মানবাধিকার, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি

লিখেছেন; পার্থ চট্টোপাধ্যায়

 [পার্থ চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের একজন নামকরা রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ। তিনি দীর্ঘদিন যাবত কলকাতা কেন্দ্রিক সেন্টার ফর স্টাডিস ইন সোশ্যাল সাইন্সের ডাইরেক্টর ছিলেন। এই প্রবন্ধটি গণতন্ত্রে মানবাধিকার শিরোনামে তার বিখ্যাত ইতিহাসের উত্তরাধিকার বইতে সংযোজিত হয়েছে। মূলত এটি একটি স্মারক বক্তৃতা। কপিল ভট্টাচাৰ্য স্মরণে এই বক্তৃতাটি ৮ অক্টোবর ১৯৯৬, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এ. পি. ডি. আর.) আয়োজিত, কলকাতার ত্রিপুরা হিতসাধনী সভার কক্ষে পঠিত হয়েছিল।মূল প্রবন্ধটি অনেক বড় হওয়ায় সেখান থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ নিয়ে এই লেখাটি তৈরি করা হয়েছে। শিরোনাম, উপ-শিরোনামে ও লেখার মধ্যে বোল্ড ও ইটালিকের সংযোজন মূলধারা বাংলাদেশ কর্তৃক।–সম্পাদক]

রাইটস, অধিকার ও হক-এর ধারণা

মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, এই শব্দগুলোর মধ্যে ‘অধিকার’ বা ‘rights’-এর ধারণাটি একান্তভাবেই আধুনিক ইউরোপীয় ধারণা। তার মানে এই নয়, আধুনিক যুগের আগে ইউরোপে ‘রাইটস’-এর কোনও ধারণা ছিল না। রাষ্ট্ৰতত্ত্বের ইতিহাসের যে কোনও বইতেই রোমান আইনে jus শব্দটি নিয়ে আলোচনা পাওয়া যাবে। Jus মানে right বা অধিকার, jus মানে প্রতিষ্ঠিত আইন, jus মানে ন্যায়বিচার বা justice। কিন্তু এই jus-এর অধিকারী ছিল গৃহকর্তা-নাগরিক। পারিবারিক সম্পত্তিতে তার অধিকার ছিল, পরিবারের সদস্যদের শাসন করার অধিকার ছিল, নাগরিক জীবনে বা পৌরপ্রতিষ্ঠানের কাজকর্মে অংশ নেওয়ার অধিকার ছিল। এ সবই বলা যেতে পারে তার ‘নাগরিক অধিকার’। বলাই বাহুল্য, রোম সাম্রাজ্যের অধিকাংশ অধিবাসী এই অর্থে মোটেই নাগরিক পদবাচ্য ছিল না।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়

তারপর সামন্ততন্ত্রের যুগে নগর, গিল্ড বা এস্টেটে বিভিন্ন শ্রেণী, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির পারস্পরিক অধিকার নির্ধারণের মধ্যে দিয়ে কীভাবে আধুনিক ইউরোপে রাইটস-এর এই সামান্য এবং সাধারণভাবে প্রযোজ্য ধারণা গড়ে উঠল, তার বিবরণ রাষ্ট্ৰতত্ত্বের ইতিহাসে পাওয়া যায়। তাই রোমান যুগে বা মধ্যযুগের ইউরোপেও ‘রাইটস’ ছিল। কিন্তু তা ছিল নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমিত বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা শ্রেণীর বেলায় প্রযোজ্য অধিকার।

আধুনিক যুগে যেমন সমাজধৰ্ম বা সমাজনীতি নির্ধারণের সময় সর্বপ্রধান নির্ণায়ক ধারণাই হয়ে গেছে right, সে সময় তা ছিল না। আজ আমাদের কাছে right মানে শুধু অধিকার নয়, right মানে যা সঙ্গত, ন্যায্য, right মানে যা সঠিক, সত্য। Right-কে যা লঙঘন করে তা হল wrong, যা অসঙ্গত, অন্যায়, ভুল। এই অর্থে আধুনিক জগতে সামাজিক-রাজনৈতিক, এমনকী ব্যক্তিগত জীবনে, সবচেয়ে ব্যাপক প্রচলিত এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী নৈতিক ধারণাই বলা যেতে পারে right।

বাংলা ভাষায় যদিও ‘রাইট’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘অধিকার’ শব্দটা আমরা ব্যবহার করছি, একটু ভাবলেই দেখা যাবে ‘অধিকার’ কথাটায় আধুনিক ‘রাইট’-এর ধারণার সবরকম অর্থ প্রকাশ করা যায় না। ‘অধিকার’-এর সমার্থক শব্দ ভাবতে গেলে মনে হয় স্বত্ব, মালিকানা, দখল বা এক্তিয়ার। এগুলো সবই ‘রাইট’-এর অন্তর্গত। ‘অধিকার’ বলতে গেলে আরও মনে হতে পারে দাবি বা হক। তা-ও ‘রাইট’-এর অন্তর্গত। কিন্তু যে অর্থে ‘রাইট’ মানে যা ন্যায্য, সঙ্গত বা সঠিক, সেই অর্থটা আমরা ‘অধিকার’ শব্দে পাই না।

‘রাইট’ মানে তো শুধু স্বত্ব বা দখল বা দাবি নয়। যে স্বত্ব বা দাবি ন্যায্য, সঙ্গত, সঠিক, সেই অধিকার হল ‘রাইট’। ‘রাইট’ শব্দটায় এই নৈতিক অনুষঙ্গ আছে বলেই আধুনিক জগতে তার প্রভাব এত প্রবল। বাংলায় প্রচলিত শব্দের মধ্যে একমাত্র আরবি ‘হক’ শব্দটিতেই বোধহয় এই নৈতিক অনুষঙ্গ অনেকটা ধরা পড়ে।

বিভিন্ন প্রচলিত ধারণা নিয়ে এই আলোচনা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে যে প্রাচীন বা মধ্যযুগের ইউরোপের মতো আমাদের দেশেও অধিকার বা হকের ধারণা দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। কিন্তু সে ধারণা কোনওমতেই আধুনিক সমাজব্যবস্থায় ‘রাইট’-এর ধারণার মতো সার্বিক, ব্যাপক, সর্বজনগ্রাহ্য নৈতিক ধারণা ছিল না। এই নৈতিক ধারণাকে আপন করে নেওয়ার ঘটনাটা একান্তভাবেই আমাদের আধুনিক হয়ে ওঠার ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে।

সামাজিক চুক্তি ও পাশ্চাত্যে রাষ্ট্রের  উৎপত্তি

নানা ঐতিহাসিক কাৰ্যকারণে আমাদের আধুনিক হয়ে ওঠার ইতিহাসে যেহেতু পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক বা লিবেরাল রাজনৈতিক ঐতিহ্য, এবং আরও বিশেষ করে ব্রিটিশ রাজনৈতিক এবং আইনি চিন্তাধারা একটা বিরাট স্থান দখল করে রয়েছে, তাই আমাদের বর্তমান অবস্থায় ‘রাইটস’ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই লিবেরাল চিন্তার মূলনীতিগুলোকে কিছুটা বিশদভাবে বোঝা দরকার। গোড়াতেই বলে রাখা দরকার, পাশ্চাত্যের লিবেরাল রাজনৈতিক বা দার্শনিক চিন্তাভাবনার কোষাগারটি বিশাল। বিশেষ করে আজকের পৃথিবীতে রাজনীতিতত্ত্বের অ্যাকাডেমিক আলোচনার কথা যদি বলেন, তা হলে তার সিংহভাগই দখল করে রয়েছে লিবেরাল তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা। তাই ‘রাইটস’ নিয়ে লিবেরাল চিন্তাধারার কথা বলতে গেলে যে একটি কোনও সুনির্দিষ্ট তত্ত্ব বা নীতি উপস্থিত করা যায়, এমন মোটেই নয়। যে কোনও লিবেরাল নীতি বা আদর্শের কথা তুললেই দেখা যাবে যে তাই নিয়ে লিবেরালদের মধ্যেই তর্ক রয়েছে।

রাইটস’ নিয়ে লিবেরাল চিন্তা বুঝতে হলে প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে এই চিন্তা আসলে একাধিপত্য-বিরোধী। সমাজে কোনও ব্যক্তি বা প্ৰতিষ্ঠানের হাতে একচ্ছত্ৰ ক্ষমতা থাকলে তার অপব্যবহার রোধ করা যায় না, সে সমাজে অত্যাচার অবধারিত— এই হল লিবেরাল চিন্তার গোড়ার কথা।

একাধিপত্য রোধ করার উপায় হল ক্ষমতার গণ্ডি বেঁধে দেওয়া, অধিকার বা একাধিকারের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া। এক ব্যক্তি বা পদাধিকারী বা প্ৰতিষ্ঠানের অধিকার অন্য ব্যক্তি বা প্ৰতিষ্ঠানের অধিকার দিয়ে সীমিত। এ থেকেই লিবেরাল সাংবিধানিক চিন্তার ক্ষমতা বিভাজন এবং চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স তত্ত্বের উৎপত্তি, যার প্রয়োগ হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে এবং যা ভারতবর্ষের সাংবিধানিক ব্যবস্থাকেও অনেকটা প্রভাবিত করেছে।

লিবেরাল চিন্তার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। একাধিপত্য বা ক্ষমতা অপব্যবহারের হাত থেকে যাকে রক্ষা করার চেষ্টা হচ্ছে তা হল ব্যক্তিমানুষের স্বাধীন অস্তিত্ব বা সত্তা। বস্তুত, লিবেরাল চিন্তার একটা প্রভাবশালী ধারা এমন কথাই বলে যে ব্যক্তিসত্তাই প্রাথমিক, সমাজ সৃষ্টির আগেও ব্যক্তি উপস্থিত ছিল। ব্যক্তিরাই একত্র হয়ে সমাজ সৃষ্টি করেছে, সমাজনীতি বা আইনের প্রয়োজন স্বীকার করেছে, রাষ্ট্ৰীয় আধিকারিকদের আইন প্রণয়ন বা প্রয়োগ করার ক্ষমতা দিয়েছে।

লিবেরাল রাষ্ট্রচিন্তার আদি যুগে এই নীতিগুলিকে উপস্থিত করা হত সামাজিক চুক্তির ধারণার মাধ্যমে, যে প্রসঙ্গে সপ্তদশ শতাব্দীর ইংরেজ দার্শনিক জন লকের রচনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধারণায় সমাজ সৃষ্টির আগেও ব্যক্তিসত্তা আছে, যে ব্যক্তির ভাষা আছে, চৈতন্য আছে, স্বাৰ্থ আছে, নীতিবোধ আছে। এই স্বাৰ্থ আর নীতিবোধ থাকার ফলেই সমাজপূর্ব বা প্রাকৃতিক অবস্থার ব্যক্তিরা তাদের ব্যক্তিসত্তা এবং ব্যক্তিস্বার্থ সুরক্ষার জন্য সেইসব সামাজিক রীতিনীতি বা নিয়মকানুনই মানতে বাধ্য যা সামগ্রিক এবং দীর্ঘ মেয়াদে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করে।

কিন্তু সামাজিক রীতিনীতি বলবৎ করার জন্য বা নিয়ম লঙ্ঘনকারীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই চুক্তির ফলে সৃষ্টি হতে পারে না। চুক্তিকারী ব্যক্তিরা তো সকলেই সমান, তাদের ওপর দণ্ডধারী হবে কে? রাষ্ট্রক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কেবল দ্বিতীয় একটি চুক্তির মাধ্যমে যা সংগঠিত হয় একদিকে সমাজবদ্ধ ব্যক্তিরা আর অন্যদিকে সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় আধিকারিকের মধ্যে। এই দ্বিতীয় চুক্তিতে সার্বভৌম রাষ্ট্রের ক্ষমতা আর সমাজবদ্ধ ব্যক্তির অধিকার নির্দিষ্ট করা থাকে। সার্বভৌমের একাধিপত্যের পরিবর্তে লিবেরালরা উপহার দিলেন সীমিত রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাষ্ট্রক্ষমতার গণ্ডি যেখানে শেষ, সেখানে শুরু হচ্ছে সমাজবদ্ধ ব্যক্তি বা নাগরিকের অধিকার।

বস্তুত, এই নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত করা, অর্থাৎ ব্যক্তির জীবন, ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং ব্যক্তির সুখস্বাচ্ছন্দ্য অক্ষুন্ন রাখার প্রয়োজনেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি। সেটাই রাষ্ট্রক্ষমতার কারণ।

লিবেরাল ট্র্যাডিশনের আদিযুগে ‘রাইটস’-এর ধারণার এই রকমই চেহারা ছিল। অর্থাৎ ‘রাইটস’ হল প্রধানত রাষ্ট্রক্ষমতার সীমানা হিসেবে সমাজবদ্ধ ব্যক্তি বা নাগরিকের অধিকার। সাংবিধানিক আইনের অধিকাংশ আলোচনা, বিশেষ করে ইঙ্গ-মার্কিন পরম্পরার আলোচনায়, অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি প্রধানত রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবেই দেখা হয়েছে।

গণতান্ত্রিক অধিকার বা মানবাধিকার নিয়ে ইদানীং যে সব দাবি আমরা তুলছি, সে ধরনের প্রশ্ন আদি লিবেরালরা তুলতে চাইতেন না। কারণ তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল, রাষ্ট্রক্ষমতা সীমায়িত করা। বিভিন্ন শ্রেণী বা গোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক দাবি মেটানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তার ক্ষমতার ব্যাপ্তি বা পরিমাণ বৃদ্ধি করার তাঁরা আদৌ পক্ষপাতী ছিলেন না। কারণ তার ফলে আবার একাধিপত্য বা একচ্ছত্র ক্ষমতা গজিয়ে উঠতে পারে, এই আশঙ্কা তাঁদের মনে বদ্ধমূল ছিল।

‘রাইটস’ নিয়ে ব্যাপকতর ধারণাটির উদ্ভব বিশেষ করে ফরাসি রাজনৈতিক ট্র্যাডিশনে। বিশেষ কোনও দার্শনিকের নাম করতে হলে এখানে রুসো-র নামটাই সবচেয়ে আগে বলতে হয়। রুসোর আলোচনাতেও সামাজিক চুক্তির ভূমিকা আছে। কিন্তু সেই চুক্তির ফল সীমিত রাষ্ট্র নয়। তার কারণ রুসোর ধারণায় সামাজিক চুক্তি দুটি নয়, একটি। যে চুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তিরা সমাজপ্রতিষ্ঠা করছে, সেই একই চুক্তিতে রাষ্ট্রও সৃষ্টি হচ্ছে। তার কারণ এই ধারণায় সমাজবদ্ধ ব্যক্তি একদিকে আর সার্বভৌম কর্তৃত্ব অন্যদিকে, এমন আদৌ নয়। সমাজবদ্ধ ব্যক্তিরাই সার্বভৌম রাষ্ট্ৰীয় কর্তৃত্ব। তাদের বাদ দিয়ে অন্য কোনও সার্বভৌম কর্তৃত্ব নেই, থাকতে পারে না। সার্বভৌমত্ব এক এবং অভিন্ন, আর তার অধিকারী একমাত্র নাগরিকেরা। বলা যেতে পারে, এই ধারণা আধুনিক দুনিয়ায় গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কথা।

জনগণের সার্বভৌমত্বের  ধারণা

জনগণের সার্বভৌমত্বের এই ধারণার একটি পরিণাম হল যে জনগণ বা নাগরিকের অধিকার কখনওই লঙ্ঘিত হতে পারে না। জনগণই যদি সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী হয়, তবে সার্বভৌম রাষ্ট্র যে আইনই পাশ করুক, তা জনগণের সাধারণ মতের অনুগামী। সে আইন যদি ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব বা হরণ করে, তবে তাতেও নিশ্চয় সাধারণের সায় রয়েছে। বস্তুত, এমন বিরোধ উঠতেই পারে না। যেখানে আইন প্রণয়নের কর্তা আর আইন প্রয়োগের লক্ষ্য এক এবং অভিন্ন, সেখানে নিজেই নিজের স্বাধীনতা হরণ করা যায় কীভাবে?

সীমাহীন গণতন্ত্রের এই ধারণায় আসলে রাষ্ট্ৰীয় আধিকারিক আর জনগণের মধ্যে কোনও পার্থক্যই স্বীকার করা হচ্ছে না। আইনসভার সদস্য অথবা প্রশাসনিক অধিকর্তা জনগণের প্রতিনিধি নয়, কার্যনির্বাহী মাত্র। যে কোনও সময় যে কোনও কারণে তাদের সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে, বদলে দেওয়া যেতে পারে, ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যেতে পারে। গণতন্ত্র যদি সীমাহীন হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক অধিকারই তো সীমাহীন। অন্যভাবে বলতে গেলে, গণতান্ত্রিক অধিকারই তার নিজের সীমানা। তা আর লঙ্ঘিত হবে কী করে ? সুতরাং তাকে রক্ষার ব্যবস্থা করার প্রশ্নও অবান্তর।

বলা বাহুল্য, আধুনিক গণতন্ত্রে জনগণের সার্বভৌমত্বের এই ধারণাটি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, আধুনিক রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করার ক্ষেত্রে এর উপযোগিতা খুবই সামান্য। অনায়াসেই দেখা যাবে, আধুনিক সমাজের বৃহৎ এবং অতিজটিল প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে যে রাষ্ট্রকাঠামোর কথাই ভাবুন না কেন, তাতে আইন বা প্রশাসনের প্রতিটি কাজে যদি সভা করে বা ভোট নিয়ে সাধারণ মত যাচাই করার প্রশ্ন ওঠে, তবে তার চেয়ে অবাস্তব কথা আর কিছু হতে পারেনা।

জনগণের সার্বভৌমত্ব শিরোধাৰ্য, এ কথা মেনে নিয়েও আধুনিক গণতন্ত্রে অপরিহার্য হয়ে পড়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশে, বিভিন্ন পদে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাৰ্যনির্বাহী আধিকারিকদের ক্ষমতা এবং দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া। তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি, জনগণের সায় নিয়েই তাঁরা তাঁদের পদে বসবেন। তাঁদের দায়িত্ব তাঁরা পালন করছেন কিনা তাও যাচাই করার ব্যবস্থা থাকবে। পদের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে আবার তাঁদের জনগণের সামনে হাজির হতে হবে। এই হল আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র। এখানে রাষ্ট্ৰীয় আধিকারিকের ক্ষমতাও থাকছে, জনগণের সার্বভৌমত্বও থাকছে। কিন্তু একটি অন্যটিকে সীমিত করে রাখছে।

শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রজীবনের ভিত্তি হিসেবে জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেওয়ার পরও প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিটি বিশেষ ক্ষেত্রে সাধারণ মত যাচাই করা হবে কোন নিয়মে? কোনও বিষয়ে সকলে যদি একমত না হতে পারে, তবে কি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই সাধারণ মত বলে গণ্য করা হবে? তা যদি হয়, তবে জনগণের সার্বভৌমত্বের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা তো সংখ্যালঘুর সবরকম অধিকার, এমনকী অস্তিত্বটুকুও খারিজ করে দিতে পারে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কী হবে ? উপায় একটিই আছে। তা হল, গোড়াতেই এমন কিছু মৌলিক অধিকার নির্দিষ্ট করে দেওয়া যা জনগণের প্রতিনিধিরাও লঙঘন করতে পারবেন না, সংখ্যাগরিষ্ঠের মত থাকলেও নয়।

অর্থাৎ জনগণের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে যে প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হল, তার কার্যকর ক্ষেত্রটি গোড়াতেই সীমিত করে দেওয়া হল। সেই সীমারেখা যদি বদল করতে হয়, তবে রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিতটাকেই নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। অর্থাৎ সেটা হবে রাষ্ট্রবিপ্লব, যাতে পুরনো সার্বভৌমত্বের কাঠামোটাকে খারিজ করে নতুন এক সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হতে পারে। যতক্ষণ তা না হচ্ছে, জনগণের সার্বভৌমত্বও কাৰ্যক্ষেত্রে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর সীমিত থাকাটাই বাঞ্ছনীয়।

অধিকারতত্ত্বের সর্বজনীনতা

সকলের সমানাধিকারের বদলে ভিন্ন-ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভিন্ন-ভিন্ন অধিকারের কথা বলে, সে ধরনের মতবাদ এবং তাই নিয়ে বিতর্ক পশ্চিমের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোতেও যথেষ্ট শোনা যায়। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, এবং চীনে চমকপ্ৰদ ধনতান্ত্রিক অগ্ৰগতি সত্ত্বেও সেখানকার রাষ্ট্রনেতারা লিবেরাল গণতান্ত্রিক আদর্শের কট্টর বিরোধী হয়ে রয়েছেন। ‘প্রাচ্যের নিজস্ব সামাজিক ঐতিহ্য’ প্রভৃতি শ্লোগানের সামনে পড়ে সে সব দেশে নাগরিক বা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন মোটেই সুবিধা করে উঠতে পারছে না। কিন্তু এই লিবেরাল-বিরোধী মতবাদগুলি আসলে যা অস্বীকার করছে, তা হল অধিকারতত্ত্বের সর্বজনীনতা।

তাদের বক্তব্য, ‘ওসব গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, ওগুলো পশ্চিমি সমাজের পক্ষে ভাল হতে পারে, আমাদের পক্ষে নয়। আমাদের সমাজে অধিকার সম্বন্ধে অন্য ধারণা আছে, যা আমাদের সমাজে প্রযোজ্য।‘ সুতরাং অধিকার সম্বন্ধে লিবেরাল মতবাদ খণ্ডন করে কোনও বিকল্প সর্বজনীন মত এখনও তেমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যা প্রচলিত রয়েছে, তার কোনওটাই সর্বজনীন প্রয়োগ দাবি করে না। এই অর্থে মানবাধিকার সম্পর্কে সর্বজনীন ধারণা বলতে লিবেরাল-গণতান্ত্রিক মতেরই মোটামুটি একাধিপত্য চলেছে।

আজকের অবস্থায় অধিকার সম্বন্ধে লিবেরাল মত কী? অধিকার—তত্ত্বের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে আমরা একদিকে ইঙ্গ-মার্কিন নাগরিক অধিকারের ধারণা, অন্যদিকে ইউরোপের গণতান্ত্রিক অধিকারের ধারণার কথা বলেছি। বলা বাহুল্য, অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর তুলনায় আজকালকার রাজনীতি-দর্শনের ভাষায় প্রভূত পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আর স্বাভাবিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি, এই ধরনের ভাষায় দর্শনের আলোচনা হয় না। এখনকার লিবেরাল তত্ত্বে অধিকার বলতে কী বোঝায়, সেটা একবার দেখে নেওয়া যাক। এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিকেরা প্রায় সকলেই মার্কিন, যেমন জন রলস বা রনাল্ড ডোয়ার্কিন। সেই সঙ্গে কিছু অর্থনীতিবিদও লিবারেল অধিকারতত্ত্ব বিষয়ে উল্লেখযোগ্য আলোচনা করেছেন, যেমন কেনেথ অ্যারো এবং অমর্ত্য সেন।

লিবেরাল দার্শনিকেরা বলবেন, যে কোনও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিকের কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হওয়া চাই এবং রাজনৈতিক মতভেদ নিম্পত্তি করার ও সমাজনীতি নির্ধারণ করার জন্য গণতান্ত্রিক রীতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া চাই। কোন অধিকারগুলি মৌলিক আর কোন রীতি গণতান্ত্রিক, তা স্থির হবে কীভাবে ? স্বভাবতই এ নিয়ে মতভেদ হতে পারে। বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে যে বিষয় বা রীতিগুলি নিয়ে ব্যাপক মতৈক্য রয়েছে, লিবেরালদের বক্তব্য যে সেইগুলিকেই সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে শুরু করা উচিত। কিন্তু সেই সঙ্গে এ কথাও স্বীকৃত হওয়া উচিত যে এই রীতিনীতি পরিবর্তিত হতে পারে। পরিবর্তনের পদ্ধতি হল, বিভিন্ন মতের ভেতর যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও বিতর্ক এবং গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী সমাজনীতি নির্ধারণ।

এই প্রক্রিয়ার ফলে মৌলিক অধিকার বা গণতান্ত্রিক রীতি সম্বন্ধে মতৈক্যের ক্ষেত্রটাই পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। যেমন, একশো বছর আগে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে অথবা বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার স্বীকৃত ছিল না। কারণ সে বিষয়ে ব্যাপক মতৈক্য ছিল না। এখন সে অধিকার স্বীকৃত মৌলিক অধিকার, কারণ যুক্তিনির্ভর বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাই নিয়ে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আত্মহত্যার অধিকার অথবা মরণাপন্ন মানুষের বিনাকষ্টে মৃত্যুর অধিকার এখন বিতর্কিত বিষয়। তাই নিয়ে মতৈক্য নেই, তাই তা স্বীকৃত মৌলিক অধিকার নয়।

নাগরিকের অধিকার রক্ষাই রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য

লিবারেল মতবাদের দ্বিতীয় বক্তব্যঃ সামাজিক হিতসাধনের তুলনায় অধিকার রক্ষাই রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য। এ বক্তব্যটি আধুনিক লিবেরাল মতবাদের কেন্দ্ৰবিন্দু বলা চলে, তাই সেটিকে একটু ভাল করে বোঝা প্রয়োজন।ব্যক্তিমানুষ অথবা কোনও বিশেষ গোষ্ঠী বা জাতি অথবা সমগ্ৰ মানবসমাজের হিতসাধন কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে নানা মতবাদ প্রচলিত আছে। সে মতবাদ ধর্মীয় হতে পারে, জাতিগত হতে পারে, রাজনৈতিক হতে পারে। তাদের মধ্যে নানা বিষয়ে বিরোধ এতই গভীর ও তীব্ৰ যে সমাজের সার্বিক মঙ্গল নিয়ে কোনও ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হওয়া অসম্ভব।

লিবেরাল রাষ্ট্রদর্শন বলে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এরকম কোনও সার্বিক মত প্ৰতিষ্ঠার চেষ্টাই করা উচিত নয়, কারণ তা নিয়ে কোনও ব্যাপক মতৈক্য হতে পারে না। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বলতে যা বোঝায় তার ব্যাপ্তি অত্যন্ত সীমিত। তা কোনওমতেই মানবজীবনের সব বিষয়ে কোনটা ন্যায্য বা অন্যায্য, তা বলে দিতে পারে না। এই সীমিত অর্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে দরকার প্রত্যেক নাগরিকের কিছু প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানো।

সেই প্রয়োজন হল: (১) কিছু মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা, (২) চলাফেরার স্বাধীনতা এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত বিস্তৃত সুযোগসুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের পছন্দমতো জীবিকা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, (৩) প্রধান প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল পদে নির্বাচিত বা মনোনীত হওয়ার অধিকার, (৪) উপার্জন ও ধনসম্পদ আহরণ এবং (৫) সামাজিক আত্মমর্যাদা।

এই পাঁচ রকম প্ৰাথমিক প্রয়োজন মেটানোর ব্যাপারে প্রত্যেককে ঠিক একই পরিমাণ সম্পদ দিলে তা মোটেই ন্যায্য হবে না। কারণ শারীরিক বা মানসিক ক্ষমতার দিক দিয়ে কিংবা জীবনযাত্রার আদর্শের দিক দিয়ে সকলের প্রয়োজন সমান নয়। পানীয় জলের প্রয়োজন যদি প্রাথমিক প্রয়োজন বলে স্বীকৃত হয়, তা হলে প্রাকৃতিক কারণে কোনও বিশেষ অঞ্চলের অধিবাসীদের পানীয় জলের জোগান দিতে যদি রাষ্ট্রকে বেশি খরচ করতে হয়, তা মোটেই অন্যায় হবে না। শিক্ষায় যদি সকলের সমান অধিকার থাকে, তবে যে বিজ্ঞান পড়বে আর যে সাহিত্য পড়বে, তাদের দুজনের জন্য সমান সম্পদ বণ্টন করাও ন্যায্য হবে না।

মূল কথা হল, সামাজিক হিতাহিত সম্বন্ধে প্রচলিত মতবাদের মধ্যে রাষ্ট্র কোনও একটি মতবাদকে বাস্তবে রূপায়িত করার চেষ্টা করবে না। রাষ্ট্র চেষ্টা করবে যাতে প্রত্যেক নাগরিক তার নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন করার ও সামাজিক মঙ্গলসাধন করার জন্য সমান মৌলিক স্বাধীনতা আর ন্যায্য সুযোগ পায়। ওটাই হবে রাজনৈতিক ন্যায়বিচার। রাষ্ট্রের কাছ থেকে এর বেশি আদায় করার চেষ্টা করলে তা সমাজনীতি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ঐক্যমতের বাইরে চলে যেতে বাধ্য। তার ফলে ন্যায়বিচারও প্রতিষ্ঠিত হবে না, রাজনৈতিক বিরোধের সন্তোষজনক মীমাংসাও হবে না।

আমাদের দেশে রাষ্ট্রের উৎপত্তি

আমাদের দেশেও ঔপনিবেশিক আমল থেকে আধুনিক লিবেরাল-গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান অল্প অল্প করে গড়ে উঠেছিল। ব্যাক্তিস্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক রীতি, সাংবিধানিক রাষ্ট্র—এ সমস্ত ধারণা আমরা পশ্চিমের আধুনিক রাজনীতির ঐতিহ্য থেকেই পেয়েছি। জাতীয়তাবাদের যুগে আর স্বাধীনতা লাভের পর সেই আদর্শ অনুসরণ করে আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও আমরা নির্মাণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের বেলাতেও দেখা যাচ্ছে, ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে গণতান্ত্রিক মতৈক্য বলতে যে বিষয় বা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত ছিল, আজ গণতান্ত্রিক অধিকারের ক্রমবর্ধমান চাপে তা যেন বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছে। সরকারি দপ্তর বলুন, আদালত বলুন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলুন, হাসপাতাল বলুন, শহরের রাস্তাঘাট বলুন—সব জায়গা নিয়েই হাহাকার শুনবেন, প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে, নিয়মকানুন কেউ মানছে না। অনেকে এর অর্থ করছেন, গণতন্ত্র যেটুকুও বা ছিল, তাও নষ্ট হয়ে গেল। অন্য অনেকে বলছেন, বড় বেশি গণতন্ত্র চলেছে, তাই এই অরাজকতা।

অধিকার-প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে কিন্তু আমাদের বোঝা উচিত যে গণতান্ত্রিক অধিকার বা পদ্ধতি নিয়ে যে সাংবিধানিক মতৈক্য স্বাধীনতালাভের যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা ছিল আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় এলিটদের মধ্যেকার মতৈক্য। গত তিন-চার দশকে গণতন্ত্রের ইচ্ছা অনেক ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। নতুন নতুন দাবির সামনে পড়ে সেই পুরনো মতৈক্য টিকে থাকতে পারে না।

ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে গণতান্ত্রিক অধিকারের ধারণা এইভাবেই বিকশিত হয়—তা ক্ৰমান্বয়ে গণতন্ত্রের সীমানাগুলোকে প্রসারিত করতে চায়। পুরনো প্রতিষ্ঠান ভেঙে যাচ্ছে বলে হাহাকার করার মধ্যে লিবেরাল আদর্শের রক্ষণশীল দিকটাই শুধু প্রকাশ পায়। কিন্তু যে কারণে লিবেরাল-গণতান্ত্রিক আদর্শ এখনও এত শক্তিশালী, তা হল অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিতে পারার ক্ষমতা। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার কাজটা রক্ষণশীলেরা পারেন না, কারণ সে অধিকার রক্ষা করতে হলেও নতুন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হয়।

গণতান্ত্রিক অধিকার প্রকৃতি বা ইতিহাসের দান নয়, তা দাবি করতে হলেও উপযুক্ত সমাজব্যবস্থা নির্মাণ করতে হয়। বহুদিন একটি কথা আমরা মনে করে এসেছি। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বলতে কী বোঝায়, তা অন্যেরা তৈরি করে দেখিয়ে দিয়েছে-ইউরোপে, আমেরিকায়, রাশিয়ায় অথবা চীনে-আমাদের কাজ শুধু  সেগুলো এ দেশের মাটিতে পুঁতে দেওয়া। প্রায় দুশো বছরের আধুনিকতা আর পঞ্চাশ বছরের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতায় এবার আমাদের বোঝা উচিত, গণতন্ত্রের তৈরি মডেল বলতে কিছু নেই, হতে পারে না। আমাদের গণতন্ত্র আমাদের নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হবে। 

টিকা

১. এ বিষয়ে অতি মনোজ্ঞ আলোচনা পাওয়া যাবে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, দণ্ডনীতি (কলকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৯৯৮) বইতে

২. John Rawls, A Theory of Justice (London: Oxford University Press, 1972); Rawls, Political Liberalism (New York: Columbia University Press, 1993); Ronald Dworkin, Taking Rights Seriously (Cambridge, Mass: Harvard University Press, 1977).

৩. Kenneth J. Arrow, Social Choice and Individual Values (New York: John Wiley, 1966); Amartya K. Sen, Collective Choice and Social Welfare (San Francisco: Holden-Day, 1970); Inequality Re-examined (Oxford: Clarendon Press, 1992). 

[উৎসঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গণতন্ত্রে মানবাধিকার, ইতিহাসের উত্তরাধিকার, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, পঞ্চম মুদ্রণ, ২০১৫, পৃঃ৪৩-৫৬]

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

কোথায় গণ্ডগোল হল- পর্ব ১: স্যাকুলারিজমের নামে অনাচার

কোথায় গণ্ডগোল হল-পর্ব ২: দুই জাতীয়তাবাদী নেতার দৃষ্টিতে অতি প্রগতিশীলতার বিকার

নাগরিকের অধিকার ক্ষমতাসীন কোনো শাসকের মর্জির উপর নির্ভরশীল নয়

সমাজতন্ত্র ও ইসলামপন্থাঃ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজনের দুই ধারা

পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোয় জন্মগ্রহনকারী বাংলাদেশ প্রজন্মের সংকট

রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রের সংকট

রাষ্ট্র যখন নিপীড়কের ভূমিকায়

অযোগ্যদের উৎপাতঃ Dunning–Kruger effect

মার্সেনারির ভূমিকায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী!

দরকার নয়া জাতীয় বয়ান

রেনেসাঁস, পূনর্জাগরণ নয় (Renaissance, not Revival)

পলিসি’র রাজনীতি (Politics of Policy)

বৈধতার দায়ঃ নিরাপত্তা হেজাফতে নির্যাতন আদিম বর্বরতাকেও হার মানায়

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion