সাম্প্রদায়িকতাঃ প্রচলিত বয়ান ও বাস্তবতা-পর্ব৩

লিখেছেনঃ নাজমুল হাসান

পর্ব ১ঃ সাম্প্রদায়িকতাঃ সংজ্ঞার সংকট  পর্ব ২ঃ মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার ভিন্নতা  

ভূমিদস্যুতা, লুটপাট আর সাম্প্রদায়িকতা এক নয়

এই সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে জানা গেল যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সাথে সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে আপাত কোন সম্পর্ক নেই। তাঁদেরকে মৌলবাদী রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কিন্তু সাম্প্রদায়িক হিসেবে নয়। এই পর্বে দেখার বিষয় হচ্ছে ভূমিদস্যুতা, লুটপাট আর সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্ক। বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক, লেখক গবেষক ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দিন উমরের ভাষ্য হচ্ছে;

”হিন্দু অথবা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের লোকের ওপর আক্রমণ মাত্রকেই সাম্প্রদায়িকতা আখ্যা দেয়ার থেকে রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তির ব্যাপার খুব কমই আছে। আসলে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করে তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করার যে চেষ্টা বিভিন্ন জায়গায় এখন দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক নেই।”৪১

 এরপর তিনি হিন্দুদের ওপর আক্রমণের কারণ হিসেবে লিখেন;

”এই আক্রমণকে দেশে বিরাজমান লুটপাট, ভূমিদস্যুতা এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার করতে হবে। এক্ষেত্রে এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এ ধরনের আক্রমণ শুধু হিন্দুদের ওপরই হচ্ছে না, এটা আরও বড় আকারে হচ্ছে মুসলমানদের ওপর, যার রিপোর্ট প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় দেখা যায়। হিন্দুরা বাংলাদেশের সমগ্র জনসংখ্যার একটি অংশ। কাজেই দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে জনগণের ওপর যে আক্রমণ হচ্ছে, তার অংশ হিসেবে হিন্দুদের ওপরও আক্রমণ হচ্ছে।‘’ (প্রাগুক্ত) 

অনেকেই হিন্দু-মুসলিম তিক্ততার আলোকে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের সাথে সাম্প্রদায়িকতার সংযোগ নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। যেমন বামপন্থী ইতিহাসবিদ ও গবেষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে,

”ভারতবর্ষ ভাঙলো, বাংলাও দু’টুকরো হলো, মূল কারণ ওই সাম্প্রদায়িক বিরোধ এবং সেই সাথে ব্রিটিশের উস্কানি। কিন্তু তারপরেও সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটলো না। অবসান হবে বলে অনেকে আশা করেছিলেন।…দ্বন্দ্বের শেষ হলো। কিন্তু তবু যে সাম্প্রায়িকতা শেষ হয়ে গেলো না তার কারণ কি? কারণটা হলো বৈষয়িক লালসা। আরো স্পষ্ট করে বললে সম্পত্তির লোভ। সম্পত্তি বলতে এক্ষেত্রে জমি,বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, সুযোগ-সুবিধা সব কিছুই বোঝাবে। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের লোকেরা সংখ্যালঘুদের উৎখাত করে তাদের সম্পত্তি দখল করতে তৎপর হয়ে উঠলো। আসলে এ হচ্ছে দুর্বলের ওপর প্রবলের অত্যাচার।”৪২   

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের জন্য দায়ী করেন। কারণ হিসেবে বলেছেন ‘তারাই হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে আমাদের মুখপাত্র’। বদরুদ্দিন উমর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে কোন আক্রমণকেই সাম্প্রদায়িকতা বলতে অস্বীকার করলেও সিরাজুল ইসলামের বক্তব্য ওতটা পরিষ্কার নয়, বরং রয়েছে কিছুটা দ্বৈততা এবং অসংগতি।  তিনি ঐ প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেনঃ”সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়ের লোকেরা, দুর্বলের অর্থাৎ সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের সম্পত্তি কেড়ে নিতে থাকলো। ব্যাপারটি ছিল লুণ্ঠন, কিন্তু তার ওপর একটা আচ্ছাদন দেওয়া হলো, সেটা ধর্মীয়। ধর্মীয় আচ্ছাদনে দুটো সুবিধা। এক. এতে লুটপাটের ব্যাপারটাকে পবিত্র কর্তব্য বলে সাজানো যায়। দুই. ধর্মের জিগির তুললে মানুষের মধ্যে উন্মাদনাও তৈরি করা সম্ভব হয়।”৪৩

এরপর তিনি লিখেনঃ ”পাকিস্তান রাষ্ট্রকে আমরা মানি নি। আমরা তার জিঞ্জির ছিড়ে বের হয়ে এসেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। দ্বিজাতি তত্ত্ব পরিত্যক্ত হয়েছে। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জায়গায় এসেছে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। কিন্তু তবু সাম্প্রদায়িকতা শেষ হয়নি। না হবার কারণ অন্যকিছু নয়, ওই যে সম্পত্তি দখল করা সেটাই। সংখ্যালঘু হিন্দুরা এখানে দুর্বল, সংখ্যাগুরু মুসলমানরা তাই তাদের সম্পত্তি কব্জা করতে তৎপর। কেবল যে হিন্দু সম্পত্তি লুণ্ঠিত হচ্ছে তা নয়, মুসলমানদের সম্পত্তিও চলে যাচ্ছে ধনীদের হাতে। কিন্তু হিন্দুদের সম্পত্তি বিশেষভাবে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। প্রথমত, অধিকাংশ হিন্দুই দরিদ্র; দুই, তারা আবার সংখ্যায় কম। তিন, তাদের সম্পত্তি দখল করার সময় ধর্মকে ব্যবহার করা যায়। সাম্প্রদায়িকতা তাই ধর্মের ব্যাপার নয়, ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপার বটে।”(প্রাগুক্ত)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী(বামে), ফরহাদ মজহার(ডানে), বদরুদ্দিন উমর(মাঝখানে)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মন্তব্য প্রাসঙ্গিক হলেও সাধারণ পাঠকের ধারণা জন্মাতে পারে যে সংখ্যালঘুর সম্পদ লুণ্ঠনের সাথে ধর্মের একটা সংযোগ রয়েছে। কেননা এক জায়গায় তিনি লিখেছেন ‘লুটপাটের ব্যাপারটাকে পবিত্র কর্তব্য বলে সাজানো যায়’। যদিও অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন ‘সাম্প্রদায়িকতা তাই ধর্মের ব্যাপার নয়’। বিষয়টা পরস্পর বিরোধী মনে হয় কি? কেননা ধর্মের ব্যাপার না হলে ‘পবিত্র কর্তব্য’ মনে করবার কারণ কি? এই সংশয় এড়ানোর জন্য ধর্মতত্ত্বের জায়গা থেকে দেখা দরকার লুটপাট যে কোনভাবেই ‘পবিত্র কর্তব্য’ নয় এবং ধর্মীয় জায়গা থেকে সেটা জাষ্টিফাই করার কোন সুযোগ ইসলাম ধর্মতত্ত্বে রাখা হয় নি। এই বিষয়ে সংক্ষেপে একটি হাদীসের উল্লেখ করা যাক।

হাদীসে  হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, “মুসলমান রাষ্ট্রে কোন মুসলমান দ্বারা কোন অমুসলিমের অধিকার ক্ষুন্ন বা নির্যাতনের শিকার হয় যা সে সহ্য করতে পারেনা রোজ কিয়ামতের দিনে আমি স্বয়ং ঐ মুসলমান ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব”।৪৪

অর্থাৎ, সংখ্যালঘুর সম্পদ লুটপাটের সাথে ধর্মের, ধার্মিকতার কোন সম্পর্ক নেই। এই ধরণের কাজের কোন ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তিও অনুপস্থিত। সেজন্য কেউ লুটপাট করে পবিত্র কর্তব্য মনে করারও সুযোগ আর থাকছে না। স্পষ্টত দুই তাত্ত্বিকের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে সংখ্যালঘু নিপীড়নের সাথে জড়িত জবরদখল, ভূমিদস্যুতা এবং লুটপাট, যার ভুক্তভোগী হিন্দু-মুসলিম উভয়ই। ফলে, ঢালাওভাবে সংখ্যাগুরু মুসলিমদেরকে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উৎখাত করে সম্পত্তি দখলের দায় দেয়া স্পষ্টতই বিভ্রান্তি। কেননা লুটপাট করা ও সেটাকে নিজের আয়ত্ত্বে রেখে ভোগ করার জন্য যে ক্ষমতার দরকার সেটা বাংলাদেশের খুব কম নাগরিকেরই আছে।

 সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বামপন্থিদের বিভ্রান্তি

বাংলাদেশের প্রচলিত বয়ানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ মাত্রেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এটা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন প্রচার করেন, তেমনি করেন বামপন্থী ও মার্ক্সবাদী মতাদর্শের ভেতর দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়ে উঠে আসা বুদ্ধিজীবীরাও। এই প্রচারের নেতিবাচক দিক হচ্ছে এটি হিন্দুদের মধ্যে এক ধরণের ভিক্টিম মানসিকতা তৈরি করেছে। বদরুদ্দিন উমর এই প্রবণতাকে বিভ্রান্তি হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন; ‘হিন্দু অথবা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের লোকের ওপর আক্রমণ মাত্রকেই সাম্প্রদায়িকতা আখ্যা দেয়ার থেকে রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তির ব্যাপার খুব কমই আছে।’

মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দিন উমরের ওপরের বক্তব্যটি ২০১৪ সালে লেখা একটি প্রবন্ধের অংশ। তবে তাঁর বক্তব্যের ধারাবাহিকতা দেখা যায় গত বছর প্রকাশিত আরেকটি আলোচিত ও সমালোচিত প্রবন্ধে। গতবছর জুন মাসে তিনি দৈনিক যুগান্তরে  ‘বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘু কারা?’ শিরোনামের একটি লেখায় লিখেন হিন্দুরা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নয়। কেননা মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙ্গে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ গঠিত হবার কারনে হিন্দুরাও শাসক গোষ্ঠীর অংশ। ফলত, হিন্দুদের ওপর আক্রমণ মানেই সাম্প্রদায়িকতা বলা যায় না। তিনি আরো বলেন;

”উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণে “হিন্দুরা বাংলাদেশীদেরই অংশ। হিন্দুরা ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু হলেও জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু। কাজেই যে বাঙালিরা বাংলাদেশে শাসন ক্ষমতায় রয়েছে তাদের মধ্যে বাঙালি হিন্দুরাও আছে। এটা মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশে মুসলমানদের শাসন বলে যদি কিছু থাকে তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল বাঙালিদের শাসন। শাসন ক্ষমতার চরিত্র বিচার করলে বাংলাদেশে মুসলমানরা শাসক নয়, বাঙালিরাই শাসক আর হিন্দুরা শাসক শ্রেণির অংশ।এদিক দিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।”৪৫ 

তাঁর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করতে পারেনি হিন্দুত্ববাদীরা, পারেনি অনেক মার্ক্সবাদীরাও। বামপন্থিদের মধ্যে এই বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বদরুদ্দিন উমর সেসব সমালোচনার জবাবে আরেকটি প্রবন্ধ লিখেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশে প্রচলিত সংখ্যালঘু রাজনীতির প্রকৃত চিত্রটি তুলে ধরেছেন। প্রকৃত চিত্র পাবার লক্ষ্যে একটু দীর্ঘ হলেও মন্তব্যটি তুলে ধরা যাক। তিনি লিখেনঃ

”আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে এখন যারা সব থেকে কুৎসিত ভাষায় বিষোদগার করছে এবং নানা ধরনের মিথ্যা ও বানোয়াট কথাবার্তা বলছে, তারা আওয়ামী ঘরানার লোক ও প্রধানত সিপিবির সঙ্গে সম্পর্কিত। এটা সবারই জানা, তবু গুরুত্বের জন্য এখানে আবার বলা দরকার, আওয়ামী লীগ ও সিপিবি প্রকৃতপক্ষে আদর্শগতভাবে অভিন্ন। পাকিস্তান আমল থেকেই তাদের এ অবস্থা। বাংলাদেশ হওয়ার পর তারা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালে আর কোনো রাখঢাক না করে নিজেদের পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দল বাকশালে যোগদান করেছিল। …তাদের ‘মার্কসবাদী’ চিন্তাধারায় বাকশালকে আলোকিত করেছিলেন!! ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবের হত্যা এবং বাকশাল উচ্ছেদ হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের আমলে রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সময় আওয়ামী লীগ ও সিপিবি উভয়েই বাকশালের গর্ভ থেকে পুনর্জন্ম লাভ করেছিল যমজ ভাই হিসেবে। দল হিসেবে স্বতন্ত্র হলেও তারা উভয়েই ‘মুজিববাদী’ আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত ও তার অনুসারী। এ কারণে বাকশালের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসার পর সিপিবির নামকরণ যথার্থভাবে হয়নি। তার নামকরণ হওয়া দরকার ছিল সিপিবি (মুজিববাদী)।

আওয়ামী লীগ ও মুজিববাদী সিপিবি এখন প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছে যে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার এক প্রবল আবহ তৈরি হয়েছে, হিন্দুরা এ সাম্প্রদায়িকতার নির্যাতনে অতিষ্ঠ ও আতংকিত হয়ে দিন কাটাচ্ছে, অনেকে দেশত্যাগ করছে! তারা নিজেরাই যে হিন্দুদের ওপর সব থেকে বড় নির্যাতক এ কথা ধাপাচাপা দেয়ার জন্যই তারা এসব করছে এবং হিন্দুদের ওপর নির্যাতনকে তার পরিপ্রেক্ষিত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে একে আখ্যায়িত করছে সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে। নির্যাতন হলেই যে তা সাম্প্রদায়িক হবে, তার অন্য কোনো চরিত্র থাকবে না বা থাকতে পারে না, এ বক্তব্য হাজির করে তারা নিজেদের লুটতরাজ ও হিন্দু নির্যাতনের বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক হামলা ও নির্যাতন আখ্যা দিয়ে দেশের জনগণের বিরুদ্ধেই কুৎসা রটনা করছে।…আওয়ামী লীগের মধ্যে শিক্ষিত লোকের নিদারুণ অভাবের কারণে সিপিবি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠন বা Cultural Wing হিসেবেই কাজ করে এসেছে। আমার বিরুদ্ধে তাদের লোকজনই এখন নানা ধরনের কুৎসা প্রচার করে আওয়ামী লীগের ‘সাম্প্রদায়িক’ চরিত্র আড়ালের চেষ্টা করছে। তাদের এ ‘সাম্প্রদায়িকতার’ সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই।”৪৬

সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যালঘু বিষয়ক বদরুদ্দিন উমরের প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়াগত আলোচনা-পর্যালোচনা আরো জমে উঠে যখন কলম ধরেন আরেক আলোচিত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার। তিনি উমরের প্রতি বামপন্থিদের সমালোচনাকে হীনমন্যতা হিসেবে আখ্যায়িত করে লিখেন; 

”বাংলাদেশের যে সকল বামেরা বদরুদ্দিন উমরের সাম্প্রতিক লেখাকে অন্যায় ভাবে সমালোচনা করছে তাদের মূল সমস্যা হচ্ছে চরম হীনমন্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। এদের ধারণা বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক প্রমাণ করতে না পারলে বুঝি বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে হিন্দু বা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের আর কোন ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের সমাজকে দোষী সাব্যস্ত করে আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায় না তুলে তারা স্বস্তি পায় না। হিন্দু যে কারণেই নির্যাতীত হোক তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের হাতে সংখ্যালঘু হিন্দুর অত্যাচার নির্যাতন হিসাবে ব্যাখ্যা করতেই হবে। একে উমর তাঁর কোন এক লেখায় বলেছেন এটা শ্রেণি বিশ্লেষোণের পদ্ধতি বাদ দিয়ে বামদের সাম্প্রদায়িক চিন্তার পাটাতনে বন্দী থেকে সাম্প্রদায়িকতাকে বোঝার চেষ্টা।” ৪৭

পর্যালোচনায় ফরহাদ মজহার আরো লিখেন; ”সাম্প্রদায়িকতার কোন আর্থিক ভিত্তি না থাকলে উমর তাকে সাম্প্রদায়িক বলতে নারাজ।যারা উমরের সমালোচনা করেছেন তাদের কাছে এই জায়গাটি হচ্ছে সবচেয়ে আপত্তির জায়গা। উমরের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে তারা বলতে চান রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতা আছে। অতএব উমর ঠিক বলেন নি। কিন্তু পুরা সমাজ নিয়ে উমর কথা বলছেন। হিন্দুর ওপর অত্যাচার নির্যাতন কিম্বা হিন্দুর জমি দখল ইত্যাদি বাংলাদেশের সমাজ আদৌ সঠিক গণ্য বা বরদাশত করে কি? তাহলে একে অন্যের জমি লুন্ঠনকারী বা ভূমিদস্যুদের কাজ না বলে এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রতিরোধ তৈরি না করে তাকে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বলছি কেন? দুর্বৃত্ত ও ভূমিদস্যুদের বিরোধিতা না করে কেন তার ওপর সাম্প্রদায়িকতার রঙ চড়ানো? হাওয়ায় তলোয়ার ঘুরানো কেন সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।” (প্রাগুক্ত)

বামপন্থিদের এই প্রবণতার মধ্যে যে সংকট বিদ্যমান সেটা বদরুদ্দিন উমরের ২০১৪ সালের লেখায়ও প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি সেখানে লিখেনঃ

(ভূমিদস্যুতাকে) ”..সাম্প্রদায়িকতা আখ্যা দিয়ে অর্থাৎ এর সঙ্গে সাধারণ মানুষকে জড়িত করে যদি পরিস্থিতি বিচার করা হয়, তাহলে একদিকে যেমন সাধারণ অসাম্প্রদায়িক জনগণকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করা হবে, তেমনি এভাবে বিষয়টি দেখলে এ হামলার বিরুদ্ধে কোনো প্রকৃত প্রতিরোধ গড়ে তোলাও সম্ভব হবে না। কারণ এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে অসাম্প্রদায়িক জনগণের বিরুদ্ধে নয়, এটা করতে হবে ভূমিদস্যু ও লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে।”৪৮

 উমর তাঁর লেখায় এভাবে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর প্রচেষ্টার অন্তর্নিহিত কারণ সম্পর্কে বলেন; ”এ কাজকে যখন সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেয়া হয়, তখন এর সঙ্গে সাধারণ মুসলমানদেরও যুক্ত করা হয়। তাদের সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয়। এ কাজের মাধ্যমে হিন্দুদের ওপর হামলাকারী প্রকৃত ক্রিমিনালদের আড়াল করে সাধারণ লোকদের ঘাড়ে এর দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়। এভাবে ভূমিদস্যু ও লুটপাটকারীদের কাজকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগের লোকজন ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের প্রচারণা যে দুরভিসন্ধিমূলক এতে সন্দেহ নেই।” (প্রাগুক্ত) 

দলীয় ও মতাদর্শিক বুদ্ধিজীবী, দলীয় একটিভিস্ট ও হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তিবর্গদের এই ধরণের দুরভিসন্ধিমূলক প্রচেষ্টার কারনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু নিপীড়ন কমে নি বরং গত কয়েক বছরে আরো বেড়েছে। ভূমিদস্যুতাকে সাম্প্রদায়িকতা আখ্যা দেয়ার মাধ্যমে যদি সাম্প্রদায়িকতা কমে যেত তাহলে আমার এই আলোচনার দরকার ছিল না। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদেরকে আড়াল করার কারণে সমাজে ভূমিদখল, লুণ্ঠন, নিপীড়ন বেড়েই চলেছে। কারা এসব করছে সেটা দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে আগামী পর্বে বিস্তারিত অনুসন্ধানের চেষ্টা করব।

পরিশেষে, এই পর্বের আলোচনাকে সংক্ষেপ করলে যেটা দাঁড়ায় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের মৌলিক কারন হচ্ছে ভূমিদখল ও লুটপাট। এসবের সাথে ঐতিহাসিকভাবে চিহ্নিত ও এই জমিনে জারি থাকা সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক সেভাবে নেই। 

নোটঃ

৪১. বদরুদ্দীন উমর, এটা কি সাম্প্রদায়িকতা?, যুগান্তর, ২৫ মে ২০১৪, http://www.jugantor.com/old/sub-editorial/2014/05/25/103204

৪২. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাম্প্রদায়িকতা কি ও কেন, দৈনিক আজাদী, ১৫ মার্চ ২০১৫

৪৩. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, পূর্বোক্ত

৪৪. সুন্নান আবু দাউদ, সংখ্যা নং-৩,পৃঃ-১৭০,হাদীস নং-৩০৫২

৪৫. বদরুদ্দীন উমর, বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘু কারা?, যুগান্তর ০৫ জুন, ২০১৬, http://www.muldharabd.com/?p=1129 

৪৬. বদরুদ্দীন উমর,   সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িকতা বিতর্ক প্রসঙ্গে, ২১ জুন, ২০১৬, যুগান্তর, https://goo.gl/EHDDJH

৪৭. ফরহাদ মজহার, বদরুদ্দিন উমর ও বাংলাদেশের ‘হিন্দু’ প্রশ্ন, Chintaa.com, ১৭ জুন ২০১৬, https://goo.gl/D9dFpM  

৪৮. বদরুদ্দীন উমর, এটা কি সাম্প্রদায়িকতা?, যুগান্তর, ২৫ মে ২০১৪, http://www.jugantor.com/old/sub-editorial/2014/05/25/103204

(চলবে)

লেখক ;গবেষক, অনুবাদক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘু কারা?-বদরুদ্দীন উমর

সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ ও একরৈখিক চিন্তাভাবনা, এই পোস্টে মুনতাসির মামুন দাবী করেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে চেষ্টা করছেন

বাংলাদেশের হিন্দুদের সাম্প্রদায়ীকতা

বাংলাদেশের সরকারী চাকুরীতে সংখ্যালঘুদের অবস্থান

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু জনসংখ্যা কমে যাওয়ার আসল কারণ

সাহিত্যের পাতায় মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা

বঙ্কিম সাহিত্যে মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা-পর্ব ১

সাম্প্রদায়িকতাঃমুক্ত নন রবীন্দ্রনাথও

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রদায়িক চেহারা

স্কুলে সাম্প্রদায়িকতার চর্চাঃ সেকাল-একাল

Facebook Comments

Opinion matters, Please share your opinion