পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাঃ অসাধারণ নজির স্থাপন করলেন গ্রামের সাধারণ মানুষ

বাংলাদেশ যখন ফরহাদ মজহার ইস্যুতে ব্যস্ত, ঐদিকে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়ে গেল এক দফা।অনেকদিন থেকেই বিজেপি যেটা চাইছিল। এবার সেরকম উস্কানিতে পা দিল কিছু স্থানীয় মুসলিম জনতা। শুরুটা হয় ফেইসবুকে কাবাঘরের ওপর অশ্লীল ফটোশপের ছবির প্রতিবাদে।(১) ঠিক যেন আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার মঞ্চায়ন।
 
মাগুরখোলা গ্রামের একাদশ শ্রেণির ছাত্র শৌভিক সরকার৷ সে-ই ফেইসবুকে কাবা শরিফ নিয়ে পোষ্ট করে। প্রশ্ন উঠেছে, একাদশ শ্রেণীর একজন ছাত্রের হাতে কুরুচির এই ছবি গেল কি করে। স্থানীয় মুসলিমরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসলে প্রশাসন খুব দ্রুত ঐ ছেলেটিকে গ্রেফতার করে। কিন্তু মুহর্তেই বিজেপি ও হিন্দু পরিষদের নেতারা গভর্নর হাউজ যান। বিজেপির নিয়োগপ্রাপ্ত রাজ্যপাল কেশরী নাথ ত্রিপাঠি মূখ্যমন্ত্রী মমতা মুখার্জীকে ‘আদেশ’ দেন  শৌভিককে ছেড়ে দিতে, সে মমতাকে প্রেসিডেন্ট রুলেরও হুমকি দেয়। (২)
ঘটনার পর বহিরাগতরা এসে গ্রামে হামলা চালায়। ঘটনার দিন পাড়ার মুসলমান ‘চাচারা’ই বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন শৌভিককে। আমিরুল মাগুরখোলা মিলন মসজিদ কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, ‘‘প্রথমে কি হয়েছে ঠিক জানতাম না। হঠাৎ ভাইপোর কাছে খবর পাই বাবলু সরকারের(শৌভিকের কাকা) বাড়িতে দু-তিনশো জন জড় হয়েছে। গিয়ে দেখি উন্মত্ত ওই যুবকদের৷ওরা বাবলুর ভাইপোকে খুঁজছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যে বাড়িতে আগুনও লাগিয়ে দেয়৷’’ নিজের পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও ওদের থামানো যায়নি বলেও জানান আমিরুল। এরপর গ্রামের বাকি লোকজনদের খবর দেওয়া হয়৷ গ্রামের ছেলে মকসুদ দমকলে খবর দেয়। সে নিজেও দমকলে কাজ করে৷ তাই সমস্যা হয়নি। পরে গোবরডাঙা থেকে দমকল এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়৷।এদিকে গ্রামের হিন্দু-মুসলমানরা জোট বাঁধতেই পালিয়ে যায় বহিরাগতরা।(৩) 
 
কিন্তু ঘটনা আরো গভীর। সুমন দাসগুপ্ত ফেসবুকে লিখেছেন,
“পবিত্র কাবা শরিফের ছবির উপর আল্লাহ ও রসুলকে নিয়ে নোংরা ছবির ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন করার দায়ে (যে ছবি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না) রবিবার রাতে উত্তর ২৪ পরগণার বাদুড়িয়াতে গ্রেপ্তার সৌভিক সরকার। ধুলাগড়েও ঠিক একই রকম ভাবে, দাঙ্গা বাধানোর ছক কষেছিল নপুংষক হিন্দুত্বের ধামাধারীরা। ধুলাগড়ে স্থানীয় অন্নপূর্ণা ক্লাব, এই হিন্দুত্ব বাহিনীর দ্বারা পরিচালিত একটি ক্লাব। হজরত মহম্মদের জন্মদিন উপলক্ষে ওখানকার মুসলমানেরা একটি শোভাযাত্রা বের করে। অন্নপূর্ণা ক্লাবের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো ওই শোভাযাত্রাটি ওই সময় হিন্দুত্ববাদী বীরপুঙ্গবেরা, শোভাযাত্রার শেষের দিকে থাকা কিছু মুসলমান যুবক কে বলপূর্বক হিন্দু দেবদেবীদের নাম বলতে বাধ্য করে এবং গন্ডগোলের সূত্রপাত সেখান থেকেই।(৪)
 
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বরাতে ইত্তেফাক জানাচ্ছে, বসিরহাট ছাড়াও বাদুড়িয়া, দেগঙ্গা, স্বরূপনগর এলাকাগুলিতে সোমবার সন্ধ্যা থেকেই অশান্তি শুরু হয়। বহু মানুষ রাস্তা আর রেলপথ অবরোধ করে রাখেন অনেক রাত পর্যন্ত। বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের নেতারা অবরোধকারীদের বোঝাতে থাকেন যে অভিযুক্ত কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কাজেই তারা যেন অবরোধ তুলে নেন। কিন্তু নেতাদের কথা শোনেন নি ওই অবরোধকারীরা।(৫)
 
জি নিউজ জানাচ্ছে দাঙ্গার আগুনে তেল দিয়েছেন অনেক দিন থেকে সুযোগ সন্ধানী সাম্প্রদায়িক ‘হিন্দু সংহতি’র নেতা তপন ঘোষ। ফেইসবুকে সে উসকানিমূলক তথ্য দিয়ে যাচ্ছে। বলছে ৭ জন নাকি খুন হয়েছে, অথচ এরকম কোন খবর কেউ নিশ্চিত করেনি।(৬)যার কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার হিন্দু সংহতি ও আসাদুদ্দিন ওয়েইসির সংগঠন ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন এর সভা-সমাবেশের ওপর নিষেদাজ্ঞা জারি করেছে।একই সাথে সরকার অপপ্রচার আর চক্রান্ত ঠেকাতে পাড়ায় পাড়ায় শান্তি বাহিনী তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে।(৭)
 
অন্যদিকে বাদুড়িয়ার অশান্তি নিয়ে এক অভূতপূর্ব বাদানুবাদ হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ও রাজ্যপাল কেশরী নাথ ত্রিপাঠির মধ্যে। মমতা ব্যানার্জী অভিযোগ করেছেন বাদুড়িয়ার অশান্তি নিয়ে রাজ্যপাল তাকে অত্যন্ত অপমান করেছেন। (৮) 
 
কাবা’র ছবি বিকৃতের জেরে উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট, ইত্তেফাক, ০৫ জুলাই, ২০১৭
তবে এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, গ্রামের সাধারণ মানুষ সাম্প্রদায়িকতা নামক কলুষতা থেকে অনেকটাই মুক্ত। গ্রামের আমিরুল চাচা আগলে রেখেছিল শৌভিক সরকারকে। একইভাবে, আনন্দবাজার পত্রিকায় নির্মল বসু তুলে ধরেছেন অন্যরকম আরেকটি মানবিক চিত্র। মঙ্গলবার রাত থেকে প্রায় ২৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন বর্মা কলোনিতে। তার উল্টো দিকে পশ্চিম দণ্ডিরহাট। সেখানেই মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হয়েছে বোমা-গুলির তড়পানি। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বহু বাড়িতে। দিশেহারা হতদরিদ্র পরিবারগুলো কোথায় যাবে, কী করবে ঠাহর করতে না পেরে জলা পেরিয়ে চলে এসেছে বর্মা কলোনিতে।তাঁদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করছেন ঐক্যবদ্ধভাবে কলোনির হিন্দু-মুসলিমরা। রক্ষণাবেক্ষণ করছেন একজন সন্তানসম্ভাবা মায়েরও।তাঁদের সেবায় মুগ্ধ রমা চোখে জল নিয়ে বললেন, ‘‘এমন আতিথেয়তা পাব ভাবিনি। মনে হল, নিজের লোকজনের মাঝেই আছি।’’ (৯) 
 
হিন্দু সংহতি’র তপন ঘোষ সম্ভবত আশা করেছিল কিছু লাশ পরুক। কিন্তু সেটা হয়নি বলে সম্ভবত তাঁর আফসোস আছে। মুসলমানেরা নাকি পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তান বানিয়ে ফেলছে। বিদ্বেষ লালনকারীদের মিথ্যাচারই একমাত্র পুঁজি। কিন্তু গ্রামের মানুষ, যাদের মধ্যে বিদ্বেষ নেই, বিপদের দিনে তারাই প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়িয়ে যায়। এই ঘটনা থেকে আমাদেরও শিক্ষণীয় আছে। পারস্পরিক দোষারোপের মানসিকতা ছেড়ে যদি সামাজিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো যায়, তাহলে আমাদের অল্প সংখ্যক সংখ্যালঘুদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীই।
 
রেফারেন্সঃ
 
(১) বিবিসি বাংলা, কাবার ফটোশপ করা অশ্লীল ছবির প্রতিবাদে অশান্ত পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট, ৪ জুলাই ২০১৭, http://www.bbc.com/bengali/news-40496282
 
(২)  Amaresh Misra, What really happened in Bengal and how it was designed to cause riots, July 5, 2017,  http://www.jantakareporter.com/india/really-happened-bengal/134628/
(৩) Kolkata24x7.com, দমকলে খবর দেয় মকসুদ, শৌভিককে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন আমিরুল, July 6, 2017, https://www.kolkata24x7.com/maksud-called-fire-brigade-souvik-was-saved-by-amirul.html
 
(৪) TDN Bangla, বাদুড়িয়ার চক্রান্ত ফাঁস, July 6, 2017, http://www.tdnbangla.com/state/leaked-plot-of-baduria-riot/ 
 
(৫)ইত্তেফাক, ‘কাবা’র ছবি বিকৃতের জেরে উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট, ০৫ জুলাই, ২০১৭ ইং, http://www.ittefaq.com.bd/world-news/2017/07/05/119353.html
 
(৬) Zeenews, বসিরহাট-বাদুড়িয়া কাণ্ড নিয়ে বিতর্কিত পোস্ট হিন্দু সংহতির নেতার, উত্তাপ ফেসবুকে, July 6, 2017 , http://zeenews.india.com/bengali/state/controversial-fb-post-by-hindu-samhati-leadr-tapan-ghosh_170176.html
 
(৭) আনন্দবাজার, রাজ্যে হিন্দু সংহতি এবং এএমআইএম-এর সমাবেশ নিষিদ্ধ করল সরকার, ৬ জুলাই, ২০১৭, http://www.anandabazar.com/state/hindu-samhati-and-amim-banned-in-west-bengal-dgtl-1.638752
 
(৮)ইত্তেফাক, প্রাগুক্ত
 
(৯)নির্মল বসু, ‘গ্রামের পুরুষরা সব মারামারিতে ব্যস্ত, পেটের বাচ্চাটা তো আগে বাঁচুক’, আনন্দবাজার, ৬ জুলাই, ২০১৭, http://www.anandabazar.com/state/giving-shelter-to-pregnant-womens-1.638530?ref=strydtl-rltd-state

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion