে তাও ছিল দুঃসাধ্য। স্বাধীনতার আগে নিউজপ্রিন্ট ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৪০ টাকা, স্বাধীনতার পরপরই তা প্রথম দফায় ২ হাজার ১৫০ টাকায় পৌছে। যা ছিল প্রায় ৯০ ভাগ বৃদ্ধি। ১৯৭৪-এর মার্চে আরেক দফা বাড়িয়ে নিউজপ্রিন্ট টনপ্রতি ৩ হাজার ২০০ টাকায় উন্নীত করা হয়।

২। যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজে সংকট ছিল অফুরন্ত। অনভিজ্ঞ সরকারের ভুলভ্রান্তি হওয়াও অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু জনগণের পক্ষে ধৈর্য ধরা ছিল অসম্ভব। এই দ্বন্দ্বে মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের প্রতিটি ভুল খুব বড় আকারে প্রতিভাত হচ্ছিলো-তেমনি সরকারও সমালোচকদের প্রতি ছিল অসহিষ্ণু ও নির্মম। বিরুদ্ধমতকে দেশদ্রোহিতাও আখ্যায়িত করা হতো।

৩।অস্ত্রের জোরে অনেক অন্যায় দাবী পূরণ হয়ে যাচ্ছিলো। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে নকলের সুযোগ দাবী করে এবং আদায় করে নেয়। ঢাকা ও কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ শতাংশের উপরে। অনেক স্থানে নকলের দাবীতে সশস্ত্ৰ মিছিল বের হয়, যা মূল্যবোধের অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে তোলে।  ঐ সময় এক বিবৃতিতে মাওলানা ভাসানী তাঁর সাপ্তাহিক হককথার ২৫ ফেব্রুয়ারী [১৯৭২] সংখ্যায় মন্তব্য করেছিলেন,

‘এক শ্রেণীর দুষ্কৃতকারী মুজিব বাহিনী বা মুক্তিবাহিনী পরিচয় দিয়া যেসব সমাজবিরোধী কাজ করছে তাতে আগামী ২৫ বছরেও দেশে শান্তি আনা সম্ভব হবে না।’  

৪। দ্রব্যমূল্য বাড়লেও চারিদিকে ভারতীয় পণ্যের অবাধ উপস্থিতি দেখা যায়। প্রথম দিকে দুই দেশ এক চুক্তির মাধ্যমে সীমান্তের ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে বাণিজ্য উন্মুক্ত করে দিলে চোরাচালান ব্যাপকতা পায়। ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ এই চুক্তিটি হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী এম আর সিদ্দিকী এবং ভারতের পক্ষে বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী এল এন মিশ্র এই চুক্তিটি করেন। চুক্তির আওতায় সীমান্তের ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী নির্বাচিত কিছু মানুষকে এক ধরনের ‘পারমিট’ দেওয়া হয়­-যার ভিত্তিতে তারা অবাধে মালামাল আনা নেয়ার অধিকার পায়। এই অদ্ভুত উদ্যোগ বাস্তবে চোরাচালানকে এক সর্বগ্রাসী রূপ দেয়।

প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য চুক্তিটি হলেও বাংলাদেশে তীব্ৰ বিতর্ক ও ক্ষোভ তৈরী হওয়ায় ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ৮ অক্টোবর ঢাকায় এ বিষয়ে এক পর্যালোচনা বৈঠক হয় এবং তারপর উভয় দেশের সরকার চুক্তিটি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। তবে এরপরও চোরাচালান ছিল অবাধ। এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আবদুল মোহাইমেন লিখেছেন,

‘৭১ সালে অনুকূল আবহাওয়ার ফলে মুক্তিযুদ্ধ চলা সত্ত্বেও দেশে প্রচুর ধান হয়েছিল। তখন দেশে চালের দাম ছিল ৩৫-৪০ টাকা মন। উন্মুক্ত সীমান্ত বাণিজ্যের ফলে লাখ লাখ মন ধান ভারতে চলে যাওয়ায় স্বাধীনতার ছয় মাসের মধ্যে চালের মন এক শত টাকায় উঠে। ফলে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্ৰতিক্রিয়া দেখা দেয়।‘  

৫। অন্যদিকে, স্বাধীনতার আগে ভারতের মুদ্রার সাথে পাকিস্তানের মুদ্রার বিনিময় মূল্য প্রায় সমান থাকলেও ১৬ ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশের মুদ্রার মান কমতে থাকে। মাস ছয় পরে এটা ভারতীয় মুদ্রার তুলনায় প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। যুদ্ধের পর এটা কেন কম হবে তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয় নি। দেশের বাজারে ভারতীয় পণ্য কিনতে গেলে অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ বেশি বাংলাদেশী মুদ্রা দিতে হচ্ছিলো তখন। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব বিনিময় হার ভারতীয়দের পক্ষে আরও বেশি অনুকুল ছিল। ফলে কিছুদিন আগেও যারা পাঞ্জাবী বিদ্বেষে ভুগতেন তারা এবার ভারত বিদ্বেষে ভুগতে শুরু করেন।

বিষয়টি আরও গভীরতা পায় বাংলাদেশের প্রথম কিস্তির ৩৫০ কোটি টাকার কারেন্সি নোট মুদ্রণের দায়িত্ব ভারতকে প্রদানের মধ্য দিয়ে। পত্রিকায় এসময় একই নম্বরের একাধিক নোটের ছবি প্ৰকাশিত হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে ভারত অধিক নোট ছাপিয়ে বাজারে ছেড়েছে। ফলে টাকার দাম আরও পড়ে যায় এবং জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে।

৬। শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনকে ঘিরেও এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা তৈরী হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র ভারত এদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠে। শরণার্থীদের মাঝে হিন্দুদের সংখ্যাই ছিল বেশি। তবে কোথাও কোথাও একাত্তরের পূর্বে দেশান্তরীরাও ফিরছিলেন। এক্ষেত্রে বাস্তব সংখ্যার চেয়ে গুজব তৈরী হচ্ছিলো অধিক হারে। এসব হিন্দুরা এসে তাদের বিক্রিত বা পরিত্যক্ত বা দখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তি ফেরত চাইবে এ ভয় মুসলমান সমাজে তীব্ৰতা পায়; যার ছাপ পড়ে গণমাধ্যমেও এবং রাজনৈতিক মেরুকরণেও তা ভূমিকা রাখে। এক পর্যায়ে অবস্থা এমন দাঁড়ালো, খোদ মুজিবকে বিবৃতি দিয়ে বলতে হয়, বাংলাদেশ কেবল একাত্তরে যাওয়া হিন্দুদের গ্রহণ ও পুনর্বাসন করবে।

তবে মুজিবের এই হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও সমাজের একাংশে হিন্দু বৈরিতা নীরবে পাখা মেলছিল। তার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়, যুদ্ধোত্তর প্রথম দুৰ্গা-উৎসবে (১৪-১৭ অক্টোবর) দ্বিতীয় দিনেই প্রতিমা ভাঙচুর হয় খোদ ঢাকায়, যা কখনো অবিভক্ত পাকিস্তানকালেও ঘটে নি।

৭। রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৫ লাখ টাকার অধিক মূল্যের শিল্প-সম্পত্তিগুলো জাতীয়করণের ফলে ব্যক্তি উদ্যোগ নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। ফলে ধারণা তৈরী হয়, ভবিষ্যতে এখানে ভারতীয় পণ্যের একচেটিয়া কারবার শুরু হবে। যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদেরও চরমভাবে নিরুৎসাহিত করে। ভারত বিদ্বেষকে এটা আরও বেগবান করে। টাকার মান কমানো, সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে (যার ঊর্ধ্বসীমা করা হয় ২৫ লাখ টাকা) এ সময় ভারত নির্ভরতার একটি প্রবল প্রবণতা দেখা যায়।

৮। শিল্প পরিমণ্ডলে জাতীয়করণের নামে ‘সমাজতন্ত্র’-এর ধ্বনি উঠলেও গ্রামে সেরকম সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন কর্মসূচি ছিল অনুপস্থিত। সত্তরের নির্বাচনে মুজিব ও আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘গণরায়’-এর বড় এক শক্তি ছিল গ্রামীণ খুদে চাষী সমাজ, যারা আশা করেছিল স্বাধীনতা জমির পুনর্বন্টন বা পুনর্বিন্যাস ঘটাবে। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর সমাজে সরকার সিদ্ধান্ত দেয় যে, পরিবারগুলো এক শত বিঘা পৰ্যন্ত জমি দখলে রাখতে পারবে। উপরন্তু এই ঘোষণায় ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞাও নির্ধারিত ছিল না-ফলে ধনী জোতদাররা নানা কৌশলে সকল জমিই রক্ষা করতে পারলো। এতে ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন চাষী সমাজ বুঝতে পারলো যে, ‘পরিবর্তন’-এর কোন সম্ভাবনা নেই।

৯। ঠিক উপরোক্ত সময়েই চারিদিকে চলছিলো লুণ্ঠন, চোরাকারবারি, কালোবাজারি, মজুদদারি। আবার এমনি এক অবস্থায় সরকারি তরফ থেকে ডাক দেওয়া হচ্ছিলো কৃচ্ছতাসাধনের,যার আওতায় সরকারি-বেসরকারি কর্মচারিদের বেতনের ৩০ ভাগ কেটে নেয়া শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাও এ থেকে বাদ যান নি। কিন্তু চারিদিকের লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় এবং ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের মাঝে সরকারের এই উদ্যেগ শুধুই বাড়াচ্ছিলো।

১০। ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদির কারণে সমাজে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরী হয়।আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তৃত্ব ছিল ন্যূনতম।সাংবাদিক নির্মল সেনের ভাষ্য থেকে দেখা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম বছরই দেশে ৪ হাজার ২০০ ডাকাতি ঘটে।যার মধ্যে কেবল ঢাকাতেই ৬৮৬ টি ডাকাতি সংঘটিত হয়।৯  তবে দৈনিক গণকন্ঠের হিসাবে দেখা যায়, উল্লিখিত এক বছরে ব্যাংক ডাকাতি হয়েছে ৩১টি, গুপ্তহত্যা ১৪৬৭টি, ডাকাতি ২০৩৯টি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ১৭৩৪১টি।১০

বস্তুত এসময় দিনে রাতে অনেক সময়ই গুলি বোমা ইত্যাদির শব্দ শোনা যেত। যারা এসব করছিলো তারা ছিল সশস্ত্র। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধকালে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক থেকে দেড় লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সরকার অবাঞ্ছিত কাজ যেমন বন্ধ করতে পারছিলো না, তেমনি অপবাদের হাত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করতেও ব্যর্থ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা অধিকাংশই ছিল তরুণ। নিজেদের পেশাগত ভবিষ্যত নিয়েই অনেকের মাঝে উদ্বেগ তৈরী হয়। কারণ সরকারের তরফ থেকে এই সশস্ত্ৰ জনশক্তির জন্য যথাযথ কোন পুনর্বাসন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছিলো না। আবার পুলিশকে ব্যবহার করে ডাকাতি, সন্ত্রাস ইত্যাদি দমনেরও সুযোগ ছিল সীমিত। কারণ একদিকে পুলিশের সংখ্যা ছিল অতি অল্প (১৯৭২-৭৩-এ মাত্র ২২-২৩ হাজার] এবং অন্যদিকে, দুষ্কৃতকারীদের ব্যবহৃত অস্ত্ৰ পুলিশের চেয়ে উন্নত। উপরন্তু কোথাও ধরা পড়া মাত্রই প্রথমোক্তরা রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ছাড়া পেয়ে যেত।

১১। রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে আলাপ-আলোচনার সংস্কৃতি একেবারে অবলুপ্ত হয়ে যায়। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য সংঘর্ষের মাধ্যমে ফয়সালার রেওয়াজ শুরু হয়। কেউই বিশ্বাস করতে পারতো না এবং চর্চা করতেও ছিল অনিচ্ছক যে, রাজনৈতিক বিবাদ অনেক ক্ষেত্রেই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসাযোগ্য।

১২।পাকিস্তান ও ভারত প্রত্যাগতদের পুনর্বাসনে যথাযথ কোন উদ্যোগ ছিল না। ভারত প্রত্যাগতদের পরিবার প্রতি ১০০ টাকা বরাদ্দ করা হয়। পরে কমতে কমতে তা ২৫ টাকায় নেমে আসে। পাকিস্তান প্রত্যাগতদের জন্য তাও মেলেনি। অন্যদিকে, সরকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ব্যাপকভিত্তিক রিলিফের উদ্যোগ নিলেও পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল আওয়ামী লীগ নির্ভর এবং দুনীতির কারণে উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়। এর মধ্যদিয়ে সর্বত্র দুর্নামের শিকার হয় আওয়ামী লীগ।

১৩। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুটিকয়েক সন্ত্রাসী ছাত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সংখ্যায় তারা অত্যল্প হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বশংবদ হয়ে পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভয়-ভীতির সংস্কৃতি এতটাই শেকড় গাড়তে শুরু করে যে, পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশের সকল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করে একটি ‘জাতীয় দল’করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সবাইকে তার সদস্য হতে পরোক্ষে চাপ প্রয়োগ শুরু হয়-তখন দেখা গেল, গণতান্ত্রিক আবহের জন্য বিখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র পনেরজন শিক্ষক ঐ একক দলে যোগ দিতে অপারগতার কথা সাহস করে জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচাৰ্য আবুল ফজল ব্যতীত আর সকল উপাচাৰ্যই তাদের কর্মচারি ও শিক্ষকদের জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন।১১

তিনজন উপাচার্য উল্লিখিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও অন্তর্ভুক্ত হন। এরা হলেন ড. আবদুল মতিন চৌধুরী (ঢাকা বিশ্ব.), ড. মাযহারুল ইসলাম (রাজশাহী বিশ্ব.) এবং ড. মোহাম্মদ এনামুল হক (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ব.)। এভাবে পচাত্তরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহসরাসরি মেঠো রাজনীতির অংশীদারহয়ে পড়ে—যা কার্যত শিক্ষার পরিবেশকে দারুণভাবে কলুষিত করে। দেশের চারটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম দফায় নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যদের [ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ আলী আহসান, ড. ইন্নাস আলী প্রমুখ] অধিকাংশই স্বাভাবিকভাবে নিয়োগকাল শেষ করতে পারেন নি। মূলত সরকার দলীয় ছাত্রদের চাপের মুখে এদের অপসারণ করা হয়।

১৪। সর্বশেষ যে রাষ্ট্ৰীয় প্রবণতাটি সমাজের বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়-তা হলো জনসমাজকে তিনভাবে চিহ্নিত করা শুরু হয়। এসময়-মুক্তিযুদ্ধকালে যাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করেছেন, যাঁরা পূর্ববাংলা বা নিজ আবাসস্থলে ছিলেন এবং যাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। এর মাঝে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন বা না নেন- ‘সীমান্ত অতিক্রমকারী মাত্রই প্রশাসনে বিশেষ মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা পাচ্ছিলেন। মেধা বা যোগ্যতার পরিবর্তে ‘সীমান্ত পার হয়ে ফিরে আসা’কেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার দাবী ওঠে এবং সেটাই করা হচ্ছিলো।’১২

অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসকদের সংখ্যাগরিষ্ঠই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকলেও এবং নানানভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করলেও দেশে অবস্থান করার কারণে মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাদের হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছিলো; দেখা হচ্ছিলো সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চোখে-যদিও সংখ্যায় ছিলেন এঁরাই সর্বাধিক। আর তৃতীয় দল পশ্চিম পাকিস্তানে থাকার কারণে রীতিমতো সামাজিক রোষের কবলে পড়েন, অথচ এদের অনেকেই পরিস্থিতির শিকার হয়েই যুদ্ধকালে ভৌগলিকভাবে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছিলেন এবং সর্বতোভাবেই যুদ্ধে স্বজাতীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য কামনা করেছেন। যুদ্ধোত্তর সমাজে এইরূপ সচেতন বিভক্তি ক্ৰমে সামাজিক বিভাজন তৈরী করে।১৩

আর উপরোক্ত সম্মিলিত বাস্তবতারই এক ধরনের সামাজিক প্রতিক্রিয়া থেকে সৃষ্টি হয় ‘সোনার বাংলা’য় বাহাত্তর-তিয়াত্তরের রাজনৈতিক হতাশা এবং ক্ষোভ।

দেশে ফিরে মাত্র কয়েক মাস পরেই শেখ মুজিবুর রহমান বিস্ময়ের সঙ্গে কেবল এটাই আবিষ্কার করেননি যে, চল্লিশ-অনুর্ধ্ব একদল তরুণের ঔদ্ধত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে সশস্ত্ৰ-নিরস্ত্ৰ সকল পরিসরে, বরং তিনি এও দেখতে পান, তাঁর তরফ থেকেই ঐ ঔদ্ধত্যে প্রতিনিয়ত জ্বালানী যোগানো হচ্ছে।

তথ্যসুত্র

১. উপরোক্ত মন্তব্যের পটভূমি সম্পর্কে দেখুন, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন,অনন্যা, ২০০০, ঢাকা, পৃঃ২৮।

২. নির্মল সেন, আমার জবানবন্দী, তরফদার প্রকাশনী, ২০০৬, ঢাকা, পৃ. ৩৮১।

৩. মো. আবদুল মোহাইমেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ, প্রকাশক: লেখক নিজে, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ.২৩

৪. এর একটি অশোভন প্রকাশ দেখা যায় বেসামরিক ভারতীয় প্রশাসক—যারা ঐসময় নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সমঝোতার মধ্যদিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতে এসেছিলেন, তাঁদের প্রতি স্থানীয়দের আচরণে।

৫. মো. আবদুল মোহাইমেন, পূর্বোক্ত, পৃ. ২০।

৬. কার্তিক ঠাকুর,  সংবিধান ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, প্রকাশকাল ও প্রকাশ তারিখ উল্লেখ নেই, পৃ. ৫-৬। কাৰ্তিক ঠাকুর বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিচিত নেতা।

৭. যদিও শেখ মুজিব বলছিলেন যে স্বাধীন বাংলাদেশ হবে ‘এশিয়ার সুইজারল্যান্ড’-এর মতো নিরপেক্ষ চরিত্রের], কিন্তু তাঁর শাসনামলজুড়ে ‘নির্ভরতা’ প্রবণতার নানান মাত্রা লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, আর্থিক ও শিল্প নির্ভরতার চেষ্টা; যার বড় এক প্রকাশ ছিল পাটখাতসংশ্লিষ্ট নীতি-কৌশলে। দ্বিতীয়ত, সামরিক নির্ভরতা; যার বড় প্রকাশ ছিল রক্ষীবাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারতীয় সংশ্লিষ্টতায়। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক নির্ভরতা; এই প্রবণতার প্রকাশ ঘটে আগে থেকেই; স্বাধীনতার পর বেশ কয়েক সপ্তাহ দেশের দায়িত্ব গ্রহণে প্রবাসী সরকারের বিলম্ব এবং এসময় বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনায় ভারতীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে আসার মধ্যদিয়ে। চতুর্থত, ভাবাদর্শিক নির্ভরতা; যার প্রধান এক প্রকাশ হিসেবে দেখা যায় সংবিধান প্রণয়ন ও চূড়ান্তকরণের পূর্বে ড. কামাল হোসেন কর্তৃক ভারত গমন। ভাবাদর্শিক নির্ভরতার আরেক প্রকট ক্ষেত্র ছিল রক্ষীবাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারতীয় সিআরপিএফকে মডেল হিসেবে অনুসরণ ও ভারতীয় Armed Forces (Special Powers) Act-কে বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশে ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন’ প্রণয়ন।

৮. ১৯৭২-এর ২৬ মার্চ মুজিব ঘোষণা দিয়েছিলেন, পরিবারগুলো ১০০ বিঘা জমি রাখার পাশাপাশি যাদের ২৫ বিঘার কম জমি থাকবে তারা খাজনা রেয়াত পাবে। তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশন একে সমাজতন্ত্র অভিমুখীন ‘ভূমি সংস্কার কর্মসূচি’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও তার ফলাফল ছিল শূন্যগর্ভ। কারণ যদি কর্মসূচিটি বাস্তবায়িতও হতো তা হলে সর্বোচ্চ দু লাখ একরের মতো জমি উদ্ধার হতো এবং তা যদি সে সময়কার ৩২ লাখ ভূমিহীনের মাঝে বন্টিত হতো তা হলে প্রতি পরিবারের বরাদ্দ দাঁড়াতো ০.০৭ একর। আর্থিক বিবেচনায় এইরূপ জমি প্রাপ্তির তাৎপর্য হতো অতি নগণ্য। উপরন্তু বলা হচ্ছিলো, এইরূপ উদ্বৃত্ত জমি দিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হবে।কিন্তু দেশজুড়ে বিচ্ছিন্ন আকারে উদ্ধার করা ছোট ছোট জমি খন্ডগুলো কীভাবে সমবায়ের মাধ্যমে আবাদ করা যাবে এমন কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা শেখ মুজিবের ঘোষণায় যেমন ছিল না-তেমনি পরিকল্পনা কমিশনও তা কখনো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে নি।

৯. নির্মল সেন, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই, ঢাকা, তরফদার প্রকাশনী, ২০০৯, পৃ. ৬৬।  সাংবাদিক- রাজনৈতিক নির্মল সেন এই লেখা লিখেছিলেন ১৯৭২-এ দৈনিক বাংলায় । ঐ পত্রিকায় ‘অনিকেত’ নামে তখন নিয়মিত উপসম্পাদকীয় লিখতেন তিনি।  ১৯৭৩-এর ১৬ মার্চ লেখা তাঁর একটি উপ-সম্পাদকীয়ের শিরোনাম ছিল স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। সমকালীন বাস্তবতা ফুটে ওঠার কারণে সর্বত্র সেসময় এই কলামটি আলোড়ন তুলেছিল। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাসের পর অনিকেতের কলামটি বন্ধ হয়ে যায়।

১০. দৈনিক গণকণ্ঠ, ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৩

১১. আহমদ ছফা, ‘মুজিব শাসন: একজন লেখকের অনুভব’, নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ গ্রন্থে সংকলিত, ঢাকা, খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পানি, ২০১১, পৃ. ৫১৭ । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষকরা সেসময় বাকশালে যোগ দেননি তাঁদের মধ্যে ছিলেন আহমদ শরীফ, মমতাজুর রহমান তরফদার,আবদুল লতিফ, হোসনে আরা হক, লতিফা আকন্দ, নূরুল ইসলাম,  আহমেদ কামাল, স্বপন আদনান, মুনতাসীর মামুন প্রমুখ। উল্লিখিত শিক্ষকদের অন্তত একজন বর্তমান লেখককে জানিয়েছেন, যদিও তাঁরা স্ববিবেচনাবোধ থেকেই ‘একক দল’ বাকশালে যোগ দেননি, তবে সেসময়কার প্রভাবশালী পণ্ডিত প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকও গোপনে তাঁদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন ঐ দলে যোগ না দিতে।

১২. এইরূপ মানদণ্ড এমন এক হাস্যকর অবস্থার জন্ম দেয়-যাতে দেখা যায়, সীমান্ত ফেরোনো এক কোটি মানুষকে বাদ দিলে দেশে জনসংখ্যার হিসাবে তথাকথিত ‘দালাল’-এর সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি। উপরোক্ত পরিস্থিতিকে ব্যঙ্গ করেই সেসময় সাংবাদিক এনায়েতুল্লা খান সাপ্তাহিক হলিডেতে নিবন্ধ লিখেন IFebruary 6, 1972] ‘Sixty-Five Million Collaborators.সেসময় এই লেখাটি বিশেষ আলোড়ন তুলেছিল।  

১৩. যুদ্ধোত্তর উক্তরূপ পরিস্থিতির একটি দৃষ্টান্তমূলক বিবরণ দিয়েছেন শিক্ষাবিদ সৈয়দ আলী আহসান। সেই বিবরণ থেকে দেখা যায়, যুদ্ধোত্তর সময়ে দেশে কলকাতাগামীদের ‘দেশপ্রেমিক’ ও কলকাতায় না যাওয়াদের ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের চেয়ে প্রবাসী সরকারের নেতৃবৃন্দের ইন্ধনই ছিল বেশি। আলী আহসান এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দুই পরিষদ সদস্যের কাহিনী তুলে ধরেছেন [আবদুল হাদী তালুকদার ও জহির উদ্দীন- যারা দেশে অবস্থানের কারণে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই নিগ্রহের শিকার হন।দেখুন, আলী আহসান, ‘বঙ্গবন্ধুকেঃযেরকম দেখেছি’ , বার্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ. ৪০-৪৩।

[উৎসঃ আলতাফ পারভেজ, বাহাত্তরের বাংলাদেশঃ জাতীয় দ্বিধাবিভক্তির খোঁজে, নতুন দিগন্ত, ত্রয়োদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর, সমাজ-রুপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র,২০১৪, ঢাকা,  পৃঃ ১২১- ১২৭]

পর্ব ২ঃ ‘মুজিববাদ’ বনাম ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সাথে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা উত্তর পূর্ববঙ্গের ঘটনাবলীকে পাশাপাশি রাখলে দুটো ঐতিহাসিক ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়; এই বিষয়ে জানতে দেখুন;

পূর্ব বাংলার পাকিস্তান প্ৰাপ্তিঃ ‘স্বাধীনতা’র প্রাথমিক উপলব্ধি ও জনগণের প্রতিক্রিয়া –  ড. আহমেদ কামাল

স্বাধীনতা পূর্ব শেখ মুজিব চরিত্রের মূল্যায়নঃ‘বাঘছাল গায়ে ছদ্মবেশী সংগ্ৰামী’- আবদুল গাফফার চৌধুরী

হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা ডা. কালিদাস বৈদ্যের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে কিছু অজানা তথ্য, দেখুন;

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধেঃ অন্তরালের শেখ মুজিব 

জাসদ-সিপিবি-ইত্তেফাকের মূল্যায়নে আগষ্ট ১৯৭৫ হত্যাকান্ড– মহিউদ্দিন আহমদ

‘আমরা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পতন চেয়েছি ও রক্তাক্ত বিরোধিতা করেছি’-জাসদ

জাসদের উত্থান, বেহাত বিপ্লব ও পতনের ইতিহাস–  মহিউদ্দিন আহমদ

স্বাধীনতা উত্তর প্রশাসনের অভ্যন্তরে কি হয়েছিল জানতে দেখুন;

Making a Common Cause: Public Management and BangladeshDr. Kamal Siddiqui

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion