১৯০৫ সালের বাংলাভাগ ও পূর্ববাংলায় প্রতিক্রিয়া-পর্ব ১

লিখেছেনঃ মুনতাসীর মামুন, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা ইউনিভার্সিটি

বঙ্গভঙ্গের কারণ নিয়ে ঐতিহাসিকরা যেসব আলোচনা করেছেন তাতে দুটি বিষয়ই প্রধান হয়ে উঠেছে। একদল ঐতিহাসিকের মতে, প্রশাসনিক কারণেই ঔপনিবেশিক সরকার বাংলা কে বিভক্ত করেছিলেন যে যুক্তি ওই সময়ে ব্রিটিশ সিভিলিয়ানরা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিভিন্নভাবে।  এই প্রসঙে ম্যাকলেন লিখেছেন, ১৯০৫ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল প্রচ্ছন্ন।

অন্যেরা বলেছেন, ঔপনিবেশিক সরকারের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। বাংলা বিভক্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের উদ্দেশ্যেই ব্রিটিশ সরকার ভাগ করেছিল বাংলা কে। যেমন, সুমিত সরকার মনে করেন , ১৯০৩ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের পিছে সরকারের প্রশাসনিক পরিবর্তন-ইচ্ছাই কাজ করেছে। ডিসেম্বর ১৯০৩ থেকে ১৯ জুলাই ১৯০৫-এর মধ্যে “transfer plan was transformed into full scale partition.’ এ সময়ের রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল পূর্ব ও পশ্চিম বঙের হিন্দুদের বিভক্ত করা। এবং ১৯০৩ সালের ২৮ মার্চের চিঠিতে ফ্রেজার প্রথমবারের মত বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক ফায়দার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এমাজদ্দিন আহমেদ এক দীর্ঘ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন ব্রিটিশদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল মুখ্য।

শেষোক্ত যুক্তিটিই বর্তমানে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। সুমিত সরকারের আগে, অমলেশ ত্রিপাঠীও মোটামুটি একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন।লিখেছেন তিনি, “এ সিদ্ধান্ত আজ বোধহয় তর্কাতীত যে, রাজদ্রোহী কংগ্রেসকে ধ্বংস করার কোনোও উগ্র বাসনা থেকে বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনার জন্ম হয়নি। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইংরেজ আমলাদের প্রচন্ড বাঙ্গালি বিদ্বেষ, আর বাংলার ভৌগোলিক এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিজাত অতি জরুরি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা থেকেই এর উদ্ভব। চরমপন্থা জোরদার হবার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে তাতে কংগ্রেস বিরোধী আয়তন যুক্ত হয়।’’  এবং তারপর তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে ইংরেজ আমলাদের বাঙ্গালী বিদ্বেষ চরম আকারে ধারণ করেছিল। এটিকে আমরা একধরনের মনস্তাত্ত্বিক পটভূমি হিসেবেও উল্লেখ করতে পারি।

বঙ্গ বা বাংলা বলতে, ১৯০৫-এর আগে বোঝাত অবিভক্ত বাংলা বা বেঙল প্রপার, সম্পূর্ণ বিহার, উড়িষ্যা এবং আসাম। এরকম একটি বিস্তৃত অঞ্চল সুষ্ঠুভাবে শাসন করা দুরহ। প্রধানত এ চিন্তা থেকেই বঙ্গভঙ্গের পঞ্চাশ বছর আগে বাংলার আয়তন কমাবার প্রস্তাব করা হয়েছিল। হয়ত  এটিও ভাবা হয়ছিল যে, এতে এ অঞ্চল, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ ও আসামের পশ্চাৎমুখীনতা হ্রাস পাবে। এন্ড্রু ফ্রেজার ও তা-ই মনে করতেন।

পূর্ববঙ্গ ভারতবর্ষের একটি পশ্চাৎপদ প্রদেশে পরিণত হয় অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে।মুর্শিদকুলি খাঁ অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে ঢাকা থেকে রাজধানী স্থানান্তর করেন মুর্শিদাবাদে এবং এ পরিপ্রেক্ষিতেই অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে পূর্ববঙ্গ (বা ঢাকার)-এর ক্ষয় শুরু যা থেকে এ অঞ্চলটি বিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত আর মুক্তি পায়নি।

 ১৮৫৪ সালে, প্রধানত প্রশাসনিক কারণেই বাংলায় লেঃ গভর্নরের পদ সৃষ্টি হয়। এরপর ১৮৬৭ সালে উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষের পর বাংলার লেঃ গভর্নর এক চিঠিতে জানান যে “বর্তমানে বাংলার মত এত অস্বাভাবিক ব্যবস্থা ভারতে আর আছে বলে আমি জানিনা, ভারতে আয়তনের দিক থেকে বৃহত্তম প্রশাসনিক ব্যবস্থা আর গুরুত্বের দিক থেকে সর্বপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও বাংলা সরকারের কর্মক্ষমতা বোম্বাই ও মাদ্রাজ সরকার অপেক্ষা অনেক কম ও শ্লথ।”

১৮৭৪ সালে চিফ কমিশনারের অধীনে আসাম পরিণত হয় একটি স্বতন্ত্র প্রদেশে।১৮৬৭ সালে ভারত সচিব লর্ড নর্থকোটের নেতৃত্বাধীন এক বিশেষ কমিটির সুপারিশে তা করা হয়েছিল।

১৮৯২ সালে লুসাই উপজাতির বিদ্রোহের কারণে আবার বাংলার সীমানা পুনর্গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল যদিও তা কার্যকর হয়নি। তবে, পূর্ববঙ্গ নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাবটি প্রথমে করেন চাটগার কমিশনার ওল্ডহ্যাম ১৮৯৬ সালে। তিনি সরকারের কাছে এক প্রস্তাবে জানিয়েছিলেন, আসাম, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের অংশ নিয়ে পূর্ববঙ্গ নামে নতুন প্রদেশ হওয়া উচিত যার রাজধানী হবে চট্টগ্রাম অথবা ঢাকা। অন্যদিকে এর চার বছর পর আসামের চীফ কমিশনার, আসামের সাথে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ময়মনসিংহকে যুক্ত করার প্রস্তাব করেন। তবে ১৮৯৮ সালে দক্ষিণ লুসাইকে আসামের সাথে যুক্ত করা হয়।

১৯০৫ সালের প্রস্তাবটি কার্জনের আবিষ্কৃত নয় এবং হঠাৎ করেই হয়নি, একথা উল্লেখ করেছেন অনেক ব্রিটিশ সিভিলিয়ান। হেনরি কটন উল্লেখ করেছে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ অনেক দিনের আলোচনার পর্যালোচনারই ফল।১০ লোভাট ফেজার  মনে করেন, মধ্যপ্রদেশের চীফ কমিশনার অ্যান্ড্রু  ফ্রেজারের সম্বলপুরের সরকারি ভাষা হিন্দির পরিবর্তে উড়িয়া করার প্রস্তাবের মধ্যেই নিহিত বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব।১১

১৯০১ সালে, আবার বাংলার সীমানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। মধ্যপ্রদেশের চীফ কমিশনার ফ্রেজার প্রস্তাব করেছিলেন বাংলা ও মধ্যপ্রদেশের সীমানার খানিকটা অদলবদল করলে সম্বলপুরের ঝামেলাটা মিটে যায়। উড়িষ্যার এই ছিটমহলটি ছিল হিন্দি বলয়ে। পরবর্তীকালে ফ্রেজার তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন,বঙ্গভঙ্গের উদ্দেশ্য ছিল সীমানার ‘রিঅ্যাডজাষ্টমেন্ট’ যার তিনটি অংশ ছিল। এর প্রথমটি ছিল –

“…constitution of large Uriya Division by the addition to the existing Orissa Division Bengal of the district of Sambalpur And five Feudatory states from the Central Provinces This was a measure of great importance, though it attracted but little attention.”১২  উড়িয়া ভাষাভাষি একটি প্রদেশ হলে প্রশাসনিক সুবিধা হয়, কারন, নতুন ভাবে আবার সবাইকে ভাষা শিক্ষা করে করে কাজ করতে হবেনা।

ফ্রেজার-বর্নিত রিঅ্যাডজাষ্টমেন্টের দ্বিতীয় অংশটিও ছিল প্রথমটির প্রায় অনুরূপ। তার ভাষায় ‘was the transfer to Bengal of the five Uriya feudatory states above referred to, and the transfer from Bengal to the Central Provinces of five Hindi states, on the other side of the province. This measure was dictated by something of the same feeling as led to the transfer of Sambalpur District to the Orissa division.”১৩ ফ্রেজার উল্লেখ করেছেন এ দু’টির সঙ্গে বঙ্গবিভাগের কোনো সম্পর্কই নেই।

 ফ্রেজার উল্লেখ করেছেন , বঙ্গভঙ্গের অনেক আগেই পুর্ববঙ্গের দু’একটি জেলা আসামের অন্তর্গত ছিল। এবং প্রদেশের বাকি অংশ ‘ট্রান্সফার’ করা ছিল তার মতে, “exceedingly desirable, if not absolutely necessary”.  কারন পুর্ববঙ্গ এক বিরাট, অগম্য এলাকা। একজন লেঃ জেনারেলের পক্ষে এ ভার বহন করা সম্ভব নয়। এর ফলে দেখা যায়, প্রায় ক্ষেত্রে পুর্ববঙ্গের অনেক এলাকা অবহেলিত। অন্যদিকে আসাম এত ক্ষুদ্র তাকে নিয়েও আলাদা একটি প্রদেশ গঠন করা যায়না। সুতরাং পুর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ হওয়া বাঞ্ছনীয়।১৪

 ফ্রেজারর প্রস্তাবটি পরবর্তী দেড় বছর ধরে বিভিন্ন সিভিলিয়ানরা আলোচনা পর্যালোচনা করেন। তারপর ১৯০২ সালের ২৪ মে এ-সংক্রান্ত নথিটি কার্জনের টেবিলে পৌছালে, কার্জন আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসুত্রিতা সম্পর্কে সেই বিখ্যাত মন্তব্যটি করেন।১৫ কিন্ত, সঙ্গে সঙ্গে সীমানাসংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যা সমাধানেরও প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯০৩ সালের ১৮ মার্চের নোটে এ পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রেজার বাংলা থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ময়মনসিংহকেও আলাদা করা প্রস্তাব করেছিলেন। কার্জন অনুমোদন করেছিলেন এ প্রস্তাব। সে পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল রিজলের চিঠি যেখানে আসামের সাথে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহকে জুড়ে প্রস্তাব করা হয়েছিল আলাদা একটি প্রদেশ গঠনে।

 রিজলের চিঠিটি প্রকাশিত হবার পর থেকেই প্রতিবাদ শুরু হতে থাকে এবং কালক্রমে যা প্রবল আকার ধারন করে। গভর্নর জেনারেলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ইবেৎসন তখন এক নোটে বলেছিলেন, বিভিন্ন সংস্থা ও প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গের ব্যাক্তিগত স্বার্থ অপেক্ষা  প্রশাসনিক স্বার্থ অনেক বেশী গুরুত্বপুর্ন এবং কার্জনকে পরামর্শ দেন সব বাদ-প্রতিবাদ উপেক্ষা করে নিজের পরিকল্পনায় অটল থাকতে। তার মতে, “বাংলার [প্রশাসনিক] স্বার্থ অত্যন্ত গুরুত্ত্বপুর্ন আর আসামের জন্য তা আরও গুরুত্ত্বপুর্ন। আমার মনে হয় প্রশাসনিক প্রয়োজনে[সকল স্তরের] বিরোধিতা সত্ত্বেও এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হওয়া উচিত।’’১৬ কার্জনও ১৯০৪ সালের এক নোটে লেখেন, “যে-কোন ব্যাক্তির[প্রশাসক] পক্ষে বাংলার [প্রশাসন পরিচালনা] এক অসম্ভব ব্যাপার।[এ অবস্থায়] প্রশাসন যে অত্যন্ত দুরহ ব্যাপার তা অনুধাবনের জন্য শুধু তাকে জেলায় যেতে হবে।১৭

১৯০৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে এ প্রস্তাব নিয়ে আরও কিছু লেখালেখি হয়। ঢাকার কমিশনার স্যাভেজ লিখেছিলেন, পুর্ব বাংলাকে এমন ভাবে প্রদেশে পরিনত করা উচিৎ যেখানে সম্ভব হবে একটি ব্যবস্থাপক পরিষদ গঠন করা। কার্জন এর সাথে পাবনা, বগুড়া ও রংপুরকেও যুক্ত করার প্রস্তাব রাখেন। ১৯০৪ সালের ২২ এপ্রিল বাংলা সরকার অবশেষে সমর্থ হয় একটি পুর্নাঙ্গ প্রস্তাব তৈরি করতে।১৮

বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব কিন্ত কার্যকর হয়েছিল ভারপ্রাপ্ত গভর্নর জেনারেল আম্পটহিলের আমলে। ১৯০৪ সালের ৩০ এপ্রিল কার্জন ইংল্যান্ড চলে যান ছুটি কাটাতে। সাময়িকভাবে কার্যভার গ্রহন করেন অ্যাম্পটহিল। এ সময় রিজলে আবার আবির্ভুত হন দৃশ্যপটে।তিনি নতুন প্রশাসনিক বিভাগে রাজশাহী বিভাগ ও মালদা জেলাকে যুক্ত করার প্রস্তাব করেন। সবশেষে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সমাপ্ত করা হয় ১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে।কার্জন ছুটি কাটিয়ে এসে রিজলের প্রতিবেদন গ্রহন করে ভারত সচিবের কাছে পাঠিয়ে দেন। কার্জন সচিবকে এ প্রস্তাবের প্রশাসনিক সুবিধাগুলি তুলে ধরেন। ইন্ডিয়া অফিসের সাবেক সচিবকে গডলেকেও কার্জন উল্লেখ করেন বঙ্গভঙ্গ হচ্ছে “প্রথম শ্রেনীর এক প্রশাসনিক সংস্কার।’’১৯

১৯০৫ সালের ৯ জুন ব্রিটিশ সরকার এ প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, পার্বত্য ত্রিপুরা এবং আসাম নিয়ে গঠিত হয় পুর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ। এ সময় এ প্রদেশের জনসংখ্যা ছিল তিন কোটি ১০ লক্ষ। সংখ্যাগরিষ্ট ছিল মুসলমান সম্প্রদায়- এক কোটি ৮০ লক্ষ। এ পরিকল্পনা কার্যকর  হয় ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। পরবর্তীকালে[১৯১২] লর্ড হার্ডিঞ্জ কার্জনকে লিখেছিলেন-“ [বাংলা] বিভাগ ছিল একটি বিরাট প্রশাসনিক সংস্কার, প্রয়োজনীয় ও যুক্তিসঙ্গত আর এর জন্যে কৃতিত্বের দাবিদার আপনিই।”২০

বঙ্গ বিভাগ করার পিছনে প্রশাসনিক যে যুক্তিগুলো সিভিলিয়ানরা উল্লেখ করেছেন তা একেবারে যুক্তিহীন নয়। সে সময় ও বাস্তবতার কথা মনে রাখলে ঐসব যুক্তি একেবারে নাকচ করা যায়না। তবে, শেষ পর্যায়ে প্রশাসনিক সুবিধাগুলির কথা যখন তারা ভাবছিলেন তখন  এর সাথে রাজনৈতিক সুবিধাগুলিও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে, এবং যুক্ত হয় রাজনৈতিক আয়তন।…..সামগ্রিকভাবে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি এলিটদের একটি ক্ষোভ ছিলই। কংগ্রেস গঠন, বিভিন্ন সভাসমিতির কার্যকলাপ ও সংবাদ সাময়িকপত্রের মাধ্যমে ক্রমেই তা দানা বাধছিল।…..এই পরিপ্রেক্ষিতে ভ্যালেন্টিন চিরল লর্ড মিন্টোকে যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন তা উদ্ধৃত করা যেতে পারে। প্রতিবেদনটি ১৯১০ সালের কিন্তু তার ত্রিশ বছর আগের পটভুমিকার উল্লেখ আছে সেখানে। চিরল লিখেছিলেন-

“এটা নিঃসন্দেহ যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে অসন্তোষ দানা বেধেছে তা প্রধানত কৃত্রিম , কিন্ত যা মুলত আমাকে ভীতসন্ত্রস্ত করে আর যা আমার নিকট অত্যন্ত অশুভ তা হল পাশ্চাত্যের প্রভাব প্রতিপত্তি , বিশেষ করে এর আত্মিক ও নৈতিক , পার্থিব ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সর্বাত্মক বিপ্লবের আন্দোলন। মাঞ্চুরিয়ায় জাপানী বিজয় নিঃসন্দেহে এ আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে কিন্তু এর মুল প্রোথিত আর গভীরে। এ আন্দোলন এশিয়াব্যাপী প্রাচ্যের নবজাগরনের কোন ভারতীয় অভিব্যাক্তি নয়। বরং এ আন্দোলন হল প্রধানত হিন্দু [পুনজাগরনের] আন্দোলন। ত্রিশ বছর পুর্বে যখন আমি ভারতে এসেছিলাম তখন লক্ষ করেছিলাম, নতুন আশায় উদ্বেল নতুন ভারত বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে হতে চেয়েছিল ইংরেজদের চেয়েও বড় ইংরেজ মনোভাবাপন্ন।” এখন অবস্থা তার বিপরীত এবং “এ যেন প্রাচীন স্বর্নযুগে প্রত্যাবর্তন যখন ‘দুষ্কৃতিকারী’ ইংরেজদের আগমনের পুর্ন অগ্রগতি ও উন্নতি সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল। বর্তমানে আমরা বাংলা, দাক্ষিণাত্য ও পাঞ্জাবের মত তিনটি ঝটিকা কেন্দ্রে এ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি।”২১

এমাজউদ্দিনের মতে , এভাবে কার্জন দক্ষিনে মারাঠা ব্রাম্মণ ও পুবে ভদ্রলোকদের প্রভাব ক্ষুন্ন করতে চেয়েছিলেন।২২ তবে, তিনি যে উল্লেখ করেছেন প্রথম থেকেই শুদ্ধ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেই বঙ্গভঙ্গের চিন্তা করা হয়েছিল এ মতটি মেনে নেয়া কষ্টকর। বরং, রাজনৈতিক আয়তন যুক্তের যে ব্যাখ্যাটি (এবং সময়) উল্লেখ করেছি তাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এমাজউদ্দিন কার্জন বা ফ্রেজারের যেসব চিঠির (রাজনৈতিক সুবিধার উল্লেখ করে) উল্লেখ করেছেন সেগুলোও লেখা হয়েছে ১৯০৩ থেকে ১৯০৫-এর মধ্যে।

বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক সুবিধার কথাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন রিজলে, প্রথম ১৯০৪ সালে। তার মতে, পুর্ববঙ্গে এ প্রতিবাদ আন্দোলনের নেতৃত্বে আছে শিক্ষিত ক্ষুদ্র একটি গোষ্টি এবং ‘বাবু’রা বঙ্গভঙ্গের কারনে পেশাগত বা অর্থনৈতিক কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারেন এই চিন্তায়ই বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করা হচ্ছে। তিনি লিখেছিলেন, ঐক্যবদ্ধ বাংলা একটি শক্তি; বিভক্ত বাংলা যা নয়…আমাদের উদ্দেশ্য একে বিভক্ত করা এবং আমাদের শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বিরোধীদের দুর্বল করে তোলা।২৩

ফ্রেজার ও কার্জনও পরে এই বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। কার্জন রিজলের নোটের পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছিলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি যাতে চাপা থাকে কারন তা না হলে প্রতিবাদ হবে। “আর আমাদের মুল উদ্দেশ্যটি ব্যহত হবে…পরিষদ চেম্বারের অভ্যন্তরে একা একা যে কথা বলা যায় তা কোনক্রমেই ঘরের ছাদ থেকে ঘোষণা করা যায়না।”২৪ পরে আরও স্পষ্ট করে তিনি বলেছিলেন , বাঙালী বাবুরা চায় ইংরেজরা পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যাক যাতে গভর্নর হাউজ তারা দখল করতে পারে। তাদের হট্টগোলের বিপরীতে যদি আমরা নতি স্বীকার করি তা’হলে আর বঙ্গ বিভক্ত করা যাবেনা এবং এর ফলাফলটি কি হবে? “You will be cementing and solidifying, on the eastern flank of india , a force already formidable and certain to be force of increasing trouble in future.”২৫

ইবেৎসনও একই বিষয় উল্লেখ করেছেন তার নোটে যার মুল বক্তব্য হলো, বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার আন্দোলনকারী ক্ষুদ্র গোষ্টীর প্রভাব নিশ্চিহ্ন করা বাঞ্ছনীয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে, পুর্ববঙ্গ সফরের সময় পরিস্থিতি বুঝে কার্জন বিভক্ত ও শাসন করার নীতি প্রয়োগ করেন। পুর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বক্তৃতায় তিনি এই বিষয়টিই তুলে ধরেন যে, বঙ্গ বিভাগ হলে এই অঞ্চলের মুসলমানেরা সুযোগ-সুবিধা পাবে বেশি। ঢাকার নবার সলিমুল্লাহও যোগ দেন তার সঙ্গে। ফলে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু নীরব অংশের সমর্থন লাভ করেন কার্জন।

১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে রিজলে সামগ্রিক পরিস্থতির মুল্যায়ন করেন এভাবে বাঙালী ভদ্রলোকেরা সব সময় পুর্ববাংলার মুসলমানদের উপর প্রভুত্ত্ব করতে চেয়েছে। পুর্ববাংলার প্রভাবশালি মুসলমানদের তাদের নিয়ন্ত্রনে আনবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা এতদিন পর্যন্ত ঢাকার নবাবদের প্রভাবের দ্বারা প্রতিহত সম্ভব হয়েছে। [পুর্বাঞ্চলে] মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ট প্রদেশ গঠনের প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে। যদি ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হয় তাহলে সে সম্ভাবনা সুদুরপরাহত হবে।”২৬

এরপর দৃঢ় মনোভাব নিয়ে বঙ্গভঙ্গ করবার পথে এগিয়ে গিয়েছিল সরকার।

বঙ্গভঙ্গ রেফারেন্স ১

[উৎসঃ মুনতাসীর মামুন, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও পূর্ববঙ্গে প্রতিক্রিয়া, মাওলা ব্রাদার্স, প্রথম প্রকাশ, ১৯৯৯]

১৯০৫ সালের বাংলাভাগ ও পূর্ববাংলায় প্রতিক্রিয়া-পর্ব ২

প্রাসঙ্গিক পোষ্টঃ

বঙ্গভঙ্গের পর সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়া নুরুল কবীর

Facebook Comments