শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যকার বাকযুদ্ধের প্রেক্ষাপট

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা প্রশ্ন আছে যে, হঠাৎ করে কি এমন হল যে আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের নিয়োগকৃত বিচারপতিদের বিরুদ্ধেই জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করছে? বিচারকেরাই বা কেন (আপাত দৃষ্টিতে) সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই পোস্টে। জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি নিয়ে সমস্যার সূত্রপাত। এজন্য দেখে নেয়া যাক বিচার বিভাগের একটি বিধান-জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি কি।

 সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল

বিচারকরা যদি সংবিধান লঙ্ঘন করেন কিংবা গুরুতর অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত হন, সে ক্ষেত্রে তাদের অপসারণের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কর্তৃক তদন্ত করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত এ কাউন্সিল বিচারকদের আচরণবিধিও নির্ধারণের কাজ করবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অদক্ষতা, অযোগ্যতা, দুর্নীতিসহ অসদাচরণের কারণে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এক সামরিক ফরমানে বিচারপতিদের অপসারণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাতিল করেন। এ সময় বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে।(১)

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বিধান বিলুপ্ত করে সংবিধান সংশোধন করা হয়। যে সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতি অপসারনের ক্ষমতা সংসদের ওপর অর্পিত হয়। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে এটা করা হয়েছিল, যা সুপ্রিম কোর্ট সাম্প্রতিক সময়ে এসে বাতিল করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিচারক অভিসংশন বা অপসারনের ক্ষমতা আবারো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ফিরে গেল।(২) প্রশ্ন হচ্ছে সরকারই বা কেন বহুদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি বাতিল করল যার মাধ্যমে বিচারক অপসারনের ক্ষমতা সংসদের ওপর অর্পিত হয়?

সড়ক ভবন-শিশু একাডেমীকে সুপ্রিমকোর্টের জমি ছাড়ার নির্দেশ

১৯১০ সালে ৫৫ একর জায়গার ওপর নির্মিত হয়েছিল তৎকালীন গভর্ণর হাউজ।১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর ঐ জায়গায় স্থাপিত হয়েছিল পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট। এরপর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ঐ ৫৫ একর এলাকা বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আওতাভুক্ত হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে সামরিক সরকার এসে এ জমি থেকে শিশু একাডেমীকে ৩ একর এবং ১৯৭৯ সালে সড়ক ও জনপদ বিভাগকে ৮ একর জমি লিজ দেয়। ২০১১ সালে এসে হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও অ্যাডভোকেট ইখলাস উদ্দিন ভুঁইয়া জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি উদ্ধারে রিট মামলা করেন। ১০ মার্চ হাইকোর্ট রিটকারীর পক্ষে রায় দেন। ঐ রায়ের বিরুদ্ধে শিশু একাডেমী এবং সওজ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও আদালত তা বাতিল করে দেয় এবং হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। রায়ের ফলে শিশু একাডেমী এবং সওজ সুপ্রিম কোর্টের জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য।(৩)

আদালত ৯০ দিন সময় দিয়েছিল জায়গা ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু সওজ পুরো পুরোপুরি জায়গা বুঝিয়ে না দিয়ে অংশ বিশেষ বুঝিয়ে দিতে সুপ্রিম কোর্টকে ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১২ সালে চিঠি দেয়। সুপ্রিম কোর্ট ঐদিন বিকেলে কোর্টের জমিতে দেয়াল তৈরির কাজ শুরু করলে তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্দেশে সেটা ভেঙ্গে ফেলে সওজ অধিদফতর। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাইকোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম যোগাযোগ সচিবসহ সড়ক ও জনপদ বিভাগের চার কর্মকর্তাকে আদালতে তলব করে এবং তাঁদেরকে ১১ থেকে ৪টা ৩৫ পর্যন্ত কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখে এবং একই সাথে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ কেন আনা হবেনা বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলে। আদালত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে ১ সপ্তাহের মধ্যে সওজকে সুপ্রিমকোর্টের জায়গা বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দেয়।(৪)

কার চেয়ে কে বড়? পাল্টাপাল্টি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ

সুপ্রিম কোর্টের উক্ত আদেশ সরকারের জন্য মানা জটিল হয়ে পরে, কেননা শিশু একাডেমী এবং সওজ দুটোই সরকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে আদালতের ঐ আদেশ বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হতে থাকে। কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সড়ক বিভাগকে ৬ জুন ২০১২ সালের মধ্যে সড়ক ভবন ছেড়ে দিতে হবে। তখন বিষয়টি সংসদ পর্যন্ত গড়ায়।  এ বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সাংসদ শাহরিয়ার আলম বলেন,

‘সড়ক বিভাগ ৫২ বছর ধরে সড়ক ভবনে অবস্থান করছে। স্বল্প নোটিশে প্রতিষ্ঠানটি কোথায় যাবে। দুই লাখ ২৮ হাজার বর্গফুটের জায়গা, এত বড় জায়গা তারা কোথায় পাবে? আদালতের সমালোচনা করা যায় না। কিন্তু আদালতের অনেক কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, কার চেয়ে কে বড়? সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাই আদালতকে নিয়ে বলতে পারি। কারণ আমরা দায়মুক্ত।’(৫)

প্রথম আলোর রিপোর্টে এরপর স্পিকার আবদুল হামিদের মতামত উদৃত হয়, যেখানে তিনি সুপ্রিম কোর্টকে উল্লেখ করে বলেন,

‘সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভ। সংসদ হচ্ছে সার্বভৌম। তার মানে আমি সুপ্রিম, এটা ভাবা ঠিক নয়। সরকার যদি মনে করে, তারাই সব, সেটাও ভাবা উচিত নয়। আবার আদালতও যা ইচ্ছা তা করবে, ঠিক না। আসলে রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। তাই বিচার বিভাগের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, দেশের স্বার্থেই তাঁরা যেন বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। আমাদের আরও সহনশীল হতে হবে। সহযোগিতা করতে হবে। সব দিক বিবেচনা করেই এগোতে হবে। আমাদের একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে। ভাবতে হবে—এ দেশটি আমার। আমি কী হনু রে, ক্ষমতা পাইছি, এটা ভাবলে হবে না। ভাবতে হবে দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য সেবা দিতে হবে। এখন আদালতের কারণে যদি এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হয়, সব কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে তো সরকার প্যারালাইজড হয়ে যাবে।…আমরা আইন করছি, সেই আইন জনগণের কাজে না লাগলে জনগণ রুখে দাঁড়াবে। সরকার স্বৈরাচারী হলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস আছে। আর আদালতের রায়ে জনগণ ক্ষুব্ধ হলে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।’। (৬)

স্পিকারের এই বক্তব্যের মাধ্যমে সংসদ এবং কোর্ট মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। হাইকোর্ট স্পিকারের ঐ বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল বলে অভিহিত করে। ৫ মে হাইকোর্টের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন;

“স্পিকার সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে উসকে দিয়েছেন। স্পিকার সংসদের দায়মুক্তির অপব্যবহার করেছেন। স্পিকার সংসদে কার্যপ্রণালী বিধি এবং সংসদের রীতিনীতি অনুযায়ী, কোনো বিতর্ক ও আলোচনায় অংশ নিতে পারেন না। এটা বিচার বিভাগের মর্যাদার প্রশ্ন। স্পিকার এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন কি না, তা দেখতে হবে। তিনি একজন আইনজীবী। এ মামলায় রুল নিষ্পত্তিতে আমরা দেড় বছর সময় নিয়েছি। আমাদের বেঞ্চে অনেক রিট তিন মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে। মনে হয়, রিট সম্পর্কে স্পিকারের কোনো ধারণা নেই। ‘আমি কি হনুরে’—এ ধরনের মন্তব্য কি স্পিকার করতে পারেন? এটা কি সংসদের ভাষা? উনি সংসদের পিতা। স্পিকার সংসদের দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে যা খুশি বলতে পারেন না। স্পিকারই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন। উনি জনগণকে সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছেন। এটা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।

আমরা এটা পরিষ্কার করতে চাই যে রাষ্ট্রের অন্য দুটি অঙ্গের মতো সুপ্রিম কোর্টও সাংবিধানিক অর্গান, সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন। আমরা কোনো মন্ত্রীর দ্বারা পরিচালিত নই। আমরা কেবল আমাদের বিবেক এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে দায়বদ্ধ। সরকারের কাছে বা কোনো মন্ত্রীর কাছে আমরা দায়বদ্ধ নই। আমরা আমাদের স্বার্থে কোনো আদেশ দিই না, আমরা যে আদেশ দেই তা জনগণের স্বার্থে। সুপ্রিম কোর্টে স্থানের সংকুলান হওয়া জনগণের স্বার্থেই প্রয়োজন। কারণ, স্থান সংকুলান না হলে নতুন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে না, মামলার জটও শেষ হবে না। আমরা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করব। সরকারের কার্যক্রম অচল হবে এমন কিছু আমরা করব না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাজ সঠিকভাবে এগোবে বলে আমরা আশা করি।’ আমরা আশা করি, স্পিকার সুপ্রিম কোর্টের প্রতি মর্যাদা দেখাবেন”।(৭)

এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর উপরোক্ত মন্তব্যের পর সংসদে কয়েকজন সাংসদ এর তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে ওই বিচারপতিকে অপসারণের দাবি জানান। আলোচনায় অংশ নিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন,

‘আমরা তিন দিন অপেক্ষা করব। আমরা দেখব, প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করেছেন কি না। না হলে আমরা সংসদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের অধিকার ফিরিয়ে আনব। সংবিধান যে লঙ্ঘন করেন, তাঁর এই আসনে থাকা সমীচীন হবে না। আমরা ইমপিচ করার অধিকার ছেড়ে দিয়েছি। আমরা ছেড়ে দিলেও পাঁচ মিনিটে ফিরিয়ে আনতে পারি। বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমি বলব, তিনি (বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী) সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। সংসদে যা আলোচনা হয়েছে, তা বিচার্য বিষয় নয়। এটা করে তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তাই তিনি আর বিচারপতি থাকতে পারেন না।’(৮)

১৩ দিন পর স্পিকার আবদুল হামিদ সংসদে একটি রুলিং দিয়েছেন। রুলিং এ স্পিকার বলেন; ‘২৯ মে সংসদে আমার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ জুন হাইকোর্টের একজন মাননীয় বিচারপতি সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে সংসদ সম্পর্কে, আমার সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন তা কোনো বিবেকবান মানুষ উচ্চারণ করতে পারেন কি না আমার সন্দেহ রয়েছে। প্রথমেই তিনি বলেছেন আমার বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। আমার উপরিউক্ত কথাগুলোর কোনটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে তা আমার বোধগম্য নয়। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ উত্থাপনের আগে রাষ্ট্রদ্রোহিতা কী, কোন কাজ রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিষয়টি কে নির্ধারণ করতে পারেন এসব বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করলে বিজ্ঞ বিচারপতি তাঁর বিজ্ঞতার পরিচয় দিতেন।’(৯)

এমন প্রেক্ষাপটেই আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আসে। যার মূল লক্ষ্য ছিল উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারনের ক্ষমতা সংসদের হাতে নিয়ে আসা। সে সময় এই প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়েছিল। তা স্বত্বেও সংসদে ষোড়শ সংশোধনী পাশ হয়। এখন দেখার বিষয় এই সংশোধনী বাতিলের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট কি যুক্তি, পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এখানে বলে নেয়া দরকার যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি সর্বসম্মত। অর্থাৎ ৭ জন বিচারপতি সর্বসম্মতভাবে এই মত দিয়েছেন। এই সীদ্ধান্তে আসার আগে আদালতে দীর্ঘ শুনানি হয়। সেই শুনানিতে ৯ জন এমিকাস কিউরি (নিরপেক্ষ আদালতের বন্ধু) একই মত দেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ১৯২ এবং ১৯৩ অনুচ্ছেদে সংসদের ওপর কেন বিচারপতিদের অপসারন ক্ষমতা দেয়া যায়না সেই বিষয়ে উল্লেখ আছে। দুটোর অনুচ্ছেদের সারমর্ম যা দাঁড়ায়;  রায় মোতাবেক-

১. বর্তমান বাংলাদেশ সরকার নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, ২. নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি, ৩. নির্বাচন কমিশন এবং সংসদের ওপর মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা নেই, ৪. বর্তমান সংসদ এখনও শৈশবে অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো সময় কৈশোর পার করবে, তারপর যুবক হবে, ৫. বর্তমান সংসদ যথেষ্ট পরিপক্ব নয়। যেহেতু এই সংসদ যথেষ্ট পরিপক্ব নয়, সেহেতু এ সংসদের হাতে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা দেয়া যায় না; অতএব দেয়া হল না।(১০)

বিচারকদের অপসারনের ক্ষমতা ১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদের ওপর ন্যস্ত ছিল। সেখান থেকে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটা রাষ্ট্রপতির হাতে চলে যায়, যেই সংশোধনীর মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠিত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান। জিয়াউর রহমান নিজে প্রেসিডেন্ট হয়ে এই বিধান পরিবর্তন করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে দেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সাংগঠনিক কাঠামো ছিল প্রধান বিচারপতি এবং পরবর্তী জ্যেষ্ঠ দু’জন বিচারপতি। এই নিয়ম প্রায় ৩৬-৩৭ বছর চলেছে। এমনকি ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল সহ বড় ধরণের পরিবর্তন আনা হয়, সে সময়ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি রেখে দেয়া হয়। কিন্তু শুরুতে বর্ণিত সওজ ও শিশু একাডেমীর সাথে সুপ্রিম কোর্টের জমি সংক্রান্ত ইস্যুতে বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের যে বাকযুদ্ধের সূত্রপাত সেটা আজ এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। যেখানে সরকার দলীয় নেতা, মন্ত্রী ও সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ভাষায় আদালত ও প্রধান বিচারপতিকে আক্রমণ করে চলেছেন। বাংলাদেশে এই ধরণের ঘটনা নজির বিহীন।

নোটঃ

(১) বাংলা ট্রিবিউন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কী?, জুলাই ০৩, ২০১৭, https://goo.gl/LCPZpb

(২) ইত্তেফাক, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ: সুপ্রিম কোর্ট, জুলাই ০৩, ২০১৭, https://goo.gl/TUdGmN

(৩) বাংলা নিউজ ২৪, সড়ক ভবন-শিশু একাডেমীকে সুপ্রিমকোর্টের জমি ছাড়ার নির্দেশ, ২৮ জুলাই ২০১১, http://www.banglanews24.com/national/news/bd/51023.details

(৪)বাংলা নিউজ ২৪, সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২, http://www.banglanews24.com/national/news/bd/89365.details#1

(৫) প্রথম আলো, আদালতের কারণে কাজকর্ম বন্ধ হলে সরকার প্যারালাইজড হয়ে যাবে’, ২৯ মে ২০১২, http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2012-05-29/news/261685

(৬) প্রাগুক্ত

(৭)প্রথম আলো, স্পিকারের বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল: হাইকোর্ট, ৫ জুন ২০১২, http://bit.ly/2wQf8Z0

(৮)প্রথম আলো, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি সাংসদদের, ৬ জুন ২০১২, http://archive.prothom-alo.com/detail/news/263588

(৯)প্রথম আলো, বিচারপতির মন্তব্যে স্পিকারের রুলিং, ১৯ জুন ২০১২,  http://bit.ly/2vyjBuQ

(১০)মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, পূর্ণাঙ্গ রায়টি পড়ে যা বুঝেছি, যুগান্তর, ২৬ আগস্ট, ২০১৭, https://goo.gl/tA8br3

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion