সংখ্যালঘুর কষ্ট ও নালিশের মনস্তত্ব

এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার কিছু দিন পর ভিন্ন কারনে প্রবাসী চিন্তক মুনশি বিশ্বজিৎ হিন্দু সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেন।একই ভাবে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনও একই বিষয়ে বৃহৎ এক প্রবন্ধ লিখেন।বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নালিশের মনস্তত্ব নিয়ে বিস্তারিত জানতে আগ্রহীদের অবশ্যই দুটি পোষ্ট পড়ে নেয়া দরকার। (১)  বাংলাদেশের হিন্দুদের সাম্প্রদায়ীকতা (২) সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ ও একরৈখিক চিন্তাভাবনা-মুনতাসির মামুন

সম্পাদক

সর্বশেষ আপডেটঃ ১৩/০৭/২০১৬

…………………………………

একটা  ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে আমরা বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক পাশাপাশি বসবাস করি কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দু:খ, কষ্ট ও বেদনার জায়গাগুলো বুঝিনা।তারাও যে বুঝে এমনটা বলা যায়না।আমাদের সেন্স এবং সেন্সিবিলিটিও অনেক ক্ষেত্রে কম ।দেখুন ফেইসবুকে একজন হিন্দু ভাইয়ের মন্তব্য;

Pinak Pani Bhattacharjee লিখেছেন; উঠতে বসতে মালাউন গালি শোনা, প্রতিনিয়ত মন্দিরে হামলার খবর শোনা, আর নিপীড়িত হওয়ার যন্ত্রনাটুকু বুঝতে পারলে আপনারা একজন হিন্দুকে দেশ ত্যাগের জন্য দায়ী করতেন না।এদেশের হিন্দুরা তো ভারতের মুসলিমদের মতো কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী জংগী সংগঠনের সদস্য হয়ে আলাদা ভূখণ্ড দাবি করেনি। তারপর ও কেন বাধ্য হয় দেশের সহায় সম্বল ত্যাগ করে অচেনা দেশে পাড়ি দিতে সেটা আপনারা বুঝবেন না কারণ – “কি যাতনা বীষে বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।”

ভারতে মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতাবাদের বয়ান সঠিক নয়, কারন ভারতের অনেকগুলো রাজ্যে স্বাধীনতার যে আন্দোলন চলছে সেগুলো মুসলমানরা করছেনা, মুসলমান হিসেবে করছেনা।আসামের উলফা ও তামিলরা কি মুসলিম? এই যে বললাম তারাও মুসলমানদের ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করেন, সাম্প্রদায়িক গালি দেন….তবে বাকী বক্তব্যের ব্যাপারে কথা আছে।

এটা খুবই দু:খজনক।কোন হিন্দু ভাই কি কখনো আপনার মুসলিম বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছেন ‘মালাউন’ শব্দের অর্থ কি? আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি শতকরা ৯০ জন এর অর্থ জানেনা।আমি নিজে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি।একজন আমাকে এমনো বলেছে সে মনে করে এটা মানে হচ্ছে ‘ঐ শালা” জাতীয় একটা গালি, তবে এটা কেবলি হিন্দুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যে বলেছে সে এমবিএ করা! হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বসবাস।যে দেশে ৪০-৫০% মানুষ এখনো নিরক্ষর,সেখানে কি আর আশা করা যায়? এরমানে এই নয় আমরা অন্যায়কে ডিফেন্ড করছি।

যিনি এই লেখাটা পড়ছেন আপনি কি জানেন ‘মালাউন’ শব্দের অর্থ? তাহলে কেন বলেন এটা? আমি যখন ঐ এমবিএ বন্ধুকে এর আসল অর্থ বললাম তার রেসপন্স হচ্ছে-‘কস কি?’ এভাবেতো কখনো ভাবিনি।আমার মনে হয়না সে আর ঐ শব্দ ব্যাবহার করবে।রাগ ক্ষোভ হলে “শালা”ই বলবে।কারন আমাদের অনেকে হিন্দু বন্ধু আছে।আমরা কি তার জন্য এমন দোয়া করি- “আল্লাহ তোর উপর লানত বর্ষণ করুক”! করেন? করেছেন কখনো? ধর্মীয়ভাবে বলতে গেলে একজন মুসলমান যুদ্ধের ময়দানেও তো এমন বদ দোয়া করতে পারেনা। তাহলে আমরা কেন না জেনে এই জঘন্য গালিটি ব্যবহার করছি যার অর্থ অনেকটা এরকম- অভিশপ্ত বা আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত

আমার মনে হয় মুসলমানরাই এই শব্দটা বেশি ব্যবহার করেন।হিন্দুরাও করেন আরো বিভিন্ন শব্দ যেমন যবন, শ্লেষ, নেড়ে ইত্যাদি।প্রত্যেকটা শব্দের রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট,রয়েছে ইতিহাস ও ক্ষমতার দন্ধের লড়াইয়ের পটুভুমি।যার ফলে আমরা ঐ ইতিহাস বয়ে চলেছি।মুসলমানরা এই বাংলায় আসার আগে বৌদ্ধদের ‘নেড়ে’ বলত ব্রাম্মণরা।সেই ইতিহাস কি আমরা জানি? জানি কি বৌদ্ধদের জন্য ব্যবহ্রত এই শব্দ কেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহ্রত হতে লাগল? এখনো কেন হয়?যবন অর্থ বহিরাগত।৮শ বছর এখানে বসবাস করার পরও আমরা এখানে বহিরাগত! ব্যাপারটা এমন যে বাংলাদেশের সকল মুসলমান বখতিয়ার খলজি, মোগল অথবা পাঠান! আর সবাই শাসক কেবল হিন্দু সম্প্রদায় শাসিত।তাই কি?এই যদি হয় কারো বিশ্বাস তাহলে কিভাবে সহঅবস্থান নিশ্চিত হবে? সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষতো এভাবেই জেগে আছে মনের মধ্যে।অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এই দেশের সংখ্যাগুরু মুসলমান এই ভূমিরই সন্তান।অধিকাংশই ধর্মান্তরিত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্ম থেকে ( সংক্ষেপে জানুনঃ যেভাবে বৌদ্ধ বাংলা রুপান্তরিত হল মুসলিম বাংলায়)।

আমরা যারা বলি ইতিহাস হচ্ছে কেবলই অতীতের কথা।তারা বলুন কেন ৭শ, ৮শ, ১২ শতাব্দির এই গালিগুলো এখনো আমরা দৈনিক ব্যবহার করে চলেছি? কারন এটা আমরা ঐতিহাসিকভাবে পেয়েছি।আমাদের বাবা, তার বাবা,তিনি তার বাবা’র …কাছ থেকে শিখেছেন এমনটা নয়।কমিউনিটি, সমাজ আমাদেরকে এটা শিখিয়ে দিয়েছে।আমার বাবা জীবনে এই গালিগুলো আমাকে শেখায়নি কিন্তু আমিতো জেনে গেছি।এই গালির মধ্যে ফুটে উঠে হিন্দু-মুসলিম সভ্যতার ঐতিহাসিক সম্পর্ক। এই জন্যই আমরা বলেছি- আমরা সবাই ইতিহাসের-সময়ের ধারাবাহিকতা কেবল।কত শত সহস্র মানুষ, জনপদ আসল, গেল,আমি আপনিও চলে যাব, নতুনরা আসবে।আমাদের দাদা না আসলে আমরা দুনিয়াতে আসতাম না।সেজন্য আমাদের উচিত অন্তত ৩ পুরুষের ইতিহাস জানা।আমাদের উচিত বাবা’র দাদা নাম জানা, তার সময়ের সমাজকে, রাজনীতিকে, তাঁদের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে জানা।এটা অবশ্যকরণীয়।(পড়ুনঃ আপনার বাবা’র দাদা নাম জানেন?)

উদুর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে 

Pinak Pani Bhattacharjee যে যন্ত্রনার কথা বললেন সেটা কেবল দুই কমিউনিটির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ করে একে অপরকে বুঝার মাধ্যমে কমানো সম্ভব।মুসলমানকে ধর্মনিরপেক্ষ বা নাস্তিক বানিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবেনা। সংখ্যাগুরুকে ঢালাও সাম্প্রদায়িক গালি দিয়েও হবেনা। মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে হবে।

কিছু দিন আগে ‘বাংলাদেশে গরু জবাই বন্ধের দাবি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের’ ইস্যুতে মাঠ গরম হয়ে উঠল।অথচ ঐ প্রোগ্রামে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র শাখা থেকে দাবী করা হয়েছে “বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নজিরবিহীন নিপীড়ন চলছে এবং তাদের বেদখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তির মধ্যে চার ভাগের তিন ভাগ দখল করে নিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা” (দেখুন; বাংলাদেশে গরু জবাই বন্ধের দাবি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের, মানবজমিন,২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)।

ঐ প্রোগ্রামে শ্যামল চক্রবর্তী বলেন, অনেকে বলে থাকেন যে, বাংলাদেশি হিন্দুদের উপর নির্যাতন শুরু হয়েছে ১৯৭৫ সালের পর। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। বাস্তবে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা তথা হিন্দুদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন ও তাদের সম্পত্তি দখলের প্রবণতা শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকেই (প্রাগুপ্ত)/অথচ এই দখলদারিত্বের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা নিরিহ মোল্লা-মৌলভীদের দায়ী করেন। এভাবে ক্ষমতা, দখলবাজি থেকে শতমাইল দূরে যারা(সংখ্যাগুরু) তাদেরকে মার্জিনালাইজড করলে কিভাবে আপনাদের যাতনা দূর হবে? কে দাঁড়াবে আপনার পাশে যখন কোন সেকুলার এম্পি, মন্ত্রী নিজের লোভে আপনাকে ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করবে?

বুঝার চেষ্টা করুন।হিন্দু সম্প্রদায়ের যারা ভিকটিম তাঁরা যখন হিন্দু হিসেবে নালিশ করেন তখন এই নালিশী একটা সাম্প্রদায়িক রুপ নেয়।কিন্তু যিনি দখল করেন তার একমাত্র পরিচয় হচ্ছে-দখলবাজ, সন্ত্রাসী।আপনার নালিশ তার এই পরিচয়কে লোপ করে।অন্যদিকে ক্ষমতা, দখল থেকে হাজার মাইল দূরে থাকা নিরীহ মুসলমান বেহুদা আপনার আক্রমণে প্রতিপক্ষ হয়ে দাড়ায়।অথচ আপনি তার সহানুভুতি পেতে পারতেন। এভাবে করে সংখ্যালঘুরা “রাজনীতির মাঠে ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাসগুপ্ত” (সংখ্যালঘুরা রাজনীতির ‘দাবার ঘুঁটি’, মানবজমিন, ২২ ডিসেম্বর ২০১৫)।

সংখ্যালঘু অত্যাচার

খুন
চিত্র ১ঃ ৬ বছরে খুন সাড়ে ২৫ হাজার মানুষ, আমার দেশ, ৪ মার্চ, ২০১৬

ইংরেজ শাসনের প্রথম ১০০ বছরে বিভিন্ন বিদ্রোহ, বিপ্লবে ‘মাত্র’ ৪২০০০ মানুষ খুন হয়েছিল (শ্রী নলিনী কিশোর গুহ, বাংলায় বিপ্লববাদ, এ মুখার্জী অ্যান্ড কোং, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করন, বৈশাখ ১৩৬১/১৯২৩ ইং, পৃষ্ঠা ৮) । অথচ গত ৬ বছরে মানুষ খুন হয়েছে সাড়ে ২৫ হাজার! (৬ বছরে খুন সাড়ে ২৫ হাজার মানুষ, আমার দেশ, ৪ মার্চ, ২০১৬)।  প্রথম আলোর রিপোর্ট মতে, কেবল রাজনৈতিক সহিংসতায় ছয় বছরে (২০০৯-২০১৪) প্রাণ হারিয়েছেন ৯০৮ জন (প্রথম আলো, রাজনৈতিক সহিংসতায় ছয় বছরে খুন ৯০৮, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৪)।প্রথম আলো আরো লিখে “জাতীয় নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, বিশেষ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালে যত মানুষ মারা যায়, তা এই সরকারের পাঁচ বছরের প্রায় সমান এবং সংখ্যাটি ৫০৭”

024434Pic-33
চিত্র ২ঃ তিন মাসে ১৫০০ এর বেশী নাগরিক খুন (কালের কণ্ঠ, ৩ এপ্রিল, ২০১৬)

কেবল গত তিন মাসে ১৫০০ এর বেশী ‘নাগরিক’ খুন হল বাংলাদেশে (এনটিভি, ২৫ এপ্রিল ২০১৬; কালের কণ্ঠ, ৩ এপ্রিল, ২০১৬)।সংখ্যার অনুপাতে ধর্মীয় পরিচয়ে প্রায় ১৫০ জন হিন্দু খুন হওয়ার কথা (কথার কথা)।বাকী ১৩৫০ জন খুনের জন্য সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় কাঁর কাছে যাবে? আমরা কি বলব মুসলিম শাসকের হাতে ১৩৫০ জন মুসলিম খুন হয়েছেন ৩ মাসে?! তাহলে আপনারা কেন খুন, ধর্ষন, অত্যাচারকে সাম্প্রদায়িক চেহারা দিচ্ছেন? এভাবে দিন শেষে ভিকটিম হচ্ছেন আপনারাই।

খুনতো খুনই।রাষ্ট্রের নাগরিক খুন হচ্ছে বিনা বিচারে,এর প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব।এখন সাইদীর রায়ের পর যারা খুন হল তাঁরা যদি বলে সেকুলার মুসলিম শাসকের হাতে  শত শত মুসলিম খুন,তাহলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে? একটা ধর্মযুদ্ধের সৃষ্টি হবে।এটাই কি আমরা  চাই? বিভিন্নভাবে সংখ্যালঘু সংজ্ঞায়িত হতে পারে-ধর্মীয়, রাজনৈতিক, নৃ-তাত্ত্বিক, ভাষিক সংখ্যালঘু ইত্যাদি।কেবল মাত্র ধর্মের ভিত্তিতে নিজেকে সংখ্যালঘু হিসেবে আলাদা সুবিধা, নিরাপত্তা, প্রিভিলিজ, ফ্যাসিলিটি দাবী করাটা কতটুকু যৌক্তিক??

সাম্প্রদায়িক সমস্যার খুঁটি

আমাদের এই অঞ্চলে সমকালীন সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস বেশী আগের নয়। সলিমুল্লাহ খান এর একটি চিত্র খুব ভাবে তুলে ধরেছেন।সেখান থেকে কয়েকটি লাইন তুলে ধরছি;

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সবসময় বলিতেন, ইংরেজরা আসার ৫০০ বছর আগে পর্যন্ত ভারতবর্ষে যুদ্ধবিগ্রহ ঢের হয়েছে, মগর একটিও সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ হয় নাই। মানে হিন্দু বনাম মুসলমান যুদ্ধ হয় নাই একটিও।মুসলমান বাহিনীতে হিন্দু সেনাপতি আর হিন্দু বাহিনীতে মুসলিম সেনাপতি থাকাই ছিল প্রায় নিয়ম। কিন্তু ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার উদগাতা হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রবর্তক সম্প্রদায়।তিনি এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথকেও দায়ী করেন। সাম্প্রতিক কালে ভারতে চায় বাংলাদেশে এই সমস্যাটি জারী থাকুক।কেন?এর উত্তরে সলিমুল্লাহ খান বলেন;

বাংলাদেশ বলিতেছে, আমরা মুসলমান বা ইসলামের কারণে স্বাধীন হই নাই (১৯৭১ সালে)।আমরা জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ নীতির ছায়ায় স্বাধীন হইয়াছি। বাঙ্গালী যদি আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারী হয়, তাহা হইলে মিজো কিম্বা নাগা জাতিই বা হইবে না কেন? কাশ্মীরি জাতি জাতি হইবে না কেন? এই যুক্তি ভারত মানিতে পারে না। বাংলাদেশকে বার বার দ্বিতীয় ইসলামিক রিপাবলিক বানাইতে হইবে সেই দরকার পূরণের প্রয়োজনে। ভারতের লক্ষ্য এমনই। …বাংলাদেশকে নিয়মিত সাম্প্রদায়িক দেশ আকারে দেখানো ভারতের লক্ষ্য। (পড়ুন বিস্তারিতঃ  সাম্প্রদায়িকতাঃমুক্ত নন রবীন্দ্রনাথও).

সলিমুল্লাহ খানের কথার সত্যতা পাওয়া যায়  বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান আবু রুশদের লেখা বাংলাদেশে ‘র’ ” নামক বই এ। সেখানে তিনি লিখেন;

…..সংখ্যালঘু নির্যাতনের কল্পকাহিনী ও বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে চিহ্নিতকরণ— ‘র’-এর প্ররোচনায় বিজেপি শুধুমাত্র স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন ও মোহাজির সংঘ তৈরী করেই ক্ষান্ত হয়নি, যাবতীয় উপায়ে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণায় লিপ্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি উগ্র হিন্দু বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করাই ‘র’ এর অন্যতম লক্ষ্য। ভারতে অব্যাহত মুসলমান নির্যাতন, সংখ্যালঘু বিরোধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য মূলত ‘র’ এই পথে অগ্রসর হয়। ………লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ‘৯০ সালে ভারতে বাবরী মসজিদ ইস্যুকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা সংঘটিত হওয়ার পর থেকেই ‘বাংলাদেশের হিন্দুরা নিরাপদে নেই’ এ ধরণের প্রচারণা জোরদার করা হয়।  …. (পৃষ্ঠা: ১৬৬)।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সমস্যা বলতে আদতে কিছু নেই। যেটা আছে সেটা রাজনৈতিক নিপীড়ন, সেটা কেবলই রাজনৈতিক।এখানে আওয়ামীলীগ মারে বিএনপিকে, বিএনপি মেরেছে আওয়ামীলীগ, জামায়াত মেরেছে আওয়ামীলীগকে, এখন আওয়ামীলিগ মারছে জামায়াতকে……কেউ রাজনীতির এই লড়াইকে বলেনি মুসলমান-মুসলমান সংঘর্ষ।যেমনটা মধ্যপ্রাচ্যে দেখা যাচ্ছে শিয়া-সুন্নি বিরোধ। কিন্তু যখনই কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ খুন হন বা আক্রমণের শিকার হন সেটাকে কেন আমরা হিন্দু, বৌদ্ধ হিসেবে দেখছি? আমাদের  নাগরিকত্ব কি তাহলে মুসলমান, বৌদ্ধ বা হিন্দু  ধর্মের ভিত্তিতে ? নাকি বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবেই আমরা ধর্মীয় পরিচয়গুলো বহন করি? এক্ষেত্রে সেকুলার সম্প্রদায় এক কাঁঠি এগিয়ে।তারা সব ক্ষেত্রে সেকুলার কিন্তু সংখ্যালঘু ইস্যুতে বেশ সাম্প্রদায়িক! আমাদের সেকুলারিটির এই দৈন্য দশা আমি ব্যাখ্যা করেছি দুটি পোষ্টে (পড়ুনঃ বাংলাদেশে কালচারের রবীন্দ্রায়ন ও আমাদের স্যাকুলারিটি এবং  লাল সাম্প্রদায়িকতার ঐতিহাসিক কারণ)

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি 

এখানে আমি মূলধারা বাংলাদেশ পেইজে প্রকাশিত স্ট্যাটাস থেকে কপি করছি। বাংলাদেশের মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ,খৃষ্ঠান ইত্যাদি সকল ধর্মের মানুষই ধর্মপরায়ন।নিজ নিজ ধর্ম-বিশ্বাস নিয়ে আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সহাবস্থানের ইতিহাস।কিন্তু কেউ কেউ সহাবস্থানকে ভুল বুঝে দুই বা একাধিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মীকরন করে একধরণের স্বমন্বয় (যাতে করে উভয়ের আইডেনটিটি লোপ পেয়ে সিঙ্গুলার আইডেনটিটি) তৈরির চেষ্টা করছেন।যা কেবল ভুলই নয়, ভয়ানকও।

unity
চিত্র ৩ঃ বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যায় সম্মিলিত মানব বন্ধন

এটা হচ্ছে বাংলাদেশের চিত্র (চিত্র ৩)।এখানেও ধান্দাবাজ আছে।কিন্তু বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে।সংখ্যাগুরুকে সংখ্যালঘুর নিরাপত্তায় অংশীদার হতে হবে। দুই পক্ষ থেকেই সেই চেষ্টা, যোগাযোগ, ভাতৃত্ববোধ থাকতে হবে।সন্ত্রাসী’র খুনীর কোন ধর্ম যদি থাকে সেটা হচ্ছে-সন্ত্রাসবাদ। কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য সংখ্যাগুরুকে সাম্প্রদায়িকতার ঢালাও অভিযোগ করে আদতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ কেউ নিজেদেরকে আরো মার্জিনালাইজড করে ফেলছেন,এটা বুঝা দরকার।

সেজন্য ধার্মিক কে সেকুলার বা নাস্তিক বানিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা হবেনা।এই প্রচেষ্টা দিনে দিনে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সংখ্যালঘুদের জমি যারা দখল করেছে তাঁদের কত শতাংশ প্রকৃত ধার্মিক? অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্ম বিশ্বাসে নাক সিটকিয়ে, ধর্মীয় গুরু বা নবীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য, মশকরা করে ক্ষেপিয়ে তুলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কখনোই অর্জিত হবেনা।

প্রত্যেক কমিউনিটি’র নিজস্ব আচার, কালচার, ইতিহাস, বিশ্বাস ক্ষেত্র বিশেষে ভাষাও রয়েছে। আমাদের এইসব নিজস্বতাকে সম্মান দেখাতে হবে। এভাবেই একটি শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।

প্রাসঙ্গিক পোস্টঃ

বাংলাদেশের সরকারী চাকুরীতে সংখ্যালঘুদের অবস্থান

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু জনসংখ্যা কমে যাওয়ার আসল কারণ

বাংলাদেশের হিন্দুদের রাষ্ট্র ও রাজনীতি

বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘু কারা? এই পোস্টে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী কমরেড বদরুদ্দীন উমর বলেন;

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সাধারণ হিন্দুরা নয়,  দুর্নীতিবাজ হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত লোকই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে নানা ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। 

Facebook Comments