মুসলমান বাংলা লিখিতে জানে না!

মহাকবি কায়কোবাদ

লিখেছেনঃ মহাকবি কায়কোবাদ  

“… সে আজ বহুদিনের কথা, সপ্ততি বৎসরের কম নহে, আমি যে-কালে প্রথম বাংলা ভাষার চর্চা আরম্ভ করি, সে-কালে আমরা চারিজন ব্যতীত অন্য কোন মুসলমান লেখক ছিলেন না। সেই চারিজনের তিনজন কালের অতল সাগরে ডুবিয়া গিয়াছেন। মাত্র আমি একা এখন জীবিত থাকিয়া কবরের প্রান্তে আসিয়া দাঁড়াইয়াছি। সে তিনজনের নাম শুনিতে বোধ হয় আপনারা আগ্রহ প্রকাশ করিতে পারেন। একজন কুষ্টিয়া লাহিনী পাড়ার মীর মোশাররফ হোসেন ও অন্যজন পড়ানের পন্ডিত রেয়াজউদ্দিন। ইঁহারা দুজনেই গদ্য লেখক, মাত্র আমি কবিতা লিখিতাম। ইহার কিছু পরেই শান্তিপুরের মোজাম্মেল হক আসিয়া আমাদের সংগে মিলিত হন। ইনিও কবিতা লিখিতেন, মাঝে মাঝে গদ্য লেখাও তাহার অভ্যাস ছিল।

সেকালে হিন্দু লেখকগণ আমাদিগকে বিশেষ ঘৃণার চক্ষে দেখিতেন, তাহারা বলিতেন, ‘মুসলমান বাংলা লিখিতে জানে না’। এসব শুনিয়া আমার মনে বড়ই আঘাত লাগিত, বলিতে কি হিন্দুদের ঐসব শ্লেষ উক্তি আমার হৃদয়ে বিষম বাজিত।

সে সময় হিন্দুদের মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা বেশী ছিল না। মাত্র ‘আর্য্যদর্শন’, ‘বঙ্গদর্শন’, ‘বান্ধব’, ‘সাহিত্য’, ‘ভারতী’, ‘বঙ্গবাণী’, ‘সোমপ্রকাশ’, ‘সঞ্জীবনী’ প্রভৃতি সাত-আটখানা পত্রিকা ছিল। রায় দীনবন্ধু মিত্র বাহাদুর ‘নীলদর্পণ‘ নাটক লিখিয়াছিলেন। আমাদের বংগীয় সাহিত্যিক বন্ধু মীর মোশাররফ লিখিয়াছিলেন ‘জমিদার দর্পণ‘ ও ‘বসন্ত কুমারী’ নাটক। ইহা আমাদের পক্ষে কতকটা লজ্জাকর বিষয় বটে, রায় বাহাদুরই হউন, কি বিদ্যাসাগরই হউন, আমরা কেন তাহাদের অনুকরণ করিতে যাইব? আমরা কি লিখিতে জানিনা?

খোদাতালা আমাদিগকে যে শক্তি ও প্রতিভাটুকু দিয়াছেন, কেন আমরা তাহার অপব্যবহার করিতে যাইয়া কলংকের ডালি মাথায় তুলিয়া লইব? ইহার পরও তিনি ‘এর উপায় কি’ প্রহসন লিখিয়া হিন্দু লেখকদের দ্বারা নিতান্ত লাঞ্ছিত ও অপমানিত হইয়াছিলেন। সে সময় ‘বান্ধব’ সম্পাদক রায় কালীপ্রসন্ন ঘোষ বিদ্যাসাগর C.I.E. বাহাদুর ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের সহিত লিখিয়াছেন,

“এসব আগাছা সাহিত্যের উদ্যান হইতে কাটিয়া ফেলাই উচিত”।

আরও লিখিয়াছেন, ‘এর উপায় কি’? শুধু মীর সাহেবকে এইরূপ বিদ্রুপ করিলে প্রাণে এত বাজিত না। মুসলমান জাতিকে লক্ষ্য করিয়া এসব কটুক্তি করাতে বড়ই মর্মাহত হইয়াছিলাম। বলিতে কি,

উহারা কোন বহি হাতে লইয়া মুসলমান গ্রন্থকারের নাম দেখিলেই ফেলিয়া দিত।

আমি এই সব অবমাননার বোঝা মাথায় লইয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম, মুসলমান লেখক বাংলা লিখিতে জানে কিনা, তাহা এই হিন্দু ভায়াদিগকে দেখাইতে হইবে। এই চিন্তা করিয়াই আমি ‘অশ্রুমালা’ লিখিয়াছিলাম। আমার সে আশা পূর্ণ হইয়াছে। ইহাতে এমন একটি শব্দও ছিল না যাহা পাঠ করিয়া হিন্দু ধুরন্ধরগণ মুসলমানের লেখা বলিয়া নাসিকা কুঞ্চিত করিতে পারেন। এমন কি উহা পাঠ করিয়া সেই সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকা ‘বঙ্গবাণী’ লিখিয়াছিল,

‘মুসলমান হইয়া এরূপ শুদ্ধ বাঙ্গালায় এমন সুন্দর করিয়া লিখিতে পারেন, দেশে এমন কেহ আছেন, আমাদের জানা ছিল না’। মহাকবি নবীন সেন লিখিয়াছিলেন, ‘মুসলমান যে বাংলা ভাষায় এমন সুন্দর করিয়া লিখিতে পারেন, আমি আপনার উপহার না পাইলে বিশ্বাস করিতাম না।

অল্প সুশিক্ষিত হিন্দুরই বাঙ্গালা কবিতার উপর এরূপ অধিকার আছে। আপনার ‘অশ্রুমালা’ তাহার প্রভাত শিশির-মালা স্বরূপ বঙ্গ-সাহিত্যের ইতিহাসে স্থান লাভ করিল’। বিক্রমপুর পন্ডিত সমাজের মুখপত্র ‘সারস্বতপত্র’ লিখিয়াছিলেন,

‘কবি কায়কোবাদ মুসলমান, কিন্তু তাহার বাঙ্গালা মুসলমানী নহে, কায়কোবাদের বাঙ্গালা সুসংস্কৃত, মার্জিত ও মধুর’।

এই সব লেখা দ্বারাই আপনারা বুঝিতে পারেন, মুসলমানদের লেখার উপরে হিন্দুদের কিরূপ বিজাতীয় ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছিল। আমি এইজন্যই আমার লেখাতে বিশুদ্ধ বাংলা শব্দ ব্যতীত অন্য কোন ভাষার শব্দ ব্যবহার করি নাই। আধুনিক লেখকদের মধ্যে কেহ কেহ সেজন্য বলিয়া থাকেন, আমি হিন্দুদের লেখার অনুকরণ করিয়াছি। বাস্তবিক তাহা নহে। হিন্দুরাই যে কেবল বিশুদ্ধ বাঙ্গালা লিখিতে পারেন, মুসলমানরা লিখিতে পারেন না, তাহাদের সেই অন্যায় ধারণা ও অযথা গর্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়াছি। আমি অনেক অনাবশ্যক কথার উল্লেখ করিলাম, কারণ আমার উপরে আধুনিক মুসলিম লেখকদের যে একটি অন্যায় ধারণা ছিল উহা দূরীভূত করিবার জন্যই এই প্রয়াস।

এখন আর সেদিন নাই, আমরা উল্লিখিত চারিজন মুসলমান সাহিত্যিক মুসলিম বংগভাষার সেই শৈশব সময়ে যে ভিত্তি স্থাপন করিয়া সাহিত্যের উদ্যান সৃজন করিয়াছিলাম, সেই ফুলকুল শোভিত সাহিত্য-উদ্যানে আজ আধুনিক বহু মুসলিম সাহিত্যিক নূতন নুতন সুগন্ধি ফুল ও ফলের বৃক্ষ রোপণ করিয়া উহার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিয়াছেন, তাহা দেখিলেও হৃদয়ে আনন্দের উদ্রেক হইয়া থাকে। এখন আর আমাদের সেই বংগভাষা দীনহীন দরিদ্রা নহে। দুনিয়ার মধ্যে যত ভাষা আছে, তাহাদের সকলের সম্মুখে আমাদের এই বংগভাষা রতনে, বসনে ও নানাবিধ অলংকারে বিভূষিতা রানীর মত দাঁড়াইতে সক্ষম।

আজ আপনাদের অনুকরণের কোন প্রয়োজন নাই। আজ আপনারা আপনাদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিয়া মুসলিম বংগভাষার শ্রীবৃদ্ধি করিতে থাকুন, কোন বাধা নাই, বিঘ্ন নাই, নিন্দা করিবার কেহ নাই। আজ আপনাদের পথ উন্মূক্ত। আজ আপনাদের সাহিত্য-উদ্যানে ডক্টর শহীদুল্লাহ, মওলানা আকরম খাঁ, সৈয়দ এমদাদ আলী, নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, আব্দুল করিম সাহিত্য-বিশারদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রভৃতি বহু সাহিত্যিক আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। এখন আপনাদের চিন্তা কি?” 

[১৯৪৩ সালে ঢাকা মুসলিম হল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত। ফাগুন, ১৩৪৯ সালে মাসিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত।]

[তথ্যসূত্র: পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য , সম্পাদনা : সরদার ফজলুল করিম, বাংলা একাডেমী – মার্চ, ১৯৬৮, পৃ: ৯৫-৯৭]

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ 

সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতাঃ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

বঙ্কিম সাহিত্যে মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা ৩ 

বাংলা ভাগে ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি পর্ব ৭

ঢাকার প্রমিত বাংলায় কলকাতা কেন্দ্রিক উপনিবেশের প্রভাব

সাম্প্রদায়িকতাঃমুক্ত নন রবীন্দ্রনাথও 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রদায়িক চেহারা 

Facebook Comments