বাংলা ভাগে ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি পর্ব ৩

লিখেছেনঃ নুরুল কবির, সম্পাদক  নিউ এইজ

পর্ব ১,  পর্ব ২

যদিও খ্রিষ্টান মিশনারি, বিশেষ করে ক্যালফাম গোত্রীয় সংস্কারবাদী মিশনারিরা ‘অসভ্য ভারতকে সভ্য করতে এবং ভারতবাসীকে নৈতিক স্খলন থেকে উদ্ধারের জন্য’ সরকারের কাছে ধর্মান্তরিতকরণের (অন্য ধর্ম থেকে খ্রিষ্টান ধর্মে) অনুমোদন চেয়ে বারবার দাবি জানাচ্ছিল। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জশুয়া মার্শম্যান (১৭৬০-১৮৩৭) নামের এক খ্রিষ্টান মিশনারি ১৮১৩ সালে ‘অ্যাডভান্টেজেস অব ক্রিশ্চিয়ানিটি ইন প্রমোটিং দ্য এস্টাবলিশমেন্ট এন্ড দ্য প্রোসপারিটি অব দ্য ব্রিটিশ গভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এতে তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, তিনি এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত যে, ভারতে ব্রিটিশ রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী করার সবচেয়ে কার্যকরী উপায়গুলোর একটি হবে নীরবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ভারতীয়দের মধ্যে ‘খ্রিষ্টান ধর্মের আলো’ ছড়িয়ে দেয়া। [জশুয়া মার্শম্যানের এই বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে অমিয় কুমার সামন্তর ‘বিদ্যসাগর: ঔপনিবেশিক সমাজে বিদ্যাসগরের অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা’তে, দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০১২, পৃষ্ঠা ২০৩]।

মার্শম্যান আরো লিখেছেন, ‘হিন্দু অথবা মুসলমানদের মধ্য থেকে ধর্মান্তরিত প্রত্যেকটি ব্যক্তি নিজের স্বার্থ, নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারতে তাদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই ব্রিটিশদের আন্তরিক বন্ধুতে পরিণত হবে। [প্রাগুক্ত]। 

লন্ডনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন মার্শম্যানের যুক্তি মেনে নিয়ে ওই বছরই ভারতে খ্রিষ্টান মিশনারিদের দ্বারা ধর্মান্তরিতকরণের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দেয়। পাশাপাশি সরকার ভারতীয়দের ‘ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য’ ‘সঠিক শিক্ষা’ ব্যবস্থা প্রণয়ন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘সমাজের উচুস্তরের হিন্দু জনগোষ্ঠির সন্তানদেরকে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষা এবং ইউরোপ-এশিয়ার সাহিত্য ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে’ কলকাতায় ১৮১৭ সালের জানুয়ারি মাসে বিখ্যাত ‘হিন্দু কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। [বাংলাপিডিয়া: ন্যাশনাল এনসাইক্লোপেডিয়া অব বাংলাদেশ, ভলিউম ৫, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০৩, সাব ভার্বো: হিন্দু কলেজ]।

হিন্দু কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অ্যাঙ্গলো-ইন্ডিয়ান (ভারতে বসবাসকারী ইংরেজ নাগরিক) শিক্ষক হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডেরোজিওর অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তারা ‘ইয়াং বেঙ্গল’ নামে একটি গ্রুপ গঠন করে। এই গ্রুপের সদস্যরা প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। কৃষ্ণ মোহন ব্যানার্জির (১৮১৩-১৮৮৫) এরকম খ্রিষ্টান হওয়ার ঘটনাটি বেশ আলোচিত হয়। অন্য অনেকে হিন্দুদের নানা ধর্মাচার প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করতেন। যেমন, রামতনু লাহিড়ি (১৮৩৮-১৮৯৮) কর্তৃক ‘পৈতা’ সরিয়ে ফেলা, রসিক কৃষ্ণ মল্লিক (১৮১০-১৮৫৮) কর্তৃক ‘গঙ্গার পানি নিয়ে শপথ’ করতে অস্বীকৃতি জানানো এবং রাধানাথ শিকদার (১৮১৩-১৮৭০) কর্তৃক বালিকা বধুকে বিয়ে করতে অস্বীকার করার ঘটনাসহ এর আগে-পরে আরো অনেক ঘটনা রয়েছে।

কৃষ্ণ মোহন ব্যানার্জি ঘোষণা দেন, ‘আমরা হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি এবং আমাদের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আক্রমণ চলবে।’ [অমলেশ ত্রিপতির ‘ইতালির রেনেসাঁ, বাংলার সংস্কৃতি’ থেকে কৃষ্ণ মোহনকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ৫২]। এ ব্যাপারে, শিবনাথ শাস্ত্রী (১৮৪৭-১৯১৯) ডেরোজিওর আরেক শিষ্য মাধব চন্দ্র মল্লিকের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, তিনি (মাধব) ‘অ্যাথেনিয়াম’ নামে একটি মাসিক সাময়িকীতে লিখেছিলেন, ‘আমরা যদি আমাদের অন্তরের গভীর থেকে কোনো কিছুকে ঘৃণা করি তাহলে সেটা হচ্ছে হিন্দু ধর্ম।’ [শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, (সংকলন) বিশ্বজিৎ ঘোষ, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১২, পৃষ্ঠা ৯৫]।

হিন্দু ধর্মে পাপ হিসেবে গণ্য অ্যালকোহল সেবন ওই সময়ে হিন্দুত্ববাদী গোড়ামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায়। হিন্দু কলেজের ছাত্র শাস্ত্রী লিখেছেন, ‘তখনকার সময়ে যে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে গিয়ে অ্যালকোহল পান করতে পারতো তাকে সংস্কারবাদীদের অগ্রসৈনিক হিসেবে মনে করা হতো। [প্রাগুক্ত]।

অধিকন্তু, মিশনারিগুলোর প্রচেষ্টায় তখন কলকাতা এবং এর আশপাশের এলাকায় প্রচুর সংখ্যক সাধারণ হিন্দুও খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করে। হিন্দু অভিজাত শ্রেণীর কট্টর রক্ষণশীল অংশ এ ধরনের ঘটনায় কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে অভিজাতদের চিন্তাশীল অংশ ধর্মান্তর রোধে নিজেদের ধর্মে বেশ কিছু সংস্কার সাধন করেন। এর ফলে তারা শুধু হিন্দু ধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলো সংস্কৃত থেকে সহজবোধ্য ভাষায় অনুবাদের দায়িত্বই নেননি, বরং নিজেদের ধর্মকে আধুনিকতার আলোয় ব্যাখ্যা করা এবং সেসব ব্যাখ্যা সাধারণ হিন্দুদের কাছে সহজলভ্য করার উদ্যোগও গ্রহণ করেন।

এজন্য হিন্দু জনগোষ্ঠির ইংরেজি জানা এবং না-জানা অংশের কাছে সহজবোধ্য একটি ভাষার প্রয়োজন পড়ে। আর এ থেকেই ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু অভিজাতদের পক্ষ থেকে একটি আধুনিক বাংলা গদ্য রীতি তৈরি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। যার অগ্রদূত ছিলেন রাজা রামমোহন রায়।

Raja_Ram_Mohan_Roysরামমোহন রায় ইউরোপিয়ানদের বাংলা শিক্ষার সুবিধার্থে ১৮৩৬ সালে ইংরেজি ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। তার আগে ১৮৩৩ সালে গৌড়ীয় ব্যাকরণ নামে বাংলা ভাষায়ও তিনি একটি ব্যাকরণ রচনা করেন। এই ব্যাকরণটিকে বাংলা ভাষার অপরিবর্তনীয় প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে রচিত প্রথম ব্যাকরণ হিসেবে পরিচিত লাভ করে। রামকমল সেন (১৭৮৩-১৮৪৪) নামে ইংরেজি শিক্ষিত একজন ধার্মিক হিন্দু ব্যক্তি যিনি পরে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল’র সেক্রেটারি হয়েছিলেন, ১৮২৫ সালে ‘বাংলা টু ইংলিশ’ একটি অভিধান সংকলন করেছিলেন। এর আগে ১৮২০ সালে রামকমল সেন হিন্দু স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘হিতোপদেশ’ নামে একটি পাঠ্যবই রচনা করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল কিশোর-তরুণদেরকে হিন্দু ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি অনুগত রাখা। পরবর্তীতে হিন্দু কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দায়িত্ব পালনের সময় সেন প্রতিষ্ঠানটি থেকে ডেরোজিওকে বহিস্কার করতে সক্ষম হন। তবে তার ‘বাংলা টু ইংলিশ’ অভিধানটি বাংলা গদ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

হিন্দু অভিজাত শ্রেণীর ইংরেজি শিক্ষিতদের মধ্যে কট্টর রক্ষণশীল অংশ যে ধর্মান্তরিতকরণের অব্যাহত হুমকি থেকে তাদের তরুণদের দূরে রাখতে বেশ সক্রিয় ছিল তার প্রমাণ মেলে রামকমল সেনের সমসাময়িক রাজা রাধাকান্ত দেবের (১৭৮৪-১৮৬৭) বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকর্ম থেকে। রাজা রাধাকান্তও তিন দশক ধরে হিন্দু কলেজের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। প্রফেসর মুহাম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন, ‘খ্রিষ্টান মিশনারিদের কবল থেকে ইয়াং বেঙ্গল’র সদস্যদের রক্ষায় রাধাকান্ত দেব বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।’ [মুহাম্মদ আবদুল হাই এবং সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যেও ইতিবৃত্ত: আধুনিক যুগ’, আহমেদ পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা, একাদশ মুদ্রণ, ২০১০, পৃষ্ঠা ৫৯]। হিন্দু বাঙালীদের মধ্যে ঐতিহ্যগত নৈতিকতার পূনঃজাগরণের জন্য কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটির দায়িত্বে থাকার সময়ে ১৮১৮ সালে ‘নীতিকথা’ নামে বাংলায় একটি গল্প সংকলন প্রকাশ করেন। এরপর ‘বাংলা শিক্ষা গ্রন্থ’ নামে আরেকটি বই প্রকাশ করেন ১৮২১ সালে। ১৮২৩ সালে বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য ‘গৌড়ীয় সমাজ’ নামে একটি সংস্থা গঠন করেন তিনি।

হিন্দু তরুণদেরকে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে রাধাকান্ত দেবের বুদ্ধিবৃত্তিক চেষ্টা আধুনিক বাংলা গদ্যকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করলেও এটা প্রনিধানযোগ্য যে, তিনি রামমোহন রায়ের কাঙ্খিত হিন্দু ধর্ম সংস্কারের ধারণার বিরোধী ছিলেন। ১৮২৮ সালে হিন্দু ধর্মে উদারনৈতিক সংস্কার সাধনের উদেশ্যে রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ এর বিপরীতে রাধাকান্ত দেব ‘ধর্মসভা’ নামে কট্টর রক্ষণশীল হিন্দুদের নিয়ে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। রাধাকান্ত দেব এবং তার ধর্মসভা ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সে ‘সতীদাহ প্রথা’ নিষিদ্ধ করে তৈরি আইন বাতিলের আবেদন করেছিলেন। [কৃষ্ণা ক্রিপালিন, দারকনাথ ঠাকুর: বিস্মৃত প্রতিকৃতি, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া, নিউ দিল্লী, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ৪৬]।

বাংলা গদ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও রাধাকান্তের ভাষা ছিল ভীষণভাবে সংস্কৃত-প্রভাবিত। সে সময়ে সংস্কৃত শিক্ষার বিস্তারে তিনি প্রচুর কাজ করেছিলেন। ১৮১৮ থেকে ১৮৫১ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তিনি সাত খন্ডে একটি সংস্কৃত অভিধান সংকলন করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘শব্দকল্পদ্রুম’। রাজা রামমোহন রায় ৩০টির মতো বই ও পুস্তিকা বাংলায় রচনা করেছিলেন। এরমধ্যে শুধুমাত্র বাংলা ব্যাকরণটি বাদ দিয়ে ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ ও ‘বেদান্ত সার’সহ (১৮১৫) তার লেখা সব বই-ই হিন্দু ধর্ম দর্শনের নানা দিকের ব্যাখ্যামূলক এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যঙ্গাত্মক। হিন্দু ধর্মে সংস্কার সাধনের চেষ্টার অংশ হিসেবে রায় ধর্মটির বিভিন্ন ‘অযৌক্তিক’ এবং অমানবিক আচার, যেমন সতীদাহ প্রথা, নিয়ে বেশ কিছু পুস্তিকা রচনা করেন।

হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ের সমালোচনার পাশাপাশি রামমোহন রায় হিন্দু তরুণদের মাঝে খ্রিষ্টান ধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে কয়েকটি পুস্তিকা লিখেন। তার মধ্যে একটি ছিল ‘প্রিসেপ্ট অব জিসাস’, যেটিতে তিনি খ্রিষ্টান বিশ্বাসের ‘ত্রিত্ববাদ’কে নিয়ে সমালোচনা করেন। ত্রিত্ববাদ নিয়ে রামমোহনের সমালোচনা শুধু ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দুদেরই খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণের আগে দু’বার ভাবতে বাধ্য করেনি, বরং তার (রায়ের) ইংলিশ বন্ধু উইলিয়াম অ্যাডামকে ‘একত্ববাদ’-এ বিশ্বাসী ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করে। এর ফলে ‘ত্রিত্ববাদে’ বিশ্বাসী শ্রীরামপুর ভিত্তিক ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিগুলোর ক্ষোভের শিকার হতে হয় রামমোহন রায়কে।

আগেই বলা হয়েছে, রায় তার বেশিরভাগ পুস্তিকা বাংলায় রচনা করেছেন। ধর্মীয় সংস্কারের কর্মসূচি পরিচালনা করতে গিয়ে, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মের একত্ববাদী ধারণার ব্যাখ্যা মানুষের সামনে হাজির করার সময় একই সাথে রামমোহন রায় বাংলা গদ্যের উন্নয়নের কষ্টকর কাজটিও করে ফেলেছেন। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৮ সালে ইংরেজিতে লেখা একটি প্রবন্ধে রামমোহনকে মূল্যায়ন করেছিলেন এভাবে:

‘বাঙলার মানুষের আত্মপ্রকাশের জন্য রামমোহন যখন তার নিজের ভাষার উন্নয়নের সম্ভাবনাসমুহকে কাজে লাগাতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন তাকে বাংলা গদ্যের অনাবিৃস্কত ক্ষেত্রগুলোতে বহু কষ্ট করে বিচরণ এবং তাতে পথ তৈরি করতে হয়েছে। আধ্যাত্মিক দর্শনে বাঙালী মননকে আলোকিত করার চেষ্টা করলেও তিনি বেদান্তকে তখনো গড়ে না উঠা বাংলা গদ্যে ব্যাখ্যা করার মতো কঠিন কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেননি। তাকে এই কাজটি করতে হয়েছে পড়াশোনা জানা মানুষদের জন্য, যাদের অনেকে উপনিশদকে ভুয়া এবং মহানির্বান তন্ত্রকে স্বয়ং রামমোহন কর্তৃক পরিবর্তিত ধর্মীয় বক্তব্য বলে মনে করতেন।’ [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘রাম মোহন রায়’ রবীন্দ্রসমগ্র, ভলিউম ২০, পাঠক সমাবেশ, ঢাকা, ২০১৩, পৃষ্ঠা ১২১২]

পাশাপাশি বেদ পাঠ, ব্রহ্মার পূঁজা ও তার কাছে প্রার্থনা এবং ধর্মীয় প্রচারণায় বাংলা ভাষা ব্যবহার শুরু করে রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজ। [দারকনাথ ঠাকুর রামমোহনকে বাংলায় পূঁজা, প্রার্থনা পরিচালনার পরামর্শ দেন। দেখুন, কৃষ্ণ কৃপালিনী, দারকনাথ ঠাকুর: বিস্মৃত প্রতিকৃতি, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট- ইন্ডিয়া, নিউ দিল্লী, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ৪৩]। এই প্রক্রিয়ায় রায়একই সাথে গুরুগম্ভীর চিন্তা এবং বিদ্রুপাত্মক নানা ধারণা বহনে সক্ষম করার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় শুধু প্রচুর শক্তি সঞ্চারই করেননি, বরং সীমিত আকারে হলেও বিভিন্ন ধরনের যতিচিহ্ন ব্যবহার করার মাধ্যমে ভাষাটির অকৃত্রিম ছন্দকে সামনে নিয়ে এসেছেন। [মুহাম্মদ আবদুল হাই এবং সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত: আধুনিক যুগ, আহমেদ পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা, একাদশ মুদ্রণ, ২০১০, পৃষ্ঠা ৫৭]।

রামমোহন রায় বাংলা সাহিত্যে বিপুল পরিমাণ ধর্মীয় ব্যঙ্গাত্মক এবং দার্শনিক লেখালেখি করেছেন, কিন্তু সম্ভবত, সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রচুর হিন্দু ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে বিশ্লেষণ করার কারণে তার সেসব লেখা ভীষণভাবে সংস্কৃত-প্রভাবিত থেকে গেছে। রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলন, অন্যকথায় যাকে বলা যায়, হিন্দু ধর্মের আদি একত্ববাদী ধারণাকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলা ভাষায় ধর্মটিকে পুনঃব্যাখ্যা করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু তরুণদের গণহারে খ্রিষ্টান হওয়া, এবং হিন্দু ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ থেকে দূরে রাখার ধর্মীয় উদ্দেশ্যটি উল্লেখযোগ্যভাবে অর্জিত হয়। এ বিষয়টি ১৮৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথের একটি পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

‘প্রথম ইংরেজি শিক্ষার সংস্পর্শে এসে বাঙালী তরুণরা প্রচন্ড ভাবে জাতি বিরোধী হতে শুরু করল। গরুর গোশত খাওয়াকে তাদের কাছে নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব মনে হল। আর প্রাচীন হিন্দু ধর্মের অনুসারীদেরকে তাদের কাছে চারপেয়ে প্রাণিটির সমার্থক বলে মনে হতে লাগলো। এসময়  মহান ব্যক্তিত্ব রামমোহন রায়ের প্রচারিত ব্রাহ্ম ধর্ম আস্তে আস্তে দেশজুড়ে শিকড় মেলতে শুরু করে। অতঃপর সেই তরুণদের কাছে এটা স্পষ্ট হল যে, আমাদের দেশেও অতীতে একসময় একত্ববাদী চিন্তা বিদ্যমান ছিল। এরপর থেকেই এটা তাদের কাছে নিজেদের জাতির অতীতকে সম্মান করার প্রধান অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নব্যবঙ্গের আন্দোলন, রবীন্দ্রসমগ্র, ভলিউম ১৭, পাঠক সমাবেশ, ঢাকা, ২০১৩, পৃষ্ঠা ৪৬৬]।

পরের পর্বঃ বাংলা ভাগে ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি পর্ব ৪

[উৎসঃ নুরুল কবির এর লেখা Colonialism, politics of language and partition of Bengal, ৩৫ পর্বের ধারাবাহিক এর অনুবাদ।লেখক এই সিরিজটি তার সম্পাদিত ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজ পত্রিকায় ২০১৩ সালে প্রকাশ করেন। প্রথম ১১ পর্বে তিনি বাংলা ভাগের রাজনৈতিক কারণগুলো আলোচনা করেছেন।সেই ১১ পর্ব নিয়ে মূলধারা বাংলাদেশ একটি ই-বই প্রকাশ করেছে। সেই বই এবং পর্ব আকারে লেখা পেতে লিংকে ক্লিক করুন 

প্রাসঙ্গিক পোস্টঃ

বাংলা ভাষার নূতন পরিচয়– কবি গোলাম মোস্তফা

এম আর আখতার মুকুলের লেখা বর্ণ হিন্দুদের খুশি রাখতে পলাশীর পর বন্ধ থাকে খ্রিষ্টধর্ম প্রচার

পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহন ও খ্রিষ্টধর্মের মোকাবেলায় হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের উদ্যেগ

 

Facebook Comments