ইতিহাসের আলোকে ভারতের জাতীয়তা ও আঞ্চলিকতার প্রশ্ন

লিখেছেন; অমলেন্দু গুহ*

[প্রবন্ধটি লেখক কর্তৃক পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদের তৃতীয় বার্ষিক সম্মেলনের সাধারণ অধিবেশনে মুখ্য ভাষণ হিসেবে পঠিত। প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৮৭। দীর্ঘ প্রবন্ধটিকে মৌলিক কোন সম্পাদনা ছাড়াই কিছু অংশ বাদ দিয়ে সংক্ষেপিত করা হয়েছে।উপ -শিরোনামগুলো মূলধারা বাংলাদেশের দেয়া-সম্পাদক]

জাতি ও জাতীয়তাবাদ 

অমলেন্দু গুহ
অমলেন্দু গুহ, মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ

জাতি কি ? জাতীয়তাবাদই বা কি ? এক কথায় বলা যায়, স্বরাজ্যের দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে-ওঠা একই সংস্কৃতি ও মানসিকতা-সম্পন্ন জনসমষ্টিই জাতি, আর এই জনসমষ্টির পারস্পরিক আত্মীয়তাবোধের ভাবাবেগজনিত প্রকাশই জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। জাতি ও জাতীয়তাবাদ তো হাওয়ায় উড়ে আসেনা, শ্রেণীসমাজের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেই এর শিকড়, এবং একদিন এর লয় হবে। তাহলে, এর উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে কি কি বাস্তব উপাদান কারণ হিসাবে সক্রিয় ? সেগুলিকে সংজ্ঞাবদ্ধ করা যায় কি ? প্রচলিত কোনো সংজ্ঞা সম্পর্কেই সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে ঐকমত্য নেই। তবে, ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিটিতে ব্যাপারটা আপেক্ষিকভাবে পরিষ্কার।

ভারতের জাতীয় প্রশ্নের আলোচনায় প্রবেশের আগে, সাধারণভাবে আরো কিছু কথা বলে নিতে চাই। আমার মনে হয় ‘জাতি’র প্রচলিত নানা সংজ্ঞার মধ্যে স্তালিনের সংজ্ঞাই আপেক্ষিকভাবে সবচেয়ে বাস্তবানুগ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সংজ্ঞাও যান্ত্রিকতা দোষদুষ্ট। এই সংজ্ঞা অনুসারে ধর্মের ভূমিকা অবান্তর, কিন্তু ভাষাগত ঐক্য জাতিগঠনের অন্যতম আবশ্যিক শর্ত।

স্বয়ং লেনিনও জাতীয় বাজার সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভাষিক বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উল্লেখ করে এই বন্ধনকে জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান আবশ্যিক উপাদানই বলেছেন। কিন্তু তিনি কখনো ধারণাটিকে ছকে ফেলার চেস্টা করেননি। বরং দেখিয়েছেন যে সুইজারল্যাণ্ডের মতো দেশও আছে, যেখানে লোকেরা নানান ভাষায় কথা বলেন। তবু, ঐক্যের অন্যান্য উপাদানের মাধ্যমে ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত জাতীয় সংস্কৃতি ও সুনির্দিষ্ট ভূ-খণ্ডের আধারে সুইস জাতি সুপ্রতিষ্ঠিত। তাছাড়া, অনেক লেখায় লেনিন কাজাক, তাজিক ইত্যাদি জনসমষ্টিকে ‘মুসলমান জাতিগুলি’ বলতেও দ্বিধা করেন নি।

এর-ও আগে এ্যাঙ্গেলস তো স্পষ্টই বলেছেন, ভাষা সর্বত্র “জাতীয়তা নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারেনা।‘’ তিনি এই প্রসঙ্গে উদাহরণও দিয়েছেন। বলেছেন, হাঙ্গেরীর জার্মাণভাষীরা নিজেদের ভাষা না ছাড়লেও, অন্য সকল ব্যাপারে একীকৃত ( Integrated ) হয়ে ‘’মনোভাবে, চরিত্রে ও আচার-অনুষ্ঠানে’’ পুরোপুরি মাগিয়ার বনে গিয়েছেন।

ভাষা সর্বত্র জাতীয়তা নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারেনা- এ্যাঙ্গেলস

আমাদের জীবনকালেই দেখেছি, ভাষার ঐক্য এক ভাষাভাষী পাঞ্জাবকে অখণ্ড রাখতে পারেনি। সে কি শুধুই বৃটিশ ভেদনীতির জন্য ? ভাষার ঐক্য সত্ত্বেও আজ ধর্মীয় ঐক্যাশ্রয়ী ভাবাবেগের ধাক্কায় লেবানন ছিন্নভিন্ন। আবার এও দেখছি যে নানা ভাষাভাষী ইহুদীরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে উড়ে এসে উড়ে এসে ইজরাইলে জুড়ে বসেছেন, আর মৃত হিব্রু ভাষাকেই চালু করে, সেখানে তাঁরা এক নতুন জাতিতে রূপান্তরিত। সেখানে জাতীয়তাবাদ প্রধানত ধর্মীয়-ঐক্যাশ্রয়ী, যেমন দেখছি আমাদের আকালি-শাসিত পাঞ্জাব রাজ্যে।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের এবং অধুনা সিন্ধী জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থানের ক্ষেত্রে ভাষা এবং ধর্ম উভয়েরই স্পর্শকাতরতা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। জন-গণতান্ত্রিক দলের নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তানের সংবিধান-রচয়িতারাও জাতিত্বের অন্যতম উপাদান হিসাবে ক্ৰমে ধর্মকেও স্বীকৃতি দিয়েছেন তাঁদের দেশে।

এ্যাঙ্গেলসের আর একটি কথায় আসি । ১৮৬৬-তেই এ্যাঙ্গেলস সাবধান করে দিয়েছিলেন যে অনেক সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দুর্বল করার জন্যই সাম্রাজ্যবাদীরা, এমন কি, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জাতিগুলিকে পৰ্যন্ত বিচ্ছিন্নতার পথে উসকিয়ে দেয়। এই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে লেনিনও ১৯১৬-তে যা বলেছিলেন, তা উদ্ধত করা যেতে পারেঃ

“Engels emphasises that the proletariat must recognise the political independence and ‘self-determination’…of the great, major nation of Europe, and points to the absurdity of the principle of nationalities’ (particularly in the Bonapartist application, i.e. of placing any small nation on the same level as these big ones”-[Lenin, Collected Works, Vol. 22 (Moscow, 1964), p. 349n.]—(গুরুত্বাচিহ্ন লেখকের )।  অর্থাৎ, লেনিন বলতে চেয়েছিলেন যে আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটা সীমারেখা কোথাও টানতেই হবে। বড় আর ক্ষুদে জাতিদের ঢালাওভাবে একই মানদণ্ডে বিচার করাটা অবাস্তব।

তাই বিপ্লবের পরে, সোভিয়েট দেশে জাতিসমূহের আন্তনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হয়েছিল অন্ততঃ চার রকমে। ইউনিয়ন রিপাবলিকের ব্যবস্থা শুধু বড় জাতিদের জন্য, বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার সহ। অন্যদের জন্য ভৌগিলিক বাধ্যবাধকতা, জনসমষ্টির মিশ্র চরিত্র ও সংখ্যা ইত্যাদির বিবেচনা সাপেক্ষে স্বশাসিত রিপাবলিক, স্বশাসিত অঞ্চল এবং স্বশাসিত সাংস্কৃতিক এলাকার ব্যবস্থা। সোভিয়েটের জাতিসমস্যার স্মাধান-সুত্র খোল-নলচে সমেত ভারতের বেলায় প্রযোজ্য নয়। তবু এর থেকে অনেকটাই গ্রহণযোগ্য, যেমন নাকি বহুজাতিক চীনের অভিজ্ঞতা থেকেও।

প্রাক-বিপ্লব রুশ সাম্রাজ্যের সংগে জাতিবিন্যাসের ক্ষেত্রে ভারতের তফাৎ অনেকটা । বৃটিশ শাসনের অবসানের পরে এখন আর আমাদের দেশে কোনো একটি বিশেষ জাতিকে শাসক-নিপীড়ক জাতি বলে চিহ্নিত করা যায় না। এদেশে একচেটে পুঁজিপতিগোষ্ঠী জাতিত্বে পাঁচমিশালী, এবং এই গোষ্ঠীর বৃহদংশের গৃহভূমি কোনো বিশেষ অঞ্চলে আবদ্ধ নয়।

বড় বড় শহর ও পাঁচতারা হোটেলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এঁদের সংস্কৃতি বাপক অর্থে সৰ্বভারতীয় । এঁরা সমগ্র ভারতকে একটি অখণ্ড বাজার হিসেবেই পেতে চান, প্রয়োজন মতো বা চাপে পড়ে বহুজাতিক সংস্থা এবং আঞ্চলিক বুর্জোয়ার সঙ্গে সমঝোতা ও ভাগাভাগির ভিত্তিতে।

আমাদের দেশের শ্রমিকশ্রেণীও জাতি-ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। বড় বড় শিল্প শহরে, খনি ও বাগিচা এলাকায় এরও গড়ন পাঁচমিশালী। শ্রমিকশ্রেণীর ব্যবহারিক সংস্কৃতিও ক্ৰমে সৰ্বভারতীয় চেহারা নিচ্ছে বস্তি এলাকার মিশ্র বসতিগুলিকে কেন্দ্র করে। শ্রমিকশ্রেণীর বিন্যাসও তাই ভারতের ঐক্য রক্ষার অনুকূল, যদিও অনবরত শিম্পশ্রমিকে রূপান্তরিত গ্রামীণ কৃষকেরা এখানো আঞ্চলিকতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতপাত এবং জাতিদ্বেষকে শ্রমিকদের মধ্যে জীইয়ে রেখেছেন । “জাতীয় সমস্যা প্রধানত কৃষক সমস্যা” (স্তালিন) এবং কৃষক সমাজই আঞ্চলিক বুর্জোয়া স্বার্থ ও আঞ্চলিকতার উৎসভূমি।

জাতিআলোচনা ভাববাদী ঐতিহাসিকদের রচনায় অনুপস্থিত

যে দৃষ্টিভংগী নিয়ে ‘জাতি’ ব্যাপারটির আলোচনা করা হ’ল তা কিন্তু আমাদের দেশের ভাববাদী ঐতিহাসিকদের প্রাসংগিক রচনায় অনুপস্থিত। তাঁদের অনেকের মতেই জাতির উপস্থিতি প্রাক আধুনিক যুগেও ছিল। অনেকেই অশোক বা আকবরের সাম্রাজ্যকে ভারতীয় জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন এবং পরবর্তী যুগের মারাঠা রাজ্যের বিকাশকে মারাঠি জাতির উত্থান হিসাবে চিত্রিত করতে প্রয়াসী।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে শাসকশ্রেণীকে ঘিরে রাজ্যজোড়া সৰ্বভারতীয় বা আঞ্চলিক উপরতলার সংস্কৃতি যে স্থানবদ্ধ লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি গড়ে ওঠেনি, তা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একে উপাদান হিসাবে ব্যবহার করে সচেতন সমষ্টিগত ভাবাবেগ জাগিয়ে তোলার কোনো নজিরই নেই। সমষ্টিচেতনা কুল, উপজাতি, জাতপাত, বৰ্ণ এবং ধর্মীয় -সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, জীবনযাত্রার এই বেড়াগুলি ডিঙিয়ে সাধারণীকৃত জাতীয় চেতনায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

প্রাচীনযুগে রামায়ণে রামকে দিয়ে বালানো হচ্ছে, ‘স্বর্ণপুরী লংকায় আমার রুচি নেই, জন্মভূমি স্বর্গের বাড়া’—। আবার আদি-মধ্য যুগে দেখি, আপন ‘জনকভূমি’ বা পিতৃভূমি বরেন্দ্রের মাটি ও গাছপালার জন্য ভাগ্যতাড়িত রামপালের উচ্ছ্বসিত মমতা সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’-এ পরিস্ফুট। এতে স্বভূমি প্রীতির (Patriotism) প্রকাশ থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয়তাবাদ নেই। সেযুগে তো আধুনিক জাতির সমার্থক প্রতিশব্দই ছিল না প্রচলিত কোনো ভাষায়। জাতীয়তাবাদই বা থাকবে কি করে ? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে এ প্রশ্ন ভাবিত করেছিল। ১৯১৯-এ তিনি লিখেছেন-

“…যাহাদের মধ্যে জন্মগত বন্ধনের ঐক্য আছে তাহারাই নেশন। তাহাদিগকেই আমরা জাতি বলিতে পারিতাম। কিন্তু আমাদের ভাষায় একদিকে অধিকতর ব্যাপক, অন্যদিকে সংকীর্ণ।…এমন স্থলে নেশনের প্রতিশব্দরূপে জাতি শব্দ ব্যবহার না করিয়া ইংরাজী শব্দটাই চালাইবার চেষ্টা করিয়াছি।… ”

আলোচনায় nation, race এবং caste-এর বানানো বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে যথাক্ৰমে অধিজাতি, প্রবংশ এবং জাতি বা বর্ণ ব্যবহার করা যায় কিনা এ প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ তুলেছিলেন, কিন্তু সিদ্ধান্তে আসেন নি। বরং অবশেষে মন্তব্য করেছিলেনঃ

“আমি নিজেই বলিয়াছি ‘নেশন’ কথাটাকে তর্জমা না করিয়া ব্যবহার করাই ভাল। ওটা নিতান্তই ইংরাজী অর্থাৎ ঐ শব্দের দ্বারা যে অর্থ প্রকাশ করা হয় সে অর্থ ইহার আগে আমরা ব্যবহার করি নাই।’’৪  (বিস্তারিত দেখুন;  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ন্যাশনালিজম’ ভাবনা)

আরো পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথই মহাজাতিসদনের নামকরণের মাধ্যমে সর্ব-ভারতীয় জাতীয় ঐক্যের দ্যোতক ‘মহাজাতি’ শব্দটি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন। এই পটভূমিতে race অর্থে প্রবংশ, nation অর্থে মহাজাতি nationality অর্থে জাতি/জাতীয়তা, subnationality অর্থে অধিজাতি এবং caste অর্থে জাত-এই পরিভাষা ব্যবহার করার কথা ভাবা যেতে পারে। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় আধুনিক নেশন ও ন্যাশন্যালিটির, এমন কি প্রায়-সমার্থক প্রতিশব্দের অভাবই প্রাক-বৃটিশ যুগের ভারতে জাতি ও জাতীয়তার অনুপস্থিতির কথা তুলে ধরে।

ঔপনিবেশিকতার পরিবেশে, ভারতে পুঁজিবাদের এবং জাতীয়তাবোধের দুর্বল উন্মেষ ঘটতে থাকে উনিশ শতকের প্রারম্ভ থেকে। এর বাস্তব উপকরণগত ভিত্তি-যেমন ব্যাপক বাজার, আঞ্চালিক ভাষা-সাহিত্য ও শিল্প-রীতি এবং ভৌগোলিক-রাজনৈতিক সংহতির ঐক্যসূত্র ইত্যাদি—ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল আরো আগে থেকেই। কিন্তু এ সম্বন্ধে সমষ্টিগত আত্মসচেতনতা ছিল না।

কিন্তু উনিশ শতকে রাজনৈতিক ফয়দা লোটার জন্য ভারতের উঠতি বুর্জোয়ারা এই বাস্তব উপাদানগুলিকেই বৃটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ সৃষ্টির কাজে লাগালেন। ভারতব্যাপী বৃটিশ প্রশাসনের লৌহকাঠাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ইতিমধ্যে তাঁদের এই কাজকে সহজ করে তুলেছিল। এই পরিবেশেই অবশেষে বৃটিশরাজের বিকল্প হবু স্বাধীন রাষ্ট্রের বনিয়াদ হিসাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম।

প্রথম থেকেই কিন্তু ভারতে জাতীয়তাবাদের চেহারা দ্বৈত-সর্বভারতীয় এবং আঞ্চলিক। এমন কি যাঁরা হিন্দু মুসলমান দুই ‘জাতি’র কথা বলতেন, তাঁরাও ১৯৪o-এর আগে পৰ্য্যন্ত একই রাষ্ট্ৰকাঠামোতে মিলেমিশে থাকার কথাই বলতেন। একই লোক, হিন্দু কিংবা মুসলমান, নিজেকে একাধারে বাঙালী এবং ভারতীয়, অথবা অসমিয়া এবং ভারতীয়, বলে ভাবছেন—উনিশ শতকের ও পরবর্তী অসংখ্য সাহিত্যকর্মে তার ভূরি ভুরি প্রমাণও রয়েছে। অন্যত্র এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

মতাদর্শের ক্ষেত্রে, তাই, প্রথম থেকেই দ্বৈত জাতীয়তাবাদের অনুকূল যুক্তরাষ্ট্ৰীয় কাঠাম-ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তাই বাস্তবানুগ হত। কিন্তু তা হয়নি। প্রথমদিকে কংগ্রেসের রাষ্ট্রচিন্তায় সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদই শুধু পরিস্ফুট হয়েছে, অবহেলিত হয়েছে আঞ্চলিক সত্ত্বা। প্রতিপক্ষ বৃটেন একীকৃত একজাতিক রাষ্ট্র। অতএব, তার বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছিল একীকৃত একজাতিক ভারতরাষ্ট্রের ধারণাকে। তার জন্য বুর্জোয়া নেতারা প্রয়োজনমতো তথ্যের সংগে কল্পনারও আশ্রয় নিয়ে ভারতবাসীকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিলেন যে ভাষা, জীবনযাত্রা, ধর্ম, মানসিকতা ইত্যাদির অনেক অনৈক্য সত্ত্বেও দেশব্যাপী একই বিমিশ্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শরিকানার দৌলতে ভারতীয়রা একজাতিভুক্ত। তাদের বক্তব্য ছিল, ভারতের সংবিধানও তাই বৃটেনের মতো এককেন্দ্রিক হওয়া বাঞ্ছনীয়।

রাষ্ট্রব্যবস্থার এই মডেল ভারতীয় মুসলমানদের পছন্দ না হওয়ারই কথা। কারণ, ভাষা-সংস্কৃতির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্ৰীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে কয়েকটি অংগরাজ্যে অন্ততঃ মুসলমান সংখ্যাধিক্য থাকতো এবং সেক্ষেত্রে, সর্বভারতীয় স্তরে দুর্বল মুসলমান বুর্জোয়ারা সেই রাজ্যগুলির বাজারে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারতেন। এ প্রসঙ্গে ইস্তাম্বুল থেকে ১৯২৬-এ প্রকাশিত, প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী মৌলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধীর রচিত The Constitution of the Federated Republics of India উল্লেখ্য। বইটির সপ্রশংস উল্লেখ রয়েছে জওহরলাল নেহরুর আত্মজীবনীতে।

আর একটি ব্যাপারেও মুসলমানদের আপত্তি ছিল। উদারপন্থীদের সেকুলার ভাবধারা সত্ত্বেও, শুরু থেকেই হিন্দুমেলা, আৰ্যসমাজ, বীরাষ্টমী, গো-রক্ষা, বর্ণদম্ভ ইত্যাদি হিন্দুয়ানির নানা প্রতীকচিহ্ন, ভাবনা এবং তারিকা জাতীয়তাবাদ প্রকাশের ধারক এবং বাহক হয়ে উঠেছিল, যার কোনই আবেদন ছিল না ভারতীয় মুসলমান সমাজের কাছে। এই দুই কারণে এবং মুসলমানদের মধ্যে মৌলপন্থী এবং নিখিল-ইসলামপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধির ফলে জাতীয়তাবাদের মঞ্চ মুসলমানদের তেমন আকৃষ্ট করতে পারেনি।

১৯২১-এ বুর্জোয়া নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলমানের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী যুক্তফন্ট সারা দেশে সাড়া জাগালেও, মতাদর্শের সীমাবদ্ধতার দরুণ শেষ পর্যন্ত এর থেকে কংগ্রেস কোনো ফয়দা তুলতে পারেনি। ১৯২৮ সালে নেহরুর রচিত যুক্তরাষ্ট্রীয় গঠনতন্ত্রের খসড়ায় ‘অবশিষ্ট’ (RESIDUAL) ক্ষমতা কেন্দ্রে ন্যস্ত করার কথা থাকায় মুসলিম লীগ এই প্রস্তাব এবং ত্ৰিশের আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায়। ‘অবশিষ্ট’ ক্ষমতা কংগ্রেস পরবর্তীকালে প্রদেশের হাতে ন্যস্ত করতে রাজী হল বটে, কিন্তু কোনো বিশেষ অঞ্চলের পৃথক হয়ে যাওয়া অধিকার অস্বীকার করে প্রস্তাব পাশ করলো (লালা জগৎ নারায়ণের  ‘অখণ্ড ভারত প্রস্তাবঃ এলাহাবাদ এ, আই, সি, সি)।

এই পটভূমিতেই কুখ্যাত পাকিস্তান প্রস্তাব চল্লিশের দশকে মুসলিম গণসমর্থন লাভ করে। পাকিস্তানকে যখন আর ঠেকানো গেল না, তখন স্বাধীন ভারতের সংবিধান-রচয়িতারা ‘অবশিষ্ট’ ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতেই রেখে দিলেন। পরবর্তীকালে, নানাভাবে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে কেন্দ্রের অনুকূলে আরও রদবদল ঘটানো হল। এর ফলে জাতীয় সমস্যা এক দিক দিয়ে হয়ে দাঁড়ালো আরো জটিল।

আত্মনিয়ন্ত্রণ থিসিসঃ অধিকার প্রশ্নে সঠিক, প্রয়োগিক নয়

মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে, সমাজবিকাশের অমোঘ নিয়মেই ইতিহাসের এক পর্যায়ে, অর্থাৎ পুঁজিবাদের বিকাশের যুগে, উপজাতীয় ও ধর্মীয় গোষ্ঠীচেতনা অতিক্রম করে জাতীয় চেতনার বিকাশ হয়। জাতীয় আন্দোলন জাতীয় রাষ্ট্রগঠনের অভিমুখী হয়। সে অবস্থায় জাতিসত্ত্বার বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই শ্রমিক শ্রেণীকে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পূর্ণ করার জন্য অন্য একাধিক শ্ৰেণীকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রামের পথে এগুতে হয়। এই তাত্ত্বিক দূরদৃষ্টির বলেই ১৯২৫ এ  স্তালিন বলতে পেরেছিলেনঃ

“ভারতকে আজকাল একটি সমগ্র জাতি বলিয়া প্রচার করা হইলেও একথা স্বীকার করিতেই হইবে যে ভারতে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের সময় নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি লইয়া বহু অজ্ঞাত জাতি আত্মপ্রকাশ করিবে।”

ভারতে কিন্তু ১৯৩৯-৪০ সাল পর্যন্ত অন্যান্য জাতীয়তাবাদীদের মতো মার্ক্সবাদীরাও ভাবতেন, ভারতবর্ষ এক জাতি, এবং একজাতিক কাঠামোর মধ্যেই হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। উদীয়মান জাতিগুলির সমস্যার প্রতি তাঁদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে থাকে ১৯৪০ থেকে, এবং অচিরেই ভারত একটি বহুজাতিক দেশ এই সিদ্ধান্তে তাঁরা উপনীত হন। জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির প্রয়োগ ভারতে কিভাবে হবে সে সম্বন্ধেও আলোচনা শুরু হয়।

দেখা গিয়েছিল যে ১৯৩৫ থেকে ১৯৪o পৰ্যন্ত যতই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল, ততোই মুসলমান জনসাধারণও তার সংগে জড়িয়ে পড়ছিলেন। তবু- “কেনই বা জাগ্ৰত মুসলমান জনগণ বিশেষ করিয়া কংগ্রেসী মন্ত্রিত্বের সময়ে মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হইল, এবং মুসলিম লীগ শক্তিশালী মুসলিম সংগঠন হিসেবে দাঁড়াইতে পারিল ? কেনই বা ঠিক এই সময়েই হিন্দু মুসলিম সংঘর্ষ তীব্রতর হইতে লাগিল ?…(“জাতীয় ঐক্য চাই”, পিপল’স ওয়ার, ৮.৮.১৯৪২)।

এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে তদানীন্তন কমিউনিস্ট দল উক্ত প্রবন্ধে এ-ও লক্ষ করেছিল যে, যত নিম্নস্তরেরই হোক, শিল্পোন্নতির ফলে এবং নতুন শাসনতন্ত্র মারফৎ সীমিত প্রাদেশিক স্বায়ত্ত-শাসনের সুযোগ আসায় ঐ একই সময়ে বাংলা, উত্তরপ্রদেশ এবং পাঞ্জাবে হিন্দু-মুসলিম প্রশ্ন এবং অন্যত্র বাঙালী-অসমিয়া, মারাঠী-কর্ণাটকী এবং অন্ধ-তামিলনাদ প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। ঘটনার এই উভয়বিধ ধারাতেই যেমন একটি ভেদমুখী দিক আছে, তেমনি একটি প্রগতিশীল দিকও আছে-এই ছিল কমিউনিসটদের সেদিনকার দ্বান্দ্রিক উপলব্ধি।

১৯৩৮ সালে মুসলিম লীগ ভারতের জন্য পূর্ণস্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল, এবং ইতিমধ্যে প্রসারিত গণভিত্তির চাপে শিল্পপতি বুর্জোয়শ্রেণীর নেতৃত্বাধীন হয়ে পড়ছিল। “অতএব”, প্রবন্ধের ভাষায়,

“লীগের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ নহে, বরং মুসলমান জনগণের ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনারই ইহা অভিব্যক্তি। বৃহত্তর নিখিল-ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কাঠামোর মধ্যে সিন্ধী, পাঞ্জাবী, মুসলমান, পাঠান প্রভৃতির স্বতন্ত্র জাতীয়তাবোধেরই ইহা প্রকাশ।”

কমিউনিস্টদের তরফ থেকে কংগ্রেসকে বলা হল

“পুরুষানুক্ৰমে একই ভূখণ্ডে, একই ভাষা, একই সংস্কৃতি ও একই অর্থনৈতিক জীবনব্যবস্থার মধ্যে বসবাসকারী স্বতন্ত্র জাতিদের স্বয়ংশাসিত রাষ্ট্রজীবন নির্বাহের অধিকার ও তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করিবার অধিকার স্বীকার করিয়া লইবার প্রতিশ্রুতি দিলে তাহার ফলে মাতৃভূমির ব্যবচ্ছেদ কখনো ঘটিতে পারে না।”

আশা প্রকাশ করা হয়েছিল, কংগ্রেস এমন প্রতিশ্রুতি দিলে পাকিস্তান প্রস্তাব মুসলিম জনসমর্থন হারাবে এবং শেয় পর্যন্ত কংগ্রেস-লীগ সমঝোতা ও স্বেচ্ছা-মিলনের ভিত্তিতে ভারতের যুক্তরাষ্ট্ৰীয় কাঠামো বজায় থাকবে। কংগ্রেস এই প্রস্তাব মেনে নেয়নি। মেনে নিলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জোয়ার এবং ভারত-বিভাজন ঠেকানো যেত কিনা, সে প্রশ্ন এখন অবান্তর।  সে যা-ই হোক, প্রবন্ধটিতে উপস্থাপিত দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিতেই আত্মনিয়ন্ত্রণ নীতির প্রয়োগ সংক্রান্ত থিসিস ১৯৪২-এর সেপ্টেম্বর মাসে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে গৃহীত এবং ১৯৪৩-এর মে মাসে দলের প্রথম কংগ্রেস, ডঃ গঙ্গাধর অধিকারীর প্রাসংগিক ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনটি সহ, অনুমোদিত হয়েছিল।

ভারতের বেলায় কোনো অঞ্চলের জাতীয় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নির্ণায়ক হিসাবে ভাষা ইত্যাদি উপাদানের পাশাপাশি কোন কোন বিশেষ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত আঞ্চলিক সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকেও উপাদান হিসাবে গণ্য করাটাই  বাস্তবানুগ হবে-ডঃ অধিকারীর এই পরামর্শ ছিল প্রাপ্ত মার্কসবাদী তত্ত্বের সঙ্গে নতুন সংযোজন।

এরই ভিত্তিতে পশ্চিমা-পাঞ্জাবী ও পূর্ববঙ্গীয়দের স্বতন্ত্র মুসলমান-প্রধান জাতি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রতিবেদনটির উপসংহারে একথাও বলা হয়েছিলঃ

“জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে রাজনৈতিক-বৈপ্লবিক প্রশ্ন হিসাবে দেখিতে হইবে, নিয়মতান্ত্রিক প্রশ্ন হিসাবে দেখিলে চলিবে না। …পৃথক হইবার অধিকার মানিলেই যে সত্য-সত্যই এই অধিকার প্রয়োগ করা হইবে বা প্রয়োগ করা সমীচীন হইবে, তাহা নহে। সমগ্র সামাজিক পরিস্থিতি ও বিকাশের পটভূমিকাতেই ক্ষেত্র ও কাল বিশেষে এই শেষোক্ত প্রশ্নের মীমাংসা সম্ভব। পৃথক হইলে সমগ্র সমাজ ও রাজনৈতিক বিকাশের পক্ষে কিরূপ ফল হইবে তাহা বিবেচনা করিয়াই বাস্তব ক্ষেত্রে এই সমস্যার মীমাংস করা সম্ভব।”১০

এই স্পষ্টীকরণ সত্ত্বেও মুসলিম লীগের মধ্যে সামন্তীয় প্রভাব ও সাম্প্রদায়িকতাকে খাটো করে ও গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকে অতিরঞ্জিত করে দেখার ফলে এবং কমিউনিস্টদের অবস্থানে বাস্তবে নিয়মতান্ত্রিক বিচ্যুতি ঘটার ফলে, আত্মনিয়ন্ত্রণের থিসিসটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে সরেজমিনে প্রকারান্তরে পাকিস্তান প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনের প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

১৯৪৬-এর ১৫ এপ্রিল তারিখে ক্যাবিনেট মিশনের কাছে পেশ করা স্মারকলিপিতে এই ভ্ৰান্তি অনেকটা সংশোধিত হল। কমিউনিস্ট দল অবশ্যই চেয়েছিল অখণ্ড ফেডারেল ভারত এবং একটি সীমানা কমিশনের মারফৎ ভাষা ও সংস্কৃতির ঐক্যসূত্রের বিচারে জাতিভিত্ত্বিক প্রদেশ পুনর্গঠন ৷ কিন্তু সেইসঙ্গে এ-ও বলেছিল যে পুনর্গঠিত প্রদেশগুলি ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেবে না স্বতন্ত্র রাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো ইউনিয়ন গড়বে—সে সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই স্বাধীনভাবে নেবে। তখনকার সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধ-সদৃশ পরিস্থিতিতে, যখন জাতীয় নেতৃত্ব হৃত-উদ্যোগ এবং বৃটিশবাহিনী ভারত ত্যাগে বদ্ধ-পরিকর, মনে হয়, কমিউনিস্টদের এই অবস্থান বাস্তবানুগ ছিল।১১

অনুরূপ অবস্থানের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল তখন অসমিয়া জাতির বংগাসাম গ্রুপিং বিরোধী ঐক্যবদ্ধ বিরাট আন্দোলন। সর্বোচ্চ কংগ্রেস নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে পাল্টে দিয়ে সেদিন এই আন্দোলন ক্যাবিনেট মিশনের সর্বশেষ ত্রি-স্তর কনফেডারেশনের প্রস্তাবটিকে ভেস্তে দিতে এবং প্রকারান্তরে আসামের পূর্ব-পাকিস্তানভুক্তি রদ করতে পেরেছিল ( আসাম বিধানসভায় গৃহীত প্রস্তাব, ১৬ জুলাই, ১৯৪৬ )।১২ অনুরূপ অবস্থানের ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে পূর্ববঙ্গ ও পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছিল

ভারত-বিভাগের আগেই লীগের ভূমিকা পাকিস্তান প্রস্তাবের প্রতি কমিউনিস্টদের মনোভাব পরিবর্তিত হলেও, নিঃশর্ত জাতিভিত্তিক আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির উপরে আস্থা ছিল অটল। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদই জায়মান জাতিগুলিকে শৃংখলিত করে এক কারাগারে রেখেছিল, কাজেই প্রাকস্বাধীনতা যুগে এই জাতিগুলির বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ ভাগ্য নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার মেনে নেওয়া উচিত-অবস্থানে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। বরং, সেটাই ছিল মার্কসবাদ-সম্মত। কিন্তু অবস্থার জটিলতাকে অতি সরলীকৃত করে নেওয়ার ফলে প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভুলও হয়েছিল । আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির ব্যাখ্যা কত দূর প্রসারিত ছিল, তার একটি উদাহরণ দিচ্ছি।

১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারীতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট দলের আসাম প্রাদেশিক সম্মেলনের মূল প্রস্তাবে পার্বত্য অঞ্চল ও কাছাড় সহ সমগ্র আসাম প্রদেশের ভারত থেকে পৃথক হওয়ার অধিকার সহ পূৰ্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল। একই সাথে, পার্বত্যাঞ্চল এবং কাছাড়ের জন্যও বলা হয়েছিল আসাম থেকে পৃথক হওয়ার অনুরূপ অধিকারের কথা। অবশ্য এ ছিল অধিকারের কথা, বাস্তব প্রয়োগের কথা নয়।১৩

নাগাল্যাণ্ড, কাশ্মীর, তামিলনাডু, এবং মিজোরামে উত্থাপিত ভারতের সংগে সম্পর্কছেদের দাবির প্রতি বাস্তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের সারা বরাবরই নেতিবাচক ছিল সঠিকভাবেই। তা সত্ত্বেও, ১৯৬৪ পর্যন্তও কমিউনিস্ট কাৰ্যসূচীতে ভারত থেকে পৃথক হওয়ার অধিকারের ধারাটি বলবৎ ছিল। পরে, এই ধারাটিকে কয়েক বছর নিক্ৰিয় রেখে, ১৯৭২-এ পাকাপাকিভাবে খারিজ করা হয়।১৪

তখন থেকে বিচ্ছেদের অধিকার-বিহীন আঞ্চলিক স্বশাসনের ব্যবস্থাকেই আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট ভাবা হয়, যেমন ভাবা হয় মাও-সে-তুঙের আমল থেকেই চীনদেশেও।

আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে মার্কসবাদের প্রবক্তাদের মধ্যে আর একটি ভ্ৰমাত্মক ঝোঁকও কিছুকালের জন্য প্রকট ছিল। গুজরাট এবং রাজস্থানীদের হাতে একচেটে পুঁজির আধিপত্য দেখে অনেক আঞ্চলিক আন্দোলনগুলিতে এর বিরুদ্ধে আঞ্চলিক জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন ভারতে কোন বিশেষ শোষক-নিপীড়ক জাতি নেই-আলোচনা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই সত্যে পৌছাতে তাঁদেরও বিলম্ব ঘটেনি।

তথ্যনির্দেশক পাদটীকা

১. জে. ভি. স্তালিন, Marxism and the National Question ( মস্কো, ১৯১৩ )।

২. ভি. আই. লেনিন, “Right of nations to self-determination” (Collected Works, খন্ড ২০, মস্কো, ১৯৬৪); “Critical remarks on the national question,” প্রাগুক্ত এবং “The discussion on self-determination summed up” ( Collected Works, খন্ড ২২, মস্কো, ১৯৬৪)

৩. এংগেলসের রচনা থেকে উদ্ধৃতির জন্য, পি. এন. ফেদোসেয়েভ, Leninism and the National Question (মস্কো, ১৯৭৭) পৃ ৫৯

৪. রবীন্দ্র রচনাবলী, খন্ড ১৫, (শতবার্ষিকী সংস্করণ,পঃবঙ্গ সরকার, কলিকাতা),পৃ ২৮৪-৫।

৫. অমলন্দু গুহ, ‘’The Indian national question: a conceptual frame’’, Economics and Political Weekly, খন্ড ১৭, জুলাই ১৯৮২ এবং ‘’Nationalism: Pan-India and regional in a historical perspective’’ (ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেসের বর্ধমান অধিবেশনে পঠিত আধুনিক ভারতের ইতিহাস শাখার সভাপতির ভাষণ), Social Scientist, ফেব্রুয়ারী ১৯৮৪।

৬. উদ্ধৃতির জন্য, গঙ্গাধর অধিকারী সম্পাদিত এবং সত্যশংকর গুপ্ত অনূদিত পাকিস্তান ও জাতীয় ঐক্য (কলিকাতা, ১৯৪৪) পৃ ৫৯

৭. প্রাগুক্ত, পৃ ৭।

৮. প্রাগুক্ত, পৃ ৯।

৯. প্রাগুক্ত, পৃ ১১ এবং পৃ ১৪।

১০. প্রাগুক্ত, পৃ ৬৮-৯

১১. স্মারকলিপির জন্য, এইচ. এন. মিত্র সম্পাদিত, Indian Annual Register খন্ড ১, জানুয়ারী-জুন ১৯৪৬, পৃ ২২০-২১

১২. অমলেন্দু গুহ, Planter Raj to Swaraj: freedom Struggle and Electoral Politics in Assam ১৯২৬-১৯৪৭ (নিউ দিল্লী, ১৯৭৭) পৃ ৩১০-৫।

১৩. ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অসম প্রাদেশিক সম্মিলনঃ রাজনৈতিক প্রস্তাবঃ প্রথম অধিবেশন (গৌহাটি, ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮) পৃ ১৬-১৭

১৪. সি পি আই (এম) Work Report (Political) of the Central Committee to the Ninth Congress…Note on National Question and Amendment to Party Programme Adopted by the Ninth Congress (কলিকাতা ১৯৭২)

[উৎসঃ অমলেন্দু গুহ, ইতিহাসের আলোকে ভারতের জাতীয়তা ও আঞ্চলিকতার প্রশ্ন, ইতিহাস-অনুসন্ধান ২, গৌতম চট্টোপাধ্যয় (সম্পাদিত), কে পি বাগচী এন্ড কোম্পানী, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, ১৯৮৭,পৃঃ ১০-২২]

*অমলেন্দু গুহ (১৯২৪-২০১৫) ছিলেন একজন মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ ও কবি। জন্মেছিলেন ভারতের মনিপুরে।এই প্রবন্ধটি প্রকাশের সময় তিনি অধ্যাপনা করতেন সেণ্টার ফর সন্টাডিস ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা ।

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ন্যাশনালিজম’ ভাবনা

জাতি, জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবাদী– Dr. M. Abdul Mu’min Chowdhury

সেকুলার ভাষা ভিত্তিক জাতিয়তাবাদের সংকট– Dr. M. Abdul Mu’min Chowdhury

ভাষার ঐক্যের ভিত্তিতে দুই বাংলা অখণ্ড থাকেনি। কেন থাকেনি সেটা জানতে দেখুন; মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে

অখন্ড বাংলা, অখন্ড ভারত, অখন্ড পাকিস্তান নাকি বাংলাদেশ?

বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির উত্থান, পতন ও প্রভাব

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion