বাংলা, বঙ্গ, বঙ্গালা থেকে বাংলাদেশ-শেষ পর্ব

পর্ব ১ঃ বাংলা নামের উৎপত্তি  পর্ব ২ঃ বঙ্গের ভৌগলিক অবস্থান নির্ণয়  পর্ব ৩ঃ বঙ্গ থেকে বঙ্গালা পর্ব-৪ঃ ‘বঙ্গালানামের উৎপত্তি কিভাবে হল

লিখেছেন; প্রফেসর আবদুল করিম*

প্রশ্ন হয়, মুসলমানেরা বঙ্গালা নাম পাইলেন কোথায়? এমন না যে সুলতান শামস-উদ-দীন ইলিয়াস শাহ সংবিধান জারি করিয়া দেশের নামকরণ করেন, যেমনটি বর্তমান যুগে করা হয়। ‘বঙ্গালা’ নামটি হয় বিবর্তনের মাধ্যমে, নিশ্চয়ই ‘বঙ্গালা’ নাম দেওয়ার কিছু ঐতিহাসিক কারণ ছিল। দক্ষিণ ভারতীয় লিপিতে ‘বঙ্গালা’, ‘বঙ্গাল দেশ’ পাওয়া যাইতেছে এবং এই ‘বঙ্গাল’ নামটা অন্ততপক্ষে নয় শতক (নেসারীলিপি) হইতে প্ৰচলিত হয়। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে প্রাচীন লিপির ‘বঙ্গাল’ বিবর্তিত হইয়া ‘বঙ্গালা’ নামের উৎপত্তি হইয়াছে।

প্রাক-মোগল যুগে বিদেশী সূত্রে ‘বঙ্গালা’ নাম অনেক পাওয়া গেলেও ‘বাংলা’র অভ্যন্তরীণ কোন সূত্রে ‘বঙ্গালা’ নাম পাওয়া যায় না। সমসাময়িক কালে লিখিত ‘বাংলা’র কোন ইতিহাস বা অন্য কোন দলীল আবিষ্কৃত হয় নাই। অবশ্য এই কথা ঠিক যে দেশের অভ্যন্তরে, বিশেষত শাসকবর্গের কাছে ‘বঙ্গালা’ নাম চালু ছিল, নচেৎ একাধিক বিদেশী সূত্রে এই একই নাম পাওয়া যাইত না। তবে আশ্চর্যের বিষয় এই যে বাংলা সাহিত্যেও বঙ্গালা বাবাঙ্গালানামের ব্যবহার দেখা যায় না।

মোগল আমলে ‘বঙ্গালা’ নামের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, আকবরের আমলে ‘বঙ্গালা’ নাম অঙ্কিত মুদ্রা প্রচলিত হয়, আবুল ফজল ‘বঙ্গালা’ নামের তাৎপৰ্য ব্যাখ্যার প্রয়াস পান, প্রাদেশিক শাসনকর্তারা ‘বঙ্গালা’র সুবাদার রূপে অভিহিত হইতে থাকেন, মোগল এবং মোগল আমলের আফগান ঐতিহাসিকেরা ‘বঙ্গালা’ নামই ব্যবহার করেন, কিন্তু মোগল আমলেও বাংলা সাহিত্যে (অন্তত আঠার শতকের গোড়া পর্যন্ত) ‘বঙ্গালা’ নামের ব্যবহার দেখা যায় না। সুলতানী আমলে বাংলার সুলতানকে গৌড়েশ্বর বলা হইত এবং বাংলার বিভিন্ন অংশকে পূর্ব নামে, অর্থাৎ, বরেন্দ্র, রাঢ়, বঙ্গ ইত্যাদি রূপে উল্লেখ করা হয়।

কৃত্তিবাস ‘বঙ্গ’-এ প্রমাদের কথা বলেন, তাঁহার পূৰ্বপুরুষ নরসিংহ ওঝার গঙ্গাতীর আশ্ৰয় নেওয়ার কথা বলেন, গঙ্গা পার হইয়া বরেন্দ্রে গুরুগৃহে যাওয়ার কথা বলেন, গৌড়েশ্বরের দরবারে যাওয়ার কথা বলেন, কিন্তু কোথাও ‘বঙ্গালা’ নাম ব্যবহার করেন নাই, যদিও ‘বঙ্গালা’ নাম কৃত্তিবাসের সময়ের আগে হইতে প্রচলিত হয়।

বিজয়গুপ্ত মুল্লুক ফতোয়াবাদ-এ বাঙ্গরোড়া তকসীমের কথা বলেন, গৌড়েশ্বরের কথা বলেন, কিন্তু ‘বঙ্গালা’ উল্লেখ করেন নাই, যদিও লক্ষ্য করার বিষয় এই যে ডি. সি. সরকার বাঙ্গরোড়াকে তাঁহার চিহ্নিত ‘বঙ্গাল’ দেশের মধ্যে অবস্থিত বলিয়া মত প্রকাশ করেন।মুকুন্দরাম আকবর বাদশাহ, ডিহিদার মামুদ শরীফ এবং রাজস্ব কর্মকর্তাদের অত্যাচারের কথা বর্ণনা করেন, কিন্তু ‘বঙ্গালা’ কোথাও বলেন নাই।

মুসলমান কবিরা ‘বঙ্গ’, ‘বাঙ্গালী’ এবং ‘বাঙ্গালা’ ভাষার কথা বলেন, কিন্তু দেশ বুঝাইতে ‘বঙ্গ’ই ব্যবহার করেন, ‘বঙ্গালা’ বা ‘বাঙ্গালা” নয়।

সৈয়দ সুলতান “কর্মদোষে বঙ্গেত বাঙ্গালী উত্তৰ্পন”, অর্থাৎ ‘বঙ্গ’ ও ‘বাঙ্গালী’র কথা বলেন; নসরুল্লাহ খোন্দকার ‘গৌড়দেশে বাঙ্গু (বঙ্গ) নাম’ বলেন; আবদুল হাকিম ‘বঙ্গেতে’ জন্মিয়া যাহারা ‘বাঙ্গালা’ ভাষা ঘৃণা করে তাহাদের গালমন্দ করেন, কিন্তু আলাওল ‘মুল্লুক ফতোয়াবাদ গৌড়েতে প্রধান’ বলেন।

sulatani amal

চৈতন্যচরিতকারগণ রাঢ়, উড্র দেশের কথা বারবার বলেন, কিন্তু ‘বঙ্গালা’ দেশের কথা বলেন নাই; তাঁহারা মাঝে মাঝে শ্ৰীহট্ট ও চট্টগ্রামের কথাও বলেন, কিন্তু ‘বঙ্গালা’র উল্লেখ করেন নাই। কৃষ্ণরাম রাঢ়, বঙ্গ, কলিঙ্গ এবং নেপাল দেখার কথা বলেন,৬০ কিন্তু ‘বঙ্গালা’ বলেন নাই।

আঠার শতকে বাংলা সাহিত্যে ‘বঙ্গালা’ বা ‘বঙ্গালা’ নামের ব্যবহার কিছু কিছু দেখা যায়, যেমন ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে আছে, “কাঙ্গাল হইনু সবে বাঙ্গালায় এসে। শির বেচে টাকা করি তাও যায় ভেসে।”৬১ নরসিংহ লিখেন, “বাঙ্গালায় বীরভূম বিখ্যাত অবনি।”৬২

ফলে দেখা যায় যে মধ্যযুগের বাঙ্গালী কবিদের মধ্যে ‘বঙ্গালা’ (বা বাঙ্গালা) নামের প্রতি আকর্ষণ ছিল না, শুধু আঠার শতকে আসিয়াই তাঁহাদের লেখায় ক্বচিৎ ‘বঙ্গালা’ নাম পাওয়া যায়। অবশ্য আঠার শতকে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হইয়াছে, গৌড় অনেক আগেই পরিত্যক্ত এবং ধ্বংসস্তুপে পরিণত; রাজধানী তাণ্ডা, রাজমহল এবং ঢাকা ঘুরিয়া মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়। মোগল শাসন পাকাপোক্ত হওয়ায়, মোগল রাজস্ব ব্যবস্থা গ্রামেগঞ্জে ছড়াইয়া পড়ায়, মোগল কর্মচারীদের মারফৎ ফরমান, সনদ, পরওয়ানা ইত্যাদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছিয়া যায়, সুবা ‘বঙ্গালা’র নামও চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে।

মোগল রাজ সরকারে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য ফার্সী ভাষা শিক্ষার প্রবণতা বাড়িয়া যায়; হিন্দুরাও অধিক সংখ্যায় ফার্সী শিখে। ইউরোপীয়দের, বিশেষ করিয়া ইংরেজদের বাণিজ্যিক তৎপরতা বৃদ্ধির ফলে তাহাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক এই দেশীয় লোক-যেমন উকিল, দালাল, পাইকার, দাদনদার, তাঁতী ইত্যাদি, বিদেশীদের দেওয়া বেঙ্গল নামের সঙ্গে পরিচিত হয়।

প্রফেসর আবদুল করিম
প্রফেসর আবদুল করিম

মুর্শিদকুলী খানের সময় হইতে, বিশেষ করিয়া মুর্শিদকুলী খানের পরে বাংলা কাৰ্যত স্বাধীন হইয়া যায়, হিন্দুরা উচ্চ রাজপদ, এমন কি রায়রায়ান পদও অধিকার করে। ইহাদের পোষ্য ও তস্য-পোষ্যদের কাছেও সুবা বঙ্গালার নাম প্রিয় হইয়া উঠে। সুতরাং সুবা ‘বঙ্গালা’র নাম শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ না থাকিয়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রচারিত হয়। ‘বঙ্গালা’ নাম অফিস আদালত এবং সর্বত্র প্রসার লাভ করে।

“বঙ্গালা” নামের প্রতি মধ্যযুগের বাঙ্গালী কবিদের আকর্ষণ না থাকায় কারণ বোধ হয় ‘বঙ্গালা’ নামের উৎসেই নিহিত। আগেই বলা হইয়াছে যে প্রাচীন দক্ষিণী তাম্রলিপিতে ‘বঙ্গালা’ এবং ‘বঙ্গাল দেশ’-এর উল্লেখ আছে।

আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে এই প্রসঙ্গে নিবেদন করিতে চাই যে প্রাচীন লিপির ‘বঙ্গাল” দ্বারা বঙ্গাল দেশ না বুঝাইয়া ‘বঙ্গ’-এর অধিবাসী ‘বঙ্গাল’ বুঝান হইয়াছে এবং ‘বঙ্গাল দেশ’ দ্বারা ‘বঙ্গাল’দের দেশ বুঝান হইয়াছে। ‘বঙ্গ-এর অধিবাসী ‘বঙ্গী’ রূপে পরিচিত না হইয়া ‘বঙ্গাল’ বা বাঙ্গাল রূপেই পরিচিতি লাভ করে।

‘মানিকচন্দ্র রাজার গান’-এ আছে, “ভাটি হৈতে আইল বাঙ্গাল লম্বা লম্বা দাড়ি।‘’৬৩ মুকুন্দরামও ভাল নাবিকরূপে ‘বাঙ্গাল’দের উল্লেখ করেন।৬৪ ‘বঙ্গ’-এর অধিবাসীদের বুঝাইবার জন্য ‘বঙ্গী’ উল্লেখ পাওয়া যায় না।

সুতরাং ‘বঙ্গ’-এর অধিবাসী ‘বঙ্গাল’ কিন্তু কোন কোন সময় বা কোন কোন এলাকায় ‘বঙ্গাল’ (বা ‘বাঙ্গাল’) অবজ্ঞার সুরে ব্যবহৃত হয়। নেসারীলিপি বা তিরুমালাইলিপিতে অবজ্ঞার সুর ছিল, কারণ উভয় লিপিতে ‘বঙ্গাল’ রাজার পরাজয়ের কথা বলা হইয়াছে। চর্যাগীতিতে ভুসুকুর পদে ‘বঙ্গল’, ‘বঙ্গালী’ অবজ্ঞার অর্থে ব্যবহৃত।

ডঃ আহমদ শরীফ বলেন, “তেমনি অবজ্ঞা বর্তমান গঙ্গার পূর্ব-দক্ষিণ পাড়ের লোকের প্রতি। আজো চট্টগ্রামে বাঙাল বলতে ঐতিহ্য আভিজাত্য সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিহীন লোক ও পরিবার বুঝায়। অবশ্য বঙ্গ, বঙ্গাল ও বঙ্গালীর ব্যবহারও রয়েছে…।” ভুসুকুর বঙ্গাল, বঙ্গালী সম্পর্কে তিনি বলেন, “এর মধ্যে নিন্দা ছাড়া আর কিছুই নেই। এবং কোন বাঙ্গালী কবি এই সব পদ রচনা করতে পারেন না।৬৫

এই ঢাকা শহরেই পঞ্চাশের দশকে দেখিয়াছি, ঢাকার মূল অধিবাসীরা ঢাকার বাহির হইতে আগত সকলকে অবজ্ঞা করিয়া ‘বঙ্গাল’ বলিত।ইহার জবাবে বাহিরের লোকেরা ঢাকার লোকদের ‘ইংলিশম্যান’ বলিত।

১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হওয়ার প্রাক্কালে বাউণ্ডারী কমিশনের নিকট এ. কে. ফজলুল হক ভাগীরথী নদীকে সীমানা নির্ধারক করার স্বপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করিয়া বলেন যে ভাগীরথীর পশ্চিম এবং পূর্ব অংশে সংস্কৃতিগত প্ৰভেদ রহিয়াছে; পশ্চিম অংশে লোকেরা পূর্ব অংশের লোককেবাঙ্গালএবং পূর্ব অংশের লোকেরা পশ্চিম অংশের লোককে ঘটি বলিয়া ডাকে। মুকুন্দরামের ‘বঙ্গাল” উল্লেখ লক্ষ্য করে ডি. সি. সরকার বলেন যে মুকুন্দরাম পশ্চিমবঙ্গের লোক এবং তাঁহার অঞ্চলের লোকেরা পূর্ববঙ্গের যে কোন জিলার লোককে ‘বাঙ্গাল’ বলে।৬৬

এই ‘অবজ্ঞার পাত্র ‘বঙ্গাল’ হইতেই যেহেতু ‘বঙ্গালা’ বা ‘বাঙ্গালা’ নামের উৎপত্তি, সেহেতু ঐ নামের প্রতি মধ্যযুগের কবিদের আকর্ষণ থাকার কথা নয়। তাঁহারা গৌড়কে আকড়িয়া ধরেন, পরে গৌড় একেবারে ধ্বংস হইয়া গেলে তাঁহারা নিজ নিজ এলাকা যেমন, বঙ্গ, রাঢ় এবং পরে আরও ছোট ছোট অঞ্চল, দামুনা, বাঙ্গরোড়া, ভুরসুট, এমনকি মুসলমান আমলের নাম ফতোয়াবাদকেও উল্লেখ করিতে দ্বিধাবোধ করেন নাই।

মুসলমানদের আগমনের সময় পূর্ব ভারতের এই অংশ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, বরেন্দ্র,রাঢ়, সমতট, কামরূপ ইত্যাদি।মুসলমান ঐতিহাসিকেরা এই নামগুলি গ্রহণ করেন, অবশ্য ফার্সী লেখায় ধ্বনিগত কিছু পরিবর্তন হয়, যেমন বরিন্দ, রাল, বং, সনকনত বা সকোনত এবং কামরূদ বা কামরু। প্রথম মুসলমান রাজ্য লখনৌতি নামে অনেক দিন পরিচিত ছিল, কিন্তু ‘বঙ্গ’ অধিকৃত হওয়ার পরে তাহারা দেখে যে ‘বঙ্গাল’ শব্দটি বহুল প্রচলিত এবং এই শব্দ দ্বারা ‘বঙ্গ’-এর জনগণকে বুঝায়।

প্ৰথম ‘বঙ্গালা’ উল্লেখ্যকারী মুসলমান ঐতিহাসিক বরনীর তারিখ-ই-ফীরুজশাহীতে পাই ‘আবু-বঙ্গাল’ বা বঙ্গালদের পিতা, এবং এখানে ‘বঙ্গাল’ দ্বারা ‘বঙ্গাল’ জাতির পরিচয় দেওয়া হয়। এই ‘বঙ্গাল’ হইতেই ‘বঙ্গালা’। বরনীও হয়তো অবজ্ঞার অর্থেই ‘বঙ্গাল’ ব্যবহার করেন, কারণ দিল্লীর সুলতানের প্রতিদ্বন্দী ‘বাংলা’র সুলতানকে তিনি সিয়াহ (কাল) এবং ভাঙখোর বলে গালমন্দ করেন এবং ‘বাংলা’কে বলগাকখানা (বিদ্রোহী অঞ্চল) রূপে চিত্রিত করেন।

ফার্সী ভাষায় ‘বঙ্গাল’ এবং ‘বঙ্গালা’ শব্দের পার্থক্য শুধু একটি অক্ষর। অন্তে হ অক্ষরটি কোন কোন সময় উচ্চাতি হয়, কিন্তু প্রায় সময় উচ্চারিত হয় না। উচ্চারিত হইলে তা জাহেরী (বা প্রকাশ্য), কিন্তু অনুচ্চারিত থাকিলে মখকী (বা অপ্ৰকাশ্য) রূপে পরিচিত। এই হ অক্ষরের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে; তন্মধ্যে একটি হইল এজাফত-এর জন্য বা বিশেষ্যের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয় করার জন্য তাহা ব্যবহৃত হয়।৬৭

এখানেও জিয়া-উদ-দীন বরনী এবং শামস-ই-সিরাজ আফীফ ‘বঙ্গাল’দের সঙ্গে সম্পর্ক নিরূপণের জন্য বা ‘বঙ্গাল’দের দেশ পরিচয় দেওয়ার জন্য (হ) অক্ষরটি যোগ করেন, যেমন ‘বঙ্গাল’ ‘বাঙ্গালাহ’, ‘হ অনুচ্চারিত থাকে, সুতরাং ‘বঙ্গালা’।৬৮ ফার্সী ভাষায় ‘বঙ্গালা’ শব্দের প্রথম অক্ষর ‘বে’-এর উপর জবর; বাঙ্গালা ভাষায় জবর-এর জন্য ‘আ’ ব্যবহার করা হয়, যেমন ‘রসূল’কে ‘রাসূল’; ‘রহমত’কে ‘রাহমত’; ‘হাজার’কে ‘হাজার’; খজনা’কে ‘খাজানা’ লিখা বা বলা হয়। সুতরাং ‘বঙ্গালা’ বঙ্গালা ভাষায় ‘বাঙ্গালায়’, রূপান্তরিত হইয়াছে।৬৯

এখন আমরা আমাদের আলোচনা শেষ করিতে পারি। আমরা দেখিয়াছি যে প্রাচীন ‘বঙ্গ’ রাজ্যের সীমানা উত্তরে ব্ৰহ্মপুত্র, পূর্বে ব্ৰহ্মপুত্র ও মেঘনা, পশ্চিমে ভাগীরথী ও করতােয়া এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই সম্পূর্ণ এলাকা (ভাগীরথীর পূর্ব তীরে কিছু অংশ বাদ দিয়া) বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার যে বলিয়াছেন, “ইতিহাসের দিক হইতে পূর্ববঙ্গের ‘বাংলাদেশ’ নাম গ্রহণের কোন যৌক্তিকতা নাই” বা “বর্তমান পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রনায়কগণ ইতিহাস ও ভূগোলকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া আবেগের দ্বারা পরিচালিত হইয়া তাঁহাদের দেশের ‘বাংলাদেশ’ নাম গ্রহণ করিয়াছেন”, এই কথাগুলি ইতিহাস ও ভূগোলের আলোকে সত্য নয়।

দ্বিতীয়ত আমরা দেখিয়াছি যে ‘বঙ্গালা’ নাম ‘বঙ্গ’-এর অধিবাসী ‘বঙ্গাল’ বা বাঙ্গাল হইতে আসিয়াছে অথবা বলিতে পারি ‘বঙ্গাল দেশ’ (অর্থাৎ ‘বঙ্গাল’দের দেশ) কথাটির ফার্সী রূপ বঙ্গালা’। প্রাচীন কালে বা কোন কালে ‘বঙ্গালা’নামে আলাদা কোন দেশ বা ভূভাগ ছিল না। ডঃ মজুমদার বলিয়াছেন, “বাংলার পূৰ্বরূপ বাঙ্গালা নাম মুসলমানদের দেওয়া-নামটি বাংলার একটি ক্ষুদ্র অংশের নাম ‘বঙ্গাল’ শব্দের অপভ্রংশ, ইহা বঙ্গ শব্দের মুসলমান রূপ নহে।” এই বক্তব্যের মধ্যে,

(ক) “বাংলার পূর্বরূপ বাঙ্গালা নাম মুসলমানদের দেওয়া,” কথাটি সত্য।

(খ) “নামটি বাংলার একটি ক্ষুদ্র অংশের নাম ‘বঙ্গালা’ শব্দের অপভ্রংশ”, কথাটি সত্য নয়, কারণ ‘বঙ্গাল’ নামে বাংলার বা ‘বঙ্গ’-এর কোন ক্ষুদ্র অংশ ছিল না। আমরা দেখিয়াছি যে ডঃ মজুমদার কর্তৃক প্রদত্ত ‘সিটি অব বেঙ্গালা’র পরিচিতি গ্ৰহণযোগ্য নয়। “

(গ) ‘বাঙ্গালা’ ‘বঙ্গ’ শব্দের মুসলমান রূপ নহে কথাটি সত্য, কিন্তু প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটি  সত্য নয়, কারণ ‘বঙ্গ’ এলাকাই প্ৰথমে বঙ্গালা রূপ লাভ করে, যাহা পরে সারা ‘বাংলা’র জন্য প্রযোজ্য হয়।

তৃতীয়ত, ডঃ মজুমদার পূর্ববঙ্গের বাংলাদেশ নামকরণ করায় বাংলাদেশ সরকারের অধিকার এবং বিজ্ঞতার প্রশ্ন তুলিয়াছেন, কারণ তাঁহার ভাষায় পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বাংলাদেশ “আদিতে মুসলমানদের বাঙ্গালা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না (‘বঙ্গ ওয়া বাঙ্গালাহ’ তাহার প্রমাণ)” এই প্রশ্নের উত্তর আগেই দেওয়া হইয়াছে। ডঃ মজুমদারের এই উক্তি তথ্যভিত্তিক নয়; যেই ‘বঙ্গ’, ‘বঙ্গ’-এর অধিবাসী ‘বঙ্গাল’ হইতে মুসলমানদের ‘বঙ্গালা’, ‘বাঙ্গালা’ নামের উৎপত্তি, সেই ‘বঙ্গ’-এর প্রায় সম্পূর্ণ অংশই বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সুতরাং বাংলাদেশ নামকরণ মোটেই অযৌক্তিক নয়।

প্ৰসঙ্গত ‘বঙ্গ ওয়া বাঙ্গালাহ’ উক্তির জন্য ডঃ মজুমদার কোন সূত্র উল্লেখ করেন নাই, আমরা এই উক্তি মুসলমান ইতিহাসে খুঁজিয়া পাই নাই। এইরূপ উক্তি থাকিলেও (আছে বলিয়া মনে হয় না) কোন অবস্থাগত কারণে তাহা উক্ত হইয়াছে আমরা পরীক্ষা করিতে পারি নাই।

ডঃ মজুমদার আর কিছু মন্তব্য করিয়াছেন, যাহা আবেগের ব্যাপার। তিনি বলিয়াছেন, “অবিভক্ত বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতির গঠনে যাঁহারা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী অধিবাসী তাঁহাদের পূর্বপুরুষদের অবদানও যথেষ্ট ছিল।” এই বক্তব্যের সত্যতা কেহই অস্বীকার করিতে পারিবে না।

এই সকল মহৎ ব্যক্তির প্রতি আমরা শ্ৰদ্ধাশীল। ডঃ মজুমদারের জন্মস্থান ফরিদপুরে, তাঁহার মতো আরও অনেক জ্ঞানী-গুণী মনীষীর জন্মস্থান বর্তমান বাংলাদেশেই, তাঁহারা স্বেচ্ছা নির্বাসন না নিয়া জন্মস্থানে থাকিলে বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ হইত।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘকাল ধরিয়া বাঙ্গালা, বাংলাদেশ, বাঙ্গালী শব্দগুলি সমগ্ৰ Bengal বা বাংলা অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। সম্পূর্ণ সত্য কথা, তবে আমাদের  এখানে প্রতিপাদ্য বিষয় আমাদের দেশের ‘বাংলাদেশ” নামকরণের যৌক্তিকতা লইয়া। ডঃ মজুমদার আরও বলেন, “পশ্চিমবঙ্গকে বাদ দিয়া ‘বাংলাদেশ’ ও ইহার অধিবাসীদের বাদ দিয়া ‘বাঙ্গালী জাতি’ কল্পনা করা যায় না।” কথাটায় রাজনীতির সুর আছে, আমরা রাজনীতি আলোচনা করিতেছি না, কিন্তু স্মরণ করা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে বঙ্গদেশ ব্যবস্থাপক সভার হিন্দু সদস্যরা ১৯৪৭ সালে ‘বাংলা’ বিভাগের পক্ষে মত না দিলে বর্তমান রাজনৈতিক বিভাগের সৃষ্টি হইত না।

তথ্য নির্দেশঃ

৬০. D. C. Sen : History of the Bengali Language and Literature, 2nd edition, Calcutta, 1954,পৃ.৩২৩।

৬১. ঐ পৃ. ৫৭০

৬২. সুকুমার সেনঃ বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, প্ৰথম খণ্ড, অপরার্ধ, কলিকাতা, ১৯৬৫, পৃ. ১৮৫। নরসিংহ ১৭১৪ খ্ৰীষ্টাব্দে তাঁহার ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্য রচনা শুরু করেন। সুকুমার সেনের পুস্তকে ছাপার তুলে ১৬১৪ খ্ৰীষ্টাব্দে লিখা হইয়াছে। (ঐ, পৃ. ১৮৮)।

৬৩. Quoted in Studies, পৃ.১৩৫, টীকা ১।

৬৪. ঐ

৬৫. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ৪৪০।

৬৬. Studies, পৃ. ১৩৩, টীকা ১।

৬৭. Steingass, F. : A Comprehensive Perstan-English Dictionary, Fourth edition, London, 1957, পৃ. ১৪৮৪, অক্ষর দ্রষ্টব্য।

৬৮. ডি. সি. সরকার অন্য যুক্তিতে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তিনি বলেন, “There has been some discussion on the derivation of the name Bengal. But the conclusions are not satisfactory. Since the emergency of modern Hindi from its Apabhramsa stage, the speakers of Hindi and other Languages have been calling the Bengali-speaking area by the name of Vangal (without the final a in the last consonant), which has been transliterated by the English in their script as Bengal. The Muslims first came to India when the final a in the last consonant of the Sanskritic words in North Indian dialects was pronounced. The earlier pronunciation of Vangal, as is well-known, was Vangala which was naturally transliterated by the Muslims in their script as Bangalah (Pronouncing Bangala). This Muslim pronunciation of the name is directly responsible for the name Bangala now applied by the Bengalis to their country.” (Studies, পৃ. ১৩৮-৩৯)। কিন্তু মুসলিম আমলের আগে ‘বঙ্গালা’ কোন সূত্রে পাওয়া যায় না, ‘বঙ্গাল’ই পাওয়া যায়, তাহা ছাড়া মুসলিম ঐতিহাসিকদের ‘হ’ অক্ষরের ব্যাখ্যা সরকারের, এই বক্তব্যে নাই। অবশ্য সরকার নিজেও বলেন যে এই যুক্তি সন্তোষজনক নয়।

৬৯. ডি.সি. সরকার বলেন, “The people of Bengal is known elsewhere in India as Vangali which the English transliterated as Bengali or Bangalee and which the Bengalis have made Bangali in their language…It is interesting to note in this connection that, according to a general ethnological principle, the specific name of a tribe often originates among neighbouring tribes and is eventually adopted by the tribe to which it is applied.” (Studies, পৃ.১৩৯)।

৭০. মিনহাজ, পৃ. ৬৬।

৭১. মিরজা নাথন, বাহরিস্তান-ই-গায়বী, এম, আই, বোরাহ কর্তৃক অনূদিত, ভল্যুম ১, আসাম, ১৯৩৬, পৃ. ২৪৯-২৫২।

৭২. আইন-ই-আকবরী, ভল্যুম ২, জেরেট কর্তৃক অনূদিত, পৃ. ১৩৩।

৭৩. এই মানচিত্র এবং এই অধ্যায়ের উল্লিখিত অন্যান্য মানচিত্রের জন্য দেখুন, জে. এ. এস. পি. ভল্যুম ৮, নং ২, ১৯৬৩, পৃ. ২৪-এর পরে।

৭৪. এন. কে. ভট্টশালী, কয়েনস এ্যাণ্ড ক্রনলজী অব দি আর্লি ইন্ডিপেণ্ডেণ্ট সুলতানস অব বেঙ্গল, পৃ. ১৩৬-এ উদ্ধৃত।

৭৫. ঐ পৃ. ১৫৪-এ উদ্ধৃত।

৭৬. আ. রহীম, সোশ্যাল এ্যাণ্ড কালচারাল হিস্টরী অব বেঙ্গল, ভল্যুম ১, পৃ. ১৮-এ উদ্ধৃত।

৭৭. ঐ

৭৮. সুখময় মুখোপাধ্যায়, ৩য় সংস্করণ, পৃ. ৩৫১।

৭৯. জে এন. দাসগুপ্ত, বেঙ্গল ইন দি সিক্সটিনিথ সেঞ্চুরী, পৃ. ১১৭ ও পরে।

৮০. ঐ।

৮১. আ. রহীম, সোশ্যাল এ্যাণ্ড কালচারাল হিস্টরি অব বেঙ্গল, ভল্যুম ২, পৃ. ২১।

৮২. আইন-ই-আকবরী, ভল্যুম ২, জেরেট কর্তৃক অনূদিত, পৃ. ১৩২।

৮৩. ঐ, পৃ. ১৩৫-১৩৬

৮৪. এইচ. এ. আর. গিব কর্তৃক অনূদিত ইবনে বতুতার সফরনামা, পৃ. ২৬৭।

৮৫. জওহর আফতাবচী, তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াত, মইনুল হক কর্তৃক অনূদিত, পৃ. ৩০।

৮৬. আকবরনামা, ভল্যুম ৩, ইংরেজী অনুবাদ, পৃ. ২৯৩।

৮৭. তারিখ-ই-ফীরূজশাহী, মূল ফার্সী, পৃ. ৮২৷

[উৎসঃ প্রফেসর আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাসঃ সুলতানী আমল, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ঢাকা, ২০১৩, পৃ.২৮-৩২]

*আবদুল করিম (১ জুন, ১৯২৮- ২৪ জুলাই, ২০০৭) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য।  তিনি বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৭৩ – ১৯৭৫।  

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

বঙ্গ-ভাষার উপর মুসলমানের প্রভাব

কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও ১৯৪৭ সালের বাঙলা ভাগ – জয়া চ্যাটার্জী

হিন্দু অভিজাত শ্রেনীর বিশেষ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধার জন্যই  বাংলা ভাগ

অখন্ড বাঙলায় জিন্নাহ-মুসলিম লীগের সম্মতি, নেহেরু-কংগ্রেসের প্রবল আপত্তি

মধ্যযুগের মহাকবি সৈয়দ সুলতান ও তার কাব্য প্রসঙ্গ

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion