‘ভারতের সামনে নিজ দেশকে উপনিবেশ বানানো ছাড়া গত্যন্তর নেই’-অরুন্ধতী রায়

বর্তমান সময়ে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত লেখক অরুন্ধতী রায়। চলমান ঘটনাবলী সম্পর্কে বুকার পুরস্কারজয়ী এই লেখকের বিশ্লেষণগুলো নতুন মাত্রার সৃষ্টি করে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি’র বিপুল বিজয়ের পর ভারত যে সঙ্কটের দিকে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে কথা বলেছিলেন তিনি পাকিস্তানের প্রভাবশালী ডন পত্রিকা সাথে। ২০১৪ সালের মে মাসে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল। অরুন্ধতী রায়ের ভারতীয় নির্বাচন সম্পর্কে বিশ্লেষণটি লিখেছিলেন তাহির মেহদি, বাংলায় অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ। 

অরুন্ধতী রায়, উপন্যাসিক ও বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, রাজনৈতিক সমালোচক
অরুন্ধতী রায়, উপন্যাসিক ও বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, রাজনৈতিক সমালোচক

‘ভারতের জিডিপি যে দ্রুত ও খাড়াখাড়িভাবে ওঠছিল, তা আকস্মিকভাবে আরো বেশি বেগে নিচে নেমে আসার ফলে উড়ার অপেক্ষায় বসে থাকা মধ্যবিত্ত শ্রেণির কোটি কোটি লোক হঠাৎই মাঝ আকাশে নিজেদের ঠাণ্ডায় জমে যেতে দেখেন’, বলেছেন অরুন্ধতী রায়। ‘তাদের উল্লাস প্রথমে আতঙ্কে এবং তারপর ক্রোধে রূপান্তরিত হয়। মোদি এবং তার দল এই ক্রোধকে কাজে লাগিয়েছেন।’

সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতির জন্য পরিচিত ভারত ১৯৯১ সালে বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এতে করে ভারত রাতারাতি বৈশ্বিক পুঁজির স্বর্গভূমিতে পরিণত হয়, এর অর্থনীতি দ্রুত চাঙ্গা হয়ে ওঠে। অবশ্য নব্য–উদারবাদের ‘রোলার কোস্টার রাইডটি’ অপ্রত্যাশিত কিছু বাধার মুখে পড়ে। ২০১০ সালে আকাশছোঁয়া ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি চুপসে গিয়ে গত তিন বছর ধরে পাঁচ শতাংশের নিচে অবস্থান করতে থাকে। ভারতের কর্পোরেট শ্রেণি এই বিপর্যয়ের পুরো দায় চাপায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টির ‘নীতি নির্ধারণে স্থবিরতা’র ওপর। ‘ভদ্র’ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এখন বাধা হিসেবে চিহ্নিত হলেন। ফলে আগ্রাসী মোদি তার চূড়ান্ত বিপরীত হিসেবে গণ্য হলেন।

‘তিনি [মোদি] এখন আর মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালানোর ডাক দেবেন না, তিনি বরং বন–জঙ্গলের ওপর নজর দেবেন, সেখানকার প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে সেগুলো খনি ও অবকাঠামো করপোরেশনগুলোর কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেবেন,’ ব্যাখ্যা করলেন অরুন্ধতী। ‘সব চুক্তিপত্রই হয়ে আছে, কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিল। তাকে এমন এক মানুষ হিসেবেই বাছাই করা হয়েছে, যিনি কেবল মুসলিম রক্তপাত নয়, কোনো ধরনের রক্তপাতকেই পরোয়া করেন না।’

ভারতের সবচেয়ে গরিব উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই দেশটির বৃহত্তম খনি ও জ্বালানি প্রকল্পগুলো অবস্থিত। এসব লোক তাদের জীবিকার সম্পদরাজি বলপূর্বক নিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে আসছে। মাওবাদী জঙ্গিরা এসব আদিবাসীর স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার। এসব এলাকার অনেকগুলোতে কার্যত তাদের শাসনই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।

‘এ ধরনের উন্নয়ন মডেলে রক্তপাত অনিবার্য। ইতোমধ্যেই হাজার হাজার লোককে জেলে ঢোকানো হয়েছে,’ তিনি বলেন। ‘কিন্তু সেটাও আর যথেষ্ট বিবেচিত হচ্ছিল না। প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে ও নির্মূল করে দেওয়া হবে। শেষ স্থান পর্যন্ত যেতে পারে, এমন লোকের দরকার বৃহৎ পুঁজির। এ কারণেই বড় বড় শিল্প মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় কোটি কোটি ডলার ঢেলেছে।’

অরুন্ধতী রায় বিশ্বাস করেন, ভারত যে ধরনের উন্নয়ন মডেল গ্রহণ করেছে, সেটার ভিত্তি হচ্ছে গণহত্যা। “অন্যান্য ‘উন্নত’ দেশ কিভাবে অগ্রগতি হাসিল করেছে? যুদ্ধ, উপনিবেশ স্থাপন এবং অন্যান্য দেশ ও সমাজ থেকে সম্পদ লুণ্ঠন করার মাধ্যমে,” বলেন তিনি। ‘ভারতের সামনে নিজ দেশকে উপনিবেশ বানানো ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই।’

ভারতের জনসংখ্যা এমনভাবে বিন্যস্ত যে সব ধরনের প্রকল্প, বড় আকারের ড্যাম বা খনি প্রকল্পের কথা বাদই থাক,এমনকি রাস্তা নির্মাণের মতো একেবারে সাধারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলেও হাজার হাজার লোককে উচ্ছেদ করা দরকার হয়। সেইসঙ্গে দেশটিতে সমৃদ্ধ নাগরিক সমাজ, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং রাজনীতির অস্তিত্ব রয়েছে। এসব চ্যানেলের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু প্রতিরোধ করপোরেট উচ্চাভিলাষকে হতোদ্যম করে।

‘তারা এখন এটাকে সামরিকায়ন করতে চায়, সামরিক পন্থায় এটাকে দমন করতে চায়,’ বলেন অরুন্ধতী। তিনি মনে করেন, দমন করা “বলতে সবসময় গণহত্যা চালানো বোঝায় না বা এর দরকারও হয় না। তাদেরকে অবরোধে রেখে, ক্ষুধায় মেরে এবং তাদের ‘নেতা’ বা ‘উত্তেজনা সৃষ্টিকারীদের’ হত্যা করে বা জেলে ঢুকিয়েও এটা করা যায়।” এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চমাত্রার হিন্দু জাতীয়তাবাদের পথ। যারাই ‘উন্নয়ন’ প্রতিরোধ করবে, তাদেরকে জাতীয়তাবাদ বিরোধী হিসেবে অভিহিত করার লোকরঞ্জনের পথ এ থেকেই পাওয়া যাবে।

তিনি বঞ্চিত ক্ষুদ্র চাষীদের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এরা জীবনযাপনে তাদের পুরনো পন্থা ছেড়ে বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে। কেবল ২০১২ সালেই ভারতে ১৪ হাজার দুর্ভাগ্যপীড়িত কৃষক আত্মহত্যা করেছে। ‘এসব গ্রাম পুরোপুরি সম্পদহীন,শূন্য ও ধূলার মতো শুষ্ক ছিল। এসব মানুষ প্রধানত দলিত। এখানে রাজনীতির কোনো ব্যাপার ছিল না। ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারীরা তাদের ওপরওয়ালাদের কিছু ভোটের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসব মানুষকে ভোটকেন্দ্রে ঠেলে দিয়েছিল,’ বলেন তিনি। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের গ্রামগুলোতে তার সফরের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। ভারতে সেখানেই কৃষকদের আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। (আরো দেখুন; NDTV, 11,400 Farmers Committed Suicide In 2016: Union Agriculture Minister, July 20, 2017)

তাহলে কি ভারতে গণতন্ত্র নেই? ‘এমনটা বলা অতিকথন হয়ে যায়,’ তার জবাবে বললেন। ‘কিছু গণতন্ত্র তো আছেই। কিন্তু আপনি একথা তো অস্বীকার করতে পারবেন না যে, বিশ্বে ভারতেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ।

অধিকন্তু,স্বাধীনতার পর থেকে একটা দিনও নেই – যেদিন রাষ্ট্র তার সীমানার ভেতরেই বিদ্রোহ দমন করতে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করার প্রয়োজন পড়েনি। অবিশ্বাস্য সংখ্যায় মানুষজনকে হত্যা ও নিপীড়ন করা হয়েছে। এই রাষ্ট্রটি অব্যাহতভাবে তার জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ছত্তিশগড় বা উড়িশার মতো স্থানগুলোতে চলমান ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন, এখানে যা ঘটছে তাকে গণতন্ত্র বললে পরিভাষাটিকে অপমান করা হয়।’

অরুন্ধতী রায় বিশ্বাস করেন যে, নির্বাচন এখন পরিণত হয়েছে বিশাল করপোরেট প্রকল্পে। আর মিডিয়ার মালিক এবং পরিচালনাতেও রয়েছে একই করপোরেশন। তার অভিমত হলো, ভারতে ‘কিছু পরিমাণ গণতন্ত্র’ কেবল মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত। এর মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের মধ্যে আত্তীকৃত হয়ে গণপ্রতিরোধের রাষ্ট্রীয় ভাষ্যের অনুগত ভোক্তায় পরিণত হয়।

‘২০১৪ সালের নির্বাচন কিছু অদ্ভূত ধাঁধাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে,’ তিনি চিন্তিতভাবে বললেন। ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মায়াবতীর দল বিএসপি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম ভোট পেলেও একটি আসনও পায়নি। নির্বাচনের পাটীগণিত এমনই যে ভারতের প্রতিটি দলিতও যদি তাকে ভোট দেয়, তবুও তিনি হয়তো একটি আসনও পাবেন না।’

‘এখন আমাদের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুষ্টিমেয়তান্ত্রিক (totalitarian) সরকার এসেছে,’ তিনি বলে চলেন। ‘তাত্ত্বিকভাবে এবং আইনগতভাবে বিরোধী দল গঠন করার মতো পর্যাপ্ত আসন কোনো পার্টি পায়নি। তবে আমাদের অনেকে আরো অনেক আগে থেকেই বলে আসছে যে ভারতে কখনো প্রকৃত বিরোধী দল ছিল না। প্রধান দুই দল বেশির ভাগ নীতিমালায় একমত ছিল এবং তাদের প্রত্যেকেরই হাতে সাফল্যগাঁথা হিসেবে কোনো না কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চালিত নির্মূল অভিযানের স্মারক শোভা পাচ্ছে। তাই এখন সবকিছুই উন্মুক্ত। পুরো ব্যবস্থাটা প্রকাশ হয়ে পড়েছে।’

ভারতের ভোটারেরা তাদের রায় দিয়েছে। তবে মোটা দাগে অরুন্ধতী রায় যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন তার জবাব এখনো পাওয়া যায়নি : ভারতের গরিব মানুষেরা কোথায় যাবে?

 [ উৎসঃ মূল Tahir Mehdi, ‘Now, we have a democratically elected totalitarian government’ — Arundhati Roy, Dawn, May 23, 2014। বাংলা অনুবাদ, আমাদের বুধবার, ‘ভারতে এখন মুষ্টিমেয়তান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে’ : অরুন্ধতী রায়, জুন ৩, ২০১৪]

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

‘Manipur more a colony of India’- American diplomat

ভারতে বর্ণবাদঃ দলিতদের করুন অবস্থা

পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানঃসাচার রিপোর্টের দশ বছর পর সংখ্যালঘু বঞ্চনার চিত্র

ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদের উল্লম্ফনের ঐতিহাসিক পটভূমি

নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষ ভারত থেকে মোদীর হিন্দুত্ববাদী ভারত

স্বাধীন ভারতে কেমন আছে সংখ্যালঘু মুসলিমরা?

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion