বাহাত্তরের বাংলাদেশঃ জাতীয় দ্বিধাবিভক্তির খোঁজে-শেষ পর্ব

পর্ব ১ঃ জাতীয় দ্বিধাবিভক্তির সূত্রপাত  পর্ব ২ঃ পর্ব ২ঃ ‘মুজিববাদ’ বনাম ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’

লিখেছেনঃ আলতাফ পারভেজ,গবেষক ও সাংবাদিক

২৩ জুলাই ১৯৭২; শেখ মুজিবুর রহমান ও সিরাজুল আলম খান দুদিকে

আমরা ইতিহাসকে নতুন করে গড়তে পারি না, কিন্তু মাঝে-মধ্যে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন ভবিষ্যতের পথ নিরূপণের অবশ্যই সহায়ক হতে পারে। -অশোক মিত্র, মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ; ১৯৭৭-৮৭ সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী ছিলেন;২৭

ফেব্রুয়ারী মাসে (১৯৭২) একটা প্রস্তাব এসেছিল, খুব সম্ভব কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে; তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গ্ৰাম কর্মীবাহিনী’ হিসেবে গ্রাম উন্নয়ন প্রচেষ্টায় নিয়োগ করার। এই পরিকল্পনা পাশ হয়নি। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বাইরে যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত এরকম একটি ‘বাহিনী’র হাতে কখনও গ্রামকে ছেড়ে দেওয়া যায় না!…দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইংল্যান্ডে সমাজতন্ত্রের স্তম্ভ ছাড়াই রানীকেও সপ্তাহে একটি মাত্র ডিম খেতে দেওয়া হতো। আমাদের নেতৃবৃন্দ এটুকুও পারলেন না। খুব শিগগির স্পষ্ট হয়ে যায়, কোন আশা নেই। -আনিসুর রহমান, অর্থনীতিবিদ, স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য২৮

রাশিয়া কিংবা চীনে তো বটেই, প্রথাগতভাবে বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও এবং সুনির্দিষ্টভাবে দক্ষিণ এশিয়াতেও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম শ্রমিক ও কৃষক অঙ্গনেই প্রথম প্রস্ফুটিত হলেও মুজিব বাহিনী থেকে সৃষ্ট জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর রাজনীতির উৎস ছিল দেশের শিক্ষাঙ্গন। ছাত্র সংগঠকদের আহবান ও কার্যক্রমকে তখন স্রেফ অনুসরণ করছিল তাদের সমর্থক শ্রমিক ও কৃষক সংগঠকরা। শ্রমিক লীগের যুদ্ধোত্তর ভাঙ্গন কিংবা কৃষক লীগের বিনা বাক্যব্যয়ে জাসদকে অনুসরণকে তাই অভিহিত করা যায় ছাত্রলীগের তৎপরতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে।

শেখ ফজলুল হক মনি

সিরাজপন্থী তিন নেতা (আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও শরীফ নুরুল আম্বিয়া) যখন জাতীয় বিপ্লবী সরকার গঠন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, গণপরিষদ ও মন্ত্রিসভা বাতিলসহ অন্যান্য দাবীসমূহ উত্থাপন করছিলেন-তখন তাঁদের পেছনে সমর্থনের শক্তি দেখাতেই শ্রমিক লীগ নেতাদের দিয়েও বিবৃতি দেওয়ানো হলো। সিরাজপন্থীদের বিবৃতিতে উপস্থাপিত উপরোক্ত বক্তব্যকে ঘিরে শ্রমিক পরিমণ্ডলে বেশি মনযোগ সৃষ্টি না হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্র রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। শেখ মনি ‘বাংলার বাণী’তে নিজ কলামে এসব বিবৃতির পেছনের শক্তিকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিবিপ্লবী’ হিসেবে অভিহিত করে সরাসরি রাজনৈতিক এই মেরুকরণে অংশ নেন এবং বলেন, ‘যারা বঙ্গবন্ধুর সরকারকে ভেঙ্গে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তাব করছেন তাদের আসল উদ্দেশ্য হলো:

ক. দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরী;

খ. বঙ্গবন্ধুকে ডিক্টেটর করে তোলা;

গ. সংবিধান রচনার পথে বাধা সৃষ্টি করা, এবং

ঘ. গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মান নষ্ট করা।’২৯

ছাত্রলীগ বা মুজিববাদপন্থীদের মাঝে এরূপ মতদ্বৈততার মাঝেই ঢাকায় এসময় ছোট একটি ঘটনা ঘটে যা মুজিব বাহিনীর ভবিষ্যত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে গতানুগতিক বামপন্থীদের অতীত আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তোলে।

বর্তমানে ঢাকায় বারডেম হাসপাতালের পাশে যেখানে পিজি হাসপাতাল রয়েছে সেখানেই স্বাধীনতাপূর্ববর্তী সময়ে ‘শাহবাগ’ নামে একটি হোটেল ছিল। এই হোটেল ভবনকে পিজির একাংশে পরিণত করার বিরুদ্ধে সেসময় হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন আন্দোলন করে যাচ্ছিলো। এই হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠিত করতো তখন বামপন্থী রাজনীতিবিদ, বিশেষত শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের কমিউনিস্টরা। একাত্তরের ষোল ডিসেম্বরের পরও এই আন্দোলনের রেশ জারি ছিল। কোনভাবেই যখন ঐ হোটেল শ্রমিকদের আন্দোলনকে দমানো যাচ্ছিলো না তখন সরকারের একটি অংশ সেটা মোকাবেলার জন্য মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দের সাথে যোগসাজশ করে। যার পরিণতিতে শ্রমিকদের মিছিলে গুলি চালানো হয়। এরপর হোটেলকে হাসপাতালে পরিণত করতে বেগ পেতে হয় নি। অন্যান্য সেক্টরের শ্রমিক ইউনিয়নেও এই ঘটনা নীরব এক আশঙ্কাজনক বার্তা পৌছে দিয়েছিল দ্রুত।৩০

এসব যৌথ কার্যক্রম সত্ত্বেও এসময় ছাত্রলীগে সিরাজুল আলম খান ও শেখ মনি গ্রুপের দ্বন্দ্বও ছিল বহমান। ফল হিসেবে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্ৰ-ছাত্রী সংসদ (ডাকসু)-এর স্বাধীনতা পরবতী প্রথম নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত না হয়েও ছাত্রলীগের তরফ থেকে দুটি প্যানেল জমা পড়ে এবং নির্বাচনে উভয় প্যানেল বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেলের কাছে পরাস্ত হয়।৩১

শেখ মুজিবুর রহমানের (ডানে) সাথে মুজিব বাহিনীর চার নেতা (বা থেকে) রাজ্জাক, সিরাজ, তোফায়েল, ও শেখ মণি

এসময় ছাত্রলীগ অনানুষ্ঠানিকভাবে দু’ভাগ হয়ে যায়। সিরাজুল আলম খানদের গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন শরীফ নুরুল আম্বিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ আগের পদেই থাকলেন। একইভাবে বিপরীত শিবিরে সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী আগের পদে থাকেন আর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করা হয় ইসমাত কাদির গামাকে। মনিরুল ইসলাম দাবী করেছেন,৩২  নূরে আলম সিদ্দিকীরাই প্রথম ছাত্রলীগে ভাঙ্গন প্রক্রিয়ার সূচনা করে শাহজান সিরাজসহ সিরাজুল আলম খানের অনুসারী প্রভাবশালী সকলকে বহিষ্কারের মধ্যদিয়ে। পরে অবশ্য শেষোক্তরাও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে।

পারস্পরিক এই বহিষ্কার ও পাল্টা বহিষ্কারের পরপরই ’৭২-এর জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে দুই গ্রুপ ঢাকার বুকে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় সমাবেশ ডেকে। সেসময় উভয় গ্ৰপই ভাবছিল সাংগঠনিক কার্যক্রমে ব্যাপকতা ও সমাবেশশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই তাঁরা শেখ মুজিবকে ‘জয়’ করবেন এবং ‘কাছে’ রাখবেন। বস্তুত সেটাই [সমাবেশশক্তি] তখন ছিল কাৰ্যত রাজনীতিতে সঠিকতা ও বেঠিকতার মানদণ্ড।

বাহাত্তরের মে-জুনে ছাত্রলীগের ঠাণ্ডাযুদ্ধকালীন এই পরিবেশে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলেন-যদিও যুদ্ধের মেঠো উপাদান ছিল ‘মুজিববাদ’-এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সিরাজুল আলম খান বিরোধীদের সম্মেলনস্থল সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে অতিথি হিসেবে হাজির হয়ে উপরোক্ত ঠাণ্ডাযুদ্ধের অবসান ঘটান এবং ছাত্রলীগের বিভক্তিকে পূর্ণতা দেন। একই সঙ্গে ভাঙ্গে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীও।

ছাত্রলীগের একাংশের সম্মেলনে শেখ মুজিবের এই উপস্থিতির প্রতীকী মূল্য ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বিপুল হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সাহিত্যে তার তাৎপর্য নিয়ে খুব কমই আলোকপাত করা হয়েছে। ছাত্রলীগের ঐ সময়কার বিভক্তি প্রক্রিয়া থেকে স্পষ্ট ছিল, সংগঠনটির অধিকতর সংগ্ৰামী ও মেধাবী অংশই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ডাক দিয়ে এগোচ্ছে এবং সংখ্যায়ও তারা শেখ মনি ও তোফায়েল আহমেদ সমর্থকদের চেয়ে বেশি ছিল।

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রপন্থীরা, যাদের সম্মেলন হচ্ছিলো পল্টন ময়দানে-ভেবেছিলেন দুটি স্থানে সম্মেলন হলেও মুজিব নিশ্চয়ই কোনটাতেই যাবেন না। কিন্তু শেখ মনি, রাজ্জাক ও তোফায়েল সমর্থকদের মাঝে হাজির হয়ে মুজিব কার্যত সিরাজুল আলম খান অনুসারীদের বাধ্য করলেন নতুন একটি দল গঠনে এগিয়ে যেতে। ‘বাইশে জুলাই গণকণ্ঠ প্রথম পাতায় দুই সম্মেলনের সচিত্র সংবাদ ছাপা হলো, দুই কলাম করে। বাঁয়ে শেখ মুজিবের ছবি। হেডিং ছিল গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র হবে। ডানে আ স ম রবের ছবি। হেডিং ছিল, গণতন্ত্র দিয়ে সমাজতন্ত্র হবে না। মুজিব আর রব সমান বরাদ্দ পেলেন।’৩৩

বস্তুত মুজিবের সেদিনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতির জাতীয়তাবাদী ছকটিকে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছিল।৩৪ সিরাজুল আলম খান ও তাঁর সহযোগীদের সামনে তখন এক রূঢ় বাস্তবতা। জুলাইয়ের দ্বিধাবিভক্তির পর থেকে এরা শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলা বন্ধ করে দেন। মনিরুল ইসলামের বিবরণ থেকে দেখা যায়, ‘মুজিবের নীরবতা ও নিরপেক্ষতা ভঙ্গ’-এর আকস্মিকতায় সিরাজপন্থীরা তখন ‘হতবিহবল’!৩৫

এ পর্যায়ের সামগ্রিক ঘটনাবলী যে মুজিব ও সিরাজের পারস্পরিক বোঝাপড়ার একেবারে বাইরে ঘটেনি সেরকম সাক্ষ্যও মেলে। মুজিব ও সিরাজ উভয়ে একটি বিষয়ে এ সময় একমত ছিলেন যে, ‘সমাজতন্ত্রের শ্লোগানধারী জঙ্গী একটি দলের জন্ম ছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর উত্তাল এই তারুণ্যকে সর্বহারা পার্টি, চারু মজুমদার প্রভাবিত নকশাল, সিপিবি, ন্যাপ ইত্যাদি থেকে সরিয়ে রাখার আর কোন উপায়। নেই।‘৩৬ এই দৃষ্টিভঙ্গী যে কতটা সঠিক তার প্রমাণ মেলে মাঠ পর্যায়ের তাৎক্ষণিক চিত্র থেকে।

১৬ ডিসেম্বরের পরপরই বাহাত্তরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে তার প্রায় সব কয়টিতে ছাত্র ইউনিয়ন জয়লাভ করে। মূলত তাদের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিই তরুণদের আকর্ষিত করে। কিন্তু পরের বছরই যখন দেখা যায় সিপিবির অঙ্গসংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ক্ৰমে শেখ মুজিবকে অন্ধভাবে সমর্থন দিচ্ছে আর ছাত্রলীগেরই একটি ধারা তাঁর বিরোধিতা এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধ্বনি দিয়ে জঙ্গী অবস্থান নিয়েছে তখন একই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একচেটিয়াভাবে জাসদপন্থী ছাত্রলীগ জয়লাভ করতে শুরু করে। জাসদপন্থী ছাত্রলীগ তখন ছাত্র ইউনিয়নকে বলতো ‘বি-টিম’ । আর ছাত্র ইউনিয়নের কাছে প্রথমোক্তরা ছিল ‘বিভ্রান্ত মাওবাদী।‘

ভারতীয় সেনা অফিসার মেজর উবানের সঙ্গে মুজিব বাহিনীর চার নেতা ১৯৭১ সালে

উল্লেখ্য, ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ ও ‘মুজিববাদ’পন্থী৩৭ উভয় অংশ তাদের ঐতিহাসিক সেই দ্বিধাবিভক্ত সম্মেলনের শেষ দিন ২৩ জুলাই দুপুরে ঢাকায় ব্যাপক সংঘর্ষেও লিপ্ত হয়। এভাবেই কাৰ্যত স্বাধীন বাংলাদেশে মুজিব বাহিনীর প্রথম দফা ভাঙ্গন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রায় একই সময় শ্রমিক লীগেও৩৮ উপরোক্ত দুই ধারার অনুসারীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান।

সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের সমাবেশ শেষে মুজিববাদপন্থী ছাত্রলীগের সভাপতি করা হয় শেখ শহিদুল ইসলামকে, সাধারণ সম্পাদক হন এম এ রশিদ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হন শফিউল আলম প্ৰধান। অপরদিকে, পল্টনের সমাবেশ থেকে সিরাজুল আলম খান সমর্থক ছাত্রলীগের নতুন যে কমিটি ঘোষণা করা হয় তাতে সভাপতি পদে শরীফ নুরুল আম্বিয়াই রইলেন, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এলেন আ ফ ম মাহবুবুল হক আর সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন বদিউল আলম। তবে শেষোক্তদের রাজনীতি তখন আর শিক্ষাঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকলো না। ততদিনে শুরু হয়ে গেছে নতুন দল গড়ে তোলার কর্মযজ্ঞ।

প্রায় দু’মাস পরে ১৭ সেপ্টেম্বর পল্টনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী ছাত্রলীগের পরবর্তী এক জনসভায় আ স ম আব্দুর রব নতুন দল প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন। এসময় শেখ মনি চেষ্টা করছিলেন গণমাধ্যমে শেষোক্তদের প্রচার নিয়ন্ত্রণ করার। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের প্রচার কৌশলের মাধ্যমে সিরাজ অনুসারীরা দেশে নতুন একটি শ্লোগান ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন : আমরা লড়ছি সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। ইতিমধ্যে মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল ও লে. কর্নেল তাহেরের সাথে সিরাজুল আলম খানের যোগাযোগ ঘটে গেছে।৩৯

‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ নামে পার্টির নামও ঠিক হয়ে গেছে। ১৯৭২ এর ৩১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি গঠিত হলেও ১৭ নভেম্বর বায়তুল মোকাররমে এর প্রথম জনসভা হয়। আর বড় আকারে প্রকাশ্য সাংগঠনিক প্রকাশ ঘটে ঢাকার সোহরাওয়াদি উদ্যানে ২৩ ডিসেম্বর। ১৯৭৩-এর ১১ মে জাসদের প্রথম জাতীয় সম্মেলন বসে পল্টনে। ঐ সম্মেলন চলে তিন দিনব্যাপী। দ্বিতীয় দিন অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ। যদিও সাধারণ্যে তখনও এরা ছাত্রলীগের ‘রব গ্রুপ’ বা ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী গ্রুপ’ মাত্ৰ-কিন্তু ইতিমধ্যে সদম্ভেই জাসদ তার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করে, যার পাঁচ জন সহ-সভাপতির একজন হন লে. কর্নেল আবু তাহের-যদিও তাঁর নামটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি তখন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৮০৫ জন কাউন্সিলর যোগ দিয়েছেন জাসদের প্রথম সম্মেলনে-যা ছিল দলটির দেশব্যাপী সাংগঠনিক বিস্তৃতির প্রাথমিক এক লক্ষণ। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিলেন মুজিব বাহিনীর সদস্য।

প্রথম কেন্দ্রীয় সম্মেলনের পর নতুন দলের নীতিনির্ধারকরা কয়েকটি অঙ্গ সংগঠন গড়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও কার্যত তাদের শক্তিভিত হয়ে থাকলো ছাত্রলীগই। তেহাত্তরের জুনে পরের সম্মেলনে জাসদ-ছাত্রলীগের নেতা হয়ে এলেন সভাপতি হিসেবে আ ফ ম মাহবুবুল হক এবং সম্পাদক হিসেবে মাহমুদুর রহমান মান্না। ইতিমধ্যে দেশের প্রধান প্রধান ক্যাম্পাসগুলোতে এই ‘জাসদ ছাত্রলীগ’ই প্রধান সংগঠন হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিহাত্তরের আগস্টে যখন কেন্দ্রীয় ছাত্ৰ-ছাত্রী সংসদের নির্বাচন এলো দেখা গেল এদের ঠেকাতে ছাত্রলীগের মুজিববাদপন্থী গ্রুপ ও ছাত্র ইউনিয়ন একজোট হয়ে গেছে। এদের তরফ থেকে ছাত্র ইউনিয়নের নুহ-উল-আলম লেনিনকে ভিপি এবং ছাত্রলীগের ইসমাত কাদির গামাকে জিএস প্রার্থী করে একক প্যানেল দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীদের বিজয়৪০ যখন রোখা যাচ্ছিলো না এবং ভোট গণনাকালে যখন দেখা গেল ছাত্র ইউনিয়ন ও আওয়ামী ছাত্রলীগের যৌথ প্যানেলের চেয়ে জাসদ-ছাত্রলীগের মাহবুব-জহুর প্যানেল সকল পদে ব্যাপক ভোটে এগিয়ে আছে তখনি এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে-ছাত্রলীগের শেখ মনি গ্রুপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মিলে যৌথভাবে ভোট গণনা কার্যক্রম বানচালের জন্য সন্ধ্যার আঁধারে ভোট গণনাস্থলে এসে সশস্ত্ৰ হামলা চালায়।৪১

এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বাধীনতা-উত্তর ছাত্ৰ-ছাত্রী সংসদের প্রথম নির্বাচন ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের মধ্যদিয়ে পণ্ড হয়ে গিয়েছিল। সেখানেও আক্রান্ত ও আক্রমণকারী উভয়ে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার অনুরূপ। দেশের প্রধান দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের এইরূপ অভিজ্ঞতার পরপরই দেশজুড়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুরু হয় মুজিব বাহিনীর সশস্ত্ৰ সক্রিয়তার নতুন আরেক তরঙ্গ। আর তাতে শুরুর বলী হয় ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্র রাজনীতিতে মূল দ্বন্দ্বের জায়গা থেকে ছিটকে পড়ে পুরানো এই সমাজতন্ত্রীরা। মুজিববাদী ছাত্রলীগের ‘মুখোমুখি দাঁড়া’য় তখন জাসদ-ছাত্রলীগ ।

রাজিনীতিমুখী সাধারণ শিক্ষার্থীরাও সংখ্যাগরিষ্ঠই এভাবে মেরুকৃত হয়ে পড়ে কিংবা তাদের মাঝে এইরূপে মেরুকরণ ঘটানোই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য-এবং ইতিহাসের এক নির্মম কৌতুক এই যে, বাংলাদেশ ঐ মেরুকরণ থেকে চার দশক পর আজও মুক্তি পায়নি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে-বিশেষত, যখন দেখা যায়- মুজিব বাহিনী, যুদ্ধকালীন ঘটনা ও একাত্তরপরবর্তী রাজনীতির প্রসঙ্গ এলেই পুরো দেশ জুড়ে শুরু হয় তিক্ত বিতর্ক। যদিও সেই বিতর্ক শেষেও চাপা পরে থাকে মুজিব বাহিনী গঠনের মূল রাজনীতি।

তথ্যসূত্র 

২৭. বিভাজনের পশ্চাৎপটঃ বঙ্গভঙ্গ ১৯৪৭, ভূমিকা, সম্পাদনাঃ দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, রিডার্স সার্ভিস,২০১৩।

২৮. উন্নয়ন জিজ্ঞাসা, কেন হলো না, ব্র্যাক, ঢাকা, ১৯৯২, পৃ.৪, ৮।

২৯. একইরূপ বক্তব্য নিয়ে শেখ ফজলুল হক মনির একাধিক কলাম (৩ জুন ১৯৭২, ৬ অক্টোবর ১৯৭২ ইত্যাদি) প্রকাশিত হয় এই সময় দৈনিক বাংলার বাণীতে। মনি এ সময় তাঁর লেখনির মাধ্যমে একদিকে সিরাজুল আলম খানদের রাজনৈতিক অবস্থানের মোকাবেলার পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের কাজেরও তীব্র সমালোচনা করতেন (দেখুন, বাংলার বাণী, ৩১ আগস্ট ১৯৭২)। তাজউদ্দীনকে ‘সমাজতন্ত্রের শত্রু’ হিসেবেও অভিহিত করা হতো। মনির এইরূপ ভূমিকায় তাজউদ্দীন আহমদ শেষ পর্যন্ত ক্যাবিনেটে নিজ অবস্থান ধরে রাখতে পারেন নি। ফলে আবার সিরাজুল আলম খান ও তাঁর অনুসারীদের মাঝে এই ধারণাই জোরালো হয়, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ থেকে তাঁদের আজ কিংবা কাল বের হতেই হবে। সেক্ষেত্রে তাজউদ্দীনের মতো নিঃসঙ্গ অবস্থার শিকার না হয়ে ভিন্ন আদর্শিক অবস্থান নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে বের হওয়াই উত্তম। এইরূপ উপলব্ধি জাসদ গঠন প্রক্রিয়াকে তীব্ৰতা দেয়।

৩০. তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ওপর পদ্ধতিগতভাবে দীর্ঘস্থায়ী আক্ৰমণ আসে আরও পরে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ‘শ্রমিক লীগ’-এর তরফ থেকে। এরূপ সংঘাতের বড় এক কেন্দ্র ছিল টঙ্গী। টঙ্গী ছাড়া অন্যত্রও তখন সরকারবিরোধী শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের কোন সুযোগ ছিল না-প্রধানত লাল বাহিনী কারণে।

৩১. ডাকসুতে ছাত্রলীগের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীপহীদের ভিপি প্ৰার্থী ছিলেন মোঃ জিনাত আলী। মনি সমর্থকরা প্রার্থী করে শেখ শহিদুল ইসলামকে, যিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নিকটাত্মীয়ও ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। নির্বাচনে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম-মাহবুব জামান পরিষদ অধিকাংশ পদে জয়লাভ করে। মনি সমর্থক প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন মনিরুল হক চৌধুরী। আর সিরাজুল আলম খানের অনুসারীদের প্যানেলে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হন মোয়াজেম হোসেন খান মজলিশ ।

৩২. মনিরুল ইসলাম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সমাজতন্ত্র, ঢাকা, জ্যা পাবলিকেশন্স, ২০১৩, পৃ. ২২৯।

৩৩. মহিউদ্দিন আহমদ, এই দেশে একদিন যুদ্ধ হয়েছিল, সিডিএল, ২০০৬, ঢাকা, পৃ. ১৫২।

৩৪. ছাত্রলীগের এই অংশের তরফ থেকে তখন নতুন একটি শ্লোগানও শোনা যেত, কমরেড শেখ মুজিব লও লওলও সালাম। ছাত্রলীগে থেকে তারা যেভাবে নানান কর্মসূচির মাধ্যমে একাত্তর পূর্ববর্তীকালে শেখ মুজিবকে ক্ৰমাগত স্বাধীনতার ধারণার দিকে ঠেলে দিতে পেরেছিলেন এবারও তাঁকে নতুন ধারার শ্লোগানের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে-এমনি বিবেচনাবোধ দ্বারা তাড়িত হচ্ছিলো ছাত্রলীগের এই অংশ তখন। তাদের মাঝে এসময় আরেকটি পরিকল্পনাও কাজ করেছে। যেভাবে তারা একাত্তর-পূর্ববর্তী সময়ে স্বাধীনতার দাবী তুলে গতানুগতিক বামপন্থীদের রাজনৈতিক রণধ্বনি কেড়ে নিতে পেরেছিল, এবারও সমাজতান্ত্রিক দেশ গঠনের আওয়াজ তুলে এবং মুজিবকে কমরেডবানিয়ে মাঠ পর্যায়ের প্রথাগত কমিউনিস্টদের রাজনৈতিকভাবে নিক্রিয় করে ফেলা যাবে বলে মনে করত তারা। কিন্তু শেখ মুজিব তার অবস্থানেই রয়ে গেলেন-দ্বিধাবিভক্ত ছাত্রলীগের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রপন্থীদের সম্মেলনস্থলে গেলেন না তিনি। এভাবেই সিরাজ অনুসারীদের কমরেড শেখ মুজিব লও লও-লও সালামশ্লোগানের করুণ সমাপ্তি ঘটলো।

৩৫. মনিরুল ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৩৮

৩৬. সিরাজুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের তরফ থেকেই এই মন্তব্যটি পাওয়া [ যেহেতু জনাব খান সরাসরি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন না সে কারণে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল ]। এ ধরনের বিশ্লেষণ বর্তমান লেখক মাঠ পর্যায়ে অনেক জাসদ নেতার তরফ থেকে পেয়েছেন। সিরাজগঞ্জের জাসদ নেতা আবদুর রউফ পাতা বলেন, ‘আমি জেলে থাকতেই জাসদ গঠন ও এর রাজনীতি নিয়ে নিজের মধ্যে কিছু প্রশ্ন তৈরী হয়। আমি সেখান থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে আট পাতার একটা চিঠি লিখি। আমার ভেতরে প্রশ্ন ছিল-জাসদ কি স্বাধীনতা-উত্তর তারুণ্যের সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ধারণ করার জন্য তৈরী হয়েছে? না-কি  সেই আকাঙ্ক্ষাধারী তরুণদের একটি জালে আটকানো হয়েছে? আমার চিঠির উত্তরে আ ফ ম মাহবুবুল হক ১৩ পাতার উত্তর পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হতে পারিনি সেদিন।‘ বর্তমান লেখক কর্তৃক গৃহীত আবদুর রউফ পাতার সাক্ষাৎকার। সম্প্রতি জনাব পাতা মারা গেছেন ।

৩৭. উল্লেখ্য, এ সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ‘মুজিববাদ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ হিসেবে আবির্ভূত হয়। শেখ মনি তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলার বাণী’তে এবং তোফায়েল আহমেদ বিভিন্ন জনসভায় এ বিষয়ে প্রায়ই গুরুত্বের সঙ্গে আলোকপাত করতেন।

৩৮. শ্রমিক লীগের ভাঙ্গন প্রক্রিয়াটিও ছিল উত্তেজনাবহুল। এই সংগঠনটি বরাবর আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু তার একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা রুহুল আমীন ভূঁইয়া যখন সিরাজুল আলম খানদের পক্ষাবলম্বন করতে শুরু করেন তখন ৬ ডিসেম্বর তাঁকে আটক করা হয়। তবে হাজার হাজার উত্তেজিত শ্রমিক তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার রমনা থানা ঘেরাও করে ছাড়িয়ে নিয়ে যান তাঁকে।

৩৯. এই যোগাযোগ ঘটে উভয়ে সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থাতেই। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই যশোর-খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে জনসভা করে ভারতীয় বাহিনীর লুণ্ঠনের প্রতিবাদ করায় মেজর জলিলের সঙ্গে তৎকালীন কর্তৃপক্ষের দূরত্ব তৈরী এবং তাঁকে আটক করা হয়। পরে সামরিক আদালতে তাঁর বিচার হয়- যে আদালতের বিচারক ছিলেন লে. কর্নেল আবু তাহের। বিচার শেষে জলিল অভিযোগ থেকে নিস্কৃতি পেলেও সেনাবাহিনী ছেড়ে চলে আসেন তিনি। জলিলের বিচার শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই ১৯৭২ সালের আগস্টে আবু তাহের এডজুটেন্ট জেনারেলের পদ থেকে কুমিল্লা সেনানিবাসে বদলী হন ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে। সেখানে থাকাবস্থাতে এক মাস পর ২২ সেপ্টেম্বর তিনি সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। জলিলের মাধ্যমেই সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে আবু তাহেরের পরিচয় হয় বলে দাবী করেছেন গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, তাহের-জিয়া ও ৭ নভেম্বর, ঢাকা, প্রথম আলো, ২ জুন ২০১৩ ।

৪০. ডাকসুতে তিহাত্তরে জাসদপন্থী ছাত্রলীগের ভিপি প্ৰার্থী আ ফ ম মাহবুবুল হক ছিলেন ক্যাম্পাসে ভীষণ জনপ্রিয়। পুরো নির্বাচনে জাসদ তাকেই সামনে নিয়ে এসেছিল। ফলে ভোট গণনার সময় দেখা গেল ডাকসুসহ সকল হলে (শুধু জগন্নাথ হল ব্যতীত) মাহবুবুল হক-জহুর প্যানেলের প্রার্থীরা এগিয়ে আছে।

৪১. সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন [ তিনি সেদিন ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন]:…নির্বাচনের ফল আসার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যাচ্ছিলো সব হলে বিরোধীরা জয়ী হয়েছে। অথচ সারাদিন এলাকাজুড়ে শোনা গিয়েছিল শুধু ‘লেনিন-গামা’, ‘লেনিন-গামা’।…আসলে ব্যালট বিপ্লব হচ্ছিলো নীরবে।…হলগুলোতেই গণনা হয়েছে প্রথমে। ডাকসুরাটা গণনা হওয়ার কথা শেষে। সন্ধ্যার পরে, যখন ডাকসুর নির্দিষ্ট ব্যালট বাক্সগুলো নির্দিষ্ট স্থানে নেয়া হবে। হলের ফল দেখেই সন্দেহ রইল না ডাকসুতে ফল কি হবে।…কলা ভবনের চারতলায় গণনার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে, হঠাৎ করে সব বাতি নিভে গেল। পেছনের সিঁড়ি দিয়ে কে বা কারা এসে ব্যালট বাক্সগুলো নামিয়ে নিয়ে চলে গেল।…বোমার বিস্ফোরণও ঘটিয়েছিল ওরা। প্রতিরোধ করার মতো কেউ ছিল না।…চারতলার ঘর থেকে আমরা নিচে এলাম। উপাচাৰ্যও আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। কলাভবনের সামনে দেখলাম চীফ রিটার্নিং অফিসার প্রফেসর ওদুদুর রহমান গাড়িতে চড়ছেন। তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন এ ব্যাপারে জানার কৌতুহল ছিল। কে যেন বললো বত্ৰিশ নম্বরে। ঐ যাত্রার সত্যমিথ্যা জানা হয়নি।…’ দেখুন: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আত্মজীবনী: দুই যাত্রায় এক যাত্রী, সাপ্তাহিক। http://www.shaptahik.com/v2/print_publication/index.php?DetailsId=4128  [৮ জুন ২০১৩ তারিখে সংগৃহীত ]

[উৎসঃ আলতাফ পারভেজ, বাহাত্তরের বাংলাদেশঃ জাতীয় দ্বিধাবিভক্তির খোঁজে, নতুন দিগন্ত, ত্রয়োদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর, সমাজ-রুপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র,২০১৪, ঢাকা,  পৃঃ ১২৭-১৪১]

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

স্বাধীনতা পূর্ব শেখ মুজিব চরিত্রের মূল্যায়নঃ‘বাঘছাল গায়ে ছদ্মবেশী সংগ্ৰামী’– আবদুল গাফফার চৌধুরী

হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা ডা. কালিদাস বৈদ্যের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে কিছু অজানা তথ্য, দেখুন;

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধেঃ অন্তরালের শেখ মুজিব 

জাসদ-সিপিবি-ইত্তেফাকের মূল্যায়নে আগষ্ট ১৯৭৫ হত্যাকান্ড– মহিউদ্দিন আহমদ

‘আমরা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পতন চেয়েছি ও রক্তাক্ত বিরোধিতা করেছি’-জাসদ

জাসদের উত্থান, বেহাত বিপ্লব ও পতনের ইতিহাস–  মহিউদ্দিন আহমদ

স্বাধীনতা উত্তর প্রশাসনের অভ্যন্তরে কি হয়েছিল জানতে দেখুন;

Making a Common Cause: Public Management and Bangladesh–Dr. Kamal Siddiqui

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion