কয়েদীর জাত থেকে বিশ্ব-নেতৃত্বঃ মার্কিনীদের উত্থানে সাহিত্যিক স্বকীয়তার ভূমিকা

লিখেছেনঃ আবুল মনসুর আহমদ

[প্রবন্ধটি লেখকের ‘বাংলাদেশের কালচার’ নামক বইয়ের ‘সাহিত্যের প্রাণ রূপ ও আংগিক’ শিরোনামের প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত।বর্তমান শিরোনাম আমাদের সংযোজন-সম্পাদক।] 

আবুল মনসুর আহমদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক,ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদ
আবুল মনসুর আহমদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক,ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদ

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সাহিত্যিক বিপ্লবের নেতৃত্ব পায় ঘটনাচক্রে। মার্কিনীদের জন্য এটা শুধু সাহিত্যিক বিবর্তনের প্রশ্ন ছিল না। এটা ছিল তাদের জাতীয় জীবন-মরণের প্রশ্ন। আঠারো শতকের শেষ দিকে মার্কিনীরা মাতৃভূমি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া নিজেদের স্বাধীনতা হাসিল করিয়াছিল। তাদের এই স্বাধীনতা একশ’ বছর চলিয়া গিয়াছে তখন। ‘রাজার স্বর্গীয় অধিকারের’ বন্ধন-মুক্ত হইয়া কাগজে-কলমে তারা প্রজাতন্ত্র কায়েম করিয়াছে। ইংরাজের শ্রেণী-প্রথাকে ঘৃণ্য বর্ণাশ্রম বলিয়া ত্যাগ করিয়াছে তারা সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার আশায়। ওয়াশিংটন-লিংকনের মতো গণতন্ত্রের সমর্থক বড় বড় মনীষী তখন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব করিয়াছেন এবং করিতেছেন।

তবু তারা সুখ শান্তির মুখ দেখিতেছে না। গৃহযুদ্ধে ও নিগ্রোযুদ্ধে মার্কিন মুল্লুক ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত। ইংরেজরা তাদের দুর্দশা দেখিয়ে বিজ্ঞের মত মাথা ঝুকাইতেছে। বলিতেছে: বুঝ স্বাধীনতার ঠেলা এইবার। ডা. জনসন মার্কিনীদের নিশ্চিত ব্যর্থতার ভবিষ্যৎ বাণী করিতেছেন। শত্রুরা হাসিতেছে। বন্ধুরা আফসোস করিতেছে।

ইমার্সনের পথনির্দেশ

কেন এমন হইতেছে? কেউ বলিতে পারে না। কেউ বুঝিতে পারে না। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি পথের সন্ধান দিলেন ইমার্সন। তিনি রোগের নিদান বাহির করিলেন।

রাজার বন্ধন হইতে মুক্তি বর্ণাশ্রম-ধর্ম বিসর্জন বড় কথা নিশ্চয়ই। কিন্তু নেগেটিভ বড় কথা। পযিটিভ কিছু নয়। পজিটিভ কি? স্বকীয়তা। পঞ্চাশ বছরেও মার্কিনীরা স্বকীয়তার ও জাতীয় সত্তার সন্ধান পায় নাই। ইমার্সন এটা বুঝিলেন। তিনি জাতীয় সত্তা ও স্বকীয়তার দিকে মার্কিনীদের উদাত্ত আহবান জানাইলেন। তিনি অবিশ্রান্ত কলম চালাইয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাষ্ট্রে বক্তৃতা করিয়া মার্কিনবাসীকে যা শুনাইলেন তার মূলকথা একটি :

“স্বকীয়তা ধর। অনুকরণ ছাড়। অনুকরণ আত্মহত্যার শামিল। স্বকীয়তাতেই মুক্তি”।

ইমার্সনের এই সাবধান বানীর গুরুত্ব বুঝিতে মার্কিনবাসীর পঞ্চাশ  লাগিয়াছে। বিশ শতকের গোড়াতেই তারা সর্বপ্রথম বুঝিতে পারে ইংরাজের কবল হইতে তারা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা হাসিল করিয়াছে সত্য, কিন্তু কৃষ্টি-সাহিত্যে তারা আজো ইংলন্ডের অনুকারী-অনুসারী ছায়া মাত্র।

মার্কিনীদের ধর্ম ইংলন্ডের খ্রিষ্টান ধর্ম। তাদের কৃষ্টি-ঐতিহ্যও ইংরেজী। কাজেই কি ভাষায় কি ধর্মে কি কৃষ্টিতে কি ঐতিহ্যে কোন দিক দিয়াই মার্কিনীদের ইংরাজ হইতে স্বতন্ত্র সত্তার কোনও যুক্তি ছিল না। দৃশ্যত কোন আবশ্যকতাও ছিল না।

মার্কিন মুল্লুক ছাড়াও আরও অনেক দূর দেশে ইংরাজ জাতি উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছে। বাড়ির পাশে ঐ কানাডীয়রাও ত তাই। তারা কিন্তু ইংলন্ডের রাজার অধীনতা ছিন্ন করে নাই। মার্কিনীরা করিলো কেন?  নাহক করিয়াছে। নাহক বলিয়াই তাদের এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হইতে বাধ্য।

ইমার্সন দেখাইলেন, মার্কিনীদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র সত্তার রক্ষা তার বিকাশ ও তার প্রসারের জন্যই তাদের কৃষ্টিক স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত হইতে হইবে। ইংরাজের অনুকরণ বর্জন করিতে হইবে। ইমার্সনের ভাষায়: ‘মাথায় না দাড়াইয়া পায়ে দাঁড়াইতে হইবে’।

এটাই আরম্ভ হয় বিশ শতকের গোঁড়ায়। জারট্রুড স্টেইন, এযরা পাউন্ড, টি এস ইলিয়ট মার্কিনীদের এই কৃষ্টিক স্বকীয়তায় উদ্বুদ্ধ করেন। তারা বলেন, ইংরাজের কৃষ্টিক বন্ধন হইতে মুক্তি পাইতে হইলে মার্কিনবাসীকে আগে ইংরাজী ভাষা ও সাহিত্যের কবল হইতে মুক্ত হইতে হইবে। মার্কিনবাসী এদের নেতৃত্বে এ কাজে হাত দেয়।

মার্কিন ইংরাজী বনাম বিলাতী ইংরাজী

কল্পনা করুন কি কঠিন কাজ। ইংরাজী শুধু অধিকাংশ মার্কিনীদের ভাষা নয়। দুনিয়া-জোড়া সমস্ত বৃটিশ উপনিবেশের সাধারণ ভাষা ইংরেজী ভাষা একটা যে-সে ভাষা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী প্রসারণশীল ভাষা।

ইংরাজী সাহিত্য দুনিয়ার ইংরাজীভাষী ভূখন্ডেরই শুধু নয়, সারা দুনিয়ারই প্রেরণাদাতা আদর্শ সাহিত্য। ইংলন্ডের ধর্ম খৃষ্টানিটির ও ইংলন্ডের ঐতিহ্যের উত্তরাধীকারী হইয়া সেই ইংরাজী ভাষা ও সাহিত্যের কবল হইতে মুক্তির আশা দৃশ্যতই অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু মার্কিনবাসী অতি অল্পদিনেই এই অবাস্তব কল্পনাকে বাস্তবের সত্যে পরিনত করিয়াছিলেন।

bd culture

করিতে পারিয়াছিল এই জন্য যে তাদের দাবী ছিল খুবই সীমাবদ্ধ। কৃষ্টিগত স্বতন্ত্র সত্তার জন্য যা না হইলেই নয়, মাত্র সেইটুকুই তাদের দাবি ছিল। ইমার্সন বলিয়াছিলেন: ইংলন্ডের ইংরাজীর হাত হইতে আমরা মুক্তি চাই। এ কথার মানে এই নয় যে, আমরা আমাদের পৈত্রিক সাহিত্য ও ঐতিহ্যের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাইতেছি। এটা আমাদের কৃষ্টিক সাহিত্যিক স্বকীয়তার দাবি। এটা আমাদের বাঁচিয়া থাকার তাগিদ।

ইমার্সনের বাণী ব্যাখ্যা করিয়া বিশ শতকের গোড়ায় মিস জারট্রুড স্টেইন বলেন: আমরা মার্কিনীরা ইংরাজীর বদলে অন্য ভাষা গ্রহণ করিতে চাইনা। আমরা চাই ইংরাজী ভাষা সাহিত্যের মধ্যে মার্কিনী প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিতে। আমরা চাই ইংরাজী ভাষা সাহিত্যে মার্কিনী অনুভূতি ঝংকৃত করিতে। ইংরাজীকে আমরা করিতে চাই মার্কিনী জনগনের মুখের ভাষা। কেমন করিয়া? মিস স্টেইন নিজের কথার ব্যাখ্যা করিয়া বলিলেন:

“আমরা ইংরাজী হরফ ও ইংরাজী শব্দই ব্যবহার করিব। কিন্তু আমাদের ইংরাজী শব্দের উচ্চারণ আমাদের ইংরাজী শব্দের মানে হইবে মার্কিনী। ইংরেজী ভাষায় অগনিত শব্দ সম্পদ রয়েছে সত্য, কিন্তু তারা ইংলন্ডেই বিচরণ করে। আমরা সে-সব শব্দকে মার্কিন মুল্লুকের কর্কশ কঠোর মাটিতে নামাইব। এই মাটির মাঠে-ঘাটে আমরা তাদের লইয়া খেলা করিব। তাদেরে ঘনিষ্টভাবে আপন করিয়া লইব। যে আমার সে আমার সাথে খেলা করিবেই। যার সাথে আমার খেলার অধিকার আছে, সেই কেবল আমার। ঐ সব ইংরাজী শব্দ আমাদের নয়া মাতৃভূমিতে আমাদের আশানিরাশা নিত্য-নতুন শব্দ তৈয়ার করিতেছে। এইসব শব্দ ইংরাজী শব্দের শামিল হইবে।”

কিন্তু মার্কিনীরা একদিনে তা পারে নাই। সহজেও পারে নাই। আমরা বর্তমানে যে হীনমন্যতায় ভুগিতেছি মার্কিনীরাও এককালে সেই রোগে ভুগিয়াছিল। আমাদের লেখক-সাহিত্যিকরা আজ যেমন আমাদের নিজের ভাষায় স্থলে পশ্চিম-বাংলার ভাষাকেই অধিকতর সভ্য, ভদ্র, শালীন ও সাহিত্যের উপযোগী ভাষা মনে করেন, এককালে মার্কিন লেখক-সাহিত্যিকরাও ইংলন্ডের ইংরেজীকে তাই মনে করিতেন। পুরা উনিশ শতক ধরিয়া, এমন কি বিশ শতকের প্রথম ভাগেও, মার্কিন লেখক-সাহিত্যিকদের এই মনোভাব বিদ্যমান ছিল।

এটা অভ্যাসের দোষ। পরাধীনতার রেশ। সদ্য-স্বাধীনপ্রাপ্ত লোকেরা যেমন নিজেদের দেশের শিল্পজাত দ্রব্যের চেয়ে বিদেশী জিনিসকে অধিকতর সরস ও সুন্দর মনে করে, নিজেদের মাতৃভাষার স্থলে পরের ভাষাকেই তাই মনে করে। বিখ্যাত ফরাসী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এলেক্সি টকভিল ১৮৩১ সালে আমেরিকা ভ্রমন করিয়া মার্কিন লেখক-সাহিত্যিকদের সম্বন্ধে লিখিয়াছেন:

‘মার্কিন লেখকরা আমেরিকায় বাস করেন না, তারা বাস করেন ইংলন্ডে। তারা ইংরেজ লেখকদের ভাষাকেই মডেল মনে করেন।’

খোদ মার্কিন পন্ডিত হেনরি ক্যাবট লজ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘স্টাডিম-ইন-হিস্ট্রি’তে লিখেছেন, ‘যেসব আমেরিকান সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে চান, নিজেদের মার্কিন পরিচয় গোপন করে ইংরেজ হওয়ার ভান করাই তাদের প্রথম পদক্ষেপ। এটা তাঁদের করতে হয় ইংলন্ডের সাহিত্যিকদের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, নিজের দেশবাসীর স্বীকৃতি পাওয়ার জন্যই।’

এই ‍দুই পন্ডিত ব্যক্তি উনিশ শতকের মার্কিন লেখক-সাহিত্যিকদের সম্বন্ধে যা বলিয়াছেন, আমাদের দেশের বর্তমান লেখক সাহিত্যিকদের সমন্ধে তা হুবুহু সত্য। এঁদেরও মডেল পশ্চিম-বংগের কথ্য ভাষা। এঁরাও মনের দিক হইতে বাস করেন পশ্চিম-বংগে, পূর্ব-বাংলায় নয়। এঁরা যেন সত্য সত্যই বিশ্বাস করেন পশ্চিম-বংগের কথ্য ভাষায় না লিখিয়া পূর্ব-বাংলার কথ্য ভাষায়, এমন কি শুদ্ধ বা কেতাবী ভাষায়, বই লিখলে পূর্ব-বাংলার পাঠকরা তা কিনিবেন না, পূর্ব-বাংলার সাহিত্য-সমাজে তা স্বীকৃতি পাইবে না।

ধারণাটা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। আমাদের নাট্যকারদের কারো কারো মুখে শুনিয়াছি, তাঁরা তাঁদের নাটকের চরিত্রগুণের মুখে পূর্ব বাংলার ডায়ালেক্টের বদলে পশ্চিম বাংলার ডায়ালেক্ট দেন এই কারণে যে নামযাদা অভিনেতারা পূর্ব বাংলার ডায়ালেক্টে অভিনয় করিতে অনিচ্ছুক। অভিনেতাদের জবাব এই যে, পশ্চিম-বাংলার ডায়ালেক্টে অভিনয় করিতে-করিতে ওটাই তাদের মুখে সহজে আসে। তাঁদের কথাও ফেলে দেয়া যায় না। আমাদের অধ্যাপক শিক্ষক, অফিসার-কেরানী, ব্যবসায়ী-নাগরিকদেরও অনেকের কলমে বাংলার চেয়ে ইংরাজীই সহজে বাহির হয়। এটা অভ্যাসের ফল।

এটাই চলিয়াছিল আমেরিকায় পুরো দেড়শ বছর। আমাদের আজকার মঞ্চ-সিনেমা, রেডিও-টেলিভিশনের মতোই মার্কিন মুল্লুকেরও ঐসব ক্ষেত্রে মার্কিন ইংরাজীর বদলে বিলাতী ইংরাজী চলিয়াছিল বিশ শতকের তৃতীয় দশকের শেষ পর্যন্ত। বিখ্যাত ভাষা বিজ্ঞানী ডা. হেনরি এল, ম্যানকন তাঁর বিশাল গ্রন্থ ‘আমেরিকান ল্যাংগুয়েজ’-এ লিখিছেনঃ

‘এমন এক সময় ছিল যখন সমস্ত মার্কিন অভিনেতারা লন্ডনের ওয়েস্টএন্ডের ডায়লেক্টে অভিনয় করিতেন। কঠোর অধ্যাবসায়ে তারা ও রেডিও-টেলিভিশনের সংবাদ পাঠকরা ঐ ভাষা ও উচ্চারন শিখতেন। সে উদ্দেশ্যে বহু স্কুল স্থাপিত হইয়াছিল। হলিউডের চলচিত্র-শিল্প ও বিভিন্ন ব্রডকাষ্টিং স্টেশনের সাহসিকতায় ১৯৩১ হতে ১৯৩৯ সালের মধ্যে ঐ প্রথার অবসান হয়।’

জনগণের জয়

ইংরেজী সাহিত্য যতই সমৃদ্ধ হোক, ইংরেজী ভাষা যতই বিপুল বিশাল হউক, তার প্রভাব যতই শক্তিশালী হউক, ইংরেজের কৃষ্টি যতই সর্বগ্রাসী হউক, তাদের সাম্রাজ্য যতই শক্তিশালী হউক, স্থান ও কালের এই দুর্বার দাবির নিকট সকলের নত হইতে হইল। ইংল্যান্ডের শান্তশীতল আবহাওয়া হইতে, বিশ্ব-শাসক ইংরাজের আভিজাত্যের প্রসাদ হইতে, ইংরাজী ভাষাকে নামিয়া আসিতে হইল মার্কিন মুল্লুকের রুক্ষ শক্ত মাটিতে। আভিজাত্যের শুভ্র পরিচ্ছন্নতা শালীনতা অক্সনিয়ান সাধুতা আর তার থাকিল না। তার গায় মার্কিন মুল্লুকের কাদা-মাটির ময়লা লাগিল। ‘কয়েদীর জাত’ মার্কিন চাষা ও কুলির মুখের ‘অভদ্র ‘ ভাষা ইংরাজী ভাষা হইল। তকে আর সাহিত্যে আপাংক্তেয় রাখা গেল না।

এটা অভিজাত ইংরাজী ভাষার মার্কিনী রূপান্তরের দিক। এই সংগে ইংরাজী সাহিত্যকে গণমুখী করিবার সংগ্রামও শুরু করেন মার্কিন নেতারই। মার্কিন সাহিত্যিক বিবর্তনের অন্যতম প্রধান নেতা এযরা পাউন্ড এ সম্পর্কে যে সব কথা বলিয়াছেন তার মর্ম এই:

ইংরাজীকে আইভরি টাওয়ারে থাকা চলিবে না। মাটিতে নামিয়া আসিতে হইবে। তা যদি সে না নামে, তবে তাকে টাওয়ারের ভাষা হইয়াই থাকিতে হইবে।মার্কিন জনগণ তার সাথে সম্পর্ক রাখিবে না। ইংরাজী সাহিত্যিকও তেমনি যদি প্রাসাদ হইতে নামিয়া না আসেন, তবে মার্কিন জনগণ হইতে তিনি সম্পূর্ণ বিযুক্ত হইবেন। যে ভাষা ও সাহিত্য জনগণ হইতে বিযুক্ত হইল, সত্য হইতেই সে বিচ্যুত হইল।

এযরা পাউন্ড এ ব্যাপারে চীনের ধর্মীয় নেতা কনফিউসিয়াসের নযির দেন। কনফিউসিয়াসের মতে আদর্শ দেশশাসক সেই ব্যক্তি যিনি দেশের প্রত্যেক নাগরিককে নামে চিনেন। চীনা ধর্ম-নেতার এই মহাকাব্যকে এযরা পাউন্ড সাহিত্যে প্রয়োগ করেন। তিনি বলেন : আদর্শ সাহিত্য সেই সাহিত্য যে সাহিত্য দেশের জনগণকে নাম ধরিয়া ডাকিতে পারে। নাম ধরিয়া ডাকা ঘনিষ্ঠতার লক্ষণ। এযরা পাউন্ড দেশের সাহিত্যকে দেশের জনগণের সহিত এমনি ঘনিষ্ঠ হইতে বলেন।

ইহার ফল কি হইয়াছে দুনিয়াবাসীর তা জানা আছে। মিস স্টেইন, এযরা পাউন্ড ও টি.এস. ইলিয়ট মার্কিনবাসীকে কৃষ্টি-সাহিত্যে যে স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত করেন, তার ফলেই আজ জ্ঞানে-বিজ্ঞানে রাষ্ট্রনীতিতে “কয়েদীর জাত” মার্কিনীরা বিশ্ব নেতৃত্ব হাসিল করিতে পারিয়াছে। ফ্রষ্ট হেমিংওয়ে ও ফকনারের মতো বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিকের জন্ম সম্ভব হইয়াছে। কৃষ্টি-সাহিত্যে স্বকীয়তা লাভ না করিলে মার্কিনবাসীর পক্ষে এটা সম্ভব হইত না।

মার্কিন আমাদের সাদৃশ্য

এইবার আসুন, মার্কিন জাতির সাথে আমাদের অবস্থার তুলনা করি।

আমরা পূর্ব-বাংগালীরা পশ্চিম-বাংগালী হইতে পৃথক হইয়া একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের নাগরিক হইয়াছি এখানে মার্কিনবাসীর সাথে আমাদের পুরোপুরি মিল আছে। পূর্ব ও পশ্চিম-বাংগালীদের ভাষা এক, হরফ এক। আমাদের উভয়ের সাহিত্যিক ঐহিত্যও এক। রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র নজরুল ইসলাম সত্যেন দত্ত উভয় বাংলার গৌরবের ও প্রেরণার বস্তু। ইংরাজ ও মার্কিন জাতিরও এক ভাষা এক হরফ। একই ইংরেজী সাহিত্য একই মিলটন শেক্সপিয়ার উভয় জাতির গৌরব ও প্রেরণার বস্তু। এখানেও আমাদের সাথে মার্কিনীদের অবস্থার পুরা মিল আছে।

দেশ বিভাগের আগেই বাংলা সাহিত্য বিশ্ব-সাহিত্যের দরবারে স্থান পাইয়াছে। গল্পে কবিতায় বিজ্ঞানে দর্শনে সমৃদ্ধশালী হইয়াছে। বাংগালী কবি বাংলা কবিতার জন্য নোভেল প্রাইজ পাইয়াছেন। মার্কিনী স্বাধীনতার আগেই তেমনি ইংরেজী সাহিত্য বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যে উন্নীতে হইয়াছে। ইংরেজী সাহিত্য বিশ্বের কৃষ্টি-শিল্পের বাহন ও বিশ্ববাসীর প্রেরণার উৎস হইয়া উঠিয়াছে। পূর্ব-বাংগালীর পক্ষে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের প্রভাব হইতে মুক্ত হওয়া যেমন কঠিন, মার্কিন জাতির পক্ষেও শ্রেক্সপিয়ারের ইংরেজী সাহিত্যের প্রভাব হইতে মুক্ত হওয়া ছিল তেমনি কঠিন। সুতরাং এ ব্যাপারেও মার্কিন জাতির সমস্যার সাথে পূর্ব-বাংগালীর সাহিত্যিক সমস্যার হুবুহু মিল আছে।

মার্কিন জাতি ইংরেজী সাহিত্যের প্রভাব-মুক্ত হয়ে জাতীয় স্বকীয়তা-ভিত্তিক নিজস্ব সাহিত্য সৃষ্টির তাগিদ অনুভব করিয়াছিল যে কারণে, সেটা ধর্মীয় বা ঐতিহ্যিক তাগিদ ছিল না। পুরাপুরি কৃষ্টির তাগিদও ছিল না। কারণ ইংরেজ জাতির মতো মার্কিন জাতির ধর্মও ছিল খ্রিষ্টান এবং চার্চও ছিল বিলাতী। ধর্ম-ভিত্তিক কৃষ্টিও ছিল তেমনি তাদের অবিভাজ্য।

সুতরাং স্বকীয়তা ও নিজস্বতা তাগিদ ছিল তাদের নিছক রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র সত্তার তাগিদ। ধর্মে ঐতিহ্যে ও কৃষ্টিতে মুলত মার্কিন ও ইংরেজ এক গোত্রীয় হইলেও রাষ্ট্রীয় ও ভৌগলিক সত্তায় মার্কিনীরা ছিল ইংরেজ হইতে সম্পূর্ণ আলাদা। একমাত্র এই রাষ্ট্রীয় সত্তার তাগিদেই তারা উপলব্দি করিয়াছিল, কৃষ্টিক ভাষিক ও সাহিত্যিক স্বকীয়তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা রক্ষা বিকাশ ও প্রসার অসম্ভব।

এ ব্যাপারেও মার্কিন জাতির সাথে পূর্ব-বাংলার মিল ত আছেই, বরঞ্চ বেশি তাগিদ আছে। অধিকার ও আবশ্যকতাও আছে বেশি।

 

আমাদের সুবিধা

ইংরেজ ও মার্কিন জাতির ধর্মীয় কৃষ্টিক ঐতিহ্যেক অবিভাজ্যতা ছিল মার্কিনী স্বকীয়তার পথে বাধা। আমাদের পথে তেমন বাধা নেই। পূর্ব ও পশ্চিম-বাংলার মধ্যে ধর্ম কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের ব্যাপারে কোনও অবিভাজ্যতা নাই। এইখানে মার্কিনীদের সাথে পূর্ব-বাংলার কোন মিল নাই। এ অমিল আমাদের সমাধান সহজতর করিয়াছে।

মার্কিন জাতি যখন স্বাধীন হয় এবং তারা যখন কৃষ্টিতে ভাষায় ও সাহিত্যে তাদের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার উদ্যম শুরু করে, তখন তাদের নিজস্ব কৃষ্টি ভাষা ও সাহিত্য বলিয়া কিছু মিল ছিল না। রাষ্ট্রীয় স্বাধীন সত্তার প্রয়োজনে পৃথক জাতীয়তার তাগিদে তারা সৃষ্টি ও নির্মান শুরু করে একেবারে ‘কিছু না’ হইতে। ‘কিছু না’ হইতেই আজ তারা একটা আত্মমর্যাদাবান জাতি, একটা বিপুল কৃষ্টি, একটা সমৃদ্ধশালী সাহিত্য সৃষ্টি করিয়াছে।

এখানে মার্কিন জাতির সমস্যার সাথে আমাদের মিল নাই। দেশ বিভাগের সময় আমাদের নিজস্ব ভাষা, ইতিহাস, নিজস্ব ঐতিহ্য ও নিজস্ব কৃষ্টি ছিল এবং আছে। কাজেই আমাদেরকে ‘কিছু না’ হইতে শুরু করিতে হইবে না। আমাদের সমস্যা মার্কিন জাতির সমস্যার মতো কঠিন নয়। আমাদের অবস্থা তাদের মতো নৈরাশ্যজনকও নয়।

আমাদের বর্তমান কৃষ্টি ঐতিহ্য ইতিহাসকে বুনিয়াদ করে অনেক সহজে আমরা নিজস্ব জাতীয়তা ও স্বকীয় সাহিত্য সৃষ্টি করিতে পারি। স্বকীয়তার মর্যাদাবান পুর্ব-বাংলার সাহিত্যে ভাষায় ব্যকরণে অভিধানে আমরা এমন উন্নতি সাধন করিতে পারি, যা পশ্চিম বাংলার অনুকরণ অনুসরনের যোগ্য হইতে পারে।

ইংরেজী ভাষার সংস্কারে মার্কিনী প্রচেষ্টাকে ইংরেজরা গোড়ায় যতই কুনযরে দেখিয়া থাকুক না কেন, এখন সে সংস্কারের অনেকগুলি ইংরেজদের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হইতেছে।

 মিনিমাম দাবি

ইংরাজী ভাষার সংস্কারে মার্কিনী দাবি কোনও অসম্ভব বিপ্লবাত্মক দাবি ছিল না। হরফ বানান ব্যাকরণ অভিধান আমুল পরিবর্তনের কোনও সংকল্প বা চেষ্টা ছিল না। তাদের দাবি ছিল নিতান্তই সীমাবদ্ধ। ইংরাজী ভাষাতে তারা মার্কিনী প্রাণ দিতে চাহিয়াছিল। ইংরাজী সাহিত্যকে দিয়া মার্কিনী জনগণের অন্তরের কথা কওয়াইতে চাহিয়াছিল। মার্কিন জাতির মুখের ভাষাকে তারা ইংরাজী সাহিত্যের ভাষা করিতে চাহিয়াছিল। ইংরাজী হরফ হরফই থাকিবে, ইংরাজী শব্দও শব্দই থাকিবে। শুধু ঐ-সব হরফ ঐ সব শব্দ ইংলন্ডের বদলে মার্কিনী বুলি বুলিবে এই মাত্র।

মার্কিন জাতির মতোই পূর্ব-বাংগালীর দাবিও সীমাবদ্ধ মডেষ্ট দাবি। আমরা বাংলা শব্দাবলীর মানে বদলাইতে চাই না। আমরা শুধু এই সব হরফ ও শব্দ দিয়া পূর্ব-বাংলার বুলি বদলাইতে চাই। বাংলা ভাষায় আমরা পূর্ব-বাংগালীর রুহ প্রবেশ করাইতে চাই।

তাতে গোটা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অবনতি হইবে না, বরঞ্চ উন্নতিই হইবে। সংকুচিত হইবে না, বরঞ্চ প্রসারিত হইবে। তাতে বাংলার শব্দ-সম্পদ যদি বাড়ে, তবে সে-সব নয়া শব্দ পূর্ব-বাংলার অন্তর হইতে পূর্ব-বাংগালীর মুখ হইতেই আসিবে, বাহির হইতে নয়।

তাতে বাংলা হরফে রূপান্তর হইবে না। হরফের সংখ্যায় যদি যোগ-বিয়োগ হয়, তবে সেটা হইবে সাহিত্যের তাগিদে পলিটিক্যাল কারণে। সে বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন সে যুগের তাগিদে পশ্চিম-বাংলায়ও অনুভূত হইবে। তাতে আমাদের সংস্কার পশ্চিম-বাংলার গ্রহণযোগ্য হইতে পারে।

কৃষ্টি-ঐতিহ্য ও ইতিহাসের পার্থক্য পূর্ব-বাংলার স্বকীয়তা সুস্পষ্ট। তাতে মতভেদও নাই। কাজেই আমাদের এই আলোচনা ভাষার স্বকীয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

[উৎসঃ আবুল মনসুর আহমদ, বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, সপ্তম মুদ্রণ, ২০১১, ঢাকা, পৃঃ৪৭-৫২] বইটির পিডিএফ কপি

লেখকের অন্যান্য লেখা-

বিশ্বকবি হয়েও রবীন্দ্রনাথ বাঙলার জাতীয় কবি নন

মুসলিম বাংলার স্বাতন্ত্র্যবোধ, স্বকীয় ভাষা নিয়ে সাহিত্যিকদের মনে বিতৃষ্ণা কেন?

আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর

পাঠ্যপুস্তকের শব্দ ও সাহিত্য নিয়ে সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়ার সেকাল-একাল

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

আধুনিক বাঙলা সাহিত্যে হিন্দু-মুসলিম স্বাতন্ত্র্যধর্মী ধারা– আবদুল মান্নান সৈয়দ

দুই বাংলার ভাষা ও সাহিত্যের সীমানা: খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি

ঢাকার প্রমিত বাংলায় কলকাতা কেন্দ্রিক উপনিবেশের প্রভাব

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion