সাম্প্রদায়িকতাঃ প্রচলিত বয়ান ও বাস্তবতা-পর্ব২

লিখেছেনঃ নাজমুল হাসান

পর্ব ১ঃ সাম্প্রদায়িকতাঃ সংজ্ঞার সংকট

মৌলবাদ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িকতার ভিন্নতা       

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে অতি প্রচলিত একটি ধারণা হচ্ছে কেবল ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাই সাম্প্রদায়িক। সাম্প্রদায়িকতার সমার্থক হিসেবে চিত্রিত করা হয় ধর্মকর্ম পালনকারী মুসলমানদের। অন্যদিকে যারা ধর্মকর্ম একটু কম করে বা নিজেদেরকে তথাকথিত ‘স্যাকুলার’ দাবী করে অথবা ‘স্যাকুলার রাজনৈতিক দলের’ সমর্থক তারাই অসাম্প্রদায়িক। অতি প্রচলিত আরেকটি ধারণা হচ্ছে সকল প্রকার সাম্প্রদায়িকতার মুলে হচ্ছে মৌলবাদ বা ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো। এসব ধারানাগুলোকে নাকচ করেছেন বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের তিনজন প্রভাবশালী মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক- বদরুদ্দিন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং ফরহাদ মজহার।

বদরুদ্দিন উমরের বক্তব্য এখানে পরিষ্কার। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোন প্রকার আক্রমণ মানেই সাম্প্রদায়িক আক্রমণ এই দাবী নাকচ করে বলেন;

সাম্প্রদায়িকতার কারণ ও রাজনৈতিক চরিত্র বিষয়ে যারা অজ্ঞ, তারাই কোনো সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর যে কোনো ধরনের আক্রমণকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে থাকে। মতলববাজরা যে এ কাজ করে থাকে এটা সবারই জানা। সাম্প্রদায়িকতা আকাশ থেকে পড়ে না, তার সুনির্দিষ্ট সামাজিক ভিত্তি থাকে, যে ভিত্তি ব্রিটিশ ভারতে ছিল এবং স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের প্রথমদিকে থাকলেও তা ধীরে ধীরে অপসারিত হতে থাকে। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিকশিত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির মাধ্যমে তার সামাজিক ভিত্তি বিনষ্ট হয়। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার সামাজিক ভিত্তি বিনষ্ট হলেও যে শাসকশ্রেণী ১৯৭২ সালে ক্ষমতাসীন হয়েছে, তাদের অধীনে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রয়োজন শেষ হয়নি। কাজেই ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের নতুন রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল মৌলবাদ, যার ধারক-বাহক ছিল জামায়াতে ইসলামী।২২

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও প্রায় একই ধরণের মত দেন।তিনি বলেন; “ কেবল যে হিন্দু সম্পত্তি লুণ্ঠিত হচ্ছে তা নয়, মুসলমানদের সম্পত্তিও চলে যাচ্ছে ধনীদের হাতে। কিন্তু হিন্দুদের সম্পত্তি বিশেষভাবে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। প্রথমত, অধিকাংশ হিন্দুই দরিদ্র; দুই, তারা আবার সংখ্যায় কম। তিন, তাদের সম্পত্তি দখল করার সময় ধর্মকে ব্যবহার করা যায়। সাম্প্রদায়িকতা তাই ধর্মের ব্যাপার নয়, ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপার বটে। ধর্ম ব্যবসায়ীরা ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বর্তমান আমলেও ধর্মকে ব্যবহার করে লুণ্ঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অবাধে। যে জন্য সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটছে না।বড় দুই দলের উভয়ই ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। আর তারাই হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে আমাদের মুখপাত্র।”২৩

অথচ এই মতলববাজ লুটেরা সেকুলার শ্রেণীর লোকেরাই নিজেদের অপকর্মের দায় চাপায় ধর্মপ্রান মুসলমান এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। ফরহাদ মজহার বলেন; ‘মূল ইস্যু ও বাস্তব সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেবার জন্য জামাতে ইসলামি, বিএনপি এবং বাঙালি জাতিবাদীদের রাজনীতির যারা বিরোধী তাদের দোষারোপ করাই বা কেন?  তাহলে হিন্দু নির্যাতনের অপরাধ জামাতে ইসলামির ওপর চাপিয়ে দেওয়া মূলত গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক শক্তির বাস্তব লড়াইয়ের চরিত্র অস্বীকার করা।’ ২৪

প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে জামায়াত ইসলামী সহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কার্যক্রমকে কিভাবে দেখব আমরা। এই জায়গায় বদরুদ্দিন উমরের অবস্থান স্পষ্ট। তিনি ২০১৪ সালের এক লেখায় লিখেন;  

‘’এই (জামায়াত ইসলামী) প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় রাজনৈতিক দলটিকে মুসলিম লীগের মতো হিন্দুদের বিরুদ্ধে কোনো সময়ে বিষোদগার করতে অথবা তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রচার করতে দেখা যায়নি। তাদের প্রতিক্রিয়াশীল আক্রমণ প্রথম থেকেই পরিলক্ষিত ছিল এবং এখনও আছে সব ধরনের গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে। ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান কেউই তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নয়।‘’২৫

বদরুদ্দিন উমর ২০১৬ সালের আরেকটি লেখায় প্রায় একই মন্তব্য পূনরাবৃত্তি করে লিখেন;  ‘’সাম্প্রায়িকতার কথা যদি বলা হয়, তাহলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা থাকলে এখানে মুসলিম লীগের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল থাকত? সেরকম কিছুই নেই। জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মতো অন্য দলগুলো হল মৌলবাদী টার্গেট হিন্দুরা নয়। টার্গেট হল কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, যে কোনো ধরনের প্রগতিশীল।’’২৬

তা স্বত্বেও ‘স্যাকুলার’ ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘প্রগতিশীল’ দাবী করা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশের যে প্রচলিত বয়ান প্রতিষ্ঠিত সেখানে সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট হচ্ছে ধর্মকর্ম পালনকারী মুসলিম। সাম্প্রদায়িকতার সাথে যেহেতু রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক বিদ্যমান সেজন্য সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ উত্থাপন হয় মূলত প্রচলিত বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করে ইসলামকে অবলম্বন করে রাজনৈতিক বয়ান নিয়ে মাঠে সরব থাকা সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব বেশি প্রভাব বিস্তারকারী না হলেও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার প্রশ্নে ঐক্য ও যোগাযোগকেও সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নে সমালোচনা করা হয়ে থাকে। উদাহরণসরূপ, কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হায়দার আকবর খান রনোর বক্তব্য লক্ষ্যণীয়, তিনি প্রধান দুই দলকে সমালোচনা করে লিখেন;

‘’দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বের কাছে আদর্শ বলে কোন বস্তু নেই। ভোটের রাজনীতির সুবিধার্থে তারা যেকোনো স্তরে নামতে পারেন। খালেদা জিয়া জামায়াতকে জোট সঙ্গী করেছেন স্রেফ ভোটের রাজনীতির হিসেব থেকে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামায়াত নেতাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করেছেন, অপরদিকে হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ করে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল সঙ্গী করলো দুটি ধর্মান্ধ মৌলবাদী সংগঠনকে। খালেদা জিয়ার জোট সঙ্গী জামায়াত। অন্যদিকে অবিশ্বাস্য মনে হলেও হেফাজত হয়ে উঠলো শেখ হাসিনার সরকারের সহযোগী।‘’২৭

আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, প্রচলিত বয়ানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রশ্নে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে জামায়াত ইসলামীর দিকেই সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আসে সবচেয়ে বেশি। প্রচলিত বয়ানে লিবারেল, জাতীয়তাবাদী এবং সমাজতন্ত্রপন্থীদের কাছে সংখ্যালঘু হিন্দু প্রশ্নে সাম্প্রদায়িকতার সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত। এই মনোভাব স্পষ্ট হয় সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের অর্থনীতি পত্রিকাকে দেওয়া কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হায়দার আকবর খান রনোর বিশেষ সাক্ষাৎকারে। সেখানে তিনি বর্তমান সরকারের গুম, খুন, দুর্নীতি, দ্রব্যমুল্যের উর্ধগতি, অনিয়ম ও একতরফা রাজনীতির সমালোচনা করেও নিন্মোক্ত সীদ্ধান্তে আসেন ;

‘’এবার যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে তাহলে হয়তো প্রতিহিংসামূলক হয়ে উঠবে। তাই আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপি-জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে। প্রতিহিংসামূলক আচরণ করুক আর না করুক বিএনপি’র সঙ্গে তো জামায়াতে ইসলামী রয়েছে। জামায়াতের মতো দল আবারও এদেশের ক্ষমতার অংশীদার হোক তা আমরা চাই না, চাইতে পারি না। বিশেষ করে জামায়াত যদি ক্ষমতার অংশীদার হয়। সেটা নিশ্চয়ই আমরা চাই না।‘’২৮ অর্থাৎ, শুধু জামায়াতই সমস্যা নয়, জামায়াতের সাথে সম্পর্ক রাখা বিএনপিও সমস্যা থেকে মুক্ত নয়।

এই পোস্টের বিষয় যদিও সমসাময়িক রাজনীতি নয়, নয় কোন দলীয় আলাপ। এই আলোচনাটা এখানে করার উদ্দেশ্য জামায়াতকে সকল দায়মুক্তি দেয়া নয়, এমনকি তাঁদের পক্ষে সাফাই গাওয়াও নয়। বরং ইসলামপন্থী, মৌলবাদকে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও নিপীড়ন বন্ধ না হওয়ার কারণ খুঁজতে যেয়ে প্রাসঙ্গিক এই আলোচনাটা এখানে করা দরকার। প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হলেও যাঁদেরকে প্রচলিত বয়ানে সাম্প্রদায়িকতার জন্য অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে তাঁদের ব্যাপারে পর্যালোচনা জরুরী।

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ পন্থী ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর বক্তৃতা, বিবৃতি ও লেখনীতে ইসলামপন্থী জামায়াতকেই সর্বদা হিন্দুদের নির্যাতনের প্রধান ভিলেন হিসেবে চিত্রিত করতে দেখা যায়। এর অন্যতম কারণ নিহিত আছে ধর্ম ও ধর্মীয় রাজনীতির প্রতি বামপন্থীদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যে অনুমানের উপর ভিত্তি করে ধর্মীয় রাজনীতিকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার প্রতিশব্দ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। বামপন্থীদের এই মতাদর্শিক অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার। তিনি প্রথাগত কমিউনিস্টদের উপরোক্ত অবস্থানের সাথে কেবল ভিন্ন মতই পোষণ করেন তা নয়, তিনি বামপন্থিদের ধর্ম ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের একাট্টা বিরোধীতারও সমালোচক। তিনি লিখেন,

‘’…ধর্মমাত্রই প্রতিক্রিয়াশীল এবং তার সঙ্গে মোকাবিলার পথ একাট্টা ধর্মের বিরোধিতা—এই বিকৃত ধারণা আমরা বাংলাদেশে যেভাবে দেখি, পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় কিনা সন্দেহ। আর কোনো দেশে কমিউনিস্ট নাম নিয়ে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কমিউনিস্টরা হরতাল করেছেন তার নজির নাই। তাহলে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করা বা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা কমিউনিস্টদের দাবি হতে পারে না। তারা বলছেন, সকল ‘সাম্প্রদায়িক’ দল নিষিদ্ধ করতে হবে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল আর সাম্প্রদায়িকতা এক নয়…।‘’২৯    

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন সংগঠিত হলেই জামায়াতের নাম উঠে আসার এই প্রবণতার ঐতিহাসিক কারন রয়েছে, যেটা পর্যবেক্ষণ করে কাতারস্থ নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সহকারী প্রফেসর সমাজবিজ্ঞানী হাসান মাহমুদ বলেন;

“ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র মোড়কে এই প্যাটার্ণটা ক্রমাগত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, যার ভিত্তিতে আছে একটা ঐতিহাসিক সত্য, কিন্তু যা’র বেড়ে ওঠা একটা নির্লজ্জ মিথ্যার উপরে। ঐতিহাসিক সত্যটা হলো এই যে, ১৯৭১এ জামাত ইসলাম রক্ষার নামে বাংলাদেশী হিন্দুদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করেছে; আর মিথ্যাটা হলো এই যে, আওয়ামীলীগ হিন্দুদের নির্যাতন করে না, করতে পারেনা। সত্যটা যেমন ঐতিহাসিক, মিথ্যাটাও।‘’৩০   

জামায়াতের অনুসারীদের ব্যাপারে ১৯৭১ সালে নিজ দেশের নাগরিকদের নির্যাতনকারী সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন ধরণের মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগের সত্যতা আছে। তবে এটাও সত্য এই দলের পলিসি, কর্মসূচী ও দৈনন্দিন রাজনীতিতে হিন্দু সম্প্রদায়কে সাধারণত টার্গেট করতে দেখা যায় না। এই বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করে বিখ্যাত ভারতীয় আউটলোক ম্যাগাজিনের সাবেক সহকারী সম্পাদক এস এন এম আবদী ভারতকে জামায়াতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পরামর্শ দেন। তিনি যুক্তি দিয়ে প্রবন্ধে লিখেন;

‘’…The Jamaat-e-Islami isn’t all villainy…The best thing about Bangladesh Jamaat-e-Islami (BJI) is that it doesn’t kill Hindus simply because of their faith. To be honest, the Jamaat pales into insignificance before monstrous Hindutva outfits that regularly target Muslims in India. This is the plain truth about the much-maligned Islamic party next door. Of course, Indian and western media don’t allow facts to get in the way of a good story… India needs to engage with this part of Bangladesh.’’৩১  

সমাজবিজ্ঞানী হাসান মাহমুদের বক্তব্য হল,

‘’জামাত পরাজিত শক্তি (১৯৭১) বলে তাদের অপরাধটা সহজেই প্রতিষ্ঠা করা গেছে, কিন্তু আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় বলে তাদেরকে অপরাধের কথা মুখে আনতেও বাঁধা, প্রতিষ্ঠা ত’ দূরের কথা। উপরন্তু, রাষ্ট্রের প্রচারযন্ত্র, দলকানা বুদ্ধিজীবি আর হলুদ মিডিয়া আপ্রাণ চেষ্টা করে আওয়ামীলীগের হিন্দুবিরোধী ভূমিকাকে আড়াল করতে।‘’৩২ 

হাসান মাহমুদের কথার প্রতিধ্বনি আছে এমন আরো কিছু উদারহণ দেয়া যাক। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের তৃতীয় রায়ে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলে জামায়াতে ইসলামী বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। সেসময় বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলিতে ও বিক্ষোভকারীদের হামলায় কয়েক দিনে শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। এ পটভূমিতে খবর আসতে থাকে যে, দেশের কোনো কোনো এলাকার হিন্দু ও বৌদ্ধদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রচলিত বয়ানের আলোকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার দায় পরে জামায়াতের ওপর। কিন্তু সে সময় বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সংবাদ সম্মেলনে বলেন,

“ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৪৬ সালে জামায়াত প্রতিষ্ঠার পর থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জামায়াতের কোনো ভুমিকা নেই। যতগুলো সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে তাতে আওয়ামী লীগের লোকজনই ধরা পড়েছে।”৩৩

সেসময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নামকরা সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী পত্রিকায় ‘কারা খেলছে হিন্দু কার্ড?’  শিরোনামে প্রবন্ধ লিখে প্রশ্ন তুলেন,

‘’পারস্পরিক দোষারোপের প্রতিযোগিতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে নির্মোহভাবে চিন্তা করে দেখতে হবে, হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটতে থাকলে কাদের সবচেয়ে বেশি সুবিধা। জামায়াতে ইসলামীকে এমনিতে ‘সাম্প্রদায়িক দল’ বলে গালমন্দ করা হয়। তদুপরি এ দলের শীর্ষ নেতারা এখন মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাবন্দী আছেন। দলের প্রথম সারির বহু নেতা নানা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে। এ পরিস্থিতিতে যদি হিন্দুবাড়ি ভাঙতে গিয়ে অথবা হিন্দুমন্দিরে আগুন লাগাতে গিয়ে কোথাও জামায়াত-শিবিরের একজন সদস্যও ধরা পড়ে, তবে দলটিকে ভীষণ বেকায়দায় পড়তে হবে। এটা সাধারণ আক্কেল-জ্ঞানের কথা।‘’৩৪ তিনি এরপর প্রকান্তরে আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেন সেসময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর সংগঠিত নিপীড়নের জন্য।   

জামায়াত সেসময় পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার দায় কেবল অস্বীকারই করেনি। তাঁরা বরং সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের জান-মাল ও উপাসনালয়ের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে রাজধানী সহ দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।৩৫ কেবল জামায়াতের জন্য এই জাতীয় কর্মসুচী নতুন নয়, নতুন ছিল বাংলাদেশের মিডিয়ার জন্যও। কেননা ইতিপূর্বে জামায়াতকে কখনোই সংখ্যালঘুদের ওপর নিরাপত্তার দাবীতে কোন ধরণের কর্মসূচী দেখা যায় নি।

শুধু তাই নয়, সঞ্জীব চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘’দেশের বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার মুসলমান পালা করে হিন্দুদের বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছে বলে আমি খবর পেয়েছি।‘’৩৬ এই পালা করে হিন্দু বাড়ী পাহারা দেয়ার কাজ ছিল জামায়াতের কর্মসুচী। ইতিমধ্যে রাজনৈতিকভাবে অপদস্থ ও বিপদগ্রস্থ জামায়াতকে সেসময় দেখা গেছে নিজেদের দলের সাথে সাম্প্রদায়িকতার মত বাড়তি অপবাদ থেকে মুক্ত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে।

গতবছর জুন মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আরেক দফা নির্যাতন হওয়ার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের একজন সিনিয়র সম্পাদক ও কলামিস্ট অতীন দাশ উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক যুগশঙ্খে কলাম লিখে বলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিএনপি এবং জামায়াতের হাত রয়েছে বলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষে এ ধরণের কাজে লিপ্ত হওয়ার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। কারণ এই দুই দল সরকারি দলের সাঁড়াশি আক্রমণে নিজেদের আস্তিত্ব নিয়েই বিপদে পড়েছে।৩৭ 

জামায়াতকে যেই কারনে মৌলবাদী বলা হয় তাঁর অন্যতম কারণ হচ্ছে তাঁরা ইসলাম ধর্মকে ভিত্তি করে, ইসলাম ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করে রাজনৈতিক বয়ান নির্মান করেছে এবং সেই ভিত্তিতে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজ পরিচালনা করতে চায়। সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নে জামায়াতকে বিবেচনার জন্য দেখা দরকার অমুসলিম প্রশ্নে ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক বক্তব্য কি। এতে করে ইসালামিক ধর্মতাত্ত্বিক বয়ানের আলোকে জামায়াত রাজনীতির শুদ্ধতা বিবেচনা করা যাবে।

হাদীসে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, “মুসলমান রাষ্ট্রে কোন মুসলমান দ্বারা কোন অমুসলিমের অধিকার ক্ষুন্ন বা নির্যাতনের শিকার হয় যা সে সহ্য করতে পারেনা রোজ কিয়ামতের দিনে আমি স্বয়ং ঐ মুসলমান ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব”।৩৮ শুধু তাই নয়, অমুসলিম কাউকে হত্যার ব্যাপারে হাদীসে স্পষ্ট উচ্চারিত হয়েছে , “যে মুসলিম ব্যক্তি মুসলমান রাষ্ট্রে বসবাসকারী একজন অমুসলিমকে হত্যা করবে সে জান্নাততো দুরে থাক তার তার সুগন্ধও পাবেনা যদিও জান্নাতের সুগন্ধ ৪০ বছর সমপরিমান দুরত্ব থেকে পাওয়া যায়”।৩৯ 

অমুসলিমদের দেবতা ও মুর্তিকে যেন মুসলিমরা গালাগালি না করে সে ব্যাপারেও ইসলাম ধর্মতত্ত্বে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, ভাঙচুর করা তো আর আলোচনাই আসেনা। কুরআনে বলা হয়েছে,

‘তারা আল্লাহ তা‘আলার বদলে যাদের ডাকে, তাদের তোমরা কখনো গালি দিয়ো না, নইলে তারাও শত্রুতার কারণে না জেনে আল্লাহ তা‘আলাকেও গালি দেবে, আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই তাদের কার্যকলাপ সুশোভনীয় করে রেখেছি, অতঃপর সবাইকে একদিন তার মালিকের কাছে ফিরে যেতে হবে, তারপর তিনি তাদের বলে দেবেন, তারা দুনিয়ার জীবনে কে কী কাজ করে এসেছে’। ৪০ 

উপরোক্ত আলোচনা থেকে একটা সাধারণ উপসংহার এভাবে টানা যায় যে, ধর্মতাত্ত্বিক জায়গা থেকে ইসলাম ধর্মে অমুসলিমদের জীবনকে অনিরাপদ করে তোলার কোন বৈধতা নেই বরং এটাকে খুবই খারাপ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।  জামায়াত ইসলামী যেহেতু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে থাকে, সেই অর্থে দলটিকে মৌলবাদী বলা যায়, সাম্প্রদায়িক নয়।  মৌলবাদী রাজনীতিকে আমরা সমালোচনা করব। জামায়াত-হেফাজতের রাজনীতি ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এমনকি ধর্মতত্ত্বের আলোকে তাঁদের পলিসি, রাজনীতির  শুদ্ধতা যাচাই করা যায়। সেটা না করে সাম্প্রদায়িকতা বা সংখ্যালঘু নিপীড়নের দায় তাঁদের ওপর চাপালে প্রকৃত অপরাধী এই ফাঁকে বেরিয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটাই এখন দৃশ্যমান। পরের পর্বগুলোতে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকছে।

নোট এবং রেফারেন্স

২২. বদরুদ্দীন উমর, এটা কি সাম্প্রদায়িকতা?, যুগান্তর, ২৫ মে ২০১৪, http://www.jugantor.com/old/sub-editorial/2014/05/25/103204 )

২৩. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাম্প্রদায়িকতা কি ও কেন, দৈনিক আজাদী, ১৫ মার্চ ২০১৫

২৪. ফরহাদ মজহার, বদরুদ্দিন উমর ও বাংলাদেশের ‘হিন্দু’ প্রশ্ন, Chintaa.com, ১৭ জুন ২০১৬,  https://goo.gl/D9dFpM

২৫. বদরুদ্দীন উমর, এটা কি সাম্প্রদায়িকতা?, যুগান্তর, ২৫ মে ২০১৪, http://www.jugantor.com/old/sub-editorial/2014/05/25/103204

২৬. বদরুদ্দীন উমর , সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িকতা বিতর্ক প্রসঙ্গে, দৈনিক যুগান্তর, ২১ জুন, ২০১৬, https://goo.gl/pfho2X   

২৭. হায়দার আকবর খান রনো, ভোটের রাজনীতি : হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ, আমাদের বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৭, https://goo.gl/XfsGFf

২৮. হায়দার আকবর খান রনো, আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপি-জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে, আমাদের অর্থনীতি, ২৬ নভেম্বর ২০১৭, http://amaderorthoneeti.com/new/2017/11/26/152805/#.WiBZptJl_cs

২৯. ফরহাদ মজহার, তবু কমিউনিজমের কথাই বলতে হবে, chintaa.com, ৮ মে ২০১৬

৩০. মাহমুদ, মন রে, তুই মুক্ত হবি কবে? (১), ক্যাডেট কলেজ ব্লগ, ১১ নভেম্বর ২০১৩, http://www.cadetcollegeblog.com/mahmudh/41595

৩১. S.N.M. ABDI, The Monster Breathes Air,Outlook Magazine, 18 March 2013, India, https://www.outlookindia.com/magazine/story/the-monster-breathes-air/284276

৩২. মাহমুদ, মন রে, তুই মুক্ত হবি কবে? (১), প্রাগুক্ত

৩৩. নতুন বার্তা ডটকম, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জামায়াতের কোনো ভূমিকা নেই: গয়েশ্বর ২৩ মার্চ ২০১৩, http://www.natunbarta.com/politics/2013/03/23/17710/d974e3965039f4b5f5c1e0b5afec655f

৩৪. সঞ্জীব চৌধুরী,কারা খেলছে হিন্দু কার্ড?দৈনিক আমার দেশ, ০৭.০৩.২০১৩, http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/03/07/190865#.UsxY2PRdWAV

৩৫. দৈনিক সংগ্রাম, সংখ্যালঘু নির্যাতনের সকল ঘটনার সাথে ক্ষমতাসীনরা জড়িত, রবিবার ২৪ নভেম্বর ২০১৩, https://goo.gl/AKB70b

৩৬. সঞ্জীব চৌধুরী,কারা খেলছে হিন্দু কার্ড?, প্রাগুক্ত

৩৭. আমাদের সময়.কম, সংখ্যালঘু নির্যাতনে বিএনপি-জামায়াতের দোষ দেখছেন না ভারতীয় কলামিস্ট,  ৩০ জুন ২০১৬, http://www.amadershomoy.biz/unicode/2016/06/30/134402.htm#.WgoCnI-0Pcs 

৩৮.  সুন্নান আবু দাউদ সংখ্যা নং-৩,পৃঃ-১৭০,হাদীস নং-৩০৫২

৩৯. সহীহ্ বুখারী সংখ্যা-৩,হাদীস নং-২৯৯৫

৪০. সূরা আল আন‘আম, আয়াত : ১০৮

পর্ব ৩ঃ ভূমিদস্যুতা, লুটপাট আর সাম্প্রদায়িকতা এক নয়

লেখক ;গবেষক, অনুবাদক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘু কারা?-বদরুদ্দীন উমর

সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ ও একরৈখিক চিন্তাভাবনা, এই পোস্টে মুনতাসির মামুন দাবী করেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে চেষ্টা করছেন

বাংলাদেশের হিন্দুদের সাম্প্রদায়ীকতা

বাংলাদেশের সরকারী চাকুরীতে সংখ্যালঘুদের অবস্থান

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু জনসংখ্যা কমে যাওয়ার আসল কারণ

সাহিত্যের পাতায় মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা

বঙ্কিম সাহিত্যে মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা-পর্ব ১

সাম্প্রদায়িকতাঃমুক্ত নন রবীন্দ্রনাথও

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রদায়িক চেহারা

স্কুলে সাম্প্রদায়িকতার চর্চাঃ সেকাল-একাল

 

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion