বাংলা-আসাম সীমান্তে অদলবদল এবং সিলেটের বিভাজন-পর্ব ১

লিখেছেনঃ আশফাক হোসেন, অনুবাদ: শিল্পী বেগম

ভূমিকা

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের আকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৮৭৪ সালে একটি নতুন প্রদেশ হিসেবে আসামের সৃষ্টি এবং বাংলা থেকে সিলেটকে আসামে স্থানান্তর ছিল নিছক এক ‘তামাশা’। ১৮৭৪ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সিলেট আসাম প্রদেশের একটি অংশ হয়েই থাকল, যেটি এই অঞ্চলে একটি তাৎপর্যময় পরিণতি ডেকে এনেছিল। ১৯৪৭ সালের গণভোটে বিশেষ করে ‘পাকিস্তানপন্থী’ দলিত (নিম্নবর্ণীয় হিন্দু) এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ‘ভারতপন্থী’ মৌলভিগণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘খেলোয়াড়’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

১৮৭৪ সাল থেকে রাজনৈতিক সঞ্চালনশীলতার দিকে দৃষ্টিপাত করে জাতিরাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসমূহ নির্মাণের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ এবং পুনঃপরীক্ষা করে দেখা হবে কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় আত্মসত্তার রাজনীতি ও ‘পরিচয়সমূহ’ আবির্ভাবের সমান্তরালে ধর্মীয় সম্প্রদায়সমূহ ও নিম্নবর্গীয় মানুষের বুদ্ধিদীপ্ত রাজনীতিও কাজ করেছিল। অভিজাত হিন্দুদের ‘সুবিধাবাদী’ রাজনৈতিক অবস্থান বা পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের ‘ভোল পাল্টানো’র কর্মটি ছিল খুবই মজার এক বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে তারা ১৯২০ ও ১৯৩০ সালে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিল ‘বাংলায় ফিরে আসা’ আন্দোলনেই, কিন্তু পরে বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের ভাগ্যনির্ধারণী মুহূর্তে ওই একই নেতারাই তাঁদের সেই অবস্থানের সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটেছিলেন এবং বাংলার সঙ্গে সিলেটকে পুনরায় একত্রীকরণের বিরুদ্ধে তাঁদের সমস্ত রাজনৈতিক শক্তিকে সচল করেছিলেন। এসব ‘আত্মস্বীকৃত’ বাঙালি জাতীয়তাবাদীরাই ১৯৪৭-পরবর্তী নতুন রাষ্ট্রে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলেন এবং একই সঙ্গে মুসলিম কৃষক সম্প্রদায় এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মুসলমানদের ক্ষমতাকাঠামোতে আবির্ভূত হওয়ার ফলে একটি সংকীর্ণ সামাজিক পরিসর সৃষ্টির ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। কিছু সংশয়ের সঙ্গে ওসব ভয় চূড়ান্তভাবে ১৯৪৭ সালে তাঁদের বাধ্য করল এই দাবি জানাতে যে সিলেটকে অবাঙালি অধ্যুষিত আসাম অংশের সঙ্গেই রাখা উচিত হবে।

এই প্রবন্ধে আসাম কর্তৃক সিলেটকে বর্ধিত অংশ হিসেবে সংযোজন এবং পরে ১৯৪৭ সালে আবার তা পূর্ব বাংলায় ফিরিয়ে দেওয়ার আনুপূর্বিক ইতিহাস উপস্থাপন করা হবে। ১৮৭৪ থেকে যে পরিবর্তন তা করার ফলে কি হিন্দু, কি মুসলিম, কি আসামের অধিবাসী—সবার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আসাম চা উৎপাদক রাজ এবং সিলেট: বিদ্রোহী একটি অঞ্চলের অন্তর্ভুক্তিকরণ

১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ হিসেবে আসাম সৃষ্টির আগে সিলেট বাংলার একটি বৃহত্ ও গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত জেলা ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার সুবাদে বিপিন চন্দ্র পালের ব্যক্তিগত কথোপকথনে ও বক্তব্যে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সিলেটের এই স্থানান্তরের রাজনৈতিক অস্থিরতা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনীর কাহিনিমালার সঙ্গে তাঁর সময়ে ইতিহাসের ঘটনা পরিক্রমা একই সুতায় গাঁথার চেষ্টা করেছেন। তাঁর আত্মজীবনী, যা ১৯৩২ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে তিনি নিম্নোক্ত ভাষায় সিলেটের পুনর্গঠন সম্পর্কে বর্ণনা করেছিলেন:

আমি কার্তিক মাসের ২২ তারিখ,১৭৭৯ শকাব্দ (বাংলা ১২৬৫ সাল), ৭ নভেম্বর ১৮৫৮ সালে সিলেট জেলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছি। সিলেট এখন আসাম প্রদেশের প্রশাসনিক একটি অংশ কিন্তু আমার জন্মের সময় এবং পরবর্তী সময়ে অনেক বছর পর্যন্ত যখন আমার শৈশবকাল ছিল তখন সিলেট ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের অধীন একটি জেলা ছিল। আসামও তখন একজন কমিশনারের অধীনে বাংলার লেফটেন্যান্ট-গভর্নরের একটি অংশ ছিল। যখন ১৮৭৪ সালে একজন প্রধান কমিশনারের অধীনেই আসাম প্রদেশকে একটি প্রদেশ করা হয়েছিল, তখন এসব জেলা যেমন: সিলেট এবং কাছাড়ের জনগোষ্ঠীর যাঁরা মূলত বাঙালি ছিলেন (আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও তা সত্যি ছিল), তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই অনেকটা নতুন প্রশাসনের অধীনে এগুলোকে স্থানান্তর করা হয়েছিল এবং যাঁরা তখনো পুনরায় বাংলার সঙ্গে একত্র হওয়ার জন্য চিত্কার-চেঁচামেচি করছিলেন।

বিপিন পাল জানাচ্ছেন যে সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিকভাবে সিলেট বাংলার একটি জেলা ছিল। তিনি দেখাচ্ছেন যে ১৮৭০ সালে ব্রিটিশরাজের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত প্রদেশ হিসেবে আসামের আবির্ভাবের আগে বাংলার অংশ হিসেবে ব্রিটিশরা আসামকে শাসন করেছে। আর এভাবেই সিলেটকে আসামে অন্তর্ভুক্তিকরণের ফলে জেলাটিতে একধরনের আত্মপরিচয় সংকটে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সময়ের আবর্তে সিলেটিদের জন্য এই পরিচয়সংকটই প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে, যারা বাংলা ও আসামের সীমান্ত এলাকায় বসবাস করছে, তাদের কাছে। আমার সাক্ষাত্কারদাতাদের মধ্যে একজন ছিলেন নুরুল ইসলাম, যিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে সিলেটের গণভোটের সময় প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে কীভাবে নতুন পরিচয় নির্মাণ হয়েছিল এবং পুনরায় ভেঙে ভিন্নভাবে নির্মাণ হয়েছিল। এই পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বিস্তৃত প্রসঙ্গ টেনে বলছেন যে:

নতুন কোনো অঞ্চল এবং রাষ্ট্রসমূহ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে এই পরিবর্তন হয়ে থাকে। যেমন আমি ১৯৩০ সালে সিলেটে জন্মগ্রহণ করেছিলাম এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এটি ব্রিটিশ শাসনামলে ছিল। আমরা তখন ব্রিটিশ রাজা-রানির অধীনস্থ ছিলাম। পরিচয়ের দিক থেকে আমরা তখন ভারতীয় ছিলাম। আমাদের দ্বিতীয় পরিচয় ছিল যে আমরা বাঙালি। ওই সময় আমরা প্রথমে বৃহত্তর বাংলায় এবং পরে আসামে বসবাস করতাম। যদিও আমরা আসামে ছিলাম কিন্তু তারপরও কখনো আমরা নিজেদের আসামি জনগোষ্ঠী বলতে পারতাম না। আসামি জনগোষ্ঠী আমাদের বলত সিলেটিরা হচ্ছে বাঙালি। আর এদিকে বাঙালিরাও আমাদের ডাকত আসামি জনগোষ্ঠী। সুতরাং আমরা একই সঙ্গে বাঙালি, আমরা ভারতীয় এবং আমরা আসামি জনগোষ্ঠী ছিলাম; তারপর আমরা পাকিস্তানি হলাম। ১৯৭১ আবার পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে আমরা বাঙালি বা বাংলাদেশি হলাম।

সুতরাং, যেকোনো বাঙালি থেকে একজন সিলেটির পরিচয়ের দৃষ্টিভঙ্গিটা কমবেশি স্বতন্ত্র।

আসামে ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বাঙালি অভিজাত সম্প্রদায় এটাকে বাংলার সম্প্রসারণ বলেই মনে করত। অপর দিকে, চা আবাদকারীরা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থের পর্যাপ্ত ব্যবহার এবং তাদের নিজেদের স্বার্থের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য একটি বিশেষ ও নিবিড় প্রদেশ তৈরির দাবি জানিয়ে আসছিল। ক্রমবর্ধমান হারে চা আবাদকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ওখানে কাজের পরিধিও বেড়ে গিয়েছিল এবং প্রশাসনের সব শাখায় চা-শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এসবের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক খরচও বৃদ্ধি পায় এবং এরই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নিয়মকানুন বা বিধিবিধানের খসড়া সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৮৭৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর আসাম, কাছাড়, গোয়ালপাড়া, গারো পাহাড় এবং অন্যান্য পাহাড়ি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদিও চার মিলিয়ন জনসংখ্যাসহ এটি একটি বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত হয়েছিল, তথাপি এর স্বল্প পরিমাণে রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। প্রাথমিকভাবে সিলেট এই নতুন প্রদেশের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়নি কিন্তু মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ঔপনিবেশিক প্রশাসন বুঝতে পারল যে আসামের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে এটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য এবং পেশাগত গোষ্ঠীর চাপে এ উদ্যোগ আরও বেশি ত্বরান্বিত হয়েছিল। ফলে ১৮৭৪ সালের সেপ্টেম্বরেই নতুন প্রদেশে বাংলার জনবহুল জেলা সিলেটের বাংলাভাষীদের যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং আসাম প্রদেশে ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষসহ সিলেট অন্তর্ভুক্ত হয়।

ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে সিলেট বাংলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। মূলত নতুন এই প্রদেশ সৃষ্টি করাতে দৃশ্যত চারটি অসম বা বন্ধুর অঞ্চলের আবির্ভাব ঘটিয়েছিল। এই বৈষম্যগুলো হলো ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার আসামি-ভাষী পাঁচটি জেলা যা আসাম অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, এটি দেখতে অনেকটা ত্রিভুজসদৃশ; একই উপত্যকার গোয়ালাপাড়া জেলা, যেখানে আসামি-বাঙালি উভয় সংস্কৃতির দ্বারা আবৃত; পাহাড়ি জেলাসমূহ, যেখানে বিভিন্ন উপভাষী বা আঞ্চলিক ভাষার মানুষ বসবাস করে; সবশেষ সিলেট এবং কাছাড়ের মতো জনবহুল এবং বাংলাভাষী দুটো জেলার অন্তর্ভুক্তকরণ।

ঠিক এভাবেই নতুন এ প্রদেশটা সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং এটি ১৮৭৪ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত কোনো আইন পরিষদ ব্যতীতই টিকে থাকল। ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সালের মাঝামাঝিতে প্রাদেশিক আইন পরিষদ বেশ কার্যকর ছিল, যাতে চা-আবাদকারী ইউরোপীয় এলিটগণ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের একেবারে শেষ পর্যন্ত তাত্পর্যময় প্রভাব বজায় রেখেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৮৭৪ সালে নতুন প্রদেশ সৃষ্টির আগে গোয়ালাপাড়া, সিলেট এবং কাছাড় তিনটিই অবিভক্ত বাংলার জনবহুল এবং বাংলাভাষী জেলা ছিল, যার মধ্যে কেবল সিলেট (তাও এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ করিমগঞ্জ মহকুমা কেটে রাখা হয়) ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলায় ফিরে এসেছিল।

আসামের সঙ্গে সিলেটের যুক্ত করার কারণে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে মেঘনার একদিকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। অন্যদিকে, সুরমা উপত্যকা এবং আসামের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধিতার কারণে আসামে প্রদেশের অখণ্ডতাই হুমকির কবলে পতিত হয়েছিল। ব্রিটিশরাজের পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক পুনর্গঠন, চা ব্যবসায়ীদের সার্বক্ষণিক স্বার্থ এবং জনগণের পরবর্তী আন্দোলন সম্পর্কে জানতে গোটা অঞ্চলটির রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণ করা দরকার। দৃশ্যত, সিলেটকে সব সময়ই বাংলার সঙ্গে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি অব্যাহত ছিল। বাংলার সঙ্গে সিলেটের মানুষের এ একাত্মতা ১৮৭৪ সালে যখন নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, তখন থেকেই জোরালো ভিত্তি পেয়েছিল।

সিলেটিরা এটি উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে তাদের জেলাটি আসাম প্রদেশের সঙ্গে একত্রীভূত করার লক্ষ্যে বাংলা থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছিল, যা কখনোই এটিকে অর্থনৈতিকভাবে কোনো সুগম পথ করে দিতে পারেনি। এলিট শ্রেণি—যার অধিকাংশই হিন্দু—তারা প্রথমে সিলেটের স্থানান্তরের বিরুদ্ধে ছিল, যেহেতু তারা এটিকে তাদের অগ্রসরমাণ বাংলা প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক ‘পশ্চাত্পদ অঞ্চলে’ বেঁধে দেওয়ার শামিল হিসেবে বিবেচনা করত। হিন্দু এলিট শ্রেণি কলকাতায় এবং সিলেট থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের মাধ্যমে আপামর জনগোষ্ঠীর জনমতকে সরকারের বিরুদ্ধে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টাও করেছিল। যেমন কলকাতার প্রভাবশালী পত্রিকা হিন্দু পেট্রিয়ট সিলেটকে নিয়ে বাঙালির হূদয়ানুভূতিতে অনুরণনের ঝড় তুলতে ধারাবাহিকভাবে নিবন্ধ এবং সম্পাদকীয় ছাপাত। এ শক্তিশালী প্রচারণার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন হিন্দু পেট্রিয়ট-এর সম্পাদক স্বয়ং কে দাস পাল, যিনি তাঁর সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন যে ‘বাংলা প্রদেশের স্বর্ণময়ী অঞ্চল সিলেটকে আসাম প্রদেশ নামক নতুন দেবীর মনোরঞ্জনের জন্য বলি দেওয়া হচ্ছে।’

১৮৭৪ সালের ১০ আগস্ট হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নেতারা সিলেটকে স্থানান্তরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে একটি স্মারকলিপি ভারতের শাসক ভাইসরয়কে প্রদান করেছিলেন। যদিও সরকার তাত্ক্ষণিকভাবে সেই প্রতিবাদ প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুক জনসাধারণকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে সিলেটে এসেছিলেন এবং এলিট/ধনিক শ্রেণি লোকদের ডেকে প্রতিশ্রুতি দেন যে নতুন প্রশাসনিক আয়োজনে তাঁদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। এ প্রশাসন আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শিক্ষা ও বিচারের বিষয়গুলো যথাক্রমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতা হাইকোর্ট থেকে পরিচালনা করা হবে।

নতুন এই প্রদেশের প্রশাসন দুটি প্রধান নীতিকে গ্রহণ করেছিল: প্রথমত, বহিরাগত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে চা-শ্রমিকদের নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ মসৃণভাবে করার নিশ্চয়তা বিধান করা এবং দ্বিতীয়ত, পূর্ব বাংলার জেলাগুলো থেকে অভিবাসী বাঙালি কৃষক সম্প্রদায়ের জন্য সিলেট এবং আসামের কৃষিব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা। ‘আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন কর’—এই আদর্শ বাক্য বা স্লোগানের অধীনে এটি করা হয়েছিল। স্পষ্টতই, ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণি যখন আসামকে নতুন প্রশাসনিক প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করেছিল, তখন এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক অথবা সাংস্কৃতিক সংলগ্নতা বুঝতে পারেনি।

যদিও প্রাথমিকভাবে সিলেট এবং কলকাতার হিন্দু অভিজাত সম্প্রদায় নতুন এই প্রদেশ সৃষ্টির ব্যাপারে বিরোধিতা করেছিল, তথাপি পরবর্তী সময়ে খুব শিগগিরই তারা তাদের সেই অবস্থান কিছু কারণে বদলাতে শুরু করেছিল। প্রথমত, তারা গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুকের কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা পেয়ে আশ্বস্ত হয়েছিল যে সিলেটের শিক্ষা এবং বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হবে বাংলার প্রশাসন থেকে। দ্বিতীয়ত, তারা এটিও লক্ষ করেছিল যে চা-শিল্পের বিকাশ তাদের নতুন প্রদেশে বেশ সুযোগ-সুবিধা করে দিতে পারবে এবং এতে তাদের কল্যাণই বয়ে আনবে। যেমন: যাঁরা শিক্ষিত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই চা-শিল্পে কেরানি এবং চা-বাগানে ‘ডাক্তার বাবু’র চাকরি পাওয়া যাবে। তৃতীয়ত, চা-শ্রমিকদের খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার জন্য সিলেটের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। ফলে সিলেটের অধিকাংশ হিন্দু জমিদার আগে যে দামে বাংলায় চাল রপ্তানি করতে বাধ্য ছিলেন, নতুন পরিস্থিতিতে তাঁরা আরও বেশি দামে আসামে চাল বিক্রির সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন।

বিভিন্ন তথ্যের আলোকে মনে হচ্ছে যে আসামের ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রে ও চা-শিল্পের বিভিন্ন কাজে সিলেটি-বাঙালিদের আধিপত্য সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে সঞ্জীব বড়ুয়ার লেখায় দেখা যায় যে ২০ শতকের প্রথম দিকে আসামে বাঙালিরা আইন, মেডিকেল এবং শিক্ষকতা পেশায় আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছিল এবং রেল ও ডাক কার্যালয়ে কেরানি ও মধ্যবর্তী পদমর্যাদাপূর্ণ পদে চাকরি পেতে শুরু করল। ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে সক্রিয় ও অগ্রসরমাণ প্রদেশ বাংলার অংশ হয়ে সিলেটবাসী আসামের অধিবাসীদের চেয়ে ইংরেজি শিক্ষায় এগিয়ে ছিল এবং ঔপনিবেশিক শাসনে পেশাজীবী হিসেবে কিছুটা বেশি অভিজ্ঞতাই অর্জন করেছিল, যা তাদের তাত্ক্ষণিকভাবে নতুন অঞ্চলে চালু হওয়া বিভিন্ন সুযোগ গ্রহণ করার সুবিধা করে দিয়েছিল।

বড়ুয়া বলছেন যে ‘যেহেতু আসামের আমলাতন্ত্রের অধিকাংশ পদ দখল করেছিল বাঙালিরা এবং তাদের আধিপত্যটা—বিশেষ করে বহু অহমিয়াভাষী শিক্ষিত শ্রেণির আবির্ভাব হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত—অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’

১৮৭০-এর দশকে এভাবেই সিলেট বাংলার বৃহত্তর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং ওই অবস্থায়ই তা দীর্ঘ ৩০ বছর অব্যাহত ছিল। ১৯০৫ সালে সিলেটকে আবার বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়। কারণ, ওই বছরই ঢাকাকে রাজধানী করে স্বল্পমেয়াদি পূর্ব বাংলা ও আসাম নামে একটি প্রদেশ (বাংলাকে ভাগ করার মাধ্যমে) সৃষ্টি করা হয়েছিল।১০ ১৯১২ সালে বাংলাকে যখন পুনরায় একত্র করা হলো, তখন আসামকে আবার প্রদেশের মর্যাদা দেওয়া হলো, যেখানে আবারও সিলেট অন্তর্ভুক্ত হলো। ফলে, জেলাটির গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম, হাটবাজার এবং শহর প্রতিবাদে প্রবলভাবে আলোড়িত হচ্ছিল। প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যগণ কর্তৃক স্বাক্ষরযুক্ত আবেদনসংবলিত প্রতিবাদ নিয়ে বিভিন্ন জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। প্রতিবাদকারী জমিদার এবং আইনজীবীরা ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে তাঁদের প্রতিবাদসংবলিত স্মারকলিপি প্রেরণ করেন, যদিও তাঁরা কোনো সফলতার মুখ দেখেননি।১১

১৯২০ সালে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় সিলেট রি-ইউনিয়ন লীগ গঠিত হয়েছিল। এটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এর নিয়োজিত প্রতিনিধিদের উচিত ভাইসরয়ের কাছে প্রতিবাদ হিসেবে স্মারকলিপি প্রদান করা, যা দেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু ওই আন্দোলন বেশিদূর অগ্রসর হয়নি, কারণ খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের বিষয় উদ্ভূত হওয়ায় তা সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।১২

১৯২০-এর দশকে আসাম আইনসভায় সিলেট ও কাছাড় জেলার ‘বাংলায় ফিরে যাওয়া’ নিয়ে প্রচুর বিতর্কের সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়; সেখানে দেখা যায়, হিন্দু এবং মুসলমান অভিজাত শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা বাঙালি পরিচয়ের বিষয়গুলোর জন্য যৌথভাবে লড়াই করেছিলেন এবং প্রথম দিকে একটি লক্ষ্যই ছিল, যাতে সিলেটের হিন্দু-মুসলিম উভয়েই বাংলায় ফিরে যাওয়া নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করেছিল।

তখন হঠাত্ করে একটি সম্ভাবনা তৈরি হলো যে হয়তো সিলেট তার শিক্ষা ও বিচারের বিষয়ে যে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, তা হারাতে পারে। আসামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও প্রশ্ন ছিল। এসব বিষয়ে হিন্দু-মুসলিম এলিট উভয়ের স্পষ্টতই প্রচুর উদ্বেগ ছিল। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের অন্যতম নেতা সিলেটের বিখ্যাত জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী সিলেটকে বাংলার সঙ্গে পুনরায় একত্রীকরণের জন্য মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি সিলেটি বাঙালিদের নৃতাত্ত্বিক বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রচলিত সমসাময়িক ‘কল্পনা’ করায়ত্ত করেছিলেন। ১৯২৪ সালের আগস্টে আসামের আইনসভায় তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন যে:

পরিবর্তিত ও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমার এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে এ প্রশাসন থেকে সিলেটকে স্থানান্তর করে বাংলার সঙ্গে সংযুক্ত করাটাই সিলেটি জনপ্রতিনিধিত্বের প্রধান উদ্বেগ। মূলত এটিই আমাদের একমাত্র রাজনীতি…আমি সম্মানিত সদস্যদের একটি করে বুকলেটের প্রতিলিপি সরবরাহ করেছি, যাতে রায় বাহাদুর গিরিশ চন্দ্র নাগ আমাদের মিনতি করে বলেছেন ‘বাংলায় ফিরে চল’। এই রায় বাহাদুর ছিলেন আসাম সিভিল সার্ভিস-এর একজন অভিজ্ঞ উঁচুপদস্থ ব্যক্তি। শুধু তা-ই নয়, তিনি আসাম আইনসভার প্রথম অধিবেশনে সিলেটের জনপ্রতিনিধিও ছিলেন…চা আবাদের জন্য ছোট্ট পরিসরে শ্রমিক আমদানি ব্যতীত সিলেটের প্রায় শতভাগ আদিবাসী সবাই বাংলায় কথা বলে, যারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি বংশধরের স্বত্বাধীন এবং তাদের চলন-বলনে, আচার-আচরণে, প্রথা-মূল্যবোধ-চিন্তা এবং ঐতিহ্যে—একই রকম চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। যেহেতু বাংলাদেশে তাদের ভ্রাতৃবর্গ বাঙালি এবং অবিচ্ছেদ্যভাবেই সিলেটিরা তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক এবং রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ [গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে]।১৩ আসাম আইনসভার এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে চৌধুরী আরও ঘোষণা করেছিলেন:

যদি কলকাতা উচ্চআদালতের সুরক্ষা থেকে একজন মানুষও সিলেটকে স্থানান্তর করার চিন্তা করে, তাহলে আমরা সিলেটিরা তার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলব। ঐতিহ্যের বন্ধন আমাদের বাঙালিদের ঐতিহ্যের সঙ্গে অটুট রেখেছে… আমি কি পারি অথবা সিলেট থেকে এই আইনসভায় আর কোনো সদস্য কি আছেন, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা হাইকোর্ট থেকে যে সুবিধা পাবেন, যদি সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন তা সহ্য করতে? আসামের জন্য যে ব্যয় হবে সিলেটিরা কেন সে খরচ বহন করবে? আমাকে কঠিন নির্ভেজাল সত্যটি বলতে দিন: সিলেটিরা কোন শর্তে সিলেটের পরিবর্তে আসামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সম্মত হবে? এটি হলো আসামের ললাটে অনিচ্ছাকৃত ও বিদ্রোহীসুলভ অংশীদারের সঙ্গে জোর করে একত্রীকরণের দুঃখজনক উত্তরাধিকার [শব্দটির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে]।১৪

আসামি জনগোষ্ঠীও তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখেছিল এবং তারা এও বুঝতে পেরেছিল যে বাংলাভাষী সিলেটই তাদের সে স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক। সুতরাং আসাম থেকে সিলেটকে বাদ দেওয়ার জন্য জোরাহাট সর্বজনীন সভা (আসামের একটি সামাজিক সংগঠন) একটি প্রস্তাব পাস করেছিল, যেটি আসামি সংবাদপত্রগুলোর সমর্থনও করেছিল।১৫ ১৯৩৩ সালে আসাম অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট জনসম্মুখে যুক্তি দিয়েছিলেন, যত দিন পর্যন্ত সিলেট আসামের সঙ্গে থাকবে, তত দিন পর্যন্ত আসাম তার নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজস্ব উচ্চ আদালত নাও পেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, আসাম তার নিজ ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নও করতে পারবে না।১৬

আসাম ও সিলেটের অভিজাতবর্গের রাজনীতিতে নীতি ও বদলের বিষয়টি ছিল কৌতুকপ্রদ। যেহেতু আসাম এবং সিলেটের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মুসলমানেরা প্রাদেশিক রাজনীতিতে ক্রমেই ক্ষমতাশীল হচ্ছিলেন এবং তাঁদের নেতাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যেমন খান বাহাদুর আলাউদ্দিন চৌধুরী, মৌলভি দেওয়ান ওয়াসিল চৌধুরী ‘বাংলায় ফিরে যাওয়া’ নিয়ে পুরোনো অবস্থান বদলে ফেলেন। তাঁরা সিলেটের বাংলার সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের বিরুদ্ধে নাটকীয়ভাবে জোরালো বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন এবং জেলাগুলোর মুসলমানেরা এটিকে সমর্থন করবে কি না সে সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলেন।১৭

একসময়ের কংগ্রেসের নেতা সিলেটের আবুল মতিন চৌধুরী তখন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হয়েছেন। তিনি ১৯২৪ সালে আসামের আইনসভার সদস্যদের কাছে চিঠি লিখে এই ঘোষণা করেন যে সিলেটের মুসলমানেরা বাংলার অংশ হতে চায় না এবং যুক্তি দেন যে একমাত্র যারা এটি চায়, তারা হলো সিলেটি হিন্দু।১৮ খান বাহাদুর আলাউদ্দিন চৌধুরী তাঁর অবস্থান বদলের কারণ বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমি আমার বক্তব্যে স্বীকার করেছি যে আমি তাদের মধ্যে একজন, যারা ১৯১৮ সালে সিলেটকে বাংলার সঙ্গে পুনরায় একত্রীকরণের স্বপক্ষে ছিলাম কিন্তু আমি আমার মতামত ১৯২০ সালে এসে পরিবর্তন করেছি। …একজন জ্ঞানী মানুষ মতামত পরিবর্তন করতে পারে কিন্তু একজন বোকা তা পারে না।’১৯

সারণি: ১

সারণি: ২

সারণি ১ ও ২ থেকে সুনির্দিষ্ট করে দেখা যাচ্ছে যে সিলেটের স্থানান্তরের ওপর আসামের আইন পরিষদে ভোটের ধরন খুবই কৌতূহলোদ্দীপক একটি বিষয়। এসব সারণিতে বিন্যস্ত তথ্য দেখাচ্ছে যে ১০ জন ইউরোপবাসী কর্মকর্তা এবং চা আবাদকারী, একজন স্থানীয় খ্রিষ্টান, ছয়জন মুসলিম, একজন অহমিয়া নেতা সিলেটকে পুনরায় বাংলায় স্থানান্তরের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন, যেখানে সব হিন্দুই এর পক্ষে বা অনুকূলে ভোট দিয়েছিলেন। যা হোক, সিলেটের মুসলিম নেতারা বিষয়গুলোর ওপর বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে পাঁচজন মুসলিম সদস্য বাংলার সঙ্গে সিলেটকে যুক্ত করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, সেখানে ছয়জন এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে মুসলিম সদস্যদের ভোটেই চৌধুরীর প্রস্তাব পাস হয়। একই রকমের আরেকটি প্রস্তাব ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে সিলেটের চারজন মুসলমান সদস্যের সহায়তায় আসামের আইনসভায় পাস হয়েছিল।২০

তথ্যসূত্র

১.       মূলত, আসাম ১৮২০ সালে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশের অধীনে এসেছিল। তার আগে সিলেট ব্রিটিশরাজের সর্বশেষ পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত প্রদেশ ছিল। ১৮২৪ সালে অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধে জয়ী ব্রিটিশদের সঙ্গে বার্মার ১৮২৬ সালে ইন্দাবো চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যার ফলাফলই হলো ঔপনিবেশিক সীমান্তের স্থানান্তর।

২.       পাল, মেমোরিস অব মাই লাইফ অ্যান্ড টাইমস, পৃ. ১

৩.       ইসলামের সাক্ষাত্কার, লন্ডন, ২০০৬, ২০০৭।

৪.      হোসেন, হিস্টোরিক্যাল গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ইমপ্যাক্ট, পৃ. ৫

৫.      হোসেন, হিস্টোরিক্যাল গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ইমপ্যাক্ট, চৌধুরী, স্মৃতি এবং প্রতীতি, পৃ. ১৩২-৩৩

৬.      প্রসেডিং অব দ্য আসাম লেজিসলেটিভ কাউন্সিল (অতঃপর পিএএলসি)

৭.      আসাম সরকারের চিঠিতে বিস্তারিত দেওয়া আছে, তারিখ ৩ অক্টোবর ১৯২৪

৮.      ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডস (অতঃপর আইওআর), এল/পিঅ্যান্ডজে/৯/৫৯, পৃ.৩০-৩১।

৯.     সঞ্জীব বড়ুয়া, ইন্ডিয়া অ্যাগেইনেস্ট ইটসেলফ: আসাম অ্যান্ড দ্য পলিটিকস অব ন্যাশনালিটি, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া প্রেস, ফিলাডেলফিয়া, ১৯৯৯, পৃ. ৫৯।

১০.      পিএএলসি, আগস্ট ১৯২৪, পৃ. ৫৬৯। আরও দেখুন আইওআর/এল/পিঅ্যান্ডজে/৯/৫৯, পৃ. ৩১।

১১.     আইওআর/এল/পিঅ্যান্ডজে/৯/৫৯, পৃ. ১২।

১২.      পিএএলসি, আগস্ট ১৯২৪, পৃ. ৫৬৮।

১৩.       পিএএলসি, আগস্ট ১৯২৪, পৃ. ৫৭২-৭৩।

১৪.       পিএএলসি, আগস্ট ১৯২৪, পৃ. ৫৬৯-৭০।

১৫.    অরুণ চন্দ্র ভূঁইয়ান ও অন্যান্য, পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অব আসাম ১৯২০-১৯৩৯, আসাম সরকার, গুয়াহাটি, ১৯৭৮, ভলিউম. ২, পৃ. ২৯২।

১৬.      পিএএলসি, আগস্ট ১৯২৪, পৃ. ৫৭০।

১৭.       পিএএলসি, আগস্ট ১৯২৪, পৃ. ৫৮৬-৮৭।

১৮.       পিএএলসি, আগস্ট ১৯২৪, পৃ. ৫৮৯।

১৯.      পিএএলসি, জানুয়ারি ১৯২৬, পৃ. ১২৬।

২০.       পিএএলসি, জানুয়ারি ১৯২৬, পৃ. ৪১।

[সোর্সঃ আশফাক হোসেন, অনুবাদ: শিল্পী বেগম, ১৮৭৪-১৯৪৭ কালপর্বে বাংলা-আসামের সীমান্তে অদলবদল এবং সিলেটের গণভোটের ইতিহাস, প্রতিচিন্তা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, https://goo.gl/wKzQKU]

পর্ব ২

প্রাসঙ্গিক পোস্টঃ

Indian Muslims are being abused as ‘Bangladeshi’ in Assam

কেমন আছেন আসামের বাংলাভাষী মুসলমানেরা?

আসামে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ ইস্যুঃ বাংলাদেশ সরকার কিছুই জানেনা!

আসামে ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ গণহত্যার হুমকি এক হিন্দুত্ববাদী নেতার

আসাম থেকে বিতাড়িত হবে ৩০ লাখ বাঙালি

আসামঃ যদি বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী হই, তবে কীভাবে ৩০ বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করেছি’

ভারত রাষ্ট্রসংঘ ও তাঁর সংখ্যালঘু বিষয়ক পোস্ট সমূহ

Facebook Comments