বাংলা-আসাম সীমান্তে অদলবদল এবং সিলেটের বিভাজন-পর্ব ২

লিখেছেনঃ আশফাক হোসেন, অনুবাদ: শিল্পী বেগম

পর্ব ১

খুব শিগগিরই হিন্দু রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বে বাংলায় ফিরে আসা আন্দোলনের প্রতি সিলেটের মুসলিম রাজনীতিবিদেরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এর কারণ ছিল প্রধানত দুই রকমের—প্রথমত, আসামের রাজনীতিতে মোহাম্মদ সাদুল্লাহ আবির্ভাব, যিনি আসামের একজন অভিজাত মুসলিম ছিলেন।২১ তিনি ইউরোপবাসী চা উত্পাদনকারী এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সহায়তায় আসামের আইন পরিষদকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আধিপত্য স্থাপন করেছিলেন। তিনি সরাসরি যুক্তি দিয়েছিলেন যে সিলেটের উচিত আসামের সঙ্গেই থাকা। তিনি এও বলেছিলেন যে ‘যদি আমরা আসাম থেকে সিলেটকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিই তাহলে কিসের ভিত্তি বা নীতিমালায় আমরা কাছাড় ও গোয়ালপাড়াকে [বাংলার সাবেক দুটি জেলা] চলে যাওয়া থেকে বন্ধ করতে পারব?’২২

স্যার সৈয়দ মোহাম্মদ সাদউল্লাহ , বিভাগ উত্তর আসামের প্রথম প্রধানমন্ত্রী

১৯২৫ সালের জুলাইয়ে সাদুল্লাহ্ সিলেট পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন যে দেশটিতে মতামত বিভক্ত। তিনি পরের মাসেই সরকারের কাছে সরেজমিনে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে একটি রিপোর্ট দিয়েছিলেন। এতে তিনি লিখেছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলতে গেলে যা বলা যায় তা হলো সিলেটের স্থানান্তর দুই দিকেই। অর্থাৎ আসাম ও সিলেটের মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট দীর্ঘায়িত করবে।’২৩ সুতরাং বলা যায়, সাদুল্লাহর আগ্রহ ছিল নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিরাপদ রাখা। পরবর্তী দশকগুলোতে তিনি ‘ধর্মীয় পরিচয়’ নিয়ে অত্যন্ত সুচতুরভাবে খেলা করেছিলেন।

অনেক অভিজাত মুসলিমও বিশ্বাস করতেন যে আসামের সঙ্গে সিলেটের অন্তর্ভুক্তকরণই ভবিষ্যতে এটিকে মুসলিম-আধিপত্যবাদী প্রদেশ থেকে নেতৃত্ব দিতে পারে। যেমন: ১৯২৬ সালে আসাম থেকে সিলেটের পৃথককরণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে মৌলভি দেওয়ান ওয়াসিল চৌধুরী আইনসভায় পরামর্শ দিয়েছিলেন যে নতুন এই প্রদেশ থেকে সিলেটিরা উপকার নিতে পারবে। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে আসামে সরকারি চাকরির পদগুলো বাঙালিদের দ্বারাই পূর্ণ ছিল কিন্তু এখন সিলেটিরা তাদের হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। বাঙালিদের থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে সিলেটিদের দৃষ্টিভঙ্গি কখনো মুছে যায়নি এবং হিন্দু-মুসলিম বিভাজন বৃদ্ধির সঙ্গে সেই দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই আবৃত্ত হয়ে যায়নি। ওয়াসিল চৌধুরী আরও যুক্তি দিয়েছিলেন যে রাজনৈতিকভাবেই সিলেট আসামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ওই সময়ই কিছু মুসলিম রাজনীতিক প্রথম সিলেটের মুসলমানদের বোঝাতে সিলেটিশব্দের উদ্ভাবন করেছিলেন। পরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর ‘পাকিস্তান’ পরিকল্পনায় আসামকেও যুক্ত করেছিলেন। তিনি আসামের মুসলিম লীগের সম্পাদক মাহমুদ আলীর কাছে বলেছিলেন, ‘যুবক, আমি তোমাকে বলছি, আসাম ব্যতীত কোনো কিছুই আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না।’২৪

সুতরাং, মুসলিম রাজনীতিবিদদের সমর্থন হারিয়ে আসামের আইনসভায় সিলেটের ‘বাংলায় ফিরে আসো’ প্রস্তাব তার ভিত্তি হারিয়েছিল। সিলেটের মুসলিম রাজনীতিবিদ যেমন: ওয়াসিল চৌধুরী, মাহমুদ আলী, আবদুল মতিন চৌধুরী আসামকে তাঁদের ‘ভবিষ্যৎ মুক্ত ভূখণ্ড’ হিসেবে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। ১৯৩০ এবং ১৯৪০ সালে শুরুর দিকে তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের অধীনে প্রদেশে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যা হোক, ১৯৪০ সালের প্রথম দিকে, আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রধান উদ্বেগ ছিল আসামকে ‘পাকিস্তান পরিকল্পনা’র সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা।২৫

১৯৩০-এর দশকে অনেক অহমিয়া রাজনীতিবিদ বিষয়গুলোকে আরও বেশি জটিল করে তোলেন, যখন তাঁরা ‘সিলেট থেকে মুক্তি’ পেতে চেয়েছিলেন এবং এ বিষয়টিকে অতি উচ্চপর্যায়ে উপস্থাপনের জন্য উদ্যোগ নেন। কারণ, নতুন উদ্ভাবিত এই অহমিয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের ‘ভূখণ্ড’ নির্ধারণ করার উদ্যোগ নিয়েছিল, যা ছিল (ক) অহমিয়া জন্য আসাম তৈরি করা এবং (খ) বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিযোগিতা থেকে মুক্তি পাওয়া। ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় গোলটেবিল সম্মেলনের প্রাক্কালে আসামের সদস্য চন্দ্রধর বড়ুয়া তাঁর দাখিল করা বিবরণে সিলেটকে পৃথক করে ভাষার ওপর ভিত্তি করে আসামের ভূখণ্ড পুনরায় বণ্টন করার জন্য শক্তিশালী যুক্তি দিয়েছিলেন।২৬ আসামের সরকারও ১৯৩৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আসাম থেকে সিলেটকে বাংলায় স্থানান্তরের বিষয়ে পুনঃসংস্কার কার্যালয়ে (রিফর্ম অফিস) একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এতে বলা হয়েছিল:

আসাম থেকে সিলেটকে বাংলায় স্থানান্তরের বিষয়ের ওপর চলমান উত্তেজনা সম্পর্কে আসাম সরকার বিবেচনা করছে একটি প্রশ্ন, যা এই প্রদেশের ভবিষ্যত্ সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে থেকে যাবে। আসাম ভ্যালি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি প্রশ্নটি উত্থাপিত করেছেন, যাতে আসাম সরকার ভারতের সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মূল কথা হচ্ছে, এই সরকারের মতে বিষয়টি এ প্রদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও বিবেচনাযোগ্য।২৭

লন্ডনে ওই সময় রিচার্ড অস্টিন বাটলার২৮ ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিবের অধীনে কাজ করছিলেন। বাংলার সঙ্গে সিলেটের পুনরায় একত্রীকরণ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বেশ সচেতন ছিলেন। অবশ্য তিনি সেসব বিষয় আমলাতন্ত্রের দ্বারাই জানতে পেরেছিলেন। ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বাটলার সাংসদ স্যার ওয়াল্টার স্মাইলসহ চন্দ্রধর বড়ুয়ার সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন।২৯ সাক্ষাত্কারটি মূলত বাংলার সঙ্গে সিলেটের একত্রীকরণের প্রশ্ন ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেই নেওয়া হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, সাক্ষাত্কারে আসাম থেকে সিলেটকে বাদ দেওয়ার যে দাবি অহমিয়া এলিটরা করেছিল, সে বিষয়কেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বাটলার উল্লেখ করেছিলেন:

তিনি (বড়ুয়া) বললেন যে আসামে একটি বিরাট অনুভূতি কাজ করেছে যে সিলেটিদের কারণে আসামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আর একটি হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার আশা পূরণ হচ্ছে না। কারণ, সিলেটিরা এসবের কোনোটিই চায়নি, যেহেতু তারা দেখতে পেয়েছিল যে প্রতিবেশী বাংলা প্রদেশে এসব পর্যাপ্ত সংখ্যায়ই রয়েছে… আমি তাকে সিলেটকে বাংলায় স্থানান্তরের বিষয়ে নতুন কোনো বিল বা আইন প্রণয়ন হতে পারে এমন কোনো আশার বাণীই শোনাতে পারছিলাম না।৩০

ওই বৈঠকে বাটলার এবং স্মাইল বড়ুয়াকে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে কেন ব্রিটিশ প্রশাসন বাংলার সঙ্গে সিলেটকে স্থানান্তরের পরিবর্তে আসামের সঙ্গে রাখতে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। বড়ুয়ার উদ্দেশে বাটলারের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল: এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্য নেই। এমনকি সেই মুসলমানেরাও, যাঁরা সিলেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ তারাও সিলেটের স্থানাস্তরের ব্যাপারে বিরোধিতা করেছে।৩১ মনে হয়েছিল যে আসামের সীমান্ত, বিশেষ করে আসামের সঙ্গে সিলেটের একত্রীকরণ মূলত চা-আবাদকারীদের স্বার্থে এবং প্রশাসনিক সুবিধাসমূহের ওপর ভিত্তি করেই করা হয়েছিল। আসাম সরকারের পক্ষে আর্থার উইলিয়াম বোথাম একটি গোপন চিঠির মাধ্যমে সরকারি অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন। নিচে তা তুলে ধরা হলো:

এমনকি বর্তমানে আসামের আংশিক বিভক্তিও প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সাংঘাতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে এবং যদি এর ভূখণ্ড বা জনসংখ্যা বস্তুগতভাবে কাটছাঁট করা হয়, তাহলে এটি অনিশ্চিত যে সিলেট ব্যতীত এ প্রদেশ তার মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে কি না।৩২

যদিও বাংলার সঙ্গে সিলেটের স্থানান্তরের বিষয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আসাম, কলকাতা, দিল্লি এবং লন্ডনে বিভিন্ন পক্ষের মতামত শুনেছিল, তারপরও সরকারের মোটামুটি অবস্থান অপরিবর্তিতই ছিল। ব্রিটিশ প্রশাসনের অনেকেই চা আবাদকারী হিসেবে একই পরিবারের স্বত্বাধীন ছিল এবং এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তারা নিজেরা চাব্যবসায় গুপ্তভাবে বিনিয়োগও করেছিল।৩৩ ১৯ শতকের শেষের দিকে চা আবাদকারীরা ব্রিটিশ ভারতে শক্তিশালী সুবিধাবাদী বা লবিগোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ওই শতাব্দীর শেষদিকে আসামের ছোট লাট স্যার হেনরি কটন শ্রমিকদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা দেখে মোটামুটি সন্তোষজনক একটি সংস্কারের পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যা হোক, চা আবাদকারীদের বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে এই ভদ্রবেশী উদ্যোগও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। কটনের আত্মজীবনী থেকে আবাদকারীদের প্রভাব ও ক্ষমতা উপলব্ধি করা যেতে পারে:

একটি ক্ষমতাবানগোষ্ঠী হিসেবে চা আবাদকারী এবং চা-ব্যবসায়ীরা সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপের প্রতি এত অসহিষ্ণু হয়েছিল যে তারা আসামের সরকারি কর্মকর্তাদের যেকোনো নির্দেশকে মর্যাদা খর্বকারী বিষয় হিসেবে দেখত এবং চা-শ্রমিক নিয়ে নিতান্ত প্রয়োজনীয় কোনো কোনো পদক্ষেপ নিলেও অসম্মানিত বোধ করত। যার ফলে সরকারি কর্মকর্তারা এদের একেবারেই শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। ওই সম্প্রদায়ের একটি অংশ প্রশাসনের নিয়ম ও আইনকানুন অমান্য করত।৩৪

স্যার হেনরি বলেছিলেন যে তাঁর সঙ্গেও চা আবাদকারীরা বিদ্বেষ এবং প্রতারণামূলক আচরণ করত, যদিও তিনি একটি অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন, যে পরিবারটি ভারতে পাঁচ-পাঁচটি প্রজন্ম পর্যন্ত আমলা হিসেবে সেবা দিয়েছিল। স্যার হেনরির বক্তব্য-বিবৃতির চেয়ে ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আসামের শ্রমিকদের কল্যাণ-বিষয়ক বক্তব্য-বিবৃতিগুলো অধিক শক্তিশালী ছিল এবং এভাবেই তাদের মধ্যে দাপ্তরিক যোগাযোগ হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও লর্ড কার্জনকে চা আবাদকারীদের বিরোধিতার মুখে পিছু হটতে হয়েছিল। স্যার হেনরির মতে, ‘তিনি (কার্জন) তাঁর গা বাঁচিয়ে চলছিলেন আর আমাকে নেকড়েগুলোর সামনে ঠেলে দিয়ে বিপদে ফেলেছিলেন।’৩৫ ফলে স্যার হেনরি বাংলার লে. গর্ভনরের চাকরিতে উন্নীত হওয়ার পরিবর্তে দ্রুত অবসরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এহেন চা আবাদকারীরা যখন নিজেদের স্বার্থে সিলেটের মতো একটি অগ্রসর অঞ্চলকে আসামে ধরে রাখতে চায়, তখন বাংলার সঙ্গে সিলেটের পুনরেকত্রীকরণ অসম্ভব এক বিষয়ই ছিল।

বিভিন্ন পক্ষের দাবির মুখে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমতের ধারণা পেতে নিজস্ব একটি জরিপও পরিচালনা করেছিল। সরকারের নির্দেশনায় ১৯২৫ সালের জুনে সিলেটের ডেপুটি কমিশনার ক্রিস্টোফার গিমসন তৃণমূল পর্যায়ে এ বিষয়ে বহু মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে সিলেটের জনগণের প্রকৃত ইচ্ছাটা কী সে বিষয়ে বলা তাঁর আয়ত্তের বাইরে। তিনি লিখেছিলেন যে মূলত ৭৫ শতাংশ মানুষই কৃষি পেশায় নিয়োজিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি জানাটা অসম্ভব।৩৬ তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন যে মাত্র শতকরা ১০ ভাগ মানুষ এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল এবং অধিকাংশ মুসলিম চেয়েছিল আসামের সঙ্গেই থাকতে। তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন যে এটিও বিস্ময়কর ছিল না যে যাঁরা ব্যবস্থাপক হিসেবে চা-বাগানে কাজ করতেন, তাঁদেরও ‘সিলেটের আসামের সঙ্গে থাকাটাই অধিক পছন্দের ছিল।’৩৭

এভাবে দাপ্তরিক জরিপের ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ শাসকেরা অত্যন্ত সচেতনভাবে আসামের ঔপনিবেশিক সীমানাগুলোর নকশা করেছিল, যাতে করে সিলেট একটি মূল উপাদান হয়ে উঠেছিল। ১৯২৮ সালে আসাম রিভিউ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে এ বিষয়ে চা আবাদকারীরা সব সময়ই সরকারের পক্ষে ভোট দিয়েছে।৩৮ ১৮৭০-এর দশকে প্রধানত হিন্দু এলিটদের নেতৃত্বে পরিচালিত আবেদন-নিবেদন ও অবিশ্রান্ত লবিং সত্ত্বেও সিলেটকে আসামের সঙ্গে একীভূত করা হয়। বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৯১০, ১৯২০ ও ১৯৩০ দশকে কখনো আসামের আইনসভায় তুমুল বিতর্ক ও প্রস্তাব পাস করে আবার নানা রকম আন্দোলন করেও সিলেটের বহু বাঙালিদের—যার অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু এলিট—দৃঢ়সংকল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সিলেট বাংলায় ফিরে আসতে পারল না।

কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য যে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর নেতৃত্বে এদের অনেকেই আবার ১৯৪৭ সালে আসামে থাকার জন্য প্রচারণা চালালেন। ইতিহাসের এই কৌতুকপদ অথচ নিদারুণ রসিকতার চিত্র বিভিন্ন মহাদেশের মহাফেজখানাগুলোর হাজার হাজার দলিলপত্রে লুকিয়ে আছে।

এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে তার কিছু নমুনা উপস্থাপন করা হবে।

তথ্যসূত্র

২১.  ১৯২০ সালে মোহাম্মদ সাদুল্লাহ আসামের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি নাইট উপাধি পেয়েছিলেন এবং ১৯৩৫ সালের পরে তিন তিনবার আসামের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

২২.    পিএএলসি, জানুয়ারি ১৯২৬, পৃ. ৬০।

২৩.   পিএএলসি, জানুয়ারি ১৯২৬, পৃ. ২৭-২৮।

২৪.   মাহমুদ আলী, রিসার্জেন্ট আসাম (আসামের পুনরুত্থান), ন্যাশনাল প্রেস, ঢাকা, ১৯৬৭, পৃ. ৯৩।

২৫.   আতফুল হাই শিবলী, আবদুল মতিন চৌধুরী: ট্রাসটেড লেফটেন্যান্ট অব মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ২০১১, পৃ. ১৬১-৬৬।

২৬.   আইওআর/এল/পিঅ্যান্ডজে/৯/৫৯, পৃ. ২৩।

২৭.    আইওআর/এল/পিঅ্যান্ডজে/৯/৫৯, পৃ. ২৩।

২৮.  ১৯৩২ সালে রিচার্ড অস্টিন বাটলার ভারতের সহকারী সচিব ছিলেন। তিনি শ্রমবিষয়ক দায়িত্ব পালন শেষে পররাষ্ট্র কার্যালয়ে সহকারী সচিব হয়েছিলেন। তিনি পরবর্তী সময়ে যান রাজস্ব দপ্তরে। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত অর্থসচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

২৯.   আইওআর/এল/পিঅ্যান্ডজে/৯/৫৯, পৃ. ১।

৩০.  আইওআর/এল/পিঅ্যান্ডজে/৯/৫৯, পৃ. ২।

৩১.  আইওআর/৫/১১/১৯৭৬। আসামের সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি। নম্বর. পল-১৯১৭-৫৫৮৫,৩০ অক্টোবর ১৯২৪। পরিশিষ্ট এ, পিএএলসি, জানুয়ারি ১৯২৬, পৃ. ২৩-র সঙ্গে চিঠিটি যুক্ত করা হয়েছে।

৩২.  আইওআর/এল/পিঅ্যান্ডজে/৯/৫৯, পৃ. ২।

৩৩.  ই জে ফুলেই, দ্য সুরমা ভেলি ম্যাগাজিন, ১(৯), ১৯২৭, পৃ. ১৭। ফুলেই ১৯২০ সালে তার বাবার কাছে লিখেছিলেন যে, এইচ সি সুদারল্যান্ড, যিনি সিলেটের ডেপুটি কমিশনার ছিলেন, তিনিও চা-বাগানে অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। আরও একটি উদাহরণ, জন হেনরি কার ছিলেন ইন্ডিয়ার সিভিল সার্ভিসের বিখ্যাত এক অফিসার। তিনি জন স্মিথ কারের ছেলে ছিলেন। আর জন স্মিথ ছিলেন স্কটল্যান্ডের একজন চা ব্যবসায়ী।

৩৪.  কটন, ইন্ডিয়ান অ্যান্ড হোম মেমোরিস, পৃ. ২৭৫।

৩৫. কটন, ইন্ডিয়ান অ্যান্ড হোম মেমোরিস, পৃ. ২৭৬।

৩৬. সি গিমসনের চিঠি থেকে, নম্বর. ৫৪৫ আইআর, সিলেট, তারিখ ২৪ জুন ১৯২৫।

৩৭. পিএএলসি, জানয়ারি ১৯২৬, পৃ. ৬২-৬৩

৩৮. আসাম রিভিউ, নভেম্বর ১৯২৮, পৃ. ১৪৪। জি পি স্টিওয়ার্ট, ১৯৩০ সালে সিলেটের জেলা কমিশনার হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন যে ‘সিলেট শহর ভারতের একটি বড় শহর ছিল। সিলেট জেলাটি আসামে ইউরোপীয়দের সবচেয়ে বড় মিলনকেন্দ্র ছিল। পুরো জেলায় চা-বাগানের ম্যানেজার, সহকারী ম্যানেজার এবং ইউরোপবাসী ছিল। এর অর্থ হলো, সিলেট শহরে বহুসংখ্যক ইউরোপীয় চা আবাদকারীর ক্লাব ছিল।’ দেখুন স্টিওয়ার্ট, দ্য রাফ অ্যন্ড দ্য স্মোথ, পৃ. ৩৫।

[সোর্সঃ আশফাক হোসেন, অনুবাদ: শিল্পী বেগম, ১৮৭৪-১৯৪৭ কালপর্বে বাংলা-আসামের সীমান্তে অদলবদল এবং সিলেটের গণভোটের ইতিহাস, প্রতিচিন্তা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, https://goo.gl/wKzQKU]

(চলবে)

প্রাসঙ্গিক পোস্টঃ

Indian Muslims are being abused as ‘Bangladeshi’ in Assam

কেমন আছেন আসামের বাংলাভাষী মুসলমানেরা?

আসামে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ ইস্যুঃ বাংলাদেশ সরকার কিছুই জানেনা!

আসামে ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ গণহত্যার হুমকি এক হিন্দুত্ববাদী নেতার

আসাম থেকে বিতাড়িত হবে ৩০ লাখ বাঙালি

আসামঃ যদি বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী হই, তবে কীভাবে ৩০ বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করেছি’

ভারত রাষ্ট্রসংঘ ও তাঁর সংখ্যালঘু বিষয়ক পোস্ট সমূহ

Facebook Comments