ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পর্যালোচনা-পর্ব ৪ঃআলীয়া মাদ্রাসার সংকট

পর্ব ১ঃ মুঘল আমলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পর্ব ২ঃ বৃটিশ উপনিবেশ শাসনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা

পর্ব ৩ঃ  কওমী মাদ্রাসার ইতিহাস ও সংস্কার প্রসঙ্গ

আলীয়া মাদ্রাসার সংকট

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিং ১৭৮০ সালে কলকাতায় আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৮১ থেকে ১৮১৯ সাল পর্যন্ত আলিয়া মাদ্রাসা ‘বোর্ড অব গভর্নরস’ দ্বারা এবং ১৮১৯ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত ইংরেজ সেক্রেটারি ও মুসলমান সহকারি সেক্রেটারির অধীনে ‘বোর্ড অব গভর্নরস’ দ্বারা পরিচালিত হয়। ১৮৫০ সালে আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যক্ষের পদ সৃষ্টি হলে ড. এ. স্প্রেংগার মাদ্রাসার প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৮৫০ সাল থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজ কর্মকর্তাগণ এ পদ অলঙ্কৃত করেন। ১৯২৭ সালে শামসুল উলামা খাজা কামালউদ্দীন আহমদ সর্বপ্রথম এ মাদ্রাসায় মুসলমান অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। (আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী, ২০১৪)

শুরুতেই ফিরাংগী মহলের দারস-ই-নিজামী কারিকুলাম গ্রহন করে আলীয়া। সেটা ১৭৯০ সাল পর্যন্ত চলে।১৭৯২ সালে আলীয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের পদচ্যুতির মাধ্যমে কারিকুলামে প্রথম পরিবর্তন আনা হয়। ১৮২৪ সালে আলীয়া মাদ্রাসায় ইংরেজি চালু করার সীদ্ধান্ত হয়,যা বাস্তবায়িত হয় ১৮২৬ সাল থেকে এবং ১৮৫১ সাল পর্যন্ত চলে(Ali Riaz, 2010)।

মনে রাখা ভাল, আলীয়া মাদ্রাসা যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন শাসন ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে।আইনত তাঁদের কোন স্কুল, কলেজ করার কথা ছিলনা।কিন্তু প্রশাসন চালাতে প্রয়োজনীয় লোক তৈরির জন্যই তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে থাকে।আলীয়া আলীয়া মাদ্রাসাও সেই উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়।মোহামেডান আইন অনুসারে মুসলিমদের পারিবারিক, বিবাহ, ওয়ারিস সম্পত্তি ইত্যাদি বিষয়ে দেখভালের জন্যই আলীয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত ও সরকারী মর্জি মাফিক চলতে বাধ্য হওয়ার কারণে আলীয়া মাদ্রাসাকে বারবার ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

১৯১৪ সালে অধ্যক্ষ শামসুল উলামা আবু নসর ওয়াহিদের নেতৃত্বে গঠিত মোহমেডান এডুকেশন অ্যাডভাইজরি কমিটি কর্তৃক প্রণীত কারিকুলামে ওল্ড স্কিমনিউ স্কিম ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয় এবং ১৯১৫ সালে তা বাস্তবায়িত হয়। মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্যে জুনিয়র ও সিনিয়র নামে দু’ধরনের নিউ স্কিম মাদ্রাসা চালু হয়। জুনিয়র মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আর সিনিয়র মাদ্রাসায় মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হতো। এসব সিনিয়র মাদ্রাসার পাঠক্রমে ইংরেজি ভাষাকে বাধ্যতামূলক করে সরকারি সাহায্যভুক্ত করা হয়। সরকারি চাকুরি পেতে মুসলিম শিক্ষার্থীরা নিউ স্কিম মাদ্রাসায় পড়তে বিশেষ আগ্রহী ছিল(আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী,২০১৫)।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার উজ্জ্বল চরিত্র আবু জাফর শামসুদ্দীন তাঁর একটি আত্মজৈবনিক সাক্ষাতকারে নিউস্কিম মাদ্রাসার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন;   ”১৯২৫ সালে জুনিয়র মাদ্রাসা পাস করে ঢাকায় এসে ক্লাস সেভেনে ঢাকা মাদ্রাসায় ভর্তি হই। তখন আমাদের মতো পরিবারের ছেলেদের বেশির ভাগকেই মাদ্রাসায় পড়তে যেতে হতো। লিবারেল এডুকেশনে যাওয়া বেশ কঠিন ছিল। মুসলমান পরিবারের ছেলেরা হাই মাদ্রাসা পাস করে জেনারেল লাইনের কলেজে পড়াশোনা করতে পারত। যেমন আমি মাদ্রাসা লাইনে লেখাপড়া করে কলেজে চলে যাই। মওলানা আবু নাসের ওয়াহিদ মাদ্রাসা ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তাভাবনার উন্মেষে অবদান রেখেছিলেন। আমরা মাদ্রাসার ছেলেরা নিজেরাও ডিবেটিং সোসাইটি ইত্যাদি গড়ে তুলেছিলাম। আরবি, উর্দু, বাংলা এমনকি ইংরেজি ভাষাতেও আমরা বিতর্কসভার আয়োজন করতাম।” তবে  নিউ স্কিম ও ওল্ড স্কিম মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করা শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য ছিল, সেটা উল্লেখ করে তিনি বলেন;

”সাধারণ্যে এ রকমের একটা ধারণা ছিল যে মাদ্রাসাগুলো রক্ষণশীলতার দুর্গ। আসলে সেটা ঠিক ছিল না। আমি মাদ্রাসাগুলোকে ঠিক রক্ষণশীলতার দুর্গ বলে মনে করি না, বরং আমরা এই ঢাকা মাদ্রাসার ছেলেরা ওল্ড স্কিম মাদ্রাসা যেটা, অর্থাত পুরোনো সোবের মাদ্রাসার ছাত্রদের খুব একটা ভালো চোখে দেখতাম না।” (আবু জাফর শামসুদ্দীন, ১৯৮৫)

Alia

১৯৪৭ সালে আলিয়া মাদ্রাসা কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দেখা যায় নিউ স্কিম মাদরাসা সিলেবাসে কোরআন, হাদীস ও আরবী বিষয়ের তুলনায় সাধারণ বিষয়সমূহ বেশি বেশি করে সিলেবাসভুক্ত করা হয়, যেমন ১০টি বিষয়ের মধ্যে ৮টি সাধারণ বিষয় বাকি ২টি বিষয় আরবী। ১৯৫৮ সনে প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের নেতৃতে পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষা সংস্কারে গঠন করে শিক্ষা কমিশন। কমিশন তার চূড়ান্ত রিপোর্টে  নিউ স্কিম মাদরাসাকে বিলুপ্তির সুপারিশ করে। কমিশন তার রিপোর্টে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে, নিউ স্কিম মাদরাসার সিলেবাসে অধিকাংশ বিষয় সাধারণ বিষয়; আরবী বিষয় মাত্র ২টি, নিউ স্কিম মাদরাসা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ কর্তৃপক্ষ করা হয়েছে স্কুল বোর্ডকে তাছাড়া মাদরাসা তথা কোরআন-হাদীসের শিক্ষার জন্য ওল্ড স্কিম মাদরাসা রয়েছে। উক্ত সুপারিশের প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার নিউ স্কিম মদরাসা বন্ধ করে দেয় (অধ্যাপক আবদুছ ছবুর মাতুব্বর,২০১৫)।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই আলিয়া মাদ্রাসায় সংস্কার চলতে থাকে।তবে এই সংস্কারের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়ন বা ভাল স্কলার তৈরির জন্য নয়।বরং সরকারী স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে সাধারন শিক্ষা ধারার প্রায় সব বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হয়। ফলে ছাত্রদেরকে কুরআন-হাদীস ও আরবী বিষয়গুলো অতিরিক্ত পড়তে হয়। এটা করতে গিয়ে খুব দ্রুত সিলেবাস শেষ করাই থাকে উদ্দেশ্য। সামগ্রিকভাবে বর্তমান সমাজের সমস্যার আলোকে সেসবের বাস্তবায়ন নিয়ে চিন্তা করার সু্যোগ নেই বললেই চলে। এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে মানার চেয়ে জানার এবং পরীক্ষায় পাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে অধ্যয়ন।

অধ্যাপক আবদুছ ছবুর মাতুব্বরের মতে, ‘আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার বর্তমান হাল নিউ স্কিম মাদরাসা থেকে খুব বেশি ব্যতিক্রম নয়। সিলেবাসের মধ্যে সাধারণ বিষয় ও আরবী বিষয়ের আনুপাতিক অবস্থান যথাক্রমে ৮০:২০। ফাজিল ও কামিল শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অপরদিকে ডিগ্রি ও মাস্টার্স কলেজের শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনামূলক জরিপ সুখকর নয়’।তিনি আশংকা প্রকাশ করেন বলেন আলীয়া মাদ্রাসা হয়ত নিউ স্কিম মাদ্রাসার ভাগ্য বরন করতে পারে।  

২০০৭ সালে মাদ্রাসার সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৯,৪৯৩টিতে। তন্মধ্যে দাখিল ৬,৭০০টি, আলিম ১,৪০০টি, ফাযিল ১,০৮৬টি এবং কামিল ১৯৮টি। Islamic University (Amendment) Act, 2006  মোতাবেক সাধারণ শিক্ষার সাথে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা সমন্বিত করার কারণে ফাযিল (ডিগ্রি) ৩ বছর এবং কামিল (স্নাতকোত্তর) ২ বছর মোট ৫ বছরের কোর্স চালু হয়েছে। তাই  সিদ্ধান্ত হয় যে, ২০০৬ সালের পর থেকে মাদ্রাসা বোর্ড শুধু দাখিল ও আলিম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করবে। উক্ত আইন অনুসারে ১,০৮৬টি ফাযিল ও ১৯৮টি কামিল মাদ্রাসা অর্থাৎ ১,২৮৪টি মাদ্রাসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হয়।এতে সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষার দীর্ঘ দিনের বিরাজমান পার্থক্য দূরীভূত হয়।(আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী,২০১৫)।

বিরাজমান পার্থক্য দূর হলেও অদূর ভবিষ্যতে আলীয়া মাদ্রাসার ফাজিল ও কামিল শ্রেণী বন্ধ করে দিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিস ডিপার্টমেন্টের সাথে একীভূত করে দিলে আশ্চার্য হওয়ার কিছু থাকবেনা।অন্যদিকে দাখিল ও আলিম শ্রেনীর সাথে এসএসসি ও এইচএসসির কারিকুলামে পার্থক্য অতি সামান্য।আর মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি মিডিয়ায় নেতিবাচক উপস্থাপনা,বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে এবং চাকুরীতে যে বৈষম্য চলছে তাতে আগামীতে মাদ্রাসায় ছাত্র ভর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

রেফারেন্স

Ali Riaz, Madrassah Education in Pre-colonial and Colonial South Asia, Journal of Asian and African Studies 46(1) 69–86, 2010

আবু জাফর শামসুদ্দীনের সাক্ষাত্কার, আমার সাংবাদিকতা জীবন, দেশভাগ ও তত্কালীন সমাজ, প্রতিচিন্তা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৩

অধ্যাপক আবদুছ ছবুর মাতুব্বর, আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা দিবস, দৈনিক সংগ্রাম, ০১ অক্টোবর, ২০১৫, http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=206446

আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী,  আলিয়া মাদ্রাসা, বাংলাপিডিয়া, সর্বশেষ আপডেট , ৫ মে ২০১৪

আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী, মাদ্রাসা, বাংলা পিডিয়া,সর্বশেষ আপডেট ৪ মার্চ ২০১৫,

(চলবে)

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ 

ইংরেজ কর্তৃক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস নিয়ে জানতে পড়ুন

জমিদারি শোষণের স্মৃতি ও চিরস্থায়ী যন্ত্রণার বন্দোবস্ত-পর্ব ৩

বাংলাদেশে ধারা বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার স্বরূপ ও তা সমন্বয়ের প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion