বাহাত্তরের বাংলাদেশঃ জাতীয় দ্বিধাবিভক্তির খোঁজে-পর্ব ২

পর্ব ১ঃ জাতীয় দ্বিধাবিভক্তির সূত্রপাত

লিখেছেনঃ আলতাফ পারভেজ,গবেষক ও সাংবাদিক

‘মুজিববাদ’ বনাম ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’

Mujibbad is the calculas of the power-elite invented to weigh and secure its usurpations on the scale of other people’s martyrdom. -Enayetullah Khan, ‘A Scheme Gone Wild’, Holiday, May 6, 1973, Dhaka.

রাজনৈতিক যুদ্ধে আমাদের পরাজিত করতে পারে এমন শক্তি বাংলাদেশে সহজে জন্মাবে না। কিন্তু আমাদের সমাজনীতি, অর্থনীতি যদি ব্যর্থ হয়ে যায় তা হলে রাজনীতিটাই টিকবে না। — শেখ ফজলুল হক মনি, বাংলার বাণী, ২০ এপ্রিল ১৯৭৩ ৷

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব রাজনীতির মূল জাতীয়তাবাদী ধারার প্রধান দুই চরিত্র শেখ মুজিবুর রহমান ও সিরাজুল আলম খান। একাত্তরের ২৫ মার্চের পূর্বে তাঁরা যা চেয়েছিলেন সেভাবেই সব ঘটনা এগিয়েছে- আর ১৬ ডিসেম্বর ঘটেছে তার শেষ অধ্যায়। কিন্তু তাদের এই ‘অর্জন’-এর মাঝেই কোথায় যেন ভয়ংকর রকম ছন্দহীনতাও বাসা বেধেছিল- কারণ ১৬ ডিসেম্বরের ‘অর্জন’ মোটেই স্বস্তি দিতে পারছিল না তাঁদের। যে কারণে আমরা দেখবো, মাত্র তিন বছরের মধ্যে (১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে) শেখ মুজিব তাঁর ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর কর্মসূচি ঘোষণা করছেন, যা ছিল কাৰ্যত একদলীয় এক শাসন ব্যবস্থা।

অন্যদিকে, সিরাজুল আলম খান শেখ মুজিবুর রহমানের আগেই তার ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এ নামেন ১৯৭২-এ। ‘জাসদ’ গঠনকে তিনি মনে করতেন ১৯৬২ থেকে শুরু করা তাঁর ‘দ্বিতীয় ধারা’র রাজনীতির অনিবাৰ্য পরিণতি। স্বাধীনতা লাভকে দ্বিতীয় ধারার রাজনীতিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসার পরিবেশ ও সুযোগ হিসেবে দেখেন তিনি।১৪

কিন্তু মুজিবুর রহমান ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ এবং তারও আগে সিরাজুল আলম খানের ‘দ্বিতীয় ধারা’র রাজনীতি নিয়ে সমাজে ব্যাপক বিতর্ক ও ভিন্নমত তৈরী হয়-একাত্তরের পূর্ববতী তাঁদের প্রথম পর্যায়ের রাজনীতি নিয়ে যা ছিল অনুপস্থিত।

সিরাজুল আলম খান, জাসদের তাত্ত্বিক গুরু ও বাংলাদেশের রাজনীতির রহস্যমানব হিসেবে খ্যাত

দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর জাসদ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দেশের বামপন্থীদের তরফ থেকে যে-সব অভিযোগ উত্থাপিত হতো তার মধ্যে অন্যতম ছিল মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর কমিউনিস্ট নির্মূলের কাহিনী। এসব কাহিনীর প্রবল ভিত্তি ছিল। অভিযোগ ওঠে, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে,১৫ সাতক্ষীরার তালায় (কাজী জাফরদের গ্রুপের), পাবনার শাহপুরে (টিপু বিশ্বাসদের গ্রুপের) অসংখ্য বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছে মুজিব বাহিনী।সিরাজুল আলম খান সমর্থক অংশ মনে করে উপরোক্ত মর্মান্তিক ঘটনাবলীর সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল মুজিব বাহিনীর ‘অপর অংশ’-এর কীর্তি। যদিও তার জন্য রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে সিরাজুল আলম খানদেরকেও।

কমিউনিস্ট ধারার রাজনীতিবিদদের নির্মূলের বিবরণ দিতে গিয়ে মুজিব বাহিনীর একজন মুক্তিযোদ্ধা১৬ যিনি নিজেও কুমিল্লার বডুরা’য় ভাসানী ন্যাপের জনপ্রিয় এক নেতাকে হত্যায় অংশ নিয়েছিলেন, বর্তমান লেখকের কাছে বলেন,

আমরা না চাইলেও কমান্ডাররা বাধ্য করেছিল ঐ কাজে। বিষয়টি স্বচ্ছন্দ করার জন্য তাই পরবর্তী পর্যায়ে বিএলএফ যোদ্ধাদের পরিচিত এলাকায় ইনডাকশান বন্ধ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ এলাকা ও মানুষ পরিচিত হলে হত্যা করার ক্ষেত্রে দ্বিধা তৈরী হতো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বামপন্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সুনামের অধিকারী থাকতেন, ফলে তাদের মারার নির্দেশ পালন করা জটিল হতো। অপরিচিত এলাকা হলে ঐ রূপ সম্ভাবনা থাকবে না-এটাই ধরে নিয়েছিল নেতৃবৃন্দ।

সাধারণভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের বামপন্থী শিবিরকে মস্কো ও পিকিং ঘরানার আলোকে বিবেচনা করা যায়। এই উভয় শিবিরই মুজিব বাহিনী দ্বারা যুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে যোগদানের ক্ষেত্রে বাধাপ্ৰাপ্ত হয়েছে। এ সম্পর্কে মস্কো শিবিরের নেতা মনি সিং এবং পিকিং শিবিরের নেতা কাজী জাফর আহমেদের স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। মস্কো ঘরানা যুদ্ধের পূর্ব থেকে আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে অবস্থান নিলেও মুজিব বাহিনীর তরফ থেকে তারাও যে ছাড় পায় নি তার স্বীকারোক্তি হিসেবে মনি সিং বলেন,

আমরা আওয়ামী লীগসহ স্বাধীনতার পক্ষের সকল শক্তির বৃহত্তম জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলাম। এই প্রচেষ্টা তেমন সফল হয়নি।…আমরা জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজস্ব শক্তির ওপর নির্ভর করার ওপর জোর দিতাম। এই সকল বিষয়ে আওয়ামী লীগের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। আওয়ামী লীগের একাংশের তরুণদের দ্বারা ‘মুজিব বাহিনী’ নামে একটি পৃথক বাহিনী গঠিত হবার পর তাদেএ সঙ্গে এবং বিশেষ করে আমাদের সমর্থক গেরিলাদের দেশের ভেতরে প্রেরণের প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে আমাদের অসুবিধা দেখা দিল।১৭

উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে মনি সিং কথিত ‘অসুবিধা’র আরও স্পষ্ট বয়ান পাওয়া যায় ২ নং সেক্টরে মেজর হায়দারের অধীনে যুদ্ধ-করা জহিরুল ইসলামের ভাষ্যে। ‘বামপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বিএলএফ-এর সংঘর্ষ এবং তাদের থেকে অস্ত্ৰ কেড়ে নেয়ার প্রমাণ হিসেবে নিম্নোক্ত বয়ানটি এ কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে ঘটনার শিকার খালেদ মোশাররফের সেক্টরের যোদ্ধারা, এবং যুদ্ধের পূর্বে খালেদের কোন বামপন্থী পরিচিত ছিল বলে প্রমাণ নেই। কিন্তু জহিরুল ইসলাম বলছেন,

যেহেতু আমরা ছাত্রলীগের ছিলাম না, অতএব বামপন্থী। এই সরলীকৃত ফর্মুলায় আমরা বামপন্থী হয়ে গিয়েছিলাম এবং পরবর্তী সময়ে [অক্টোবরে] বিএলএফ আমাদের ক্যাম্পও আক্রমণ করেছিল।….নভেম্বরে ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় বিএলএফ বাহিনী কাঞ্চন এলাকায় অবস্থানরত একটি বাম গেরিলাদলকে অতর্কিতে আক্রমণ করে ওদের সব অস্ত্ৰ নিয়ে গিয়েছিল। এই দলের বিপর্যন্ত বিধ্বস্ত কমান্ডার লুৎফর ভাই, ২০ নভেম্বর ঈদের দিন আমাদের চাপড়ি ক্যাম্পে [বর্তমানে ঢাকার নিকটবতী পূর্বাচল এলাকা] উপস্থিত হলেন। আমি লুৎফর ভাইকে চিনতাম। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন কমী ছিলেন। মহিলা পরিষদের আয়শা খাতুনের ছোট ভাই। আমরা লুৎফর ভাইকে সাময়িক আশ্রয় এবং মেজর হায়দারের মাধ্যমে বিএলএফ-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করে অস্ত্র ফেরতের ব্যবস্থা করেছিলাম।১৮

বামপন্থীদের প্রতি এসব বাধা ও আক্রমণের সাধারণ কারণ ছিল ভারতীয় কমান্ডের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের যে কোন ধরনের কমিউনিস্ট ধারার বিকাশকে বাধা প্রদানের নীতি। দেশের অভ্যন্তরে যেখানেই কমিউনিস্টরা নিজস্ব স্বাধীন শক্তিতে যুদ্ধাঞ্চল ও মুক্তাঞ্চলের বিকাশ ঘটাতে চেষ্টা করেছে সেখানেই বাধা ও আক্রমণ এসেছে। বর্তমান অনুসন্ধানকালে এরূপ আক্রমণের সবচেয়ে করুণ দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বৃহত্তর যশোরের লড়াইল-শালিখা এলাকার পুলুম গ্রামকে ঘিরে গড়ে ওঠা বামপন্থীদের সশস্ত্ৰ উত্থান ও তার বিপর্যয়কে।

মুক্তিযুদ্ধকালে ইপিসিপি-এমএল নামে পরিচিত পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির যশোর শাখা পুরোপুরি নিজস্ব উদ্যোগে এখানে বিশাল এক মুক্তাঞ্চল গড়ে তুললেও অক্টোবর নাগাদ মুক্তিবাহিনী, মুজিব বাহিনী ও রাজাকারদের সম্মিলিত আক্রমণে পুলুমের প্রতিরক্ষা ভেঙ্গে পড়ে। এখানে প্রায় দেড় শত কমিউনিস্ট যোদ্ধা নিহত হয় বলে আনুমানিক একটা হিসাব দিয়েছেন অত্র প্রতিরোধের সামরিক প্রধান নূর মোহাম্মদ। তিনি এও জানান, কেবল ভারতীয় কমান্ডের অধীনে না থাকার কারণেই তারা বারবার আক্রান্ত হন। ‘ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুদ্ধ না করলে সেটা দেশপ্রেমবর্জিত যুদ্ধ হবে- এটাই ধরে নেয়া হয়েছিল।…কিন্তু আমাদের নীতি ছিল কোন অবস্থাতেই ভারতে গিয়ে যুদ্ধ নয়।’১৯

যশোরের পুলুম মুক্তাঞ্চলের মতোই নোয়াখালীর চরজাঙ্গালীয়া ইউনিয়নে মোহাম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বে পূর্ব-পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি [মার্কসবাদী-লেনিনবাদী] এর মুক্তিযোদ্ধারা গড়ে তুলেছিল আরেকটি মুক্তাঞ্চল।এই মুক্তাঞ্চলে পাকিস্তানের সৈনিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি কৃষিবিপ্লবের লক্ষ্যে ভূমি সংস্কার শুরু হয় এবং গণপ্রশাসন গড়ে তোলা হয়। এখানেও যুদ্ধকালেই মুজিব বাহিনী প্রেরণ করা হয়-কিন্তু তোয়াহা স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে চুক্তি করে মুজিব বাহিনীর আক্রমণ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে ১৬ ডিসেম্বরের পর এক সপ্তাহের অধিক টিকতে পারেনি জাঙ্গালিয়ার কমিউনিস্টদের এই গণপ্রশাসন। যদিও ভূস্বামীদের হাত থেকে কেড়ে নেয়া জমি ক্ষুদে চাষীরা ১৯৭৪-এ রক্ষীবাহিনী আসার পূর্ব পর্যন্ত দখলে রাখতে পেরেছিল।২০

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে মুজিব বাহিনীর আক্রমণাত্মক অগ্রাভিযানে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটে যে, মুজিব বাহিনীর সমাজতন্ত্রীরাও আক্রান্তের তালিকায় চলে আসে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের স্বপন চৌধুরীর দৃষ্টান্তটি উল্লেখ করতেই হয়। এই প্রতিভাধর ছাত্রনেতাই ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে ‘সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশে’র প্রস্তাব উত্থাপন করে সেসময়কার ছাত্র রাজনীতিকে ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়ে ঠেলে দেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সমাজতন্ত্রপন্থীদের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি।২১

কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ৪৫ জনের মধ্যে মাত্র ১৩ জন সেদিন তাঁর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, যাঁদের মধ্যে ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, শেখ শহীদুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ। যাঁদের গ্রুপ-নেতা তখন ফজলুল হক মনি। নূরে আলম সিদ্দিকী ঐ বৈঠকের সভাপতি ছিলেন এবং সভাপতির ক্ষমতাবলে কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই সেদিন বৈঠক অসমাপ্ত রেখে দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল এক অর্থে স্বপন চৌধুরীর প্রস্তাবটির পরোক্ষ বিরোধিতা।২২

মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে ২৭ নভেম্বর স্বপন চৌধুরী চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে আহত অবস্থায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে আটক হন। তাঁকে রাঙ্গামাটি হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। পরে ঐ হাসপাতাল থেকে গুম হয়ে যান তিনি। এ বিষয়ে মুজিব বাহিনীর সিরাজুল আলম খান গ্রুপের অন্যতম নেতা হাসানুল হক ইনু এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস মনি গ্রুপই স্বপন চৌধুরীকে পাক বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেয়। ধরা পড়ার সময় তিনি প্রতিরোধ করেন ও আহত হন। পাক বাহিনী স্বপন চৌধুরীর পরিচয় পেয়ে তাঁর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং রাঙ্গামাটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির পতনের পর স্বপন হাসপাতালেই ছিলেন। পরদিন তাঁকে গোপনে সরিয়ে ফেলা হয়। যে নার্স স্বপনের চিকিৎসায় ছিলেন তিনিও ১৯৭১ সালে গায়েব হয়ে যান। আমাদের ধারণা এ কাজ শেখ ফজলুল হক মনি গ্রুপের।২৩

উল্লেখ্য, ডিসেম্বরে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার কিছুদিন আগেই শেখ মনির নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী সদস্যদের অগ্রাভিযানের পথ নির্ধারিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে। সম্ভবত এ সময় সিরাজুল আলম খানের প্রতি অনুগত অংশও রাজনৈতিকভাবে তাদের ভবিষ্যত অগ্রাভিযানের পথানুসন্ধান শুরু করে। ১৬ ডিসেম্বরের পর এর লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরার কিছুদিন পরই মুজিব বাহিনীর তিন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, ও শরীফ নুরুল আম্বিয়া (এরা তখন দেশের সুপরিচিত ছাত্রনেতা) স্বাধীন দেশে সরকার গঠন প্রশ্নে ‘দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যদের নিয়ে একটি জাতীয় বিপ্লবী সরকার গঠনের দাবী জানান।‘ তারা একই সঙ্গে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা, গণপরিষদ ও মন্ত্রিসভা বাতিলেরও আহবান জানান।২৪

তাদের কিছু দাবী ছিল প্রশাসনিক বিবেচনায় প্রকৃতই বিপদজনক ধাঁচের-যেমন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী ও সশস্ত্ৰ দুস্কৃতিকারীদের প্রকাশ্যে গুলি করে মারতে হবে; অসৎ ব্যবসায়ী এবং নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্র-যুবকদেরও দিতে হবে, ইত্যাদি। এসময় সিরাজুল আলম খানের উপরোক্ত অনুসারীরা ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের স্বার্থে সেনাবাহিনীকে জনগণের বাহিনী হিসেবে’ গড়ে তোলা ২৫ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের কলকাতাকেন্দ্রিক দুর্নীতির তদন্তেরও ডাক দেন।

ইতিহাসের বড় কৌতুক এই যে, সেদিন আব্দুর রব-সিরাজ-আম্বিয়াদের জরুরি অবস্থা জারির বিরোধিতা করে পাল্টা বিবৃতি দিয়েছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, ইসমত কাদির গামা ও আবদুল কুদ্দুস মাখন। আর ৭৪-৭৫ এ শেখ মুজিবুর রহমান যখন প্রকৃতই জরুরি অবস্থার আদলে দেশ চালাতে শুরু করেন তখন শেষোক্তরা ছিলেন তাঁর সমর্থক এবং রব-সিরাজ-আম্বিয়ারা ছিলেন তার করুণ শিকার।

এসময় কেবল শেখ মুজিবুর রহমানই নন, তাজউদ্দীন আহমদও সিরাজ গ্রুপের উত্থাপিত ‘জাতীয় বিপ্লবী সরকার’ ধারণার ঘোর বিরোধী ছিলেন। কারণ এরূপ বিপ্লবী সরকার গঠিত হলে বিদ্যমান প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের জায়গায় নতুন ধারার প্রশাসন গড়ে ওঠার সূচনা ঘটতো এবং তাতে, বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ে, অনেক বিপ্লবী নেতৃত্ব ও শক্তির অন্তর্ভুক্তি ছাড়া গত্যন্তর থাকতো না। এরূপ প্রশাসন পাকিস্তান রাষ্ট্রের ফেলে যাওয়া অবশেষের বদলে এমন এক নতুন রাষ্ট্ৰীয় আইনী কাঠামোর দাবী জানাতো যা মুজিবনগরে গড়ে-ওঠা প্রবাসী সরকারের সাজানো ছকটি অনিবাৰ্যভাবেই এলোমেলো করে দিতো। তাজউদ্দীন এইরূপ সরকারের ধারণা কলকাতায় থাকাকালেই এক দফা মোকাবেলা করেছিলেন। স্বাধীনতার পরও তিনি সেই অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। ভারতীয়রাও যে বাংলাদেশে এইরূপ একটি বিপ্লবী সরকার দেখতে একেবারেই প্ৰস্তুত নয় সেটাও ছিল সেসময় সুবিদিত।

বলাবাহুল্য, জাতীয় বিপ্লবী সরকার ধারণার প্রতি তাজউদ্দীন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিক্রিয়া সিরাজুল আলম খানের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল না। এই ধারণা প্রচারণার মাধ্যমে তাঁর লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ এবং বিশেষ করে মনির অনুসারীদের থেকে নিজ কর্মীদের রাজনৈতিক পৃথকত্ব সুনির্দিষ্ট করা। ছাত্ৰফ্রন্টে আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, শরীফ নুরুল আম্বিয়া এবং শ্রমিক ফ্রন্টে মোহাম্মদ শাজাহান, রুহুল আমিন ভূঁইয়া প্রমুখের মাধ্যমে উপরোক্ত বিবৃতিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দেশব্যাপী একটি আদর্শিক মেরুকরণের সূচনা এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন তিনি।

সিরাজুল আলম খানের উদ্যোগে এসময় কৃষক লীগ নামেও একটি সংগঠনের জন্ম হয়। ১৯৭৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী এই সংগঠনের প্রথম সম্মেলন হয়। সম্মেলন শেষে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় যথাক্রমে খোন্দকার আবদুল মালেক২৬ এবং হাসানুল হক ইনুকে। সহ-সভাপতি ছিলেন তিন জন; খোরশেদ আলী, কাবিল হোসেন ও মফিজুর রহমান খান। ছাত্রলীগ বা শ্ৰমিক লীগের মতো এটি ভাঙ্গনের শিকার কোন সংগঠন ছিল না-বরং প্রথম থেকেই তা পুরোপুরি সিরাজুল আলম খানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ছাত্র ও শ্রমিক রাজনীতির পর কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিসরে সিরাজুল আলম খানের সাংগঠনিক বিস্তৃতির চেষ্টা এ কারণে বিশেষ তাৎপৰ্যপূর্ণ যে, স্বাধীনতার পূর্ব থেকে এতদঞ্চলে প্রথাগত সমাজতন্ত্রীরা ঐ পরিমণ্ডলেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন। স্বভাবতই এটা ছিল বাংলাদেশে গ্রামীণ শ্রেণীরাজনীতির এক নতুন অধ্যায়। বিপুল রক্তপাতপূর্ণ এ অধ্যায় নিয়ে লেখক মূলগ্রন্থে ৯টি জেলার কেসস্টাডি তুলে ধরেছেন।

তথ্যসূত্র 

১৪. আরও দেখুন, কামাল উদ্দিন আহমেদ, সিরাজুল আলম খানের দর্শন ও চেতনালোক, ইন্টারন্যাশনাল হিস্টেরিক্যাল নেটওয়ার্ক, ঢাকা, পৃ. ৪৬।

১৫. ১৯৭১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বাঁশখালীতে ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়। ঘটনাটি বিশেষ আলোচিত হয় স্থানীয় বামপন্থী লেখক অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ যখন এর প্রতিবাদে এবং নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির উদ্দেশে ‘ইন্দিরা গান্ধীর বিচার চাই’ নামে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে একটি রাজনৈতিক গ্ৰন্থ উৎসর্গ করেন (প্রকাশক: লেখক নিজে)। এই ঘটনায় বাঁশখালী থানার নাপোড়া পাহাড়ে ঘুমন্ত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা হয়েছিল এবং তাতে সর্বমোট ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। লেখক দাবী করেছেন, ১৪ জন মারা যান সরাসরি মুজিব বাহিনীর হাতে।

১৬. বোধগম্য কারণেই এখানে তার পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না।

১৭. মনি সিংয়ের সাক্ষাৎকার, স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (১৫ শ’ খণ্ড), তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ১৯৮৫, পৃ. ৩১৬

১৮ জহিরুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধে মেজর হাদার ও তার বিয়োগান্ত বিদায়, ঢাকা, প্ৰথমা, ২০১৩, পৃ. ১৭৯

১৯. দেখুন, নূর মোহাম্মদ, ‘ডাক দিয়ে যায় : ২৩ অক্টোবর ১৯৭১’, শহীদ স্মরণে, শহীদ দেশপ্রেমিক স্মৃতি কমিটি, যশোর, ২০১২। পুলুম গ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং তার বিপৰ্যয় সম্পর্কে সরাসরিও নূর মোহাম্মদের সাক্ষাৎকার গ্ৰহণ করা হয় ২০১৩ সালের ১ মার্চ ঢাকায় । তিনি ছিলেন ঐখানে পার্টি বাহিনীর প্রথম কমান্ডার। পরবর্তীকালে এখানে বিমল বিশ্বাসও কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন-যিনি বর্তমানে ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা।

২০.হায়দার আকবর খান রনো, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং বাম-প্ৰগতিশীলদের ভূমিকা, www.amaderbudhbar.com/?=686, এপ্রিল ২৪ ও মে ১৫, ২০১৩.  হায়দার আকবর খান উপরোক্ত লেখায় চর জাঙ্গালীয়ার মতোই বাগেরহাটের বিষ্ণুপুর এলাকার আরেকটি কমিউনিস্ট মুক্তাঞ্চলের উল্লেখ করেছেন-সেখানেও মুজিব বাহিনী ঘাঁটি এলাকা ধ্বংসের চেষ্টা করেছিল। ঐ এলাকায় কমিউনিস্ট গেরিলাদের নেতৃত্বে ছিলেন রফিকুল ইসলাম খোকন।

২১. চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার ঢেমশা এলাকায় ১৯৪৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী তাঁর জন্ম।

২২. মাহমুদার রহমান মান্না, বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি, ঢাকা, শিখা প্রকাশনী, ২০১১, পৃ. ৩৩।

২৩. মাসুদুল হক, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেএবং সিআইএ, ঢাকা, গণপ্রকাশন, ১৯৯১, পৃ. ১৭০।

২৪. ২৫ মে ১৯৭২ সালে তাঁরা এই দাবী তোলেন। বিবৃতির পূর্ণপাঠের জন্য দেখুন, দ্য বাংলাদেশ অবজারভার, ঢাকা, ২৬ মে ১৯৭২। জাতীয় শ্রমিক লীগের কয়েকজন নেতাও একই তারিখে অনুরূপ একটি বিবৃতি দেন। এ পর্যায়ে একটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল, ‘মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে আসার পর থেকেই ছাত্রলীগের সিরাজুল আলম খান সমর্থক অংশ ‘মুজিববাদে’র বিষয়টি তাদের শ্লোগান ও বক্তব্যে উত্থাপন কমিয়ে দেয় এবং ‘সমাজতন্ত্র ও শ্রেণী সংগ্ৰাম’ সংক্রান্ত বক্তব্যকে প্রাধান্য দিতে থাকে।‘

২৫. এসময় সেনাবাহিনীতেও এসব বিষয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ঢাকাস্থ ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল জিয়াউদ্দিন এবং কুমিল্লাস্থ ৪৪ ব্রিগেডের কমান্ডার লে.কর্নেল আবু তাহের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন’ বিষয়ে যখন খোলামেলা বক্তব্য উত্থাপন করেন তখন প্রতিষ্ঠানটির সর্বত্র তা বিশেষ মনযোগ আকর্ষণ করে। তাঁদের সঙ্গে সিরাজুল আলম খানদের যোগাযোগ গড়ে ওঠার কারণেই শেষোক্তরা একই বিষয় রাজনৈতিক দাবী আকারে জনসমাজে হাজির করেন। অতীতে কখনোই ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপ সেনাবাহিনীর বিপ্লবী পুনর্গঠনের বিষয়ে কোন দাবী উত্থাপন বা বক্তব্য রেখেছেন বলে জানা যায় না। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য দেখুন, আলতাফ পারভেজ, অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নেল তাহের ও জাসদ রাজনীতি, ঢাকা, পাঠক সমাবেশ, ১৯৯৬।উল্লেখ্য,এই বিতর্কের তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে জিয়াউদ্দিনকে সেনাবাহিনী ছাড়তে হয়।

২৬. ২০১৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে আবদুল মালেক শহীদুল্লাহ তাঁর জাসদে যোগদানকে ‘রাগের মাথায় নেয়া সিদ্ধান্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

[উৎসঃ আলতাফ পারভেজ, বাহাত্তরের বাংলাদেশঃ জাতীয় দ্বিধাবিভক্তির খোঁজে, নতুন দিগন্ত, ত্রয়োদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর, সমাজ-রুপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র,২০১৪, ঢাকা,  পৃঃ ১২৭-১৩২]

শেষ পর্ব

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

 

স্বাধীনতা পূর্ব শেখ মুজিব চরিত্রের মূল্যায়নঃ‘বাঘছাল গায়ে ছদ্মবেশী সংগ্ৰামী’আবদুল গাফফার চৌধুরী

হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা ডা. কালিদাস বৈদ্যের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে কিছু অজানা তথ্য, দেখুন;

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধেঃ অন্তরালের শেখ মুজিব 

জাসদ-সিপিবি-ইত্তেফাকের মূল্যায়নে আগষ্ট ১৯৭৫ হত্যাকান্ড– মহিউদ্দিন আহমদ

‘আমরা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পতন চেয়েছি ও রক্তাক্ত বিরোধিতা করেছি’-জাসদ

জাসদের উত্থান, বেহাত বিপ্লব ও পতনের ইতিহাস–  মহিউদ্দিন আহমদ

স্বাধীনতা উত্তর প্রশাসনের অভ্যন্তরে কি হয়েছিল জানতে দেখুন;

Making a Common Cause: Public Management and Bangladesh–Dr. Kamal Siddiqui

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion