কংগ্রেসেরই সিদ্ধান্ত ছিল ভারত বিভাগ একমাত্র পথ

[আবুল হাশিম ছিলেন একজন দার্শনিক, চিন্তাবিদ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বিভাগপূর্ব বাংলায় তিনি মুসলিম তরুন-যুবকদের অনেকের কাছে খুবই জনপ্রিয় এবং আদর্শিক গুরু ছিলেন। বিভাগপূর্ব বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। এই লেখাটি তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি’ থেকে নেয়া। শিরোনাম আমাদের দেয়া।- সম্পাদক]

লিখেছেন; আবুল হাশিম

১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ভারতের সেক্রেটারী অব স্টেট লর্ড পেথিক লরেন্স, বোর্ড অব ট্রেডের সভাপতি স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এবং নৌবাহিনীর প্রথম লর্ড, এ. ভি. আলেকজাণ্ডারকে নিয়ে গঠিত বৃটিশ মন্ত্রিপরিষদের একটি দল ভারতে আগমন করেন। তঁদের উদ্দেশ্য ছিলো মুসলিম লীগ এবং কগ্রেসের মধ্যে পরস্পর বিরোধী চিন্তাধারার সংযোগ সাধনের উপায় খুজে বের করা। তাঁরা একটি কেন্দ্রীয় ফেডারেল সরকারের অধীনে উপমহাদেশের প্রদেশগুলিকে নিয়ে তিনটি স্বায়ত্তশাসিত গ্ৰপ গঠনের প্রস্তাব করেন এবং এটাই ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান* নামে পরিচিত। মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান গ্ৰহণ করেছিলো। যদি ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান কাৰ্যে পরিণত করা হতো তাহলে লাহোর প্রস্তাবের আদর্শগত বিষয়বস্তুকে বিশেষ ক্ষুন্ন না করে উপমহাদেশের বিভাজন পরিহার করা যেত।

আবুল হাশিম (জানুয়ারি ২৭, ১৯০৫ - অক্টোবর ৫, ১৯৭৪)
আবুল হাশিম (জানুয়ারি ২৭, ১৯০৫ – অক্টোবর ৫, ১৯৭৪)

দুৰ্ভাগ্যবশত এই চুড়ান্ত মুহূর্তে কংগ্রেসের সভাপতিরূপে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের স্থলাভিষিক্ত হলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। সাংবাদিক সম্মেলনে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু কংগ্রেসের সভাপতি হিসাবে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান মেনে চলতে অঙ্গীকারবন্ধ নয় এবং তাঁরা তাঁদের ইচ্ছে অনুযায়ী যেভাবে খুশী উপমহাদেশের সংবিধান রচনা করবেন। এই উক্তির সুস্পষ্ট প্ৰতিক্রিয়া হয়েছিলো। মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের দিকে ফিরে গেলো। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর প্রেস বিবৃতির যুক্তিগ্রাহী পরিণতি হিসাবেই মুসলিম লীগ প্ৰত্যক্ষ সংগ্রাম প্ৰস্তাব গ্রহণ এবং পরবর্তী বিধানসভা বর্জন করেছিলো।

সুহরাওয়ার্দী ১২ই আগস্ট ( ১৯৪৬) জনৈক আমেরিকান সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার কালে বলেছিলেন,

“মুসলিম লীগকে এড়িয়ে গিয়ে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার সম্ভাব্য পরিণতি দাড়াবে বাংলার পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা এবং অনুরূপ সরকার গঠন।” তিনি আরও বলেন, “বাংলা থেকে যাতে কোনো রাজস্ব আদায় করা না যায় সে ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রেখে বাংলাকে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য করব। দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছে লীগের নেই তবে যদি আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয় তাহলে লীগ এরূপ কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করবে।”

সুহরাওয়ার্দী অভিযোগ করেন যে, কংগ্রেস যদি জাতীয়তাবাদী মুসলিমদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত করে তাহলে তারা অন্তর্বর্তী সরকারে লীগের যোগদানে বাধা সৃষ্টি করবে। সুহরাওয়ার্দী মন্তব্য করেন, জাতীয়তাবাদী মুসলিমদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করলে তা সারা ভারতকে আন্দোলনের মুখে ঠেলে দিয়ে গৃহযুদ্ধের সূচনা এবং দেশকে বিচ্ছিন্ন করবে।

২৪শে আগস্ট ( ১৯৪৬ ) ভাইসরয়, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্ৰ প্ৰসাদ, আসিফ আলী, রাজা গোপাল আচারী, শরৎচন্দ্ৰ বোস, জন মাথাই, সরদার বলদেব সিংহ, স্যার শারাফাত আহমেদ খান, জগজীবন রাম, সৈয়দ আলী জাহির এবং সি. এইচ. ভাবাকে নিয়ে তাঁর কার্যনিৰ্বাহী পরিষদ পুনর্গঠন করলেন। লর্ড ওয়াভেল অন্তর্বর্তী সরকারে এবং বিধানসভায় যোগ দানের জন্য মুসলিম লীগকে তাঁদের নীতি পুনর্বিবেচনা করার জন্য আহবান করলেন। এর পূর্বে ভারতের সংবিধান রচনার জন্য বিধানসভা গঠিত হয়েছিলো এবং বাংলা থেকে বিধানসভায় আমি অন্যতম সদস্য মনোনীত হয়েছিলাম।

ভাইসরয়ের কাৰ্যনির্বাহী পরিষদ কেবলমাত্র কংগ্রেসেকে নিয়ে পুনর্গঠনের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ২৬শে আগস্ট জিন্নাহ বলেন, “ভাইসরয় যে পদক্ষেপ গ্ৰহণ করছেন সেটা খুবই অবিবেচনাপ্রসূত ও অরাজনীতিজ্ঞসুলভ।” জিন্নাহ বিধানসভা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

অন্তৰ্বতী সরকার

১৯৪৬ সালের ১৫ই অক্টোবর মুসলিম লীগ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান করল। মুসলিম লীগের মনোনীত ব্যক্তিরা হলেন, নওবাবজাদা লিয়াকত আলী খান এবং যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল। এটা খুবই আশা করা হয়েছিলো যে, অন্তর্বতী সরকারের জন্য নওবাব মহম্মদ ইসমাইল এবং খাজা নাজিমুদ্দীনকে মনোনীত করা হবে। রাজা গজনফর আলী ও চুন্দ্রীগড়ের কোনোপ্রকার রাজনৈতিক প্রাকৃপরিচিতি ছিলো না। জিন্নাহ বাংলা থেকে কোনো মুসলমানকে গ্ৰহণ করেননি। বাংলাকে প্ৰতিনিধিত্ব করার জন্য যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে নির্বাচন করা হয়েছিলো।

সরদার প্যাটেল স্বরাষ্ট্র, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের দপ্তর গ্রহণ করেন। তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দপ্তর মুসলিম লীগকে প্ৰদান করার প্রস্তাব করেন। কংগ্রেস ভেবেছিলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হবে। জিন্নাহও এ বিষয়ে একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। পাঞ্জাব অর্থ বিভাগের চৌধুরী মহম্মদ আলী অর্থ দপ্তর গ্রহণ করার জন্য জিন্নাহকে পরামর্শ দিলেন এবং নওবাবজাদা লিয়াকত আলী খানকে সর্বান্তিকরণে সমর্থন দানের প্রতিজ্ঞা করলেন। জিন্নাহ তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। লিয়াকত আলী খানকে অর্থ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হলো। ভারত সরকারের অর্থ বিভাগের আরোও দু’জন অর্থ বিষয়ক দক্ষ ব্যক্তি গোলাম মহম্মদ এবং মীর্জা মমতাজউদ্দীন, চৌধুরী মহাম্মদ আলীর দলে যোগ দিয়ে অন্তর্বতী সরকারের প্রথম বাজেট তৈরীতে সাহায্য করেন। বাজেটটি প্ৰগতিশীল জনগণের বাজেট রূপে উচ্চ প্ৰসংশিত হয়েছিলো।

কংগ্রেস দারুণভাবে হতাশ হলো। কংগ্রেসের প্রত্যাশা ছিলো যে, নওবাবজাদা লিয়াকত আলী খান শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হবেন যেটা সত্যে পরিণত হলো না। কংগ্রেস অচিরেই উপলব্ধি করল যে, মুসলিম লীগকে অর্থ দপ্তর হস্তান্তর করে তারা বিরাট ভুল করেছে। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ তার বই ‘India Wins Freedom’ এ লিখেছেন,

‘’প্রত্যেক দেশে অর্থ দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী শাসন প্রণালীতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। ভারতে তাঁর অবস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন না বৃটিশ সরকার অর্থমন্ত্রীকে তাদের স্বার্থের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে গণ্য করে থাকে। এ দপ্তরের দায়িত্ব বরাবর এক একজন ইংরেজকে দেওয়া হয়েছে এবং এ উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে তাঁদেরকে ভারতে নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী প্রতিটি বিভাগেই হস্তক্ষেপ এবং কাৰ্যসূচী প্ৰণয়ণ করতে পারতেন। লিয়াকত আলী খান যখন অর্থমন্ত্রী হলেন তখন তিনি শাসন প্ৰণালীতে মুখ্য অধিকার লাভ করলেন। প্রতিটি বিভাগের প্রতিটি প্রস্তাব তার বিভাগের সূক্ষ্ম পৰ্যালোচনা সাপেক্ষ ছিলো। এ ছাড়াও তাঁর যে কোনো প্ৰস্তাব নাকচ করার অধিকার ছিলো। তাঁর বিভাগের অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো বিভাগে চাপরাসী নিয়োগ করাও সম্ভব ছিলো না।”

ভাইসরয়ের কাৰ্যনিৰ্বাহী পরিষদে মুসলিম লীগ সদস্যদের স্থান দেওয়ার জন্য কিছুসংখ্যক কংগ্রেস সদস্যদের বাদ দিতে হয়েছিলো। কংগ্রেস স্থির করল, লীগ মনোনীত প্ৰার্থীদের স্থান সংকুলানের জন্য শরৎচন্দ্ৰ বোস, স্যার শাফাত আহমেদ খান এবং সৈয়দ আলী জাহিরের পদত্যাগ করা উচিত। শরৎচন্দ্ৰ বোস ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে কলকাতা প্ৰত্যাবর্তন করলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জেল থেকে মুক্তি লাভ করার পরই শরৎচন্দ্ৰ বোস কলকাতায় মির্জাপুর পার্কে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “পাকিস্তান একটি অর্থহীন আজগবী ব্যাপার।” এরপর থেকে উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম যে, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে  তাঁকে বোঝাব, ভারতকে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন করতে হলে ভারতের প্রতিটি দেশ ও জাতিকে স্বাধীন এবং সার্বভৌম হতে হবে। আমি স্থির করলাম শরৎচন্দ্ৰ বোসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করব।

অন্তর্বর্তী সরকারে কংগ্রেসের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিলো এবং তারা ভালোভাবে বুঝেছিলো যে, মুসলিম লীগ মন্ত্রীদের নিয়ে যে সরকার সেটার অর্থই হলো কংগ্রেসের জন্য অশেষ ঝামেলাস্বরূপ। কাৰ্যনিৰ্বাহী পরিষদের কংগ্রেস সদস্যদের যে কোনো প্ৰস্তাব অর্থমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পরিবর্তন নতুবা অগ্রাহ্য করতেন। কংগ্রেসের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গীর মৌলিক পরিবর্তন সাধন করল। সাধারণভাবে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এবং বিশেষভাবে সরদার প্যাটেল বুঝতে পারলেন যে, ভারত বিভাগই একমাত্র সমাধানের পথ।

(সোর্সঃ আবুল হাশিম, আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি, চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৮, পৃ ১০৯-১১২) বইটির পিডিএফ সংগ্রহ করুন

*১৯৪৬ সালের মে মাসের ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব ছিল ভারতকে অখণ্ড রাখার সর্বশেষ প্রস্তাব। সেই প্রস্তাবে কনফেডারেশানের ভিত্তিতে উত্তর ভারতের মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্যগুলো নিয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, বাংলা ও আসাম নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল নিয়ে আরেকটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের প্রস্তাব ছিল। প্রস্তাবে বলা হয় দিল্লি কেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মুদ্রানীতি, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র নীতির দায়িত্ব থাকবে কেবল। আঞ্চলিকভাবে থাকবে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যান্য ক্ষমতা। -সম্পাদক

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

কারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে

বর্ণ হিন্দুদের দাবী ছিল ভারত ভাগ না হলেও বাংলাকে ভাগ করতেই হবে

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও ১৯৪৭ সালের বাঙলা ভাগ-পর্ব ৫ – জয়া চ্যাটার্জী

নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির  এর লেখা;

হিন্দু অভিজাত শ্রেনীর বিশেষ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধার জন্যই  বাংলা ভাগ

বাঙলা ভাগের কুশিলব ছিল কংগ্রেস

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion